• মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৪ মাঘ ১৪২৮
  • ||

স্বমহিমায় আলোকিত কল্যাণব্রতী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

প্রকাশ:  ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:৩০
ড. কাজী এরতেজা হাসান

তার পারিবারিক পরিচয় কারও কাছে অজানা নয়। তিনি যে পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য, সেই পরিবারটির রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য। তার মাতামহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মা বাংলাদেশের চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাবা প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম ও ওয়াজেদ মিয়া। কাজেই পাদপ্রদীপের আলোয় এসে রাজনৈতিক জীবন বেছে নেওয়ার সব সুযোগ তার ছিল। কিন্তু সে পথে গেলেন না সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বেছে নিলেন অন্য এক জীবন। সে জীবনও মানুষের আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কল্যাণব্রতে নিবেদিত। বাঙালি নারী হয়েও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নিজেকে এই সাধনায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন পারিবারিক সংস্কৃতি থেকে অর্জিত ইচ্ছাশক্তির গুণে। ইচ্ছাশক্তিই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ আমরা পাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারে। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর তার জীবিত দুই কন্যা রাজনীতির প্রতি বিমুখ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসার টানে দেশ সেবাকেই ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন তাঁরা।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আজ একজন বিশ্বখ্যাত অটিজম বিশেষজ্ঞ। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বেই তিনি অটিস্টিক শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একজন সদস্য। কেউ ভাববেন না প্রধানমন্ত্রীর কন্যা হিসেবে তিনি এই সুযোগ পেয়েছেন। একজন স্বীকৃত মনোবিজ্ঞানী এবং অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেই তার এ অর্জন। সায়মা ওয়াজেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ক্লিনিক্যাল মনস্তত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। স্কুল মনস্তত্ত্বেও রয়েছে তার ডিগ্রি। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তার গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। শিশুদের অটিজম এবং স্নায়ুবিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব সংস্থা তাকে ‘হু অ্যাক্সিলেন্স’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

সম্পর্কিত খবর

    ৯ ডিসেম্বর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্মদিনে তার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার সকালে ‘বেগম রোকেয়া দিবস-২০২১’ ও ‘বেগম রোকেয়া পদক-২০২১’ প্রদান অনুষ্ঠানে মেয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চান প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটি অনুরোধ করবো, আজকে আমার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্মদিন, সবার কাছে দোয়া চাই।’ অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য পুতুলের অবদানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সে (সায়মা ওয়াজেদ) অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছে। একটা বিরাট পরিবর্তন আনতে পেরেছে সায়মা ওয়াজেদ। সেটা হলো এখন কেউ এই অটিস্টিক বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু বলে তাদেরকে আর লুকিয়ে রাখে না।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এক সময় এই অটিস্টিক বা প্রতিবন্ধী শিশুরা জন্ম নিলে বাবা-মা তাদের সন্তানকে লুকিয়ে রাখতো। যদি কোনো মায়ের সন্তান, কিন্তু সেই জন্ম দিলো কেন মাকেও পরিবারে অনেক সময় লাঞ্চিত হতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এমনকি এই ধরনের বিকলাঙ শিশু বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু জন্ম নিলে ওই নারীকে তার স্বামী তালাক দিয়ে দিয়েছে বা আরেকটা বিয়ে করেছে। এই ধরনের একটা অবস্থা আমাদের সমাজে ছিল। এই শিশুটিকে লুকিয়ে রাখতো, এই শিশুকে সমাজের সামনে আনতে চাইতো না, আনতে লজ্জা পেতো।’ অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের কল্যাণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

    প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার একমাত্র মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্মদিন ৯ ডিসেম্বর। ১৯৭২ সালের আজকের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সারাবিশ্বে অটিস্টিক শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন পুতুল। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একজন সদস্য ও একজন মনোবিজ্ঞানী। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম এবং স্নায়ুবিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে তার কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পুতুলকে ‘ডব্লিউএইচও অ্যাক্সিলেন্স’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে। মনস্তত্ত্ববিদ সায়মা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটিজম স্পিকসের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। তিনি ২০১৩ সালের জুন থেকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হন।

    কবিগুরুর এই কথাগুলো কী চমৎকারভাবে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর জোট ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) দূত নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। সায়মার সঙ্গে দূত হিসেবে আরও রয়েছেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান স্পিকার মোহাম্মদ নাশিদ, ফিলিপাইনের জাতীয় সংসদের উপস্পিকার লরেন লেগার্দা ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর প্রধান জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ তোসি এমপানু-এমপানু। সিভিএফের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর আকাক্সক্ষার, সংস্কৃতি, অর্থায়ন, সংসদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ঝুঁকিকে ছয়টি মূল বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ঝুঁকির বিষয়ে ‘থিমেটিক অ্যাম্বাসেডর’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিএইচও) মহাপরিচালকের উপদেষ্টা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

    মানুষের ধর্ম নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও তার সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস। জন্তুদের বাস ভূমণ্ডলে, মানুষের বাস সেইখানে যাকে সে বলে তার দেশ। দেশ কেবল ভৌমিক নয়, দেশ মানসিক। মানুষে মানুষে মিলিয়ে এই দেশ জ্ঞানে জ্ঞানে, কর্মে কর্মে। যুগযুগান্তরের প্রবাহিত চিন্তাধারায় প্রীতিধারায় দেশের মন ফলে শস্যে সমৃদ্ধ। বহু লোকের আত্মত্যাগে দেশের গৌরব সমুজ্জ্বল। যে-সব দেশবাসী অতীতকালের তারা বস্তুত বাস করতেন ভবিষ্যতে। তাদের ইচ্ছার গতি কর্মের গতি ছিল আগামীকালের অভিমুখে। তাদের তপস্যার ভবিষ্যৎ আজ বর্তমান হয়েছে আমাদের মধ্যে, কিন্তু আবদ্ধ হয়নি। আবার আমরাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে উৎসর্গ করছি। সেই ভবিষ্যৎকে ব্যক্তিগতরূপে আমরা ভোগ করব না। যে তপস্বীরা অন্তহীন ভবিষ্যতে বাস করতেন, ভবিষ্যতে যাদের আনন্দ, যাদের আশা, যাদের গৌরব, মানুষের সভ্যতা তাদেরই রচনা। তাদেরই স্মরণ করে মানুষ আপনাকে জেনেছে অমৃতের সন্তান, বুঝেছে যে, তার দৃষ্টি, তার সৃষ্টি, তার চরিত্র, মৃত্যুকে পেরিয়ে। মৃত্যুর মধ্যে গিয়ে যারা অমৃতকে প্রমাণ করেছেন তাদের দানেই দেশ রচিত। ভাবীকালবাসীরা, শুধু আপন দেশকে নয়, সব পৃথিবীর লোককে অধিকার করেছেন। তাদের চিন্তা, তাদের কর্ম, জাতিবর্ণ নির্বিচারে সব মানুষের। সবাই তাদের সম্পদের উত্তরাধিকারী। তারাই প্রমাণ করেন, সব মানুষকে নিয়ে; সব মানুষকে অতিক্রম করে, সীমাবদ্ধ কালকে পার হয়ে এক-মানুষ বিরাজিত। সেই মানুষকেই প্রকাশ করতে হবে, শ্রেষ্ঠস্থান দিতে হবে বলেই মানুষের বাস দেশে। অর্থাৎ, এমন জায়গায় যেখানে প্রত্যেক মানুষের বিস্তার খণ্ড খণ্ড দেশকালপাত্র ছাড়িয়ে-যেখানে মানুষের বিদ্যা, মানুষের সাধনা সত্য হয় সকল কালের সকল মানুষকে নিয়ে।’ সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সেই মানুষের ধর্ম পালন করে চলেছেন। পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচিতির বাইরে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নিজেকে ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত করেছেন একজন প্রখ্যাত অটিজম বিশেষজ্ঞ হিসেবে। বিশ্বব্যাপী অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একজন সদস্য। ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ও ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল মনস্তত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তার গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত হয়। তাই এ কথা খুব সহজেই বলতে পারি, স্বমহিমায় আলোকিত কল্যাণব্রতী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। জন্মদিনে তার দীর্ঘায়ু এবং সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

    লেখক:

    সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক ভোরের পাতা, দ্য পিপলস টাইম

    সহ-সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ

    সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

    পরিচালক, এফবিসিসিআই

    প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইরান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close