• বৃহস্পতিবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮
  • ||

বর্তমান সমাজ ও তারুণ্যের সংকট 

প্রকাশ:  ২৯ নভেম্বর ২০২১, ২৩:২৭ | আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২১, ২৩:৩১
নবনীতা চক্রবর্তী

''ওরে নবীন ওরে কাঁচা আধমরাদের ঘা দিয়ে তুই বাঁচা'' বোধ করি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ঘা শব্দটিকে একটি নবজোয়ার বা নতুন প্রাণসঞ্চার করার অর্থেই ব্যবহার করেছেন। যেখানে তরুণরা তাদের নতুন সৃষ্টি সত্তা দিয়ে, সৃজনশীলতা দিয়ে উদ্যাম দিয়ে পৃথিবীকে প্রাণ প্রাচুর্যময় করবে। তাদের কর্ম দিয়ে সমৃদ্ধি ঘটাবে। বিধিবাম, বর্তমান যুব সমাজ বা ত্রুন প্রজন্মর দশা অবলোকন করলে কবিগুরু কি লিখতেন বা পরামর্শ দিতেন তা জানি না তবে চিত্র বড়ই চিন্তাদায়ক।

হতাশা জ্ঞাপন করা এই লেখনীর উদ্দেশ্য নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করা ও তার সমাধান খোঁজাই মূল লক্ষ্য। একটি প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তরুণরা কেন সহিংসতার দিকে ঝুঁকছে? কয়েকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক, গণমাধ্যমের সূত্রমতে, এই ১৯ অক্টোবরের ঘটনা। দাদা মোস্তাফাকে খুজঁতে বের হয় নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুল্লাহপুর গ্রামের ৭ বছরের শিশু জেমি। তারপর পাশের বাড়ির কিশোর ইমরান তাকে তার নিজ বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর গলা টিপে হত্যা করে লাশ পলিথিনে মুড়ে লুকিয়ে রাখে বাড়ির টয়লেটে, তারপর একসময় লাশ ফেলে দেয় পাশের ধানক্ষেতে। পরের দিন সকালে সেই লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাজধানীর কামরাঙ্গীচরের কয়লাধাট এলাকায় পায়ে পা দেওয়ার মতো ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যার শিকার হয় সিফাত নামে ১২ বছরের কিশোর। এই হত্যাকান্ডে যারা অভিযুক্ত তাদের প্রত্যেকের বয়স ১০ থেকে ১৩। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। মোহাম্মদপুর বা উওরা, মধ্যবিত্ত এলাকা না উচ্চবিত্ত এলাকা, ঢাকা অথবা ঢাকার বাইরে এই ধরণের সহিংস উগ্রবাদের সংস্কৃতি তৈরী হচ্ছে। জিরো জিরো নাইন, নাইন স্টার, ডিস্কো গ্রুপ, নারা গ্রুপ, নামের ভয়ানক সব কিশোর অপরাধমূলক গ্যাং গড়ে উঠছে। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রকাশ্যে খুনখারাপি এবং মাদক ব্যবসার মতো কার্যক্রমে জড়াচ্ছে।

সম্পর্কিত খবর

    সম্প্রতি পীরগঞ্জের হামলায় তরুণদের সমৃক্ততা আবার প্রমাণ করে তরুণরা কোথায় ভিতরে ভিতরে মারমুখী হয়ে উঠছে, ক্ষমতালিন্সু হয়ে উঠছে, অস্থির হয়ে উঠছে যেটি নিঃসন্দেহে সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত। এখন অনেকেই আমরা আঙ্গুল তুলবো তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পৃক্ততার সাথে। সেটা কিন্তু একমাত্র সমস্যা নয়। কারণ এখন কারো চলন বলন কথার ধরণ এমনকি পোশাকের উপস্থাপনে পরিদৃশ্যত হয় এক চিত্র বাস্তবে তার মননশীলতায় ও কর্মে দেখা যায় আরেক চিত্র। যা একেবারেই নৈতিক আর্দশের পরিপন্থী। মুখে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আর্দশের ঝান্ডা উঁচিয়ে রাখলেই যে রাতারাতি সে সেই দলভুক্ত হবেন বা সেই দলের আর্দশ বুঝতে, ধারণ করতে সক্ষম হবেন এমনটা নয়। আবার দলের হয়ে তাকে খুব কাজ করতে দেখা গেলেও আবার তিনি যখন একটি দ্বায়িত্বশীল অবস্থান প্রাপ্ত হোন অমনি রাতারাতি তাকেই ভোল পালটে নিজের স্বার্থসিদ্ধিতে বা উদ্ধারে বেগবান হতে দেখা যায়। এখন এই অনুপ্রবেশকারি ও সুবিধাবাদী দুই ধরণের মানুষ শুধু সংগঠন নয় সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সমান ক্ষতিকর। তাই সাবধান হওয়ার সময় এখনই। কোন রাজনৈতিক দলকে কোন ব্যক্তি বিশেষ যেন তার স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার বানাতে না পারে সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সেই দলের। সমস্যার শিকড় আরো গভীরে প্রোথিত। যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যায় তাহলে অতীত রোহমন্থন করলে দেখা যায় ৭৫ পরবর্তীকালে ছাত্র রাজনীতির আমূল চরিত্রটাই বদলে গিয়েছে। সেই বদলে যাওয়া চরিত্রতে ক্ষুরধার স্লোগান আর লেখনির বদলে অস্ত্র আর অর্থের ঝনঝনানি। বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতির বদলে লাশের রাজনীতি সূত্রপাত। কেন্নো আর কীটদের আগমন ঘটলো রাজনীতিতে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দ্বার উন্মোচন করে তৎকালীন ক্ষমতার মসনদে উপবিষ্ট সামরিক জান্তা রাজনীতির এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূত্রপাত করলেন।

    রাজনীতির নতুন ট্যাগ লাইন হল “মানি ইজ নো প্রবলেম।" সেই অর্থলিন্সুতা, ক্ষমতার মোহ, দম্ভ, ধর্মের মোড়কে ফায়দা লোটার মচ্ছবের সূত্রপাত সেখানেই। ক্ষয়িষূ হতে লাগলো সমাজ। যার লাগাম বোধহয় এক পাগলা ঘোড়ার হাতে কিছুতেই বশে আনা যাচ্ছে না।

    রাজনীতি নিঃসন্দেহে সমাজকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে একটা সময় ছিল যখন পারিবারিক অনুশাসন ছিল মজবুত। যেখানে ভয়, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা স্নেহ, উদারতা, মানবিক শুভবোধ, সম্প্রীতির চর্চা দ্বায়িত্ব মিলেমিশে সমান্তরালভাবে ছিল। এখন এত বেশি আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনে নিজেদেরই আবদ্ধ করে ফেলেছি যে কারোই কারো দিকে তাকানোর সময় নেই, বলা ভালো আমরা দেখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করি না। আমাদের এখন চারপাশে এত যান্ত্রিক অপশন আছে যে মানু্ষের সঙ্গের প্রয়োজন আর অনুভূত হয়না। হলেও আমরা আসলে মানুষ খুঁজে পাইনা। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ , টিকটক এগুলোই এখন আমাদের জীবন ও জগত। এখন আমরা পোশাক পরি ফেসবুকের কথা ভেবে, খাবার খাই বা বেড়াতে যাই ফেসবুকের চিন্তা নিয়ে। সকাল থেকে রাত্রি লাগামহীন যার ব্যবহার। প্রিয়জনের সাথে এখন সময় কাটানো মুখ্য বিষয় নয়। ছবি তুলে সেটা ফেসবুকে আপলোড করার মধ্যেই সর্বসুখ নিহিত। তারপর কত লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার হলো সেটা দেখে পরবর্তী পরিকল্পনা করা। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের ভালোলাগা, মন্দলাগা শেয়ার করার মধ্যে বিষয়টি আর সীমাবদ্ধ নেই। রীতিমতো এটি আমাদের জীবনের একটি নিয়ামক হয়ে উঠেছে। অদ্ভূতভাবে এই অ্যাপসগুলো আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক। অবিরত একটি কৃত্রিম ও কল্পনামুখী জগতের সাথে থাকতে থাকতে আমরা নিজেরাও অমন মুখোশ আটা কৃত্রিম হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সমস্ত মূল্যবোধগুলো আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এই যে আমরা প্রতিনিয়ত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছি, প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছি, গলে যাচ্ছি, পঁচে যাচ্ছি এই যে অধঃপতন হচ্ছে সেই বোধটুকুও আমরা হারিয়ে ফেলছি। এই বিলাসব্যসনের যাপিত জীবন ধারায় আমাদের আয়োজন আছে, আড়ম্বতা আছে, জমকালো আনুষ্ঠানিকতা আছে শুধু নেই হ্রদি দিয়ে হ্রদি অনুভবের হ্রদয়ের উষ্ণতা, মানুষের সত্যিকারের সান্নিধ্য। এক শুন্যতার গহব্বরে আমাদের ক্রমশ নিমজ্জন ঘটছে। সেই সাথে সামাজিক স্তরে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাশ্বীর্য় সহিংসতা বা হরাইজেন্টাল ভায়োলেন্স। কি সেটা। খুব সহজভাবে বললে এটি হলো একটি মানুষের উপর আরেকটি মানুষের নেতিবাচক আচরণের সমষ্টি যার মাধ্যমে নিপীড়ন করা হয়। একজন মানুষকে উপেক্ষা করা, তাকে অসম্মান করা তার অবমূল্যায়ন ঘটানো। তাকে ভীত করে তোলা। যার ফলে একটি মানুষের মনে রাগ ও ক্ষোভ তৈরী হয়। সে আরেকজন মানুষকে তার প্রতিযোগী হিসেবে গণ্য করে। নিজের অস্তিত্বকে বিপন্ন প্রতিপন্ন করে তোলে। ভুগতে থেকে অস্তিত্বের সংকটে। ফলে মানুষের উপর অবিশ্বাস তৈরী হয়। এই প্রক্রিয়ার দ্বারা সে নিজের আত্মাবিশ্বাস হারাতে থাকে এবং তার সৃষ্টি ক্ষমতা ব্যাহত হতে থাকে। কোথাও আমরা আধুনিকতার মোড়কে নব্য সমাজ তৈরীতে স্থুল নৈতিকতা নির্মাণ করছি। পরিবর্তনশীল দ্বন্দমুখর সমাজ হারাচ্ছে তার মানবিক রুপ হারাচ্ছে নৈতিকতা। তাই বুদ্ধিভত্তিক সামাজিক মূল্যবোধ চর্চার সময় ঠিক এখনই। সুযোগ আর সম্ভাবনা যেমন তৈরী করতে হবে তেমন সেটিকে যথাযোগ্য কাজেও লাগাতে হবে। “যদি ভালোবাসা পাই তবে শুধরে নেব জীবনের ভুলগুলো ‘’ আমাদের তরুণ সমাজই সেই ভুল শুধরে নেওয়ার ভালোবাসা। পঁয়ষট্টি শতাংশ তারুণ্য নির্ভরদেশে তরুণদের উপর আস্থা রাখতেই হবে। তারা করুণা চায়না তারা বিকশিত হতে চায়। তারা তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সভ্যতার বুকে কল্যাণকর চিহ্ন রেখে যেতে চায়। তারা কাজী নজরুলের ভাষায় “ঝঞ্জার মতো উদ্দাম/ঝর্ণার মতো চঞ্চল/বিধাতার মতো নির্ভয়/প্রকৃতির মতো স্বচ্ছল।" তারা, ''বন্ধনহীন জন্ম স্বাধীন চিত্ত মুক্ত শতদল।'' তারাই ভবিষ্যৎ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন সোনার বাংলার।

    লেখক: শিক্ষক, ইউনিভাসির্টি অফ ইনফরমেশন সায়েন্স এ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা, বাংলাদেশ।

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close