• রোববার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

রাজনীতিহীন দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম সংকট

প্রকাশ:  ১৭ নভেম্বর ২০২১, ০০:১৭ | আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২১, ০০:২০
পীর হাবিবুর রহমান

রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই এমন কথা হামেশাই বলে আসছেন সবাই। আসলে দেশে যেমন রাজনীতি নেই তেমনি নেই রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের গভীর শূন্যতার মুখে আজ গোটা দেশ। জাতীয় পর্যায় থেকে তৃণমূলে সেকালের মতো একালে নেই গণমুখী চরিত্রের নির্লোভ আদর্শিক রাজনীতিবিদ।

রাজনৈতিক শূন্যতা ও রাজনীতিবিদদের যে সংকট তৈরি হয়েছে তার বিরূপ প্রভাব আজ রাষ্ট্রের সকল অঙ্গেই নয়, গোটা সমাজেই পড়েছে। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক এ শূন্যতা এক দিনে তৈরি হয়নি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের স্রোতধারায় এটি তৈরি হয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

    যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এটি শুরু হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার পরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে একের পর এক আঘাতে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের শাসন ক্ষমতায় চারদিক জুড়ে কেবল হাহাকার আর অন্তহীন শূন্যতার ওপর বসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনো স্বস্তি পাননি, শান্তি দূরে থাক। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গোটা দেশকে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল তাদের প্রতিহিংসার পোড়ামাটি নীতি অবলম্বন করে।

    সেই দেশে ক্ষমতায় বসতে না বসতেই ডাকসু নির্বাচনের প্রয়োজন ছয় মাসের মধ্যে কেন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল তা রহস্যময়। ছাত্রলীগের সম্মেলন দ্রুত সম্পন্ন করে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান সিরাজুল আলম খান যে ভাঙন ডেকে এনেছিলেন সেটি জাতীয়তাবাদী শক্তিকেই দুর্বল করেনি, দেশের রাজনীতিতে সর্বনাশা আগুন জ্বালিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে উঠে আসা মেধাবী, দেশপ্রেমিক টগবগে তারুণ্যকে টেনে নিয়ে জাসদ নামের দলটি গড়েছিলেন স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা আ স ম আবদুর রব, মরহুম শাজাহান সিরাজদের নিয়ে। রাজনীতির রহস্যপুরুষ খ্যাত সিরাজুল আলম খান জাসদের সভাপতি বানিয়েছিলেন মেজর জলিলকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচি ওই একবার জাসদই করেছিল।

    লাশ আর রক্তের সিঁড়িপথে নেতাদের কারাবন্দী হতে হয়েছিল। সবকিছুই ছিল রহস্যঘেরা। একপর্যায়ে রোমান্টিক উগ্র হঠকারী স্লোগানের পথে জাসদ নামের দলটিতে একাত্তরের আলবদররাও আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয় নিয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার পুত্ররা। একপর্যায়ে জাসদ আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে গিয়ে নকশালবাড়ী স্টাইলে যে রাজনীতি শুরু করে সেটি একটি সরকারকে অস্থির, অশান্ত করে তোলে। এমনকি সেনাবাহিনীর সৈনিকদের মধ্যে কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা ও তার পরিণতি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড-উত্তর খুনি মোশতাকদের হটানো বীরউত্তম খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দিয়ে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার রাজনৈতিক চিত্রপট নতুন প্রজন্ম না জানলেও এ দেশের রাজনীতিতে ক্ষত হয়ে আছে। মাঝখানে খালেদ মোশাররফের লাশের ওপর দিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর খুনি মোশতাক চক্র শাসন চালিয়েছিল তার অবসান ঘটিয়ে জেনারেল জিয়ার ফৌজি শাসন বা একনায়কতন্ত্রের অন্ধকার রক্তাক্ত শাসন কায়েম হয়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে বিশ্ব মোড়ল ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নানামুখী ষড়যন্ত্র ও তুমুল বৈরিতার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু তার শাসনামলে কেবল জাসদের উগ্র হঠকারী ভাঙনের রাজনীতিই সর্বনাশা খেলা খেলেনি সেদিন পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি বা সিরাজ সিকদাররা রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিদের হত্যা, থানালুট, পাটের গুদামে আগুনসহ নৈরাজ্যের চরম পন্থা গ্রহণ করেছিল। সেদিন চীনপন্থি অন্য উগ্র সংগঠনের নেতারাও হঠকারিতার সর্বনাশা আগুন নিয়ে খেলেছিলেন। মুজিব সরকার উৎখাতের বিষাক্ত রাজনীতি ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্রের ডালপালাকে বিস্তৃত করেছিল চারদিকে। মস্কোপন্থি বামপন্থি ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টিও সেদিন কার্যকর গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকায় না গিয়ে শাসকদলের সঙ্গে জোট গড়ে আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তো দলের সাইনবোর্ড বিলুপ্ত করে বাকশালে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। মওলানা ভাসানীর ন্যাপও মাঠের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর চরম বিরোধিতার রাজনীতি করেছিল। সেইসঙ্গে নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তি আর অতিবাম মিলে ভারতবিরোধী জিকিরও চারদিকে ছড়িয়েছিল। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে না। তাই নানা মহল থেকে সতর্ক করলেও তিনি আমলে নেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল ঘাতক পরিবার-পরিজনসহ তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন হত্যাকান্ড নজিরবিহীন। সেদিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তারা খুনি সরকারকে প্রতিরোধ না করে তাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ছিল লজ্জা ও বেদনার। সেদিন ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধই করেনি খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল। সামরিক শাসকরাই এ কুৎসিত বিকৃত অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের উত্তরাধিকার বহন করেছে। সামরিক শাসন-উত্তর বিএনপির ক্ষমতাকালেও এটি অনুসরণ করা হয়। বিএনপি নেতৃত্ব কথা দিয়েও সেদিন কথা রাখেনি। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেদিন সুগন্ধায় নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন, তৎকালীন বিরোধী দল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো কালো আইন মাথার ওপর ঝুলিয়ে সেখানে যেতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বিএনপির পাঁচ-ছয় জন মন্ত্রী সংসদের বিরোধী দলনেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে আশ্বাস দিয়েছিলেন যদি তিনি এ নৈশভোজে অংশ নেন তাহলে একটা পরিবেশ তৈরি হবে এবং তারা এ কালো আইন বাতিল করবেন। সেদিন তাদের আশ্বাসে দ্রুত নেতাদের অবহিত করে শেখ হাসিনা নৈশভোজে অংশ নেন। একই সঙ্গে সেবার বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী বা জাতীয় শোক দিবসে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের দোয়া মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা গ্রহণ করেন। নেতারা অপেক্ষায় ছিলেন তিনি ৩২ নম্বরে আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আসেননি এবং ইনডেমনিটি বিলও বাতিল করেননি। পরবর্তীতে ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন ঘোষণা করে কেক কাটার বীভৎস উৎসব সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতিকে দুর্বলই করেনি সমঝোতার রাজনীতির পথে কাঁটা বিছিয়ে দেয়। আর একুশের ভয়ংকর গ্রেনেড হামলা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের যে প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে শুরু হয়েছিল সেটিরও শেষ কফিনে পেরেক ঠুকে দেয়।

    জাসদ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তার সর্বশেষ সর্বনাশা খেলা ঘটে যায় ওয়ান-ইলেভেনে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বসিয়ে। এটা দেশের অভ্যন্তরে একদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিএনপির ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকার ভ্রান্ত নীতির পথে মুখোমুখি দুই প্রধান দলের অবস্থানের মুখে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। এ ঘটনা দেশের জাতীয় ও তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশকেই মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি, সিভিল সোসাইটির একাংশকেও অবিশ্বস্ত ও বিতর্কিত করে যায়। সেই জাসদের পরিণতি কোথায় দাঁড়িয়েছে আজকের বাংলাদেশে তা দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধুর আশ্রয়ে থাকা সিরাজুল আলম খান যতটা জ্বলেছিলেন বাইরে গিয়ে ব্যর্থতার কলঙ্ক মাথায় নিয়ে রাজনীতিতে ততটাই নিভে যান। উগ্র চীনপন্থিরা রাজনীতিতে কার্যত নির্বংশ হয়ে যান। অতিবাম নেতারা সামরিক শাসকদের মন্ত্রিত্ব ভোগ করে মওলানা ভাসানীর রাজনীতিকে কবর দিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বেনিফিশিয়ারি সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের অতিবাম, অতিডান আর কিছু মেধাবী মানুষ নিয়ে গড়া বিএনপির ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা আজকের রুগ্ন চেহারা দেখলে মনে হয় ইতিহাস তার প্রতিশোধ আপন মহিমায় নিয়ে নেয়। সেনাশাসক জিয়া সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে নিহত হওয়ার পর এরশাদের মার্শাল ল জমানায় বিএনপি প্রায় দেউলিয়া হয়েছিল। সেদিন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ছাত্রদলনির্ভর আন্দোলনের শক্তিতে নতুনভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের অপশাসন ও হাওয়া ভবন ঘিরে যেভাবে অভিশপ্ত হয়েছে তাতে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন পর্যবেক্ষকরা অন্ধকার দেখছেন। দলের মূল জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় দন্ডিত হয়ে কারামুক্তি লাভ করলেও শারীরিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে দলকে দেওয়ার মতো শক্তি তাঁর যে নেই আর কখনো হবেও না, তা দেশবাসী জেনে গেছেন। অন্যদিকে তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে রাজনীতিতে আসা তারেক রহমান দলের একাংশের কাছে যতই জনপ্রিয় হোন না কেন তিনিও দন্ডিত ও লন্ডন নির্বাসিত রাজনীতির খলনায়ক হিসেবে মানুষের কাছে উন্মোচিত। বিএনপি যে রাজনীতিতে ফের ঘুরে দাঁড়াবে বা ক্ষমতায় আসবে এমনটা কেউ দেখছেন না। নেতারা মামলার হাজিরা দিতে দিতে শেষ। তৃণমূলেও সংগঠনকে গোছানো বা শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে বর্জন করলেও তৃণমূল নেতা-কর্মীরা ঠিকই প্রার্থী হচ্ছেন।

    এদিকে একসময়ের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্য থেকে গড়ে ওঠা ন্যাপ বিলীন হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি নানা ভাঙনের ভিতর দিয়ে নিঃশেষ। কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সময় এখন বেশি কাটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বাকি নেতাদের কারও কারও টকশোয়। পল্টন থেকে তোপখানা রোডের বামপাড়া এখন অন্ধকার। একসময় ক্ষমতার রাজনীতিতে তারা আসতে না পারলেও গণমানুষের অধিকার নিয়ে এবং সরকারের নানা কালাকানুনের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। সেই রাজনীতি এখন একদম ম্রিয়মাণ। তাদের কণ্ঠস্বর মানুষের কাছে যায় না। জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দলের আসন নিয়ে থাকলেও, দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল হলেও সারা দেশে সাংগঠনিক শক্তি তেমন নেই। ইউপি নির্বাচনে বর্তমান এমপিদের অনেকেই তাদের এলাকায় প্রার্থী দিতে পারেননি। সারা দেশে দল প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের আসন নিলেও নির্বাচন করেছে মহাজোটের শরিক দল হিসেবে। এরশাদের মৃত্যুর পর রওশন এরশাদ, জি এম কাদেরসহ নেতারা সম্মিলিতভাবে দলকে ধরে রাখলেও ভবিষ্যতে কী হবে এখন বলা যাচ্ছে না। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে দলেরই ক্ষতি করেননি, নিজেসহ অনেককেই শেষ করেছেন। দল গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন। এখন তাঁকে বাদ দিয়ে ডিসেম্বরে গণফোরাম কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্বে দলকে সাজাতে চায়।

    গোটা দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান যে ঘটেছে কিছুকাল ধরে হেফাজতের কিছু কর্মকান্ডে তা দৃশ্যমান হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার নরমে-গরমে এদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন কমিশন দ্বারা নিবন্ধন বাতিলসহ শীর্ষ নেতাদের একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি হলেও, নেতা-কর্মীদের ওপর নজরদারি চললেও, মগবাজারের কার্যালয়ে এক যুগ বাতি না জ্বললেও তাদের রাজনীতির বাতি নেভেনি। অর্থ ও সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে প্রবল বৈরিতার মধ্যেও তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামপন্থি দলসহ এমন কোনো দল নেই যেখানে তাদের লোকজন ঢুকিয়ে রাখেনি। এ দলটি সহজেই হার মেনে যাবে এমনটি সহজে বলা যাচ্ছে না। সেকালে আল মাহমুদের মতো বিখ্যাত কবিকে তারা পিক-আপ করেছিল। একালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুলদের পিক-আপ করেছে। প্রবাসে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকার সমর্থক মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বহন করা গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে বিকৃত অপপ্রচারে চরিত্র হননের ব্যয়বহুল টিমও কার্যকর করেছে। গণমাধ্যমেরও কিছু ব্যক্তি যেভাবে দলকানাই নয়, দলীয় দাসে পরিণত হয়ে প্রকাশ্যে চাটুকারিতা করে চাঁদাবাজি, ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত, তাতে গণমাধ্যমও মানুষের প্রত্যাশার জায়গায় নেই। আরেক অংশ আছে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রাসাদ বানিয়ে কারওয়ান বাজারে।

    পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেশের বাইরে থাকায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ১৫ আগস্টের পর ৩ নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ চার নেতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তাজউদ্দীনের মতো বিশ্বস্ত আদর্শিক রাজনৈতিক সহকর্মীকে সরিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন অবিশ্বস্ত খন্দকার মোশতাককে কাছে ভেড়ানো হয়েছিল। সেসব ইতিহাস সবার জানা। বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী অন্ধকার সময়ে দলের নেতা-কর্মীরা হয় কারাগার, নয় নির্যাতনের শিকার অথবা নির্বাসিত জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন। তবু নেতাদের ঘুরে দাঁড়ানো ও সংগঠনকে শক্তিশালীকরণ ছিল চমক সৃষ্টি। ১৯৮১ সালের ইডেন কাউন্সিলে দিল্লি নির্বাসিত মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সভানেত্রী নির্বাচিত করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সেই অন্ধকার সময়ে কুপি হাতে তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে গণজাগরণ তৈরি করেন। অসীম সাহসিকতা নিয়ে রাজপথে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর প্রথমে তিনি ’৯৬ সালে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে দলের নেতা-কর্মীদের আগলেই রাখেননি নতুন করে প্রথমে ১৪ দল ও পরে মহাজোট গঠন করে আন্দোলন ও নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেন। ওয়ান-ইলেভেনের খড়্গ তাঁকে কারান্তরিন করে। অকুতোভয় শেখ হাসিনা সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেই শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসেন এবং ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের ব্যালট বিপ্লবে বিশাল বিজয় অর্জন করেন। তারপর এ নিয়ে তিনি টানা তৃতীয় টার্ম ক্ষমতায়। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে আর ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। চলমান ইউপি নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও তাদের কর্মীরা প্রার্থী হয়েছেন। আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। নৌকা প্রতীকে প্রার্থীদের ভরাডুবিও ঘটছে। নির্বাচনী সহিংসতায় হামলা-ভাঙচুর ও প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে। যে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে না সেখানে নির্বাচন উন্মুক্ত করে দিয়ে শাসকদল অন্তত অনির্বাচিত বা বিনা নির্বাচনে বিজয়ীদের দায়ভার এড়িয়ে যেতে পারত। আগামীতে জেলা পরিষদ নির্বাচন প্রতীকহীনভাবে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার নিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের যে মহাসড়কে নিয়েছেন তা দেখে পশ্চিমা দুনিয়াও প্রশংসা না করে পারছে না। কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই পদ্মা সেতুসহ অসংখ্য মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তিনি চমকে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতেই শেখ হাসিনার বিকল্প আজ শেখ হাসিনা। তিনি এ বয়সেও অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাকহর্সের মতো যেভাবে ছুটছেন সেভাবে না দল না তাঁর মন্ত্রিসভা ছুটতে পারছে। শেখ হাসিনার এ মহা উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের মধ্যে যদি দুর্নীতির লাগাম কঠোর হস্তে দমন করে সুশাসন নিশ্চিত করতেন ইতিহাস তাঁকে অমরত্ব দিত। গোটা সমাজ আজ কলুষিতই নয় সরকারের সব সেক্টর দুর্নীতিকবলিত। ব্যবসা নেই, বাণিজ্য নেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী অঢেল অর্থবিত্তের মালিক। ব্যাংক লুটেরা সমাজের বড় এক অভিশাপ। ঋণখেলাপিরা বিদেশে সেকেন্ড হোম করে ভোগবিলাসের জীবনে ডুবে আছে। অর্থ পাচারকারীরা কি নির্লজ্জ দাপুটে ভাবলেই ঘেন্না হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতিসহ এসব বিষয় মিলিয়ে গণমানুষের ভিতরে চরম অসন্তোষ। আওয়ামী লীগে এখনো জীবিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দু-একজন উপেক্ষিত। পঁচাত্তর-পরবর্তী ও ২০০১ সাল থেকে যারা বঙ্গবন্ধুকন্যার পাশে থেকে দলের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন তাদেরও অনেকে সারা দেশে ছিটকে পড়েছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতানির্ভর একটি সংগঠন। কাল শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে অনেক নেতা-কর্মী ও এমপির কপালে কী ঘটবে তারা চিন্তাই করছেন না। আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে চায়। বিরোধী দল যেভাবে ভঙ্গুর নেতৃত্বহীন এতে আসার সম্ভাবনাই বেশি। আরেক টার্ম শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার পর তাঁর বয়স ৮০ পার হবে। শেখ হাসিনার পর কে দলের হাল ধরবেন? কেই বা দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার হাল ধরবেন কেউ বলতে পারছেন না। কারণ রাজনীতিহীন দেশে গণসম্পৃক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট চরমে। বঙ্গবন্ধুর মতো কেউ এ দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কর্মী তৈরি করতে পারেননি। সমাদর ও মর্যাদা দিতেও নয়। সামরিক শাসকরা ওপর থেকে নেতা তৈরি করতেন পরবর্তীতে গণতন্ত্রের জমানায়ও সে ধারা বহাল রাখা সুখকর হয়নি। আর ছাত্র রাজনীতিকে শেষ করা হয়েছে গণতান্ত্রিক জমানায়। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখে নেতৃত্ব তৈরির পথকে রুদ্ধ করা হয়েছে।

    লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close