• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
  • ||

দেশি ব্র্যান্ডে বেশি লাভ

প্রকাশ:  ০৯ অক্টোবর ২০২১, ২৩:০১
জি এম কিবরিয়া

দেশি ব্র্যান্ডে বেশি লাভ! কথাটি শুনতে ভালই লাগে। যদি কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলি, যেমন: দেশি ব্র্যান্ডের দেশি লোভ; তাহলে একটু তেতো শোনাবে বৈকি! আর যদি আপনি আঠারো পেরিয়ে থাকেন তবে আপনি স্বাধীন, যা খুশি তা বলতেই পারেন (বিশেষ একটি গোষ্ঠীর সমালোচনা ছাড়া); চুল লম্বা রাখতেই পারেন; কোনাকুনি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারেন! আর এরূপ স্বাধীনতার সুযোগে বলতেই পারেন যে, "আপনি দেশি ব্র্যান্ডের প্রসার চান না"! আমাকে পচিয়ে হিরোলম, সেফুর মতো তারকা বানিয়ে দিতে পারেন! শুধু পারবেন না নিজের একটি ব্র্যান্ড তৈরি করে নিতে। একটি পজিটিভ ব্র্যান্ড। কারন এর জন্য যে ধৈর্য্য, যোগ্যতা, সততা ও প্রাজ্ঞতা প্রয়োজন; তার কোনটিই আপনার নেই!

কেন এই সমালোচনা?

সম্পর্কিত খবর

    সমালোচনার মতো শুনালেও কথাটি কিন্তু সত্য! এই যে দেখুন না নিচের ছবিটি:

    ছবিতে সানসিল্ক, লাক্স, রিন, প্যারাসুট, কোকাকোলা, কোলগেট, ম্যাগি, পেপসি, নেসক্যাফেসহ ২০টির মধ্যে ১৯টি ব্র্যান্ডই বিদেশি। তালিকার একদম তলানীতে তিব্বত বল সাবান ছাড়া দেশি কোন ব্র্যান্ডের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না।

    কারণ কি?

    অতি লোভ! অতি লোভে তাতী নষ্ট যদি নাও হয়, তবে অনেক নতুন উদ্যোগ ভেস্তে যাবে শুরুতেই! এতে কোন সন্দেহ নেই। যাকে ফুল ফোটার আগেই তা ঝড়ে যাওয়া বলতে পারেন। আর এক্ষেত্রে ব্র্যান্ড তো সুদূর দ্রুবতারা! সম্প্রতি বাংলাদেশে যতগুলো ই-কমার্স ব্র্যান্ড জনগণকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়েছে বা বানাতে চেয়েছে; তারা কিন্তু সবাই তাদের ব্র্যান্ড সমেত এখন জেল হাজতে বন্দি! এটি একটি জ্বলন্ত নজির!

    মার্কেটিং এর থাম-রোল হলো, কাস্টমার (কনজুমার) ইজ দ্য কিং। অথচ এদেশের লম্পট ব্যবসায়ীরা ধরেই নেয়, জনগণ (কনজুমার) বোকা! প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে দ্রুত বড়লোক হওয়া চাই তাদের! স্বল্প মেয়াদে তারা সফলও হন! যেন এই সর্টকার্ট বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন তাদের রক্তে, শিরায়-শিরায়, অস্থি-মজ্জায় মিশে আছে!

    প্রবাদে আছে, বিশ্বাসের ঘরে চুরি করতে নেই! আর এদেশের লোলুপ উদ্যোগক্তারা রাতারাতি ঢাকায় বাড়ি, কানাডায় বাড়ি, তিন কোটি টাকার গাড়ির স্বপ্নে তাদের উদিয়মান ব্র্যান্ডকে গলা টিপে হত্যা করে ফেলে। একেবারে সোনার রাজহাস হত্যার মতো!

    বাটা! একটি ব্র্যান্ড। কিন্তু বুঝা কি যায়, এটি কোন বিদেশি কোম্পানি? না। মনে হয় আমাদের বাপ দাদার (তিন/চার পুরুষের) কোম্পানি এই বাটা। অথচ এর জন্ম হয়েছিল আজ থেকে ১২৫ বছর আগে ১৮৯৪ সালে একজন হাঙ্গেরিয়ান মুচির হাতে। তেমনি কোকাকোলা, ইউনিলিভার, টয়োটা, টাটা, মাইক্রোসফট, এ্যাপল, আলীবাবা এরূপ কতশত ব্র্যান্ডের কথা বলবো! যারা মানুষের আস্থা অর্জন করে স্ব-গৌরবে টিকে আছে।

    অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর স্কয়ার, ইস্পাহানি, প্রাণ, ওয়াল্টন, এসিআই ইত্যাদি ছাড়া বাংলাদেশি কোন ব্র্যান্ড বিভুঁইয়ে বিশেষ স্থান করতে পেরেছে কি না আমার জানা নেই!

    আর দেশে? এ দেশিদের মনের তো কোন মূল্যই নেই! দেখবেন অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড এ দেশে দাবড়াতে চাচ্ছে, কিন্তু তাদের কোনটির মালিক লম্পট, কোনটির মালিক আউলিয়া! মানুষ বিকল্প পেলে একদিন এদের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করবে ঠিকই।

    এখানে প্রশ্ন হতে পারে, মালিকের সাথে ব্র্যান্ডের সম্পর্ক কি?

    আছে। প্রথম ব্র্যান্ডের প্রবক্তা কিন্তু মালিকই। তার ইমেজেই সূচনা হয় একটি ব্র্যান্ডের, অতঃপর সেই সুখ্যাতি টেনে নিয়ে যায় কোম্পনি বা সংস্থা। কথায় আছে, হিউম্যান সাইকোলজি! অর্থাৎ আমি চোর, লম্পট যাহা কিছুই হই না কেন, আমার নেতাকে হতে হবে দুধের ধোঁয়া! আর যে কোম্পানি পন্য কিনি সে কোম্পানির মালিক বা পরিচালক হবেন সাচ্চা দেলের মানুষ! এই হিউম্যান সাইকোলজিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালে ব্র্যান্ড তৈরি হবে না কখনো।

    একটি মজার বিষয় দিয়ে জাতির ব্র্যান্ড বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করছি। জাপান রিকন্ডিশন গাড়ি রপ্তানিকারক। বাংলাদেশ অন্যতম আমদানি কারক। এই রিকন্ডিশন গাড়ির সার্বিক চিত্র ওয়েবসাইটে (অকশন শিটে) তুলে ধরে জাপান সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সাথে। অর্থাৎ গাড়িতে কোন ক্র্যাচ বা যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কিনা তা একদম আয়নার মতো তুলে ধরে তারা। সারা বিশ্ব জানে যে, জাপানের মানুষ কখনো মিথ্যা কথা বলে না, ঘুষ খায় না, প্রতারণা করে না। এসব তাদের রক্তে নেই। তাই তারা পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই ভিসামুক্ত বা অন এরাইভাল ভিসায় প্রবেশ করতে পারেন (বিশ্বের শক্তিশালী পাসপোর্টের অন্যতম (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক)। অপর দিকে ঐ গাড়িটি যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন থেকে গাড়ির মূল ক্রেতা আতঙ্কে থাকেন যে, কখন গাড়িটির কি যেন পরিবর্তন হয়ে যায়! আর যদি আপনি একটু অসচেতন হন, তবে কেউ কেউ ২০ লক্ষ টাকার গাড়ি গছিয়ে আপনার কাছ থেকে হাতিয়েও নিতে পারে ৩৫ লক্ষ টাকা। এদেশে বাবাকে ছেলে কিংবা ছেলেকেও বাবা বিশ্বাস করতে যেন কষ্ট হয়! আর এই অবিশ্বাস, প্রতারণা বা ছল চাতুরির ফলে একদিকে যেমন ব্র্যান্ড সৃষ্টি হয় না; তেমনি অপর দিকে জাতি ব্র্যান্ডের বারোটা বেজে যায়। আর এসব কারণে বৈশ্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশী পাসপোর্টের মান তলানীর দিকে থেকে নবম অবস্থানে রয়েছে (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, অক্টোবর ৯, ২০২১)। বাংলাদেশীরা ভিসা নিয়ে বিদেশে গেলেও প্রায় প্রতিটি এয়ারপোর্টে কড়া তল্লাশির সম্মুখীন হতে দেখি; দেখি হোটেলে চেক আউটের পর তাদের কক্ষ ভাল করে তল্লাশি হতে! আর এসব সিনারি যে কতটা কষ্টের তা বোঝার মানুষ কোথায় আছে, কে জানে? যাইহোক, বিষয়টি জাতি হিসাবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। আমাদের পরিবার কিংবা শিক্ষা ব্যবস্থা কেন নৈতিকতা, ধৈর্য্য, আস্থা অর্জন পদ্ধতি শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বা গলদটি কোথায় তা দ্রুত বের করা এখন সময়ের দাবী।

    এ থেকে কি কোন মুক্তি নেই?

    অবশ্যই আছে। আমাদের তরুন প্রজন্মকেই এগিয়ে আসতে হবে। সততা, ধৈর্য্য, প্রজ্ঞা নিয়ে। তাদের কে সবার আগে লোভ, সফলতার সর্টকার্ট রাস্তা, অপরকে অনুকরণ, বাটপারি, প্রতারণা ছেড়ে দিয়ে কিংবা এসব থেকে মুক্ত থেকে নিজেকে এবং দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁদেরকে বিশ্বাসের যত্ন ও মর্যাদা দিতে শিখতে হবে। আর এরূপ চর্চাকারী কোন তরুন যদি ফুটপাতে ঝাল মুড়িও বিক্রি করে এবং সে যদি প্রমান করতে পারে যে, সে যা বলে তাই করে, অর্থাৎ সেরূপ তেল-মসলাই দেয়; তবে দু' বছরে তার দোকানে লাইন লাগবে; আর পাঁচ বছরে তার একটি ফার্স্ট ফুডের দোকান হবে এবং দশ বছরে কেএফসির মতো তার একটি ব্র্যান্ড হবে। নিজস্ব ব্র্যান্ড। নিচের ছবিটি কুমিল্লার মাতৃভান্ডারের সামনের ছবি। আপনি এখানে আধাঘন্টা লাইন দিয়ে দুই কেজির বেশি রসমালাই কিনতে পারবেন না। ছোট্ট দোকান, তাদের কোন বিজ্ঞাপন নেই! অথচ কি সুন্দর ব্র্যান্ডিং!

    মুদ্দাকথা হলো, মানুষ সারা জীবনে তিলে তিলে বিশ্বাস অর্জন করে; অথচ লোভের বশবর্তী হয়ে সেই বিশ্বাস মুহুর্তেই খান খান করে ফেলে। কি পন্য, কি ব্যক্তি, কি জাতি! সর্বক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিং এর বড়ই প্রয়োজন। সম্প্রতি ফেসবুকে সরিষার তেলের শত শত বিজ্ঞাপন দেখছি। সবাই ঘানিতে ভাঙানো তেলের কথা বলছে! আমার প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি মেশিনে ভাঙানো তেলের ক্রেতা নেই? এসব ভন্ডামি ছাড়ুন। মনে রাখবেন, মিথ্যার বেসাতি স্থায়ী হয় না; আর ব্র্যান্ড তো সুদূর পরাহত!

    লেখক: ক্লিন এন্ড গ্রিন ফাউন্ডেশন এবং গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close