• মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ৪ কার্তিক ১৪২৮
  • ||

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন এনেছে বেসরকারি খাত

প্রকাশ:  ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:১৫ | আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:১৭
ডা. এএম শামীম

স্বাধীনতার ৫০ বছর অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। ৫০ বছর একেবারে কম সময় নয়। এ সময়ে আমাদের দেশ অগ্রসর হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন হয়েছে, তেমনি ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে মানুষের চিন্তা-মননে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বেড়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। আর সেসবের প্রতিফলন দেখা গেছে আমাদের জীবন ও সমাজে।

এ সময়ে যে কয়টি বেসরকারি খাত বিকশিত হয়েছে তার মধ্যে স্বাস্থ্য খাত রয়েছে একেবারে প্রথম দিকে। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম এ খাতের অর্জন সাম্প্রতিককালে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির বিষয়টি উপলব্ধি করতে মাত্র একটি ইন্ডিকেটরের দিকে তাকালেই চলে। ১৯৭২ সালে আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৬ দশমিক ৫১ বছর। আর বর্তমানে সেটা ৭৩ বছরের ওপর। এই যে ইতিবাচক পরিবর্তন, এর পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন। এ সময় আরো কিছু প্যারামিটারের দিকে তাকানো যেতে পারে। ১৯৭১ সালে দেশে হাসপাতালে বেডের সংখ্যা ছিল সব মিলিয়ে মাত্র সাত হাজারের মতো। আর এখন সেটা লক্ষাধিক। তখন ডাক্তারের সংখ্যা ছিল প্রতি নয় হাজারে একজন, যা এখন ১৬-তে একজন। এ রকম উদাহরণ আরো অনেক ক্ষেত্রে দেয়া যায়। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট উন্নতির একটা পর্যায়ে আমরা পৌঁছেছি।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে এই যে উন্নয়ন, এতে বেসরকারি উদ্যোগের অবদান কতটুকু? এ প্রশ্নের জবাব পেতে আমরা দৃষ্টি দিতে পারি আরো কিছুুুু পরিসংখ্যানের দিকে। ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগই ছিল সরকারি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তখন ছিল না বললেই চলে। ২০২১ সালে এসে আমরা কী দেখছি? বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই বেসরকারি। সরকারের এক হিসাবেই দেখা যায়, বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে ১ লাখ ৫১ হাজারের মতো বেড রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ হাজার সরকারি ও ৯৬ হাজার বেসরকারি হাসপাতালে। দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ৯৯৭ জন। এর মধ্যে ৭৫ হাজার ৫৮৮ জনই কাজ করছেন বেসরকারি পর্যায়ে। সারা দুনিয়ায় চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সিংকে গুরুত্ব দেয়া হয়। তুলনামূলক আমাদের দেশে বিষয়টা একটু অবহেলিত। সরকারি পর্যায়ে বর্তমানে নার্সের সংখ্যা মাত্র ১৪ হাজার ৬৮৬। আর বেসরকারি পর্যায়ে নার্স রয়েছেন এর চার গুণেরও বেশি, ৫৮ হাজার ৩৫৭। এসব হিসাব থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, গত ৫০ বছরে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ ঘটেছে বিপুলভাবে। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে ব্যাপক উন্নতির কথা বলা হচ্ছে, তার সিংহভাগই এসেছে বেসরকারি উদ্যোক্তার হাত ধরে।

তবে এ কথাও ঠিক, বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অংশীদারিত্বটা বেশি লক্ষণীয় বিশেষ করে টারশিয়ারি কেয়ারে। হাসপাতাল, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। অন্যদিকে ইমোনাইজেশন, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া প্রিভেনশন, জনস্বাস্থ্য— এসব ক্ষেত্রে এখনো সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি কাজ করছে। এসব জায়গায় অবশ্য কিছু এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চিকিৎসাসেবার কথা যদি বলা হয়, তাহলে দেখা যাবে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ সাধারণত সরকারি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। অন্যদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ও ধনী শ্রেণীর মানুষ বেসরকারি চিকিৎসাসেবা নেয় বেশি। এর বাইরে প্রতি বছর উচ্চবিত্তের বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যায়। এ সংখ্যা ১০ লাখের কম নয়। এভাবে বিদেশে চিকিৎসা এবং চিকিৎসা ভ্রমণ বাবদ কমপক্ষে ৫০ বিলিয়ন ডলার বা সোয়া চার লাখ কোটি টাকা বিদেশে চলে যায়। মজার ব্যাপার, কভিড-১৯-এর এ প্যানডেমিকের সময় গত দেড় বছরে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমে গেছে। আগের তুলনায় এ সংখ্যা ১০ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। এ যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়া, এতে কিন্তু চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীদের মৃত্যুর সংখ্যা কিছুই বাড়েনি, এতে প্রমাণ হয়েছে দেশের মানুষের সব ধরনের চিকিৎসাই এখন দেশে সম্ভব। যারা বিদেশে যান, তাদের সিংহভাই যান যতটা না চিকিৎসার জন্য তারও চেয়ে বেশি মানসিক কারণে বা দেশীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার কারণে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ আস্থাহীনতা তৈরি হলো কীভাবে? এ প্রসঙ্গে আলোচনার আগে বরং আমরা বেসরকারি চিকিৎসা খাতের ধারাবাহিক বিকাশের দিকে একবার তাকাতে পারি। আমাদের দেশে বেসরকারি চিকিৎসা খাতের বিকাশ মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকে। প্রথম দিকে কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছিল। ছিল কিছু এমআর ডিএনসি ও ডেলেভারি করানোর মতো ১০-২০ বেডের ক্লিনিক। এসব কাজের জন্য কিন্তু কোথাও কোথাও এনজিওর ক্লিনিকও ছিল। বেসরকারি পর্যায়ে ছোট ছোট যে হাসপাতাল ছিল সেগুলোতে মূলত অ্যাপেনডেকটমি, গলব্লাডারের অপারেশন, ডেলেভারি—এসব হতো।

কিন্তু এর পর থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। সত্যিকারের পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল আমরা দেখতে পাই ২০০০ সালের পর। বর্তমানে দেশে প্রায় ২০০ বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যেগুলোর প্রতিটিতে শয্যাসংখ্যা ১০০-এর ওপরে। এ ২০০ হাসপাতালের মধ্যে ২০-২৫টি রয়েছে বিশ্বমানের। বেসরকারি এ হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ লোক কাজ করে। এগুলোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে ২ লাখ কোটি টাকার মতো। বছরে এর টার্নওভার প্রায় এক থেকে দেড় লক্ষ কোটি টাকা। তবে সরকারি হিসাব মোতাবেক নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজারের মতো। এর বাইরে অনিবন্ধিত আছে আরো ৬ থেকে ৭ হাজারের মতো। অনিবন্ধিত অথবা ছোটখাটো হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর কারণে অনেক সময় নানা স্ক্যান্ডাল বা বিতর্কের জন্ম হয়। জবাবদিহিতার অভাব বা নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অনেক সময় নানা প্রতারণার ঘটনাও ঘটে।

ওই যে আস্থাহীনতার কথা বলেছিলাম, তারও জন্ম এ বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো থেকে। আর সেইসঙ্গে রয়েছে কিছু পপুলার নেতিবাচক প্রচারণা। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের সমাজে সবসময়ই কিছু মানুষকে পাওয়া যায়, যারা প্রকৃত বাস্তবতাকে অনুধাবনের চেষ্টা না করেই ঢালাও সমালোচনার মধ্যে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ লাভ করেন। এ অ্যান্টি বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং এত বেশি হয়, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আমাদের দেশের মানুষের বিশ্বাসই অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।

সমালোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় বলা হয়, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। এখানে গেলে প্রচুর টেস্ট করাতে হয়। এমন অভিযোগ আসলে অতিসরলীকৃত। বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেশি হবে—এটাই স্বাভাবিক। সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে চিকিৎসক, নার্সদের বেতন-ভাতা, হাসপাতালের রক্ষণাবেক্ষণ—সবই সরকার বহন করে। যেমন এক হিসাবে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে একটি এমআরআই করতে অবকাঠামো আর লোকবলের হিসাবকে ধরলে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ২১ হাজার টাকা। সেভাবে তুলনা করলে বেসরকারি খাতে অপচয়ের পরিমাণও অনেক কম হয়ে থাকে। তবে সরকারি হাসপাতালের ব্যয়টা সরাসরি দৃশ্যমান নয় বলে সাধারণ মানুষ সেটা উপলব্ধি করতে পারে না।

তাই তুলনার প্রশ্ন যখন উঠবে, তখন সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে তুলনা করা যেতে পারে অন্য দেশের বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে। দেখতে হবে সেসব দেশের বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় আমাদের ব্যয় বেশি কিনা। এমনকি চিকিৎসার মান নিয়েও তুলনা করা যেতে পারে। সেসব বিবেচনা করলে আমরা খুব একটা পিছিয়ে থাকছি বলে মনে হয় না। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা এগিয়েই আছি বলে আমরা মনে করি। এর প্রতিফলনও ইদানীং দৃশ্যমান। প্রতিবেশী দেশের সীমান্তবর্তী ত্রিপুরা রাজ্য থেকে অনেকেই এখন বাংলাদেশে আসছে উন্নত চিকিৎসা লাভের আশায়।

এই যে অভিযোগ, আস্থাহীনতা—এসব দূর করতে দরকার যথাযথ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকা। প্রায়ই শোনা যায়, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় খরচ দেখানো হয়েছে ইত্যাদি। এসব অভিযোগ আদৌ সত্য কিনা কিংবা সত্য হলে ভুক্তভোগীর জন্য কী করণীয় তা নির্ধারণ কোনো ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। এটা থাকা দরকার। সাধারণ মানুষ যখন এ রকম অভিযোগ তোলেন, সেখানে বিজ্ঞানসম্মত বিচার-বিবেচনার চেয়ে আবেগ থাকে বেশি। তাই এটিকে অবশ্যই বিএমডিসির মতো শক্তিশালী সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি ও স্বাধীনভাবে কাজ পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি একটি স্বনির্ভর স্বাস্থ্য কমিশন গঠন করতে হবে। সে সংস্থা যেকোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পর সঠিক সিদ্ধান্ত দেবে। এসব কাজের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর দেশের মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা দুনিয়াতেই চিকিৎসা সেবা একটা ব্যয়বহুল বিষয়। সরকার যে ব্যয় করছে না, তা নয়। তবে সেটা চাহিদার তুলনায় কতটুকু পর্যাপ্ত তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আমরা যদি সরকারি চিকিৎসা খাতে বাজেটের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব বর্তমানে সে অংকটা প্রায় ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এটা আমাদের জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, আর মোট বাজেটের ৫ শতাংশ। সন্দেহ নেই, এ অংকটি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট অপ্রতুল। সে কারণেই এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমান সময়ে মানুষের স্বাস্থ্য খাতে যে খরচ হয় সেটার ৬৭ শতাংশ তার নিজেকেই বহন করতে হয়। আমাদের মতো দেশে মানুষের জন্য এ ব্যয়টা একটু কষ্টের। কীভাবে এ ব্যয় আরো কমানো যায়, সহনীয় করা যায়, সে চিন্তা কিন্তু সরকারকেই করতে হবে।

বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন খুবই লক্ষণীয়। আগে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা বা ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা ছিল না। এখন সাধারণ মানুষের জন্য সে সুবিধা উন্মুক্ত। আবার ২০০০ সালের পূর্ববর্তী সময়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে ধরনের সেবা দিত, তার অনেক কিছুই ছিল সাধারণ মানুষের বাজেটের বাইরে। বড় বড় অপারেশন, ডায়ালাইসিস, কেমোথেরাপি—এসবের জন্য আগে দেশে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান যেমন ছিল না, তেমনি এসবের ব্যয়ও ছিল সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী ডায়ালাইসিস বা কেমোথেরাপি করানোর কথা চিন্তাও করতে পারত না। কিন্তু এখন দীর্ঘমেয়াদি এসব চিকিৎসা অনেকেরই আয়ত্তের মধ্যে চলে এসেছে।

কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে তার চিকিৎসার জন্য যে খরচটি হয়, সেটি হয় প্রত্যক্ষ ব্যয়। এর বিপরীত দিকে পরোক্ষভাবে আরো কিছু অর্থনৈতিক সংকট তখন দৃশ্যমান। যেমন অসুস্থ মানুষটির আয় বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থ হওয়ার কারণে তিনি নিজেই পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হয়ে যান। সে কারণেই অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার চেয়ে কীভাবে অসুস্থ হওয়ার কবল থেকে দূরে থাকা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। জনস্বাস্থ্যের এ বিষয়টি নিয়ে সরকার অবশ্য কাজ করছে। কিছু এনজিওকেও এসব নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। কিন্তু বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের খুব একটা তত্পরতা এক্ষেত্রে দেখা যায় না। সরকার যদি তাদের এ ব্যাপারে সম্পৃক্ত করতে পারে, তাহলে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

সেই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালুর বিষয়টিও সরকার গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে পারে। আমাদের দেশে প্রতিটি মানুষের তার চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া বা সবকিছুর জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট থাকে, কিন্তু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো বাজেট থাকে না। সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে মোটিভেট করতে হবে। নিয়মিত মাসিক ভিত্তিতে তারা প্রিমিয়াম দিতে পারলে হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু করা কোনো কঠিন বিষয় হবে না।

মানুষের চিকিৎসা সেবার একটি বড় দিক হচ্ছে ওষুধ। এ ওষুধের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এক যুগান্তকারী উন্নতি হয়েছে। আমাদের যেসব ওষুধের প্রয়োজন, তার ৯৮ শতাংশই দেশে তৈরি হয়। বিদেশ থেকে তেমন কিছু আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধের মান বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে তুলনীয়। দাম অনেক কম। মান ও দামের এ বৈশিষ্ট্যের কারণে আমাদের উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানিও হয়ে থাকে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ওষুধ শিল্পের এই যে বিস্ময়কর বিকাশ, এর বলতে গেলে পুরোটাই কিন্তু বেসরকারি খাতে। দেশে বর্তমানে যে আড়াইশ ওষুধ কোম্পানি রয়েছে তার মধ্যে একটি বাদে সবই বেসরকারি খাতের।

এতসব সাফল্যের পরও কিছু চ্যালেঞ্জ কিন্তু রয়ে গেছে। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতকে তার প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে নিতে চাইলে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে হবে। প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণে সরকারকেও বাড়াতে হবে সাহায্যের হাত। প্রথমেই আসে বিনিয়োগের কথা। অনেক শিল্পোদ্যোক্তাই এখন স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের আগ্রহী। কিন্তু প্রচলিত কিছু ঝামেলার জন্য তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। যেমন বর্তমানে আমাদের একটা হাসপাতাল স্থাপনের জন্য ১৮/১৯টি লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। এসব সংগ্রহ করতে গিয়ে পদে পদে জটিলতা। অথচ এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে তেমন ব্যয়বহুল কোনো সিদ্ধান্তে যেতে হবে না। একটা ওয়ান স্টপ সার্ভিস করতে পারলেই হয়ে যায়। এতে কেবল আমাদের উদ্যোক্তাদেরই যে সুবিধা হবে তা নয়, বিভিন্ন দেশের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগও কিছুটা সহজ হবে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। যেখানে আমাদের গার্মেন্ট শিল্প থেকে আয় ৩০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ৫০ বিলিয়ন ডলার রক্ষা করতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আর একটা কথা মনে রাখা দরকার, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মান কখনো পুলিশি অ্যাক্টিভিটি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্ব বা ভারতেও কী হয়? হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে শুরুর দুই বছরের মধ্যে ল্যাবের জন্য এনএবিএল, হাসপাতালগুলোর জন্য এনএবিএইচ অ্যাক্রিডিটেশন নিতে হয়। এর মাধ্যমেই সেগুলোর গুণগত মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আমাদের এখানেও এ বিষয়গুলো চালু করা যেতে পারে। এতে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকের মান স্বনিয়ন্ত্রিত হবে।

গত ৫০ বছরে এতটুকু অন্তত প্রমাণ হয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য খাতকে আরো যুগোপযোগী করতে হলে, আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে বেসরকারি উদ্যোগকে পাশ কাটিয়ে করা সম্ভব হবে না, বরং তাদের সঙ্গে নিয়েই অগ্রসর হতে হবে। যে উদাহরণটা আগে একবার দিয়েছিলাম, সরকারি হাসপাতালে একটা এমআরআই করতে প্রায় ২১ হাজার টাকা ব্যয় হয়! এর পেছনে কি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিকতাও কিছুটা দায়ী নয়? সেই মানসিকতা আর অপচয়ের কারণেই বেড়ে যায় তাদের পরিচালন ব্যয়। অথচ এ সরকারি প্রতিষ্ঠানটিই যদি কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপে যায়, দেখা যাবে ব্যয় অনেকটাই কমে গেছে, মানুষের ভোগান্তিও কমে গেছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের এই কনসেপ্টটি একেবারে নতুন কিছু নয়। উন্নত বিশ্বে চিকিৎসা খাতে এক-তৃতীয়াংশ কাজই হয় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এরকম উদাহরণ রয়েছে। ভারতে আরোগ্যশ্রী নামে একটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প রয়েছে, সেখানে গরিব বা নিম্ন-মধ্যবিত্তের মানুষ খুবই স্বল্প খরচে জটিল সব চিকিৎসা করাতে পারে। বাংলাদেশেও এখন সে রকম কিছু চালু করা সময়ের দাবি বলেই আমি মনে করি।

আগেই বলেছি, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে এখন রয়েছে বেসরকারি খাত। এরাই এখন মূলধারা। অথচ একটি মাত্র হেলথ ডিরেক্টরেট সরকারি ও বেসরকারি উভয় চিকিৎসা খাতকেই নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে কিছু ঝামেলা হচ্ছে। হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ সরকারি ও বেসরকারি—এ খাত দুটির চরিত্র ও পরিচালনা পদ্ধতি তো একই রকম নয়। তাই আমার মনে হয়, বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও উন্নতির জন্য আলাদা একটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থাকতে পারে।

কেবল তাই নয়, চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার গড়ার শুরু থেকেই কিছু পরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে। এ বিষয়টি নিয়ে আগে কখনো সেভাবে চিন্তাভাবনা হয়েছে বলে মনে হয় না। ফলে দেখা গেছে, একজন ভালো ক্লিনিশিয়ানকে হয়তো প্রশাসনিক কোনো উচ্চ পদে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশাসন সম্পর্কে কোনো বিশেষ জ্ঞান বা দক্ষতা না থাকার কারণে তিনি ভালো কিছু দেখাতে পারেন না, আবার বিপরীত দিকে রোগীদেরও আর আগের মতো সময় দিতে পারেন না। দুদিকেই ক্ষতি। অথচ ছাত্রজীবনেই এ বিষয়টির একটা সুরাহা হতে পারত। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই চিকিৎসক, নার্স, হেলথ ওয়ার্কাররা ছাত্রজীবন থেকেই ক্লিনিক্যাল ও নন-ক্লিনিক্যাল (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও টিচিং) এভাবে ভাগ হয়ে যায়। আমাদের দেশেও এমবিবিএস পড়াকালীন এ ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিশ্চিত করে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলে আমরা ভালো চিকিৎসক যেমন পাব, তেমনি স্বাস্থ্যবিষয়ক ভালো প্রশাসকও পাব।

আমার মনে হয়, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য আমাদের একটা সমন্বিত ডাটাবেজ থাকতে পারে। দেশে এখন জনগণের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড রয়েছে। এটা অবশ্যই একটা বড় অর্জন। এখন আমাদের যদি একটি ইএমআর অর্থাৎ ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড থাকত, আর সেটাকে এ এনআইডির ডাটাবেজের সঙ্গে জুড়ে দেয়া যেত, তাহলে অনেক সমস্যারই সহজ সমাধান হয়ে যেত। মাঝে মাঝেই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অপপ্রয়োগের কথা শোনা যায় সেটা থামানো যেত। কমে যেত অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা। মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সহজ হতো তার নিজের স্বাস্থ্য এবং জরুরি অবস্থা সম্পর্কে। ধারণা করতে পারত পরবর্তী পর্যায়ে কী তার করণীয়। তবে এরকম একটা ডাটাবেজ তৈরি করা সম্ভব হলে তা থেকে সর্বোচ্চ সুফল পেতে সেটাকে প্রতি তিন মাস পরপর আপডেট করতে হবে।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আরো একটি বড় সমস্যা রেফারেল সিস্টেম না থাকা। এখানে দেখা যায়, সামান্য সর্দিকাশির জন্য অনেকে উচ্চ ফি দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে চলে যান। এতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সময় নষ্ট হয়, তার কাছে যেসব জটিল রোগীর আসার কথা, তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অথচ আমাদের দেশে প্রচুর এমবিবিএস ডাক্তার আছেন যারা এ সাধারণ চিকিৎসাগুলো বেশ ভালোভাবেই করে থাকেন। যদি কিউবার দিকে তাকান, দেখবেন সে দেশের মানুষ খোদ আমেরিকার থেকেও ভালো চিকিৎসা পেয়ে থাকে। তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পেরিফেরি থেকে শুরু হয় এবং বিভিন্ন জোনে তা বিভক্ত। শুধু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য তারা রাজধানী বা শহরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে আসেন। ভেনিজুয়েলার মতো গরিব দেশও এ জোনাল হেলথ ওয়ার্কার রেফারেল সিস্টেম দিয়ে উতরে গেছে।

লেখক: ডা. এএম শামীম: ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক

সূত্র: বণিক বার্তা

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

ডা. এএম শামীম
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close