• সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১০ কার্তিক ১৪২৮
  • ||

মানসিক চাপ কি আমাদের উদ্বিগ্ন করে? মানসিক চাপ কিভাবে সামলানো যায়?

প্রকাশ:  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২১:৫৩
মো. শফিকুল আলম

অতিমাত্রায় মানসিক চাপ অনুভব করার সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। আমরা যখন অনুমান করছি আমরা প্যানডেমিকের প্রান্তে রয়েছি; তখন অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে বরং অনেকটা নিয়ন্ত্রনহীন জীবনযাপনে ফিরছি। আমরা আসলেই প্রচন্ড মানসিক চাপে রয়েছি। হিউম্যান রিচার্স সফটওয়ার কোম্পানি CIPHR’র জুলাই মাসের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০% এ্যাডাল্টসের প্রত্যেকে বলেছেন তারা গত এক মাসে বরং বেশি মানসিক চাপ অনুভব করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৯% মানুষ না ঘুমোতে পারায় মানসিক চাপ অনুভব করছেন এবং তাদের আর্থিক উদ্বিগ্নতা ছিলো। ২৩% মানুষ জবের কারণে মানসিক চাপ অনুভব করছেন। আবার কাজের লোড ১৮% মানুষকে মানসিক চাপে ফেলেছে। গবেষনায় ৩৫% মানসিক চাপের কারণ ছিলো স্বাস্থ্য এবং পরিবার।

প্যানডেমিক শুরুর পূর্বেই আমরা অনেকেই মানসিক চাপে ছিলাম। ধন্যবাদ আমাদের দ্রুত, উন্মত্ত এবং বহুমুখী জীবনকে। অবশ্য প্রযুক্তি আমাদেরকে অবিরাম এই দ্রুত চলার সাথে অবিরাম সম্পৃক্ত, উপলব্ধ এবং সতর্ক রাখছে। প্যানডেমিক তার অনন্য এবং দার্ঘায়িত চাপে পরিস্থিতির শুধু অবনতি ঘটিয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

    ডাবলিনে ট্রিনিটি কলেজের নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের এমিরেটাস অধ্যাপক Ian Robertson বলেন, “মানসিক চাপ হচ্ছে এক ধরনের উপলব্ধি যা’ আপনার কাছে দাবী করা হচ্ছে বা আপনার কাছে প্রত্যাশিত; কিন্তু সেই দাবী বা প্রত্যাশা মেটানোর আপনার ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেছে বা সেই দাবী বা প্রত্যাশার সাথে আপনি তাল মেলাতে সক্ষম নন।”

    এই মানসিক চাপ আপনার মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের অনেক বড় ক্ষতি সাধন করতে পারে।

    ‘Stress Proof: The Scientific Solution to Protect Your Brain and Body-And Be More Resilient Every Day’ বই এর লেখক এবং নিউরোসায়েন্স গবেষক Mithu Storoni বলেন যে যদি মানসিক চাপ পূন: পূন:, তীব্র এবং অবিরত হয় এবং যদি আমরা এই চাপ থেকে মুক্তি না পাই তখন তা’ ক্রোনিক এবং ক্ষতিকর অবস্থা তৈরী করে। যেমন ক্রোনিক প্রদাহজনিত রোগ এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগ তৈরী করে।

    ২০১৮ সালে ইউকেতে মেন্টাল হেলথ ফাউন্ডেশনের গবেষনায় দেখা গেছে ঐ বছর তারা অতিমাত্রায় মানসিক চাপ অনুভব করা এবং সমন্বয় করতে না পারায় ৭৪% এ্যাডাল্টস মানসিকভাবে প্রচন্ড চাপে ভুগেছে।

    মহামারীর ধাক্কা যতোই শিথিল হচ্ছে আমাদের অনেকেই মনে করেন আমাদের চাপ মোকাবেলা করার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে, উন্নয়ন ঘটছেনা। বরং গবেষণা বলছে ইউকে এ্যাডাল্টসদের প্যানডেমিক চাপ মোকাবেলার ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এপ্রিল, ২০২০ এ ৬২% এবং এ বছর তা’ আরও হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৭৩%। Storoni মনে করেন গত ১৮ মাসে যে অবিরাম মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে তা’ অনেকের ক্ষেত্রে ক্রোনিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বা বিরতি দিয়ে পূনরায় মানসিক চাপ ফিরে আসতে পারে।

    মানসিক চাপ কখন মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়?

    Storoni বলেন যে স্ট্রেস হচ্ছে একটি এ্যালার্ম সিস্টেম যা’ বিপদ অনুমান করতে সাহায্য করে এবং আমাদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করে।তবে তা’ সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ জয়ে প্রযোজ্য। স্বল্প সময়ের মধ্যে মানসিক চাপ সামলাতে পারলে তা’ আমাদের শক্তি যোগায়, অনুপ্রাণিত করে এবং পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করে। কিন্তু অনেক সময় ঘন ঘন মানসিক চাপ ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করে। যখন আমরা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পাইনা তখন বার বার আমরা বেইসলাইনে চলে আসি এবং মানসিক চাপ ক্রোনিক হয়ে যায় এবং তখনই আমাদের শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়।

    উদ্বেগের সাথে স্ট্রেসের পার্থক্য কি?

    অনেকেই উদ্বেগের সাথে মানসিক চাপকে বিভ্রান্ত করে। কারন হচ্ছে দু’টোর বৈশিষ্ট্যে সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন ঘুমের ক্ষেত্রে উদ্বেগ এবং স্ট্রেস একই ধরনের ইস্যু তৈরি করে। তবে Storoni’র মতে দু’টোর মধ্যে মনোজগোতিক পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, “উদ্বেগ হচ্ছে অতি উত্তেজনার অবস্থা। এটি আপনার আশপাশের সবকিছুর প্রতি ভীত এবং ক্রমাগত সতর্কতার অবস্থা।”

    “উদ্বিগ্ন অবস্থায় আপনার ব্রেইনের নির্দিষ্ট এলাকা অতিরিক্ত ক্রিয়াশীল হবে কিছু কিছু অংশের থেকে।” উদ্বেগের কারনে ব্রেইনের এ্যামিগডালা (amygdala-almond-shaped) মূলত: আবেগ, ভীতির জন্য দায়ী খুব বেশী ক্রীয়াশীল হয়। উদ্বেগ যদি ক্রোনিক হয় তবে অনবরত মনে ভীতি কাজ করে যখন হয়তো ভীতির কোনো কারণ নেই।

    অপরদিকে স্ট্রেস বরং উদ্বিগ্নতাকে বাড়িয়ে দিতে এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে সাহায্য করে। তবে স্ট্রেসের প্রতিক্রিয়ার একটা মেকানিজম রয়েছে যেটি উদ্বেগের মেকানিজম থেকে ভিন্ন। আমরা কোনো চিন্তিত বিষয়ে চাপ অনুভব করতে থাকি। আমাদের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম তখন অতিরিক্ত ক্রিয়াশীল হয়। আমাদের এ্যাড্রেনালাইন বৃদ্ধি পায় এবং ২০ মিনিটের মধ্যে কর্টিসোল (সুগার নি:সরন করে) অনেক উঁচুতে পৌঁছায়। স্ট্রেস এমনকি এনার্জি রিলিজ করে। অনেকটা শরীরে এবং ব্রেইনে গ্লুকোজের প্লাবন ঘটায়। স্ট্রেস ঘন ঘন হলে ক্রোনিক উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হবে।

    আমরা কিভাবে জানবো যে আমরা অস্বাস্থ্যকর মানসিক চাপে রয়েছি?

    প্রথমেই আমাদের মধ্যে নিদ্রাহীনতা তৈরি হবে। স্ট্রেস আমাদের হরমোন কর্টিসোল বিকল করে দেয়। ফলে আমাদের সারকাডিয়ান রিদম বা অভ্যন্তরীণ ঘড়ির কাটায় ছন্দ পতন ঘটায়। ঘড়ির সাথে মিলিয়ে আমরা আর ঘুমোতে পারিনা। স্ট্রেস আমাদের মধ্যে অবসন্নতা এবং অলসতা তৈরি করে। আমরা কোনোকিছুতে অনুপ্রাণিত বোধ করিনা। পারিপার্শ্বিকতা থেকে ক্রমশ দূরে চলে যাই বা এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করি। অনবরত মানসিক চাপ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে।

    অনবরত যারা মানসিক চাপে থাকেন তারা খিট খিটে হয়ে যান, অল্পে রেগে যান এবং সবকিছুকে ভুল প্রমাণে ব্যস্ত থাকেন। এবং তাদের মধ্যে নেগেটিভ ইমোশনাল বায়াস তৈরি হয়। সবকিছু তির্যকভাবে দেখেন। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা আমরা যতোটা কঠিন মনে করি তা’ নয়।

    প্রধানত: তিনটি রুটে মানসিক চাপ নিরসন করা যায়। শারীরিক, আচরনগত এবং চিন্তার পরিবর্তন ঘটিয়ে মানসিক চাপ সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

    Global Brain Health Institute এর কো-ডাইরেক্টর রবার্টসন বলেন, অনেক সময় উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতির ব্যবহার কারো কারো ক্ষেত্রে মুহূর্তের মধ্যে কাজ করে।

    আমরা যে কখনো কখনো ওভারলোডেড থাকি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক সময় পরিস্থিতির ভুল উপলব্ধি চাপ সম্প্রসারিত করে। লন্ডনের Soke Mental Health and Wellness Centre এর সাইকো থেরাপিস্ট এবং ট্রমা বিশেষজ্ঞ Alejandra Sarmieno বলেন, “নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করার মধ্য দিয়ে চাপের স্তর কমানো যায়।”

    কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে ব্রিদিং এ ধীর গতি এনে রিদম কমিয়ে ব্রেইনে শান্ত হওয়ার মেসেজ দিতে হবে এবং নিজেকে বলতে হবে যে কোথাও কোনো ভীতির কারণ নেই।

    রবার্টসন ৪-৬ মিনিটের ব্রিদিং এক্সারসাইজের পরামর্শ রাখেন। অর্থাৎ, শ্বাস ভেতরে নিতে ৪ পর্যন্ত গুনতে হবে এবং প্রশ্বাস ফেলতে ৬ পর্যন্ত গুনতে হবে। এভাবে কয়েকবার অবিরাম করতে হবে।

    দীর্ঘ সময়ে আপনার আচরণে পরিবর্তন আনায়ন আবশ্যক। কাজকে কার্যকর করতে পরিসর বা পরিধি স্বল্প করতে হবে। অর্জনযোগ্য স্বল্পপরিসর লক্ষ্য নির্ধারন করতে হবে। যখন আপনার নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হবে তখন আপনার মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হবে। প্রত্যেকটা ছোটো অর্জন আপনার ব্রেইনের ডোপামাইন(নিউরোট্রান্সমিটার) এ্যাক্টিভেট করবে। এটা হবে প্রাকৃতিক এ্যান্টি-এ্যানজাইটি ড্রাগ এবং তখন ব্রেইন আপনাকে অনুপ্রেরনা যোগাবে আরেকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করতে এবং তা’ অর্জনে আপনি সফল হওয়ার মাধ্যমে মানসিক চাপমুক্ত হবেন। সুতরাং আমরা যখন মানসিক চাপ অনুভব করবো তখন আমরা ছোটো ছোটো পদক্ষেপ নিয়ে অর্জন করার মধ্য দিয়ে নিজের আস্থা অর্জন করবো। তখন নিমিষেই চাপ কমে যাবে।

    আমরা চিন্তার পূনর্গঠন করেও চাপ কমাতে পারি

    আমরা যখন চাপ অনুভব করি আমাদের ব্রেইন এবং মনে তখন ভীতির সন্চার হয়। আমরা পরিস্থিতির দিকে তাকালেও সেই ভীতি দেখতে পাই। তখন ব্রেইনেও নেতিবাচক স্মৃতিচারন হতে থাকে। আমরা তখন অতীতের ব্যর্থতা, গ্লানি, দুঃখ ইত্যাদির স্মৃতিচারন করি। আমাদের ব্রেইনে নেতিবাচক চিন্তার উদ্রেক হয়।

    আমরা আমাদের নিজেদের নেতিবাচক চিন্তায় ছেদ আনায়ন করে বা নেতিবাচক চিন্তা রোধ করে, বিশেষ করে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে নেতিবাচক ভাবনায় ডিটাচমেন্ট আনতে হবে এবং ইতিবাচক ভাবনায় ফিরতে হবে। নেতিবাচক ভাবনায় ছেদ আনায়ন বেশ কষ্টকর। তারপরও নেতিবাচক ভাবনা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। এভাবে চিন্তায় পরিবর্তন এনে সহজেই মানসিক চাপ রোধ করা যায়।

    লেখক: প্রবাসী সাবেক ছাত্রনেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

    পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close