• রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮
  • ||

রুবেলই অদম্য বাংলাদেশ!

প্রকাশ:  ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৮
জি এম কিবরিয়া

রুবেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র। গ্রামের মেঠোপথ, মাঠ-ঘাটে দুরন্তপনায় বেড়ে উঠা তার। বাবা রফিকুল পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। গ্রাম এলাকার রাজমিস্ত্রী বলে নলকূপের পাড় বাঁধানো, টয়লেট পাকা ও ঘরের বিট পাকা করার ছন্দেই এতোদিন চলে এসেছিল তার জীবন সংসার।

করোনায় পৃথিবীর ছন্দ-পতন ঘটে! ছন্দ হারা হয়ে পড়েন বহু নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত। এই করোনায় রফিক মিস্ত্রির জীবন সংসারও একেবারেই যেন এলোমেলো হয়ে যায়! অতি প্রয়োজনীয় কাজ নয় বলে, লোকজন রাজের কাজ বন্ধ করে দেয়; কিন্তু রাজমিস্ত্রীর পেটতো আর বন্ধ থাকে না! কিন্তু কি আর করা!

সম্পর্কিত খবর

    রফিক মিস্ত্রির বড় ছেলে রাজন একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক। এখানেও আছড়ে পড়েছে করোনার ধাক্কা! এই ধাক্কা রাজনের মতো সকল বেসরকারি স্কুল শিক্ষককেই যেন একেবারে চিড়াচেপ্টা করে ফেলেছে। স্কুল বন্ধ তো বেতন বন্ধ!

    এরূপ ক্ষণে সংসারের তরী যখন মাঝ নদীতে তখন আরেকটি ঝড়ের ধাক্কা লাগে রফিক মিস্ত্রির জীবন তরীতে! এক রাতে মেরুদন্ডের তীব্র ব্যাথা আর আর্ত-চিৎকারে জেগে উঠে পাড়া! রফিক আবিষ্কার করে, কোমর থেকে পা, কোন অংশই যেন তার কাজ করছে না, একেবারে নড়া চড়াই যেন বন্ধ! সেই সাথে তীব্র ব্যাথাতো আছেই! রফিক ঘেমে নেয়ে একাকার!

    ভোরের আজান হতেই দরজার পাল্লা খুলে চাঙ্গারী বানায় রুবেল ও রাজন।প্রতিবেশীদের সাথে ছেলেদের কাঁধে চড়ে সদর হাসপাতালে রওয়ানা হয় রফিক মিস্ত্রী। ডাক্তারের হাতে অপারেশনের বিকল্প নেই! দেরি করলেই চিরতরে কর্মক্ষমতা হারাবেন রফিক! “অপারেশনের খরচ যে মেলা!” --রাহেলা বেগমের কপালে দুশ্চিন্তার বালি রেখা! মার হাতে ঝাকুনি দিয়ে ছোট্ট রুবেল বলে, “আম্মা আমি রুবেল বাইচ্চা থাকমু, আর আব্বা বিছানার পইড়া থাকবো ইডা হইতে দিমু না!” রাজনও বলল, “হ মা, প্রয়োজনে ভিটা বিক্রি করমু”!

    সব সঞ্চিত অর্থ, ভিটা বাড়ি থেকে দুই শতক বিক্রি আর ধার দেনা করে, চিকিৎসা চলল রফিকের!

    “ছেলেদের চেষ্টায় চিকিৎসার বন্দোবস্ত হলো, কিন্তু পেট কি মানে!"--- আবার দুশ্চিন্তার রেখা রাহেলার কপালে।

    ক্ষুধার কি যে রং! টের পাচ্ছে রাজন-রফিক দুজনই!

    “একটা টিউশনি যে করমু কিংবা দোকানে কর্মচারি খাটমু; শালার সেই সুযোগ টুকুও নেই! করোনা যেন সকল কপাট বন্ধ কইরা দিছে; একেবারে কপাল শুদ্ধু বন্ধ!” আক্ষেপ ছাড়ে রাজন।

    “তুই হইলি সম্মানিত মানুষ, তাই দিনমজুরী তর সাথে যায় না!" ভাইকে আশ্বাস দেয় রুবেল। পরক্ষণেই মাথা চুলকিয়ে সে বলে "আমার সুবিধা মেলা, আমাকে কেউ চিনে না! খ্যাতিও নেই, বিড়ম্বনাও নেই!”

    রুবেলের বিশ্ববিদ্যালয় এখন বন্ধ। এই সুযোগে একটি পরিকল্পনা করে ফেলে রুবেল। যেই কথা সেই কাজ। বাবার শিষ্যদের সাথে রাজমিস্ত্রীর যোগালীতে লেগে পড়ে রুবেল। বুদ্ধিমান ছেলে, তাই দ্রুত হাত পেকে যায় তার। কষ্ট হয় খুব বেশি! অল্পতেই রুবেল টের পেয়ে যায়, বাবা তার কত শক্ত ঘানি টেনে এসেছে এতকাল! তাই অদম্য রুবেল আধাবেলা করে অটো রিক্সা চালাতে থাকে! সংসারের চাকা এখন রুবেলের হাতে!

    এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার নোটিশ চলে আসে। একমাস পরই রুবেলের পরীক্ষা শুরু হবে। বড় ভাই রাজন হয়তো শিক্ষকতা পেশায় আবার জড়াবে। কিন্তু বাবা যে এখনও বিছানায়! তাই রুবেল গরিব ফাউন্ডেশনের সাথে কথা বলে। পরীক্ষার দুটি মাস কোন রকম তাকে চালাতে অনুরোধ করে। গরিব ফাউন্ডেশন তাকে সহায়তার আশ্বাস দেয়।

    ফাউন্ডেশনকে আশ্চর্য করে রুবেল বলে, “স্যার আমি টাকাটা সহায়তা হিসাবে চাচ্ছি না, চাচ্ছি ধার হিসাবে। কারন দুই মাস আমাকে একটু বেশি করে পড়তে হবে, পরীক্ষা শেষ হলে ক্লাসের ফাঁকে কাজ করে টাকাটা জোগাড় করে ফেলবো। তখন নিজে চলবো এবং মাসে মাসে আপনাদের দেনা শোধ করবো।” গরিব ফাউন্ডেশন থেকে যথাসাধ্য টাকা পাঠানো হয় তাকে। রুবেল খুশিতে আত্মহারা, কিন্তু ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতার কপোল বেঁয়ে অশ্রুধারা নেমে আসে!

    লেখক: ক্লিন এন্ড গ্রিন ফাউন্ডেশন এবং গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা

    পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close