• শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
  • ||

কাবুল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের 'সেফ এক্সিট', নেপথ্যে অবদান যার

প্রকাশ:  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৯
সানজিদা জান্নাত পিংকি
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক জালমে মামোজি খালিজদাদ

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চলে যাওয়াটা হুট করে নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে তারা এমন চলে যাবার পথই তৈরি করেছেন। আর এই পুরো বিষয়টি পর্দার আড়ালে থেকে যিনি করেছেন তার নাম, 'জালমে খালিজদাদ।' পুরো নাম জালমে মামোজি খালিজদাদ। আফগান বংশোদ্ভূত আমেরিকান কূটনীতিক তিনি। অ্যাম্বাসেডর হিসেবে জর্জ বুশ জুনিয়রের সময় থেকে নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত কাজ করেছেন এই কর্মকর্তা। সরকারের সঙ্গে কাজ করে দায়িত্বশীল হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়ার পর দায়িত্ব পান জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করার। সেখানে গিয়েই তার চোখ পড়ে আফগানিস্তানে। বুঝতে পারেন আফগানিস্তান সংকট সমাধান করতে পারে পাকিস্তান আর তালেবানই। কিন্তু তাদেরকে স্থির সরকার গঠনের পথ করে দিতে হবে আমেরিকাকেই। সঠিক বাস্তবতার নিরিখে তিনি কাজ শুরু করেন। চলতি বছরের আগস্টে এসে সেই যাত্রার সফল সমাপ্তি ঘটে!

আমেরিকার চলে যাওয়া যতটা তালেবানের জয়ের, তার চেয়ে অনেক বেশি আমেরিকার সফল পরিকল্পনা বাস্তবে রুপ পাওয়ার।

সম্পর্কিত খবর

    অনেক আমেরিকানের মতে, ''তালেবানের কাবুল দখল এবং আফগানিস্তানের বর্তমান সংকটের জন্য একমাত্র দায়ী ব্যক্তি হলেন খলিলজাদ। এ ছাড়া পাকিস্তান ঘেষা নীতির কারণেও বিশ্ব গণমাধ্যমে তার ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম পলিটিকো বলছে- ‘আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ৯/১ পরবর্তী সকল অর্জনই নষ্ট করে দিয়েছে জালমে খলিলজাদ।’''

    শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বিশেষ দূত হিসেবে খলিলজাদেকে আফগানিস্তানে নিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, আফগানিস্তানে তিনি মার্কিন নীতিকে পাকিস্তানের অনুকূলে রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আর শান্তি আলোচনা পুরোটাই পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই কাবুলসহ সমগ্র আফগানিস্তান দখল করে নেয় তালেবান।

    খলিলজাদ গত এক বছরে অসংখ্যবার পাকিস্তান সফর করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, আফগানিস্তান শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদকে রাজি করাতেই তিনি সেখানে গেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি দেশটির সেনাপ্রধান ও গোয়েন্দা প্রধানের সঙ্গে দেখা করেছেন। আর এ নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে অসংখ্যবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

    এর বাস্তব উদাহরণ ২১ এপ্রিল ২০২১ এর একটি ঘটনা। পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় তালেবান যখন আফগানিস্তানে প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখন সিনেটের এক শুনানিতে পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলেন এই বিশেষ দূত। তিনি সিনেটকে জানান, পাকিস্তান তালেবানকে কোন প্রকার সহায়তা করছে না। ফলে, ইমরান খানের সরকারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি সিনেট।

    আফগান শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্ব মিডিয়ায় পাকিস্তানের স্তুতি গেয়েই ক্ষান্ত থাকেননি, খলিলজাদে, চলে যান পাকিস্তান সফরে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও সেনাপ্রধান ওমর জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে দেখা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানান! তার এমন কর্মকাণ্ডে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে, পাকিস্তান ছাড়া আফগান শান্তি আলোচনা কখনোই সম্ভব নয়।

    এ ছাড়া খলিলজাদকে আফগানিস্তানে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বেশ কয়েকটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। ছবিগুলো পর্যবেক্ষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, তালেবান নেতাদের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া তালেবানের প্রশংসা করে তার দেওয়া বিবৃতিও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।

    এদিকে আফগানিস্তানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট আমেরুল্লাহ সালেহ ঠিক জালমে খলিলজাদের বিপরীত। তিনি আফগানিস্তানের বৃহত্তর স্বার্থে তালেবানের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের মোক্ষম জবাব দিতে চাইতেন। অথচ খলিলজাদেরও একই প্রত্যাশা থাকার কথা থাকলেও তিনি চেয়েছেন সংকটমুক্ত হোক আফগানরা। এজন্যে তিনি 'তালেবান ও পাকিস্তানের হয়েই কাজ করেছেন'!। আর সন্ত্রাসীদের চক্ষুশূল হয়েছেন সালেহ।

    ফলে দেখা যায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে সালেহকে হত্যা করতে হামলা চালায় সশস্ত্র তালেবান। এতে ভাইস প্রেসিডেন্ট সালেহ’র ১০ নিরপত্তারক্ষী নিহত ও মারাত্মক আহত হন অন্তত ৩১ জন। সামান্য আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান আমরুল্লাহ সালেহ। আর এর কিছুদিন পরে খলিলজাদে যখন দোহায় শান্তি আলোচনায় যোগ দেন, তখন তালেবানকে তার সঙ্গে হাস্যজ্জল মুখে কুশল বিনিময় করতে দেখা গেছে!

    আমেরিকান অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যয়ের জন্য পুরো দায় জালমে খালিজদাদেরই! কিন্তু আসলে কি আমেরিকা হারলো? নাকি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটালো সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।

    একটা কথা বলতেই হয়, তালেবানের আগমনে আফগানিস্তান প্রথমবারের মতো একটি দেশ হয়ে উঠেছে। পাঞ্জশির আর বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা বাদ দিলে আফগানিস্তান এতো শান্ত ঠিক কবে থেকেছে সে উত্তর দেয়া সমরবিদের জন্য কঠিন! আর সেই শান্তির কূটনীতিতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি আমেরুল্লাহ সালেহ ও যেসব আমেরিকান মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের আফগান ত্যাগ ভুল তাদের 'শত্রু'! যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে এনে তিনি নিজের শিকড়কে স্থিতিশীল করে তুলতে পারলেন নাকি সবাইকে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতে ফেলে এসেছেন সেটা বলার মতো সময় আসেনি। তবে অগ্রগামী হিসেবে প্রাথমিক বিজয় যে তার হয়েছে সে বিষয়ে নিন্দুক বা শুভাকাঙ্ক্ষী কেউই অমত করবেন না!

    লেখক- শিক্ষার্থী

    পূর্বপশ্চিমবিডি/এআই

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close