• শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
  • ||

তাদের গল্পগুলো নীরবে, নিঃশব্দে প্রতিদিন ঘটে যায়

প্রকাশ:  ২৪ আগস্ট ২০২১, ১৫:৫৭
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

ঝলমলে বাতির শহরে সব গল্পগুলো বলা যায়না। এই গল্পের নায়কেরা অভিনেতা হয়না, সাধারণ মানুষ হয়। যাদের সারাটা জীবন বাস্তবতার সাথে লড়াই করে যেতে হয়। লাল নীল বাতির মতো জীবন তাদের হয়না। খুব সাধাসিধা একটা জীবন হয় তাদের। তাদের গল্পগুলো খুব নীরবে, নিঃশব্দে প্রতিদিন ঘটে যায়, পিনপতন শব্দের মতো, আলো আঁধারের খেলার মতো। তারা সে গল্পগুলো বলার জন্য মুখিয়ে থাকে, টান টান উত্তেজনায় তারা শিহরিত হয়, আলোড়িত হয়। কিন্তু তাদের মতো ছা'পোষা মানুষের গল্প শোনার মতো সময় কি এই পৃথিবীর আছে। পৃথিবী যে খুব নিষ্ঠুর হয়। ঠুনকো চাকচিক্যের মোহে পৃথিবী অন্ধ হয়ে যায়। সে অন্ধ চোখ জীবন খুঁজেনা, মরীচিকা খুঁজে। আলো খুঁজেনা, আলেয়াকে খুঁজে।

ছোট ছোট মানুষদের জীবনমুখী গল্পগুলো বরফ গলা নদীর মতো আর্তনাদ করে উঠে। সে নদীর ডাক কান পেতে শুনার মতো মানুষ তো আর নেই। যা আছে তাতে মানুষ থাকেনা, ইট পাথরের মুখোশ থাকে, যান্ত্রিকতার খেলা থাকে। পত্রপত্রিকা আর মিডিয়াগুলো বড় বড় মানুষের গল্প জানার জন্য রাত-দিন এক করে দেয়, হুমড়ি খেয়ে প্রতিযোগিতায় নামে। কে কার আগে লাইভ সম্প্রচার করবে তা নিয়ে ঠান্ডা লড়াই থাকে। অথচ সাধারণ মানুষের সাদাকালো জীবনের অসাধারণ গল্পগুলো শেওলা পরা প্রাচীরের মতো অযত্নে পরে থাকে। সে গল্পের অনেক রূপান্তর থাকে, বৈচিত্র্য থাকে, গবেষণার উপাদান থাকে। সাহিত্য সৃষ্টির মহাসম্ভাবনা থাকে। অথচ বাণিজ্যিক বাজারের মানুষের কাছে সে অসাধারণ গল্পের কোনো মূল্য থাকে না। ফুল ফোটাবার আগেই ঝরে যায়, সবুজ ঘাসের তৃষিত বুকে বিন্দু বিন্দু শিশির কণা স্ফটিকের মতো আলো হয়ে উঠবার আগেই রোদে পুড়ে যায়। আমরা এভাবে প্রতিদিন অনেক অসাধারণ গল্প জন্ম নেবার আগেই সেগুলো গলা টিপে হত্যা করি। কখনো জেনে, কখনো না জেনে।

গল্পগুলো আর বলা হয়না। ঠিক যেমন বলা হয়না কঠিন সত্যের সংলাপগুলো। ফুলের গন্ধ সবাই পেলেও তা দেখতে পায়না, কিন্তু না দেখা সত্যটা সবাই উপলব্ধি করে। তবে মুখ ফুটে সবাই বলার মতো সাহসী থাকেনা। কারণ সবাই যে সুবিধাবাদী। মুখোশ পরা মানুষ। রং বদলের মানুষ। মানুষ মানুষকে আঘাত দিতে জানে, তার গল্পের পিছনের গল্পগুলো জানেনা।

তারপরও সাধারণ মানুষের জীবনমুখী গল্পের যাত্রা তো থেমে থাকেনা, কোনো না কোনোভাবে সেগুলোর একটা গন্তব্য তৈরি হয়ে যায়। সে গন্তব্যের মহাযাত্রায় সাধারণ মানুষরা সবার পিছনে থাকে, মাটি আঁকড়ে পিছনে পরে থাকতে চায়। পিছনে পড়ে থেকে তারা হারায় অনেক কিছু তবে যা পায় তা হারানোর থেকেও মহামূল্যবান। সবাই সেটা বুঝেনা। আবার যারা বুঝে তারাও তা জানতে চায়না।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো পিছন থেকে দাঁড়িয়ে সামনের স্বার্থপর মানুষগুলোকে যেমন চেনা যায়, তেমনি তাদের হৃদয়, প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, চাওয়া-পাওয়া সব যে মেকি সেটাও বোঝা যায়। তাদেরটা গল্প না, তাদেরটা ফুলেফেঁপে উঠা একটা রঙিন দুনিয়ার বিভ্রম।স্বপ্নবিলাস। যেখানে মানুষের ছায়া থাকেনা, মানুষও থাকেনা, মনও থাকেনা। একটুকরো ছাই থাকে যা একটু বাতাসেই মিলিয়ে যায় আকাশে। তারপর আর কখনো তার খোঁজ মেলেনা। চার্লি চ্যাপলিন বলে গেছেন, “যেদিন হাসলাম না,সে দিনটি নষ্ট করলাম ৷ দেহের যন্ত্রনা থেকে তাই মুখের ঠোঁটকে,সবসময় আলাদা রাখি।” যাদের গল্পগুলো বাণিজ্যিক শহরের লোকদেখানো আভিজাত্য আর ক্ষমতার ভিড়ে মূল্য পায়না তারা হাসতে জানে, তবে সে হাসির পিছনে যে কান্না আছে সেটা তারা বলতে পারেনা কখনো।

লেখক: পরিচালক (গবেষণা ও সম্প্রসারণ), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close