• শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৩ আশ্বিন ১৪২৮
  • ||

ইতিহাসের চাকা স্তব্ধ করা যায়নি

প্রকাশ:  ১৫ আগস্ট ২০২১, ০১:১৩
ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এ নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি ও অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ সাধারণ মানুষের প্রতি এ নিঃশর্ত ভালোবাসার কারণেই বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন গণমানুষের নেতা। তার চিন্তা-চেতনা ও রাজনীতির কেন্দ্রেও বিরাজিত ছিল ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে সাধারণ মানুষ; যাদের তিনি ভালোবেসেছেন, ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তার অন্তঃসত্তায় এই মানবীয় গুণের সমাবেশ ছিল বলেই তিনি হতে পেরেছেন সাধারণ মানুষের পরমাত্মীয়; তাদের অতি ঘনিষ্ঠজন। তাদের জন্যই তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন, নির্দ্বিধায় কারাবরণ করেছেন। কারাপ্রাচীরের লৌহবেষ্টনী তার সত্যপথের নির্ভীক অভিযাত্রায় কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বাঙালি জাতিসত্তার সামগ্রিক মুক্তি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা ও মানবমুখী কর্মাদর্শই ছিল তার একমাত্র আরাধ্য। তার ব্যক্তিত্বের সৌরভে তাই আমোদিত হয়েছে বাংলা, বাঙালি ও সমগ্র বিশ্বলোক।

পাকিস্তানি শাসনামলে তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশেও বঙ্গবন্ধুর পথযাত্রা কখনো নির্বিঘ্ন ছিল না। তার যাত্রাপথে হিংসা-বিদ্বেষ ও জিঘাংসার কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছিল পরাজিত পাকিস্তানি প্রেতাত্মা ও তাদের দোসররা। স্বাধীন বাংলাদেশকে যারা মেনে নিতে পারেনি, তারাই নবরাষ্ট্রের অগ্রগতি ও উন্নতি ব্যাহত করার জন্য উপর্যুপরি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। বঙ্গবন্ধু যখন সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে তার স্বপ্নের বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে সম্মানের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণপণ প্রয়াস চালাচ্ছিলেন, তখনই তারা সংঘটিত করে মানবেতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে সংঘটিত এ উন্মত্ত তাণ্ডবে তারা ছিন্নভিন্ন ও রক্তাক্ত করে দেয় বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড; মৃত্যুবরণ করেন বঙ্গবন্ধু, বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল এবং বঙ্গবন্ধুর আরও অনেক নিকটাত্মীয়। এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ঘাতকরা কেবল বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারকে নয়, নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের নীতি ও আদর্শ- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কেবল তাই নয়, মোশতাক-জিয়া এবং তাদের দোসররা অতঃপর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া রুদ্ধ করার জন্য জারি করে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’। কিন্তু তাতে ইতিহাসের চাকা কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দেওয়া গেলেও চিরতরে স্তব্ধ করা যায়নি। মুজিব হত্যার বিচার হয়েছে; বাঙালির দায়মোচন হয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

    ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ন, মিসরের নাসের, চিলির আয়েন্দে এবং ভারতের নেহেরু- এসব নেতার মতো বঙ্গবন্ধুও ছিলেন শোষিত-বঞ্চিত ও নির্যাতিতের পক্ষে। ১৯৭২ সালের ২৬ জুন নোয়াখালীর মাইজদী কোর্টে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আমি গরিবের জন্য, গরিব আমার জন্য। বাংলাদেশে গরিবের রাজ কায়েম হবে। শোষকের রাজ কায়েম হবে না।’ এজন্য তিনি যতই প্রাণান্ত পরিশ্রমে কৃষক-শ্রমিক, মুটে ও মজদুর শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ উন্মোচিত করছিলেন, ততই গোপনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি দোসরদের আরও সক্রিয় ও সংঘবদ্ধ করছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করে জনতার মুজিবকে অ-জনপ্রিয় করে তোলা। বঙ্গবন্ধুর সরলতার সুযোগে ক্রমেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীকালে তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করে আগস্ট হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

    বঙ্গবন্ধু বরাবরই চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে ভৌগোলিক স্বাধীনতাকে সুসংহত করতে। বস্তুত অর্থনৈতিক মুক্তি ও সুশাসনই পারে মানুষের সামগ্রিক মুক্তি নিশ্চিত করতে। এ লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু দেশগঠনে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলেন, স্বাধীনতাবিরোধী ও প্রতিবিল্পবী চক্র ততই বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার হীন চক্রান্তে মেতে উঠেছিল। একদিকে স্বাধীনতাবিরোধীরা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছিল, অন্যদিকে প্রতিবিল্পবী চক্র থানা লুট, ঈদের জামাতে সশস্ত্র হামলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির নানা অভিসন্ধিতে লিপ্ত ছিল। বঙ্গবন্ধুর সহজাত সরলতা, অনাড়ম্বর জীবনযাপন এবং মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের সুযোগও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের কুশীলবরা পুরোপুরি গ্রহণ করেছিল। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি বঙ্গভবনে না থেকে অরক্ষিত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে থেকেছেন, অবাধে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলও তিনি নিতে চাইতেন না। ১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সাক্ষাৎকালে কিউবার মহান নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে বলেছিলেন- ‘আপনি আপনার শত্রুদের এত স্বাধীনতা দিয়েছেন। একদিন ওরা আপনার ঘাড়ে চড়ে বসবে’। কাস্ত্রোর আশঙ্কা দুই বছরের ব্যবধানে নির্মমভাবে ফলেছিল; আর বঙ্গবন্ধুর অকাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে পিছিয়ে পড়তে শুরু করল বাংলাদেশ; বিপর্যয় নেমে এলো আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।

    ১৫ আগস্টের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে উগ্র ধর্মীয়করণের দিকে নিয়ে যায়। ‘জয় বাংলার’ স্থলে পাকিস্তানি অনুকরণে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশ বেতারের নামকরণ করা হয় রেডিও বাংলাদেশ। ১৯৭৭ সালের গণভোটের আগে জিয়াউর রহমান এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করেন। সংবিধানের ৩৮ ধারা বাতিল এবং দালাল আইন রদ করার ফলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রগঠনের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়ার অপপ্রয়াস চালানো হয়। সে ধারা আজও অব্যাহত আছে।

    পঁচাত্তরে, বঙ্গবন্ধুর নির্মম মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তার উদ্ভাবিত নীতি ও রাষ্ট্রাদর্শ বাস্তবায়িত হলে আজ কেমন হতো বাংলাদেশ? যে শোষণ-বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তা নিঃসন্দেহে আরও আগেই বাস্তবায়িত হতো। একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা পেত, তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন ত্বরান্বিত হতো, দুর্নীতি নির্মূল হতো এবং একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থা দৃঢ়মূল ভিত্তি পেত। সর্বোপরি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটত।

    ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জাতির স্বপ্নপূরণের লক্ষ্য যখন বাধাগ্রস্ত হয়, জাতিসত্তা নিপতিত হয় গভীর সংকটে, তখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন তারই প্রাণপ্রিয় আত্মজা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৭২ সালে দেশের অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র ৬.৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে সঞ্চয় ছিল জিডিপির ৩ শতাংশ, বিনিয়োগ ৯ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১৪ শতাংশ। সেই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উঠে এসে ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৩১৮ বিলিয়ন ডলারে। গত পাঁচ দশকে দেশের অর্থনীতি বেড়েছে প্রায় ৩৮ গুণ। বিশ্ব অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বাংলাদেশ বর্তমানে ৪১তম অবস্থানে রয়েছে। অগ্রগতির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ‘দি ওয়ার্ল্ড ইন ২০৩০ : প্রজেকশন ফর ৭৫ কান্ট্রিজ’ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সূচকে আরও ১৬ ধাপ অগ্রসর হবে। স্বাধীনতার হীরকজয়ন্তীতে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এখন বাংলাদেশের শুধু এগিয়ে যাওয়ার পালা। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রয়াস এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তিকে আরও বলীয়ান ও বেগবান করা। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের ক্রম-উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন আমাদের সব শক্তি, বিশ্বাস ও প্রেরণার উৎস।

    লেখক : প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close