• বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ৩ আষাঢ় ১৪২৮
  • ||
শিরোনাম

যদি এমন করে সবাই ভাবতো

প্রকাশ:  ০৬ মে ২০২১, ১৪:৫৪
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

১.

মানুষের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব এক ধরনের পরাধীনতা। যা মানুষের স্বাধীন সত্তা বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে। এই কর্তৃত্ব নির্ভর করে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণার ওপর।| জন্মের পর থেকে মা-বাবার সন্তানের প্রতি প্রকৃতিগত কর্তৃত্ব তৈরি হয়। তবে সন্তান যত বড় হতে থাকে এই কর্তৃত্ব তত শিথিল হতে থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অপরাপর সামাজিক কর্তৃত্ব সমূহ ঠিক উল্টোভাবে প্রভাবক শক্তি হয়ে মানুষের ওপর ক্রিয়াশীল হয়। এ নিয়ে গবেষণা হতে পারে। সে গবেষণার ফলাফল এ সমন্ধে আরও নিশ্চিত ধারণা দিতে পারে।

আধুনিক ম্যানেজমেন্ট তাই কর্তৃত্বের প্রভাব কমাতে টীম ওয়ার্কের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করছে। একজন অফিস প্রধানের ফর্মাল কর্তৃত্বের চেয়ে তার ইনফরমাল লিডারশিপকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যাতে করে মানুষকে আরও সৃজনশীল ও দায়িত্ব নেবার ক্ষেত্রে যোগ্য করে গড়ে তোলা যায়। মানুষের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যকে খুব সহজে অর্জন করা যায় ।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও মার্কিন অর্থনীতিবিদ রিচার্ড এইচ থ্যালার যদি না বলতেন অর্থনীতির সমৃদ্ধির সাথে মানুষের মনস্তত্ব ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব রয়েছে তবে তা হয়তো কোনোদিনই আমাদের জানা হতনা। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু উদ্ভিদের প্রাণ আছে এটি প্রমান না করলে আমরা ধরেই নিতাম উদ্ভিদ জড় পদার্থ।

সময় যত এগুচ্ছে মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটছে। মানুষ ছোট থেকে ছোট বিষয়গুলোকে গবেষণার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে প্রমান করে পৃথিবীকে এগিয়ে দিচ্ছে। একসময় মানুষ ম্যাক্রো ও মাইক্রো নিয়ে কাজ করেছে। এখন মানুষ ন্যানো নিয়ে কাজ করছে। এটা মানুষের দোষ না, এটা সময়ের চাহিদা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ন্যানোপার্টিকেল খুব ছোট ছোট উপাদান, যেটার আকার আকৃতি খালি চোখে দেখা যায় না। অথচ এখন ন্যানোপার্টিকাল ইলেকট্রনিক্স শিল্প, ওষুধ ও মানুষের চিকিৎসায়, পানি পরিশোধনে, ক্লিন এনার্জি উৎপাদনে ও সংরক্ষণে, জলবায়ু পরিবর্তন কমানোসহ এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে ব্যবহৃত হচ্ছেনা। মানুষের চোখ এড়িয়ে কোনো বিষয় আর পড়ে থাকছেনা। বরং মানুষের চোখ যেন ম্যাগনিফ্লায়িং গ্লাস ভেদ করে এমন বড় হয়ে উঠেছে যে তা অযত্ন, অবহেলায় পড়ে থাকা বিষয়গুলোকে বড় বড় গবেষণার উপাদানে পরিণত করেছে।

মানুষ কর্তৃত্বের চেয়ে স্বকীয়তা ও সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছে বলেই এখন সারা পৃথিবীতে এমন ইতিবাচক ঘটনাগুলো ঘটছে।

২.

আমরা যেটা দেখি সেটা কি শ্রমিকের গড়িয়ে পড়া ঘাম নাকি বিন্দু বিন্দু রক্ত। মানুষ যখন সুস্থ থাকার জন্য হাটতে গিয়ে জলমগ্ন হয় হয়তো সেটা ঘাম। শ্রমিক তো তা করেনা। সে জীবনের দুঃসহ বোঝা মাথায় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে রক্তস্নাত হয়। একটা ভুখা নাংগা শ্রমিক ইটের পর ইটের গাঁথুনি দিয়ে বড় বড় দালান কোঠা বানায় অথচ তাকে থাকতে হয় বস্তিতে, গোলাকার পাইপের ভিতরে কিংবা রাস্তায়। যেখানে মাথার উপরে ছাদটাও নেই | আর থাকলেও সে ছাদের কোনো মূল্য নেই।

একটা শ্রমিক বড় বড় হোটেল রেস্তরাঁয় প্রতিদিন মানুষের জন্য রাজভোগের মতো নানা রঙের নানা ঢঙ্গের লোভনীয় খাবার বানায়। সে খাবারের ভাগ সে পায়না। মুখের ক্ষুধা চোখ দিয়ে মিটায়। সে শ্রমিকের বাসায় তার সন্তাদের না খেয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিন ক্ষুধার সাথে লড়াই করে বাঁচতে হয় । অভুক্ত মুখগুলো যন্ত্রনায় আছাড়ি বিছারি খায়, অবহেলায় অযত্নে মাটিতে গড়াগড়ি খায়।

যে বৃদ্ধ শ্রমিককে হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙতে হয় সে জানে এই পাথর ভাঙার চেয়ে তার মৃত্যু হলেই ভালো হতো। কিন্তু মৃত্যু তো অনিশ্চিত। তাই যতক্ষণ মৃত মানুষদের পৃথিবীতে বাঁচার অভিনয় করতে হয় ততক্ষন পাথর ভাঙার দুঃসহ বাস্তবতাকে মেনে নিতে হয়।

পৃথিবীর মানুষের অদ্ভুত এক নিয়ম। শিক্ষিত বড় সাহেবরা শ্রমিকদের বানানো বড় বড় দালান কোঠায় বসে টাকার অংকে তথাকথিত কাজের মূল্য পায় অথচ শ্রমিকরা তিল তিল করে শ্রম দিলেও তার মূল্য পায়না। শিক্ষা ও ক্ষমতাকে পুঁজি করে বড় বড় সাহেবরা স্বার্থপরের মতো নিজেদের সুযোগ সুবিধা তৈরি করে শোষণ আর বৈষম্যের মেগা মেগা পরিকল্পনা বানায়। আবার তার বাস্তবায়নে কাজে লাগায় ‘ছোটলোকের বাচ্চা, মূর্খ, অপদার্থ’ বলে গালমন্দ করা শ্রমিকদের।

বড় বড় মানুষরা এক একটা নাটক বানায় আর সে নাটকে অভিনয় করতে করতে শ্রমিকদের দম বন্ধ হয়ে আসে। বড় বড় রথী মহারথীদের শোষণ আর বৈষম্যের পায়ের নিচে চাপা পড়ে যায় অসহায় শ্রমিকদের স্বপ্ন। একটা একটা অলিখিত জীবনের গল্প। শ্রমিকদের রক্তে এই মানব সভ্যতার জন্ম হয়েছে। অথচ ইতিহাসে শ্রমিকদের নাম নেই, নাম আছে শ্রমিকদের অবদান লুন্ঠনকারী ভদ্রবেশী শিক্ষিত মানুষদের। আমরা আধুনিক মানুষরা সুট-প্যান্ট-টাই শরীরে চাপিয়ে দিয়ে গর্ব করে বলি মানুষ কত সভ্য হয়েছে। অথচ অসভ্য ক্রীতদাস প্রথার মতো আজও চলছে শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন নিপীড়ন।

অফিসের এসির নিচে দামি একটা হেলানো দুলানো চেয়ারে বসে বড় বড় সাহেবরা কখন আরামে ঘুমিয়ে পড়েন তা হয়তো তারা জানেননা। অথচ শ্রমিকদের সূর্যের দেহ থেকে বেরিয়ে আসা আগুনের মতো রোদে পুড়ে কাজ করতে হয়। দেহের চামড়া রোদে পুড়ে কুঁচকে যায়, শরীরটা রোদের দহনে ভেঙে পড়ে। তারপরও জীবনযুদ্ধের লড়াইটা চালিয়ে যেতে হয় আমৃত্যু। এমন ভারসাম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা থেকে মানুষ বেরিয়ে এসে শ্রমিকদের মূল্য দিক, মনুষ্যত্বের মূল্য দিক। তবে হয়তো শ্রমিকদের অধরা জীবনের স্বপ্নটা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। যেমন আমরা মৃত আত্মা শান্তি পাক বলে চিৎকার করতে থাকি। অথচ মানুষটা বেঁচে থাকতে তাকে শান্তি দেইনা, মূল্য দেইনা আর মরে গেলে আবেগে আপ্লুত হয়ে যাই। সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এ মানুষ! এই পচনশীল পৃথিবী শ্রমিকদের কথা কখনো ভাবেনা। কিন্তু তারপরও নিঃস্বার্থ শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে জীবন বাজি রেখে কাজ করে যায়। পৃথিবীর উত্তরোত্তর বিকাশে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে যায়। নিজেরা হয়তো সেটা বুঝেনা, তবে সে না বোঝার অন্তর্নিহিত মর্মটা জানে একটা শ্রমিকের ত্যাগের মূল্য কখনো পরিশোধ করা সম্ভব না।

৩.

আমরা মুখে মুখে অনেক দেশপ্রেমিক, কিন্তু যখন দেশপ্রেমের পরীক্ষা আসে তখন আমরা পিছিয়ে যাই, নিজেকে গুটিয়ে নেই। দেশপ্রেমের চেয়ে তখন নিজেদের স্বার্থটা আমাদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের অর্থ ও সম্পদের অভাব নেই | বরং প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি তারা বিত্তশালী। বাস্তবতা হচ্ছে দেশ যখন সংকটের মুখে পড়ে তখন তারা সে সংকটের সুযোগ নিয়ে দেশকে ঠকায়, দেশের মানুষকে ঠকায়। এভাবে দেশের মাটি ও মানুষকে ঠকিয়ে তারা আরও অর্থ ও সম্পদের পাহাড় গড়ে। দেশপ্রেমের পরীক্ষা আসলে তারা নিজেদের অভাবগ্রস্ত বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। আসলে তাদের কোনো অভাব নেই, দৈন্যতা নেই। অভাব আছে তাদের একটা বড় মনের ও গভীর দেশপ্রেমের। রতন টাটার মতো এমন দেশপ্রেমিক মানুষ আমাদের দেশেও জন্মেছে এই বিশ্বাসটা যেন সত্য হয়। সেটার প্রমাণ যেন আমরা তাদের কাজ ও ত্যাগের মাধ্যমে অনুধাবন করতে পারি। আমরাও যেন তাদের বদন্যতা ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করতে পারি। একটা কথা প্রায় আমরা বলে থাকি, দেশ তোমাকে কি দিলো সেটা বড় কথা নয়, দেশকে তুমি কি দিলে সেটাই বড় কথা। মানুষের সংকটের সময়ে এই উপলব্ধিটা আমাদের শক্তি হোক। দেশপ্রেমের মন্ত্রে জাগ্রত হোক আমাদের দেশের সব মানুষ।

লেখক: পরিচালক (গবেষণা ও সম্প্রসারণ), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close