• রোববার, ০৯ মে ২০২১, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮
  • ||

সাইডলাইনে বসে জীবন ভাবনা

প্রকাশ:  ১৮ এপ্রিল ২০২১, ১১:০৪ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২১, ০০:২৯
মনজুর রশীদ

সেই মার্চ থেকে শুরু এবং এখন অবধি চলছে দীর্ঘ আয়তনের টেস্ট ম্যাচটা। কবে শেষ হবে কারো জানা নেই। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এই ম্যাচটা বড্ড ইনক্লুসিভ! এখানে বড়-ছোট, ধনী-গরীব, সাদা-কালো, সংখ্যাধিক্য-সংখ্যালঘু কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই খেলোয়াড়। কেউ তার ব্যাটিং সম্পন্ন করেছে, কেউ করছে, আবার অনেকে সাইডলাইনে অপেক্ষা করছে। কবে থেকে আমিও মাঠের সাইডলাইনে বসে আছি। ঘরকে যদি প্যাভিলিয়ন ভাবা যায়, তবে সেই কবে থেকে মনে হয় প্যাভিলিয়নেই বসে আছি প্যাড পরে। টিভিতে লাইভ দেখাচ্ছে ম্যাচটা। দীর্ঘদিন চলা টেস্ট ম্যাচে মাঝে গতি অনেকটা শ্লথ হয়ে এসেছিলো। আবার যেন ম্যাচটা আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এমন ফাস্ট বোলিং হচ্ছে যে, দেশ-বিদেশের বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানরা একের পর ঘায়েল হচ্ছে।

ধরে নেয়া যাক, এক একটা ব্যাটসম্যানের নাম এক একটা দেশের নামে। তারা যখন সব অসহায়, একের পর এক প্রতিদিন উইকেটের পতনের শব্দে শরীর হিম হয়ে আসছে, দেশের উজ্জল নক্ষত্রগুলোর সাথে সাধারণ মানুষগুলোকেও চলে যেতে হচ্ছে, ভালো খেলোয়াড়গুলোকেও মারাত্মক চোট পেয়ে মাঠ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে, কোন ভালো স্কোর দেখছিনা, অথচ অনাকাংখিত ফলাফল দেখেই চলেছি - তখন বারবার মনে হওয়াটাইতো স্বাভাবিক, যে কোন দিন যে কোন সময় ব্যাটিং করার জন্য কারো না কারো ডাক পড়তেই পারে! আমিও তাই প্যাড পরে বসে আছি। মাঝে মাঝে চার দেওয়ালের ভেতর সাকিবের মতো ব্যাট ঘোরাচ্ছি, ওয়ার্ম আপ করছি, এক্ষুনি নামতে হতে পারে ভেবে নিজেকে তৈরি রাখছি। জানি আউট বা নট আউট অনেকটা কপালের ব্যাপার! কিছু বুঝে ওঠার আগেই আউট হওয়ার শংকা আছে যে খেলায়, সেই খেলায় নামার আগে তাই পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখতে হচ্ছে এ সময়টায়। পরিবারের সকলের কথা ভেবে ব্যাকুলতা তো থাকবেই। বাজারে ভিড় বাড়িয়ে ইমিউনাউজেশন বাড়ানোর জন্য প্রাণিজ প্রোটিন না হোক, সাধারণ ডাল-ভাত আর শাক-সবজির আয়োজন করার কথাতো পরিবারের সংগঠক হিসাবে চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক।

মোবাইলে মাঝে মাঝে খোঁজ-খবর নেয় কাছে-দূরের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনরা। 'এখনো মাঠে নামিনি' - বলে আশ্বস্ত করি ওদেরকে। আরো বলি, 'ভালো আছি, ঘরে আছি'। কিন্ত উদ্বেগ-উৎকন্ঠার কোন কমতি দেখিনা ওদের কারো অভিব্যক্তিতে!

তারপর মোবাইলের নেট অন করলেই একের পর এক মেসেজ ইনের শব্দ শুনতে পাই। এখানে ওখানে উইকেট পতনের খবর, খেলার নিয়ম না মেনে বিশৃঙ্খলার খবর আসতে থাকে ক্রমাগতভাবে। আইনের রক্ষকদের সভয়ে কথা বলার দৃশ্য দেখি, আর দেখি মোবাইলে খুলে বসা অসংখ্য ক্ষুদ্র টিভির শুধুই লাইভ ভিডিও অথবা ইউটিউব চ্যানেল। অবাক হয়ে যাই, মানুষের এতো সব প্রতিভা দেখে। এতোকাল যে সবাই কিভাবে তাদের এমনসব প্রতিভা লুকিয়ে রেখেছিলো তা জানা হতোনা এই সময়টা না এলে! যদিও কতজনই বা দেখে সেসব! আমারও সেসবের অনেককিছুই দেখা হয়নি। কিন্তু এখন দেখি, যদিও সবকিছুর গভীরে ঢোকা হয় না ডাক পড়ার ভয়ে। তারপরও আমি লাইক দিয়ে দিয়ে কাপা হাতে ভুল-শুদ্ধ বানানে মন্তব্য লিখে নিজের অস্তিত্ব, নিজের বেঁচে থাকা প্রবলভাবে জাহির করি।

ঘরের বইগুলো এর আগে কোনদিন সময় পায়নি আমাকে এভাবে দেখতে! ওরা সবাই জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। ওদের গায়ে কি জমে আছে ধুলোর আস্তরণ, নাকি জীবাণু কে জানে! খুব ইচ্ছে করে ওদের স্যানিটাইজ না করি, একটু পরিষ্কার করে গুছিয়ে সুন্দর করে তুলি। সত্যি বলছি করা হয়না। একেকটা বই খুলে পাতার পর পাতা উল্টে যাই শুধু, অথচ পড়া হয়না। সেই কবে থেকে প্যাড পরে বসে আছি, কখন যে ডাক আসে সে অপেক্ষায়!

সত্যি বলছি খুব পড়তে ইচ্ছে করে, আগের মতো বন্ধুদের নিয়ে খোলা মাঠে অথবা কোন রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা দিতে ইচ্ছে করে, দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে হৃদয়টা আনচান করে। কিন্তু বেহায়া মন কিছুতেই সায় দেয় না। সে এসে আমার দুচোখের পাতায় দুদণ্ড স্থির হয়ে বসেও না। আমার পড়া হয় না, আগের মতো আড্ডাও দেয়া হয়না বন্ধুদের সাথে। অবশ্য কারো তেমন সাড়াও দেখিনা। সবাই যেন আমার মতো সাইডলাইনে বসে আছে প্যাড, হেলমেট, গ্লাভস, ব্যাট পড়ে সেই কবে থেকে!

যদি চিরতরে নামিয়ে রাখা যেতো এসব, তবে সব ভুলে অন্যরকম একটা জীবন বেছে নিতাম। এভাবে অজানা আশঙ্কা নিয়ে সাইডলাইনে বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অধ্যায়ের যবনিকা চাইতে চাইতে হঠাৎ মনে পড়ে যায় আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটা বিখ্যাত উক্তি - ‘মানুষ পরাজয়ের জন্য সৃষ্টি হয়নি। তাকে হয়তো ধ্বংস করা যায়, কিন্তু হারানো যায় না।’

উন্নয়ন গবেষক, লেখক ও কলামিস্ট।


পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএস

সাইডলাইন,জীবন ভাবনা,মনজুর রশীদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close