• মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
  • ||

অদ্ভুত এক সময়ে!

প্রকাশ:  ০৯ এপ্রিল ২০২১, ১৫:০০
মনজুর রশীদ

অদ্ভুত এক ডামাডোলের মধ্যে আছি। করোনার ভয়ঙ্কর উত্থান। বেড়েই চলেছে মৃত্যু আর আক্রান্তের সংখ্যা। চারদিকে শুধু এ্যাম্বুলেন্স আর সাইরেনের শব্দ। হাসপাতালে সিট নেই। চিকিৎসার অভাবে মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। ঘোষিত হয়েছে লকডাউন। অথচ সবই সচল। রাস্তায় স্বাভাবিক দিনের মত তীব্র যানজট। কোনো স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বরং পথেঘাটে জনসমাগম যেন আরো বেড়ে গেছে!

এরই মধ্যে মুখে মাস্ক ছাড়াই গায়ে গা মিলিয়ে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে নানা ইস্যুতে শত হাজার মানুষের মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, বিক্ষোভ ইত্যাদি! সবকিছু খোলা রেখে যদি কেবল শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা বন্ধ হয়ে যায়, তখনতো এমন ঘটনা ঘটবেই!

অদ্ভুত এক রাজনৈতিক আবহের মধ্যে আছি। যেখানে শুধু সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন আর তাদের বিপরীতে মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে হুজুরদের সংগঠন হেফাজত ইসলামের ব্যাপক উপস্থিতি। ছোট্র পার্শ্ব চরিত্রে ঢাবির সাবেক ভিপি নূর ও তার কিছু অনুসারীরা। বিএনপিসহ আর কোনো রাজনৈতিক দলের কোন অস্তিত্ব আছে বলে মনে হচ্ছে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দেশিয় বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রসহ আবার হরহামেশা দেখা যায় কিছু সাধারণ মানুষকে। তারা নাকি রাজনৈতিক ক্যাডার। কোনো ঘটনা ঘটিয়ে ফেললে ক্ষমতাসীন দল আবার তাদের মালিকানা নিতে চায় না! অন্যদিকে হুজুরদের পক্ষ থেকে যারা জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর করে যাচ্ছে - তাদেরকেও আবার হুজুররা নিজেদের পক্ষের লোক বলে মেনে নিতে নারাজ!

অদ্ভুত এক বিনোদনের মধ্যে আছি ঘরোয়া বিনোদনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম টিভি দেখতে বসে। মানুষের যেখানে নাভিশ্বাস অবস্থা, সেখানে লিড নিউজে বিভিন্ন ফোনালোপ ফাঁস, ১৫/১৬ বছর আগে ক্ষমতাহারা এক পার্টিকে প্রতিদিন পোস্টমর্টেম করা কিংবা চলমান উন্নয়নের ফিরিস্তির খবর বলতে গেলে সবগুলো টিভি চ্যানেলে। টকশোগুলোতে একপক্ষের লোকজনের মাঝে একজন ভিন্নধারার লোককে বসিয়ে সবাই মিলে তাকে হেনস্তা করা যেন নিত্য চিত্র।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপকরা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে গিয়ে আলোচকদের চেয়ে বেশি কথা বলে যাচ্ছেন। দেশিয় চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে সুড়সুড়ি দেয়া একইধারার কাহিনী ও একইরকম পাত্রপাত্রীর প্রায় একইরকম ভাষায় কিছু নাটকের নিয়মিত সম্প্রচার। তাই তো ঘরে ঘরে ভারতীয় সিরিয়ালের দর্শক হয়ে সবাই ব্যস্ত সময় কাটায় সন্ধ্যার পর থেকেই। নিজেদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সংকটের যন্ত্রণার সাথে এখন তাই যুক্ত হয়েছে সিরিয়ালগুলোতে ঘটে যাওয়া নানারকম সংকটের বহুমাত্রিক টেনশন!

অদ্ভুত সব তামাশা দেখছি ইউটিউবে। প্রগতির দাবিদার মানুষগুলো যাদেরকে আইকন মনে করে থাকেন অনেকে, তাদেরকে ধিক্কার জানাচ্ছে বেশিরভাগ মানুষ। তাদের বক্তব্যে লাইকের সংখ্যা খুবই সামান্য, কিন্তু ভয়ংকর সব গালিগালাজের সংখ্যা আবার অনেক বেশি! আবার যাদেরকে মৌলবাদ, ফতোয়াবাজ বলা হয়ে থাকে - তাদের ভক্ত সংখ্যা লাখ লাখ। সেখানে তারা যাই-ই বলুন কিংবা তাদের নেতারা যদি অন্যায়-অকর্ম বা অধর্মও কিছু করেন, তারপরও তাদের সবকিছুকেই লাখো অনুসারীরা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে থাকেন এবং সে ধরনের মন্তব্য করেন। বড় একটি ইউটিউবার গ্রুপ সেগুলোকে আবার তারা তাদের নিজেদের মত করে উপস্থাপন করে যাচ্ছেন!

একদল দেশত্যাগী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরাও আছেন এখানে। যার যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়, কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছেনা। অথচ দু'লাইন মনের ভাব ফেসবুকে লিখে কেউ কেউ ফেঁসে যাচ্ছে আইসিটি এ্যাক্টের মামলায়!

সবকিছু দেখে জীবনানন্দ দাসের কবিতাটির কথা তাই বারবার মনে হয় - ‘‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা; যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই—প্রীতি নেই—করুণার আলোড়ন নেই, পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’’

সকল বন্ধুদের জানাই সাপ্তাহিকীর প্রীতি ও শুভেচ্ছা। ভালো ও সুস্থ থাকুন, স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলুন।

উন্নয়ন গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক

পূর্বপশ্চিমবিডি/অ-ভি

সময়,অদ্ভুত,আক্রান্ত,করোনাভাইরাস,মৃত্যু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close