• বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮
  • ||

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের উপলব্ধি

প্রকাশ:  ২৬ মার্চ ২০২১, ০১:০৮
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমাদের জন্য স্বাধীনতা সবসময়েই জরুরি ছিল। কেননা সে পরাধীন ছিল। সাতচল্লিশের স্বাধীনতার পরও সেটা জরুরি হয়ে উঠেছিল একাধিক কারণে। প্রথম কারণ জাতিগত প্রশ্নের মীমাংসা। পাকিস্তান নামের এই অস্বাভাবিক রাষ্ট্রটিতে নিপীড়ন চলছিল বাঙালির জাতিসত্তার ওপরে। নিষ্ঠুর নিপীড়ন। রাষ্ট্রক্ষমতা যাদের দখলে ছিল তারা কেবল যে অবাঙালি ছিল তা নয়, ছিল তারা বাঙালি-বিদ্বেষী। শাসন ব্যবস্থার পুরোটাই ছিল এই বাঙালি-বিদ্বেষীদের হাতে। সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, পুলিশ, আদালত, জেলখানা সবই তাদের অধীনে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ গোটা অর্থনীতি তারাই নিয়ন্ত্রণ করত। প্রচার মাধ্যমে তারা ছাড়া আবার কারা? শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তারা হাতে রাখতে চাইত।

জাতিগত নিপীড়নের এই সমস্যার সমাধান না করে অন্য প্রশ্নগুলোর মীমাংসা করা সম্ভব ছিল না। সেজন্যই স্বাধীনতা অতি জরুরি ছিল। ওটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ, সমষ্টিগত অগ্রযাত্রার। মূল লক্ষ্যটা কি? মূল লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় মুক্তি। জাতি বলতে শ্রেণি বুঝায় না, বিশেষ গোষ্ঠী বুঝায় না, জাতি হচ্ছে সমগ্র জনগণ। জনগণের মুক্তিই ছিল লক্ষ্য। জনগণ স্বাধীনতাকে ওই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছে, মনে করেছে রাষ্ট্র স্বাধীন হলে তারা মুক্ত হবে। তাদের যে ন্যূনতম চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার চাহিদা, সেগুলো মিটবে। তাদের জীবনে নিরাপত্তা আসবে। তারা মানুষের মতো বাঁচতে পারবে। এই স্বপ্ন নিয়েই একাত্তরের মানুষ যুদ্ধ করেছে। যে জন্য এ-যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ বলা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধ না বলে।

স্বাধীনতা একবার সাতচল্লিশেও এসেছিল। নতুন রাষ্ট্র, সংবিধান, রাজধানী, পতাকা, দালানকোঠা ক্ষমতায় নতুন মানুষ সবই হলো, ভূখণ্ডও পাওয়া গেল, কিন্তু যে জন্য মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল সেই আশাটা মিটল না। জনগণের মুক্তি এলো না। পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে শত শত মাইলের দূরত্ব ছিল, কিন্তু ওই দূরত্বের কারণে পাকিস্তান ভাঙেনি, সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, জুলফিকার আলী ভুট্টো ওদের তথাকথিত নির্বুদ্ধিতার কারণেও নয়, ভেঙেছে বৈষম্যের কারণে। এক অংশ সব ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল, রেখে বেড়ে ও ফেঁপে উঠেছিল, উঠে অন্য অংশের ওপর জাতিগত নিপীড়ন ও শোষণ চালাচ্ছিল। তাদের নিপীড়ন ও শোষণে পূর্ববঙ্গ শ্মশানে পরিণত হচ্ছিল। শ্মশান হবার জন্য তো মানুষ স্বাধীনতা চায়নি, লোকে বাগান চেয়েছে, ফলের ও ফুলের; সেজন্য তারা ওই স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যে প্রয়োজন ক্রমে ক্রমে এই ধারণা গড়ে তুলল। দাবির ব্যাপারটা প্রথমে স্পষ্ট ছিল না তাদের কাছে, ঘটনাই শিখিয়ে দিল যে পুরাতন রাষ্ট্রে তাদের মুক্তি নেই।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর প্রশ্ন দাঁড়াল আমাদের মুক্তি কীভাবে আসবে? আসবার একটা পথ বাংলাদেশের আদি সংবিধানে দেখানো হয়েছিল। চারটি মূলনীতি বের হয়ে এসেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ভেতর থেকে। তারা পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রের মূলনীতিতে। কিন্তু পথের দিশা সংবিধানে থাকাই তো যথেষ্ট নয়, পথটা বাস্তব ক্ষেত্রে গড়ে তোলা অনিবার্য ছিল। উপযুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের প্রয়োজন ছিল। আবশ্যক ছিল একটি সামাজিক বিপ্লবের।

সামাজিক বিপ্লবের কথা অনেক সময় বলা হয়, কিন্তু এর তাৎপর্য পরিষ্কার থাকে না। সামাজিক বিপ্লব বলতে সমাজের উপকাঠামোতে সংস্কার, চাঞ্চল্য বা বিস্ফোরণ বুঝায় না, বুঝায় মৌলিক পরিবর্তন। আসল কথা হচ্ছে ক্ষমতা। ক্ষমতা কাদের কাছে আছে সেটা নিয়েই সমাজের চরিত্র বুঝা যায়।

আর্য, তুর্কি-পাঠান-মুঘল, ইংরেজদের আধিপত্যের কালে সমাজে এক ধরনের বিপ্লব ঘটেছে। ক্ষমতার বিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে। বর্ণ ও শ্রেণির উত্থান দেখা গেছে। পাকিস্তান আমলে ব্রিটিশ আমলের পুরনো সমাজই টিকে ছিল। ক্ষমতা ছিল মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে, যারা উৎপাদনের উপায়গুলোর মালিক ছিল, যারা মহাজনী কারবার করত, ব্যবসায়-বাণিজ্যে হাত দিয়েছিল, বিভিন্ন পেশায়, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিল। গরিব মানুষের হাতে ক্ষমতা ছিল না। তারা শোষিত হতো। রাষ্ট্র এই ব্যবস্থাটাকে রক্ষা করতো এবং রাষ্ট্রের নিপীড়নকারী চরিত্রের পেছনে সামাজিক ব্যবস্থাটার সমর্থন ছিল। লোকে আশা করেছিল এই আয়োজনটা ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের পুরোপুরি অবসান না-ঘটুক, অবশ্যই তা হ্রাস পাবে।

এই সামাজিক বিপ্লব পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামোর অধীনে ঘটানো ছিল অসম্ভব। রাষ্ট্রের কাজই ছিল এর সম্ভাবনাকে নির্মূল করা। ওই রাষ্ট্রে সমাজে দুই ধরনের বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল। একটি সম্প্রদায়গত, আরেকটি শ্রেণিগত। খাড়াখাড়িভাবে পূর্ববঙ্গের মানুষকে ভাগ করা হয়েছিল হিন্দু ও মুসলমানে, আড়াআড়িভাবে ভাগ করা হয়েছিল ধনী ও গরিবে। আর সবাইকে এমনভাবে বেঁধে রাখা হয়েছিল শোষণের একটি নিগড়ে যে সেটা না ভেঙে সামাজিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সুষম বণ্টনের পদক্ষেপ নেবার কথা ভাবাই সম্ভব ছিল না। প্রথম কাজ প্রথমে। প্রথম দায়িত্ব ছিল নিগড়টা ভেঙে বের হয়ে আসা, অর্থাৎ রাষ্ট্রের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ওই স্বাধীনতাই যে চ‚ড়ান্ত লক্ষ্য ছিল তা নয়, চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মুক্তি, যেটা সম্ভব একটি সামাজিক বিপ্লব যদি ঘটানো যায় তবেই, তাকে বাদ দিয়ে নয়।

রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জন করার ব্যাপারটা সামান্য ছিল না। প্রাণ দিতে হয়েছে, দুর্ভোগ যা সহ্য করতে হয়েছে তা অপরিমেয়। কিন্তু কাজটা হয়েছে। এক লাখের মতো শত্রু সৈন্য তাদের অস্ত্রশস্ত্র হাতে নিয়েই আত্মসমপর্ণ করেছে। আবারো সংবিধান, পতাকা, ভূখণ্ড, রাজধানী, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র ইত্যাদিতে পরিবর্তন এসেছে। ক্ষমতায় এসেছে নতুন লোক। পুরনোদের অনেকেই পালিয়ে গেছে।

কিন্তু সেই সামাজিক বিপ্লবটা ঘটেনি যার জন্য স্বাধীনতা দরকার ছিল, যেটি না-ঘটলে মানুষের কাক্সিক্ষত মুক্তি ঘটাটা অসম্ভব। না, ঘটেনি। অনেক কিছুই ঘটেছে, অনেকের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু সব পরিবর্তনই জোরেশোরে একটা খবর জানাচ্ছে, সেটা হলো আসল জায়গায় পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেনি, ক্ষমতাহীন মানুষ ক্ষমতা পায়নি, বঞ্চিতদের বঞ্চনা ঘোচেনি। অল্প কিছু মানুষ ধনী হয়েছে, অকল্পনীয়রূপে। বাকিরা গরিব হয়েছে। উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক সর্বত্র পুঁজির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লোকে এখন মুনাফা ছাড়া আর কিছু বোঝে না। নিজেরটা দেখে, অন্যের দিকে তাকায় না। পাকিস্তানি হানাদাররা সশব্দে লুটপাট করেছে, বিশেষ করে নয় মাসে। তারপর থেকে স্থানীয়রা লুটপাট চালিয়েছে, তুলনামূলক কম শব্দ করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিল, যেমনটা নিত তারা পাকিস্তানি রাষ্ট্রে। তাতে বোঝা গেছে রাষ্ট্র নতুন ঠিকই, কিন্তু তার চরিত্র সেই আগেরই। সামরিক বাহিনী যখন ক্ষমতায় থাকে না তখন রাষ্ট্র চলে অসামরিক আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে। সেটাও পুরনো ব্যবস্থা। নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তাতে রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্রে পরিবর্তন আসেনি। আর নির্বাচিত হয়েছে কারা? হয়েছে তারাই যাদের টাকা আছে। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিচিত, স্থানীয় উন্নয়নে মনোনিবেশ সবকিছুই অর্থহীন যদি টাকার অভাব থাকে। টাকা না-থাকলে দলীয় মনোনয়নই পাওয়া যাবে না। নির্বাচিত হওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণতার জন্য প্রসিদ্ধ, কিন্তু এখন এসেছে এক নতুন ধর্ম, সে হচ্ছে অর্থের শাসন। টাকা এখন ইহজাগতিক ঈশ্বর, তার আরাধনায় সকলেই নিমগ্ন। পুঁজিবাদে এমনটিই ঘটে। সেখানে মানুষের শ্রমে-তৈরি অর্থ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাপারটা অনেক বেশি স্থূল, উলঙ্গ ও নির্লজ্জ।

কথা ছিল উল্টোটা ঘটবে। সমাজ হবে মানবিক। কর্ষণ চলবে মুনাফা-শিকারি মনোভাবের নয়, পরস্পরকে সাহায্য করার মানসিকতার। কিছু কিছু সংস্কারমূলক কাজ চলছে। সাহায্য সংস্থাগুলো করছে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এসব যে গড়া হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু তাতে সমাজের যে কাঠামো, তার ক্ষমতাবিন্যাস তাতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসছে না। ফলে মানুষ স্থানীয়ভাবে সুযোগ-সুবিধা পেলেও ব্যাপকভাবে মুক্তি পাচ্ছে না। দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে। গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে আসছে শহরে। যেন আগুন লেগেছে। আসলে গ্রামে কর্মের সংস্থান নেই, উপার্জনের পথ নেই।

স্বাধীনতার প্রয়োজন ছিল নতুন সমাজ গড়ার জন্যই। এই দাবিটা কোনো বিলাসিতা ছিল না। ছিল প্রাণের দাবি। আশা ছিল এই যে, জাতীয় প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেলে, শ্রেণি প্রশ্ন মীমাংসা করাটা সহজ হবে। কিন্তু শ্রেণি এমনই বস্তু যে সে মীমাংসিত প্রশ্নকেও অমীমাংসিত করে দেয়। বাংলাদেশ হবার পর যারা অনেক টাকা করেছে এবং পাকিস্তান আমলে কিছুটা সুযোগ-সুবিধা পাবার দরুন ও কিছুটা সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতার কারণে যারা পাকিস্তানপন্থি ছিল তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষাকারী যে প্রতিষ্ঠান বিএনপি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের অনুকরণে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধ্বনি তুলেছে। অন্যদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ যে আওয়ামী লীগ তারাও সমগ্র জনগণকে নিজের সঙ্গে নিতে পারছে না। জনগণ দূরে থাকছে, কেননা তারা গরিব, তারা এক হবে কি করে ধনীদের সঙ্গে? সমাজে বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। পাকিস্তান আমলে বৈষম্যটাকে স্থানীয়-অস্থানীয়ের বৈষম্য বলে চিহ্নিত করা যেত, এখন সেটা করা সম্ভব নয়, কেননা এখন সকলেই স্থানীয়। বস্তুত জাতি এখন আর এক থাকছে না, দুই জাতিতে পরিণত হচ্ছে। আমরা এক নতুন দ্বি-জাতিতত্ত্বের দিকে এগুচ্ছি। অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্ম জাতি গড়ছে না, শ্রেণি গড়ছে, জাতিকে সংহত না করে শ্রেণিকেই সংহত করছে। মুক্তি আসেনি। আসছে না। না আসার প্রমাণ ও লক্ষণ বেশ স্পষ্ট।

সংবিধান থেকে ধর্মরিপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ওই দুটি দাবি এসেছিল মুক্তির জাগ্রত আকাক্সক্ষা থেকেই। পাকিস্তান আমলে তৈরি সাম্প্রদায়িক ও শ্রেণিগত বিভাজনকে নাকচ করে দিতে চেয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মূলনীতি দুটি যে বিদায় করে দেয়া হলো সেটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, স্বাভাবিক ঘটনা বটে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ, আমাদের ইতিহাসের একমাত্র জনযুদ্ধ। জনযুদ্ধ জনতার জয় হয়েছিল। কিন্তু বিজয়ী জনতা ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছিল ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে, ক্ষমতা আগের মতোই চলে যাচ্ছিল অল্প কিছু মানুষের হাতে। পঁচাত্তরের নৃশংস পটপরিবর্তনের পর নতুন যারা ক্ষমতায় এলো তারা শুধু ক্ষমতাই বুঝেছে, অন্যকিছু বুঝতে চায়নি। তারা জনগণের লোক নয়, জনগণের আদর্শ তাদের নয়। তাদের আদর্শে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের স্থান ছিল না। তারা তাদের আদর্শকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং সেটাই ছিল স্বাভাবিক। তারপর ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়েই যারা ক্ষমতায় এসেছিল এবং আছেও তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পরিচিত। কিন্তু কই তারাও তো সরিয়ে-দেয়া মূলনীতি দুটি ফেরত আনেনি। ফেরত আনা পরের কথা, তারা সাংবিধানিক বৈধতাও দিয়ে দিয়েছে। এই উদাসীনতা তাৎপর্যহীন নয়। বাস্তবতা বদলে গেছে। জনগণ যে স্বপ্ন দেখেছিল তা এখন অতীতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। হয়তো-বা অতীতের স্মৃতিতেই পরিণত হবে, কারো কারো হয়তো মনে এমন আশা রয়েছে।

মূল সত্যটা হচ্ছে এই যে, জনগণের কাছে ক্ষমতা নেই, ক্ষমতা থেকে তারা অনেক দূরে। সামরিক সরকারের আমলে দূরে ছিল, নির্বাচিত সরকারের আমলেও সেই দূরেই রয়ে গেছে। এই দূরত্ব আগামীতে বাড়বে না, বরং কমে আসবে, এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কী? তা তো বলা যাবে না। জনগণের ন্যূনতম চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি কই? কর্মসংস্থানের উদ্যোগ কোথায়?

রাষ্ট্রক্ষমতায় যে বড় পরিবর্তন এসেছে সেগুলো এমনি এমনি ঘটেনি, বিত্তবানদের কারণেও ঘটেনি। প্রত্যেকটির পেছনেই জনগণ ছিল। ১৯৪৬-এ সাধারণ মানুষ ভোট দিয়েছে। ১৯৭১-এ সাধারণ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। তাতেই রাষ্ট্র বদলেছে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ছিল অপূর্ণ; ওই স্বাধীনতায় মুক্তি এলো না। উল্টো মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ল। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা ভিন্ন প্রকারের, তার সামনে মুক্তির লক্ষ্যটা ছিল আরো স্পষ্ট, আরো প্রত্যক্ষ। কিন্তু এই স্বাধীনতা তার প্রতিশ্রæতি রক্ষা করেছে কি? মুক্তি এসেছে কি মানুষের? সে তো মনে হয় অনেক দূরের ব্যাপার।

মুক্তি না-আসার কারণটি হচ্ছে এই যে, সংগ্রাম জনগণই করেছে এটা ঠিক, কিন্তু নেতৃত্ব তাদের হাতে ছিল না। জনগণের হাতে নেতৃত্ব থাকার অর্থ কি? জনগণ তো ব্যক্তি নয়, এক নয়, তারা বহু, অসংখ্য, কে নেতা হবে কাকে ফেলে? জনগণের হাতে নেতৃত্ব থাকার অর্থ হলো জনগণের স্বার্থ দেখবে এমন সংগঠনের হাতে নেতৃত্ব থাকা। স্বার্থটাই আসল কথা। আওয়াজ উঠতে পারে নানাবিধ, আওয়াজ মানুষকে উদ্বুদ্ধও করে নানাভাবে, কিন্তু ধ্বনি যথেষ্ট নয়, কার স্বার্থে ধ্বনি উঠেছে সেটাই জরুরি।

জনগণের পক্ষে অনেক সংগঠনই কথা বলেছে বলে মনে হয়েছে। এখনও মনে হচ্ছে। সাধারণ মানুষ সাড়াও দিয়েছে তাদের ডাকে; কিন্তু পরে যখন ক্ষমতা হাতে এসেছে তখন সংগঠনগুলো জনগণের স্বার্থ দেখেনি, স্বার্থ দেখেছে নিজেদের। সাধারণ মানুষের স্বার্থ দেখার কথা বামপন্থিদের। আমাদের দেশ বলে নয়, সবদেশেই আজকের যুগে সামাজিক বিপ্লব বামপন্থি আন্দোলনের দ্বারাই সম্ভবপর, দক্ষিণপন্থিরা ওই কাজ করবে না। সমগ্র জনগণের স্বার্থ দেখার কথা বামপন্থিদেরই, কেননা তারা শ্রেণির নয়, তারা শ্রেণিচ্যুত।

কিন্তু বাংলাদেশে বামপন্থিরা জনগণকে সঙ্গে নিতে পারেনি। যে জন্য তারা শক্তিশালী হয়নি। জনগণের আস্থা তাদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তাদের এই ব্যর্থতার কারণ জনগণের মেজাজ, ভাষা, কল্পনা তারা আত্মস্থ করতে পারেনি এবং একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে কখন কার প্রধান দ্ব›দ্ব সেটা অনুধাবনেও তারা অপারগ হয়েছে। ১৯৪৭ সালেই বামপন্থিরা আওয়াজ তুলেছিল, ইয়ে আজাদী ঝুটা হায়, লাখো ইনসান ভুখা হায়। বক্তব্যটা একেবারেই সঠিক ছিল। মানুষ অভুক্ত রয়েছে। স্বাধীনতা কোথায়? স্বাধীনতা যে ভুয়া ছিল তা মানুষ পরে বুজেছে, বুঝে নতুন করে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, কিন্তু সাতচল্লিশে তারা প্রস্তুত ছিল না নতুন করে আন্দোলন করতে। তাদের চোখে তখনও স্বপ্নের ঘোর এবং সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার নির্মম স্মৃতি। জনগণ সাড়া দেয়নি। শাসকেরা সুযোগটা নিল, তারা বামপন্থি দমনে তৎপর হয়ে উঠল। ব্যর্থ হয়ে বামপন্থিরা রণকৌশল বদল করা দরকার মনে করল। এবার চলে গেল তারা উল্টো মেরুতে, ঠিক করল কাজ করতে হবে ধীরে ধীরে, পরিচয় লুকিয়ে, উঠতি মধ্যবিত্তের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনৈতিক দলের ছাত্রছায়ায় থেকে। কিন্তু শাসকরা তো জানে তাদের আসল শত্রু কারা। আসল শত্রু আসলে জনগণ, যাদের তারা শোষণ করে এবং সে-জন্য ভয় করে। জনগণের পক্ষে যে সংগঠন দাঁড়াবে স্বভাবতই শাসক তাদের শত্রু জ্ঞান করবে। তখনকার পাকিস্তানে তারা তাই অন্য রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেনি, নিষিদ্ধ করেছে কমিউনিস্ট পার্টিকে। যাদের সঙ্গে তাদের ভোটযুদ্ধ, অর্থাৎ ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই, তাদেরকেও নানাভাবে জব্দ করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়নি; নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে বামপন্থিদেরকে, জাতশত্রু জ্ঞান করে।

তারপরও বাম আন্দোলন ছিল। ছিল তারা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে, ছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে, ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। জনগণের স্বার্থে কথা তারাই মূলত বলেছে। কিন্তু তারা নিজেরা গেছে নানা ধারায় বিভক্ত হয়ে। জনতা বিভক্ত নয়, জনতার পক্ষের লোকেরা বিভক্ত। বামপন্থিরা সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেনি, সেটা হচ্ছে জাতিসত্তার নিপীড়ন-বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্ব। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা জাতিগত প্রশ্নের মীমাংসা না করলে শ্রেণিগত প্রশ্নটি যে স্পষ্ট হবে না এটা তারা খেয়াল করেনি। সঠিকভাবে ব্যাপারটির গুরুত্ব অনুধাবন করলে স্বাধীনতার যুদ্ধ তাদের নেতৃত্বেই হতো এবং তার পরিণতি হতো ভিন্ন রকমের, মুক্তিযুদ্ধ আরো এগিয়ে যেত, সমাজ এগুতো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অভিমুখে।

বামপন্থিদের কোনো কোনো অংশ অবশ্য রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা যে প্রথম দরকার সেটা বুঝেছিল। কিন্তু তারা সংগঠিত হতে পারেনি। তাছাড়া জনগণের ভাষা তারা জানত না। পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের দ্ব›দ্বকে কীভাবে জাজ্বল্যমান করে তুলতে হবে তা তাদের ধারণার মধ্যে ছিল না। জাতিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন না থাকায় বামপন্থিদের অংশবিশেষ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পর্যন্ত করেছে।

স্বাধীনতার পরে বামপন্থিদের কাছ থেকে এটা প্রত্যাশিত ছিল যে, সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে তারা ঐক্যবদ্ধ হবে। তারা তা হয়নি। বরং তাদের বিভাজন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। একাংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যে জাতীয় বুর্জোয়াদের খুঁজতে চেষ্টা করেছে এবং আশা করেছে তথাকথিত এই বুর্জোয়াদের সাহায্যে বিপ্লব সংগঠিত করবে। কিন্তু পুঁজিবাদের সর্বাত্মক বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় বুর্জোয়া পাওয়া যায়নি, লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়ারাই কর্তৃত্ব করেছে। এরা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাই বিশ্ব পুঁজিবাদের আগ্রাসনের মুখে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে জাতীয় স্বার্থকে বিক্রি করতেও তারা প্রস্তুত থেকেছে। লুণ্ঠনকারীরা সেটাই করে; মুফতে-পাওয়া সম্পত্তির প্রতি তাদের কোনো মায়া, মমতা থাকে না। বাম উগ্রপন্থিদের কেউ কেউ আবার বলতে চেয়েছে যে, স্বাধীনতা আসেনি, রুশ-ভারত অক্ষশক্তি পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিয়েছে মাত্র। এসব বিচ্ছেদ ও বিভ্রান্তির কারণে জনগণের পক্ষে দাঁড়াবে এমন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বিকশিত হতে পারেনি।

একাত্তরের পরে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়েছিল তাদের নিজেদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল। তাদের দলীয় তরুণদের একাংশ দেখছিল তারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পারছে না, অপরাংশের তুলনায় তারা সুবিচার পাচ্ছে না। হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে তারা বের হয়ে এসে নতুন সংগঠন গড়েছে, নাম দিয়েছে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। তাদেরকেও যেহেতু শক্তি সঞ্চয় করা প্রয়োজন ছিল এবং এই শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার কাছ থেকে পাবে বলে আশা করা যাচ্ছিল না তাই তারা জনগণের কাছে গেলো। জানত তারা যে জনগণ পুরনো আওয়াজে আর সাড়া দেবে না। তাই নতুন রণধ্বনি তুলল সমাজতন্ত্রের এবং হাজার হাজার তরুণ, যারা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছিল, যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, কিন্তু মুক্তির পথ দেখতে পায়নি তারা তৎক্ষণাৎ সাড়া দিয়েছে, যোগ দিয়েছে ওই দলে। ওই দলের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ এখনো সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগোতে চাইছে, কিন্তু মূল দলসহ বাদবাকিরা ভিন্ন ভিন্ন রূপে ও মাত্রায় বিলীন হয়ে গেছে।

রাজাকাররা ফিরে এসেছে। মৌলবাদ শক্তিশালী হয়েছে। এর মূল কারণ ওই একটাই, সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসেনি। সমাজ একটা ধাক্কা খেয়েছে, সে নড়ে উঠেছে, কিন্তু এমনভাবে আধুনিক হয়নি যে রাজাকার ও মৌলবাদ অতীতের প্রাণী বলে চিহ্নিত হবে, পরিণত হবে এক দুঃস্বপ্নের স্মৃতিতে। ক্ষমতায় যারা যাতায়াত করে রাজাকার ও মৌলবাদ তাদের কাছে যথার্থ অর্থে দূরের নয়। কারো জন্য খুব কাছের, কারো জন্য ততটা কাছের নয়, ব্যবধান এইটুকুই, সেটা মাত্রাগত, গুণগত নয়। সমাজে বৈপ্লবিক রূপান্তরের চেষ্টা যদি চলতো তাহলে এরা প্রশ্রয় পেত না। শাসকশ্রেণি ধর্মকে ব্যবহার করে চলেছে, দুই কারণে। এক, জনগণের ধর্মীয় অনুভ‚তিকে কাজে লাগিয়েছে তাদেরকে নিজেদের রাজনৈতিক দলের কাছে নিয়ে আসার অভিপ্রায়ে। দুই, নিজেরাই যেসব অন্যায় করছে তার দরুন তৈরি অপরাধবোধ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায়।

বাংলাদেশের জন্য গ্রামই ছিল ভরসা। আন্দোলনে গ্রাম না এলে জয় আসেনি। বিপদের সময় গ্রাম যদি আশ্রয় না দিত তবে বিপদ ভয়াবহ হতো। গ্রামেই রয়েছে উৎপাদক শক্তি। গ্রামবাসীর শ্রমে তৈরি উদ্বৃত্ত মূল্য লুণ্ঠন করেই ধনীরা ধনী হয়েছে। এখনো গ্রাম কাজে লাগছে বিদেশ থেকে সাহায্য, ঋণ, দান ইত্যাদি এনে তার সিংহভাগ আত্মসাৎ করার অজুহাত ও অবলম্বন হিসেবে।

একাত্তরে আমরা গ্রামে গেছি। বাড়িঘর, মজা পুকুর, হারিয়ে-যাওয়া ক্ষেত, মৃতপ্রায় গাছপালা এসবের খোঁজখবর করেছি। শহর তখন চলে গেছে শত্রু র কবলে, যাকগে, আমরা গ্রামেই থাকব এই সিদ্ধান্ত ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। শহরের পতন ঘটেছে সর্বাগ্রে, গ্রামের ঘটেনি, যদি ঘটত তাহলে আমাদের পক্ষে অত দ্রুত জেতা সম্ভব হতো না।

কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র গ্রামে যারা গিয়েছিল তারা যত দ্রæতগতিতে গেছে তার চেয়ে দ্রুতগতিতে ফেরত চলে এসেছে। পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া বাড়িঘর, কারখানা, অফিস, পদ, গাড়ি যে যেটা পেরেছে লুণ্ঠন করেছে। পাকিস্তানিরা অব্যাহতভাবে লুণ্ঠন করেছিল ২৪ বছর, বিশেষ করে নয় মাসে তাদের তৎপরতা সীমাহীন হয়ে পড়েছিল, তারা ভেঙে দিয়ে গিয়েছিল সবকিছু। স্বাধীনতার পরে সুবিধাভোগীরা শোধ নিয়েছে। লুটপাট করেছে স্বাধীনভাবে। এখনো করছে।

গ্রাম রইল সেখানেই যেখানে ছিল। বস্তুত খারাপই হলো তার অবস্থা। পাকিস্তানিরা হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন সব করেছে। ঘর পুড়িয়েছে, ফসল জ্বালিয়েছে। স্বাধীনতার পরে গ্রামবাসী পুরনো জীবন ফিরে পায়নি। অবকাঠামো গিয়েছিল ভেঙে। বন্যা এলো। এলো দুর্ভিক্ষ। বিপুলসংখ্যক মানুষ একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়ল।

গ্রাম এখন ধেয়ে আসছে শহরের দিকে। আশ্রয়দাতা হিসাবে নয়, আসছে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে। তার হাত দুটি মুক্তিযোদ্ধার নয়, হাত তার ভিখারীর। ফলে শহর এখন বিপন্ন মনে করছে নিজেকে। ভাবছে আবার তার পতন ঘটবে এবার পাকিস্তানিদের হাতে নয়, গরিব বাংলাদেশিদের হাতে। মনে হচ্ছে আবারও একটা মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হবে।

না, তেমন যুদ্ধ ঘটবে না। কেননা মুক্তিযুদ্ধ তো চলছেই কোনো না কোনোভাবে। মানুষ যে মুক্ত হয়নি সেটা কারো কাছেই অস্পষ্ট নয়। ওই যুদ্ধকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সেটা বড় রাজনৈতিক দল দুটি করবে না। তার জন্য বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন হবে। ডানদিকের নয়, বামদিকের।

বলা হয়, গণতন্ত্রের মানে হচ্ছে সংখ্যাগুরুর শাসন। কিন্তু আমাদের দেশে সংখ্যালঘুরা, অর্থাৎ ধনীরা শাসন করে সংখ্যাগুরুকে, অর্থাৎ গরিবকে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই এই ব্যবস্থা চলা উচিত নয়। এটা চলবেও না। এই জন্য যে সংখ্যাগুরু সচেতন ও বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে। তারা মুক্তি চায়। পরিবর্তন একটা ঘটবেই। প্রশ্ন হলো, কবে এবং কীভাবে। স্বাধীনতা ওই বড় পরিবর্তনের জন্যই প্রয়োজন ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নিজেই দুর্বল হয়ে পড়বে যদি জাতীয় মুক্তি না আসে।

মুক্তির প্রশ্নটি এখন আর আঞ্চলিক নয়। দ্বন্দ্ব এখন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের নয়, প্রশ্নটি এখন শ্রেণিগত, দ্বন্দ্ব এখন বাঙালি ধনীর সঙ্গে বাঙালি গরিবের। বিষয়টা এমন পরিচ্ছন্নভাবে প্রকাশ পেত না বাংলাদেশ যদি স্বাধীন না হতো। স্বাধীনতা আমাদের খুবই জরুরি ছিল, সমষ্টিগত অগ্রগতির পথে প্রথম সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে।

লেখক: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী. ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close