• বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮
  • ||

মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাহিনী

প্রকাশ:  ২৬ মার্চ ২০২১, ০০:৫৭
জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী
জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী

৪৬ বৎসরের উজ্জ্বল দীর্ঘ যুবক শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের লাহোরে দীপ্ত গম্ভীর স্বরে ১৯৬৬ সনের ৬ই ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানীদের জ্ঞাত করলেন পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করেন। তারা অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার এবং ভারতীয় আগ্রাসনের বিপরীতে নিরাপত্তা বঞ্চিত। সমস্যা নিরসনের নিমিত্তে তিনি ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন।

তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখাত হলো। উল্টো শুরু হলো শেখ মুজিব সহ ৩৮ জন বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। অবশ্য পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছিল যে, অভিযোগের সত্যতার ইতিহাস। শেখ মুজিব ফাঁসির দড়ি থেকে মুক্ত হয়েছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে দেশব্যাপী গণআন্দোলনের কারণে। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সিরাজুল আলম খানের চাতুর্য্যে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নেতা তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ভূষিত করলেন “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে।

সম্পর্কিত খবর

    ৬ দফার ভিত্তিতে নির্বাচন করে ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। পাকিস্তানের সামরিক সরকার জাতীয় সংসদ অধিবেশন রহিত করে শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।

    সে সুযোগ নিয়ে ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস নেতা সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক চতুরতায় ডাকসু ভাইস প্রেসিডেন্ট আ.স.ম আব্দুর রব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ২রা মার্চ (১৯৭১) “স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা” উত্তোলন করেন এবং পরের দিন পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে শাজাহান সিরাজ পাঠ করলেন “জয় বাংলা ইশতেহারঃ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা ও কর্মসূচি।”

    আবহাওয়া উত্তপ্ত হতে থাকলো। জয়বাংলা বাহিনীর ডেপুটি প্রধান কামরুল আলম খান খসরু গান ফায়ার করে যুদ্ধের ঘোষণা দেন। ঢাকাস্থ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা প্রধান মসিহ উদদৌলা শেখ মুজিবুরকে জানালেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি সৈনিক ও অফিসার বেশি আছে। ফলে এখন বিনা রক্তপাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারের বাঙালি সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানীর মাধ্যমে জানান যে, সামরিক গোপন সার্কুলারে তিনি জেনেছেন যে, সামরিক সরকার শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না। তিনি আরও তথ্য দেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তার আধিক্য থাকায় বিনা রক্তপাতে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হবে।

    ২ বঙ্গবন্ধু নিজে কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদের নিকট উপরোক্ত তথ্যসমূহ পাঠিয়ে দেন। সিদ্ধান্ত হয় যে, সামরিক সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির নিমিত্তে ৭ই মার্চ ১৯৭১ শেখ মুজিবুর রহমান বক্তব্য রাখবেন এবং দিকনির্দেশনা দেবেন। এটি একটি গণতান্ত্রিক ঐতিহাসিক ভাষণ। সামরিক সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডকে দূতিয়ালির জন্য ঢাকা পাঠালেন। তিনি জানালেন যে, ঢাকায় ইয়াহিয়া খান এসে আলাপ-আলোচনা করে সংসদ অধিবেশনের তারিখ স্থির করবেন। অপর পক্ষে শেখ মুজিব নিশ্চিত করলেন যে, তিনি বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে এক ধরনের ফেডারেশনে আগ্রহী এবং তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্টদের সামলাতে পারবেন না।

    ৩ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে আলোচনার নামে ৬ দফার বাস্তবায়ন বিষয়ে সময়ক্ষেপণ করলেন এবং ২৪শে মার্চ ঢাকা ত্যাগ করলেন। শুরু হলো নিরীহ জনতার উপর সামরিক বাহিনীর গণহত্যা। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। মেজর জিয়াউর রহমান মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে ২৭শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৭১ সনের এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় ৭০-৮০ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক আত্মরক্ষার নিমিত্তে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ভারতীয় সরকার ও রেডক্রস সোসাইটি বিস্তারিত তথ্য হস্তান্তর না করায় শরণার্থীর সঠিক তথ্য স্বীকৃত নয়, অনুমানভিত্তিক।

    মুক্তিযুদ্ধের তিন রণাঙ্গন: মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃতি ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বরিশালের পেয়ারা বাগানে মার্ক্সবাদী নেতা সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে, টাঙ্গাইলে বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর অধিনায়কত্বে, নরসিংদীর শিবচরে মান্নান ভুঁইয়া ও আনোয়ার খান জুনোর পরিচালনায় এবং অন্যান্য আরও কয়েকটি অঞ্চলে। ভারতে অবস্থান করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল সীমান্তে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও কর্নেল এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে এগারটি সেক্টরে দশজন সেক্টর কমান্ডারের অধীনে মুক্তিবাহিনী নিয়ন্ত্রিত মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিবাহিনীর মূল শক্তি ছিল কৃষক, শ্রমিক এবং কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। তাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও হাবিলদারগণ, ইপিআর ও পূর্ব পাকিস্তান থেকে যাওয়া পুলিশগণ। তৃতীয় রণাঙ্গন ছিল লন্ডনে যেখান থেকে বৃটিশ যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কূটনৈতিক কার্যকলাপ ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন পরিচালিত হতো, দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি আবু সাইয়িদ চৌধুরী। যার কঠিন পরিশ্রমে বিশ্ব বিবেক বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে সমর্থন দান করেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের জেল থেকে ২২শে ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে মুক্তি পান।

    মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্য- সহযোগিতা ও চক্রান্ত: ১৯৪৭ সনের ভারত বিভক্তি ভারতীয় রাজনীতিবিদগণ মেনে নিতে পারেননি। ভারতকে ‘‘পাকিস্তান ও ভারত” দুই দেশে বিভক্ত করাকে তারা “ভারত মাতার” দ্বিখণ্ডন বলে মনে করতেন। ভারতের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে ১৯৪৭ সনের ১০ই জুলাই বুলেটিনে এ বিষয়ে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের বক্তব্য বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য for freedom what we have achieved cannot be completed without unity of India.

    ৪ ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানকে কিভাবে ভারতের অংশ করা যাবে সে নিয়ে সুদূরপ্রসারী সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে ভারতীয় প্রধান গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে। ১৯৬৮ সনে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং’ (Research and Analysis Wing- RAW) নামে পুনর্গঠিত হয় এবং তাদের মূল কার্যক্রম শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তান ঘিরে।

    ৫ ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তা শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৬২ সনের ২৫শে ডিসেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান ও দৈনিক ইত্তেফাকের মানিক মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলাপ করেন। শশাঙ্কবাবু পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত কিন্তু কলকাতায় ২১, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ রোড, নর্দান পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা ৭০০০২১ বসবাসকারী চিত্তরঞ্জন সুতারের সঙ্গে শেখ মুজিবের যোগাযোগ করিয়ে দেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের একটি চিঠি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর নিকট পাঠাবার ব্যবস্থা নেন। পরবর্তীতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এবং নিউক্লিয়াসের মূল কর্মকর্তাদের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন সুতারের সম্পর্ক স্থাপন করিয়ে দেন।

    কলকাতার ১০৪ রামলাল বাজারের কর্মকার বুক স্টল থেকে প্রকাশিত ডা. কালিদাস বৈদ্য তার ‘বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব’ গ্রন্থে এ সম্পর্কিত অনেক তথ্য আছে।

    উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৯ই জানুয়ারি ১৯৭২ সনে লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকা আসার পথে সার্বক্ষণিকভাবে র’ এজেন্ট শশাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধুর পাশে বসে এসেছিলেন এবং তিনি ১০ই জানুয়ারি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তার আলাপের সকল তথ্য অবহিত করেন। এ সকল তথ্য শশাঙ্ক রচিত আত্মকাহিনীতে আছে।

    ষাটের দশকে বিপ্লবী চারু মজুমদারের নকশাল আন্দোলনের ভারতের পূর্ব অঞ্চলেরাজ্যসমূহে দ্রুত ব্যাপ্তিতে কেন্দ্রীয় ভারত সরকার ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশের মাধ্যমে গুপ্ত হত্যায় জড়িত হয়ে পড়ে। এতে সমস্যার দ্রুত সমাধান না হওয়া “র” ভারতীয় সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ও আবেগ অনুভূতি অন্য পথে তাড়িত করার লক্ষ্যে নতুন পথ সন্ধান শুরু করে। ঠিক এই সময়ে (মার্চ, ১৯৭১) পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গণহত্যা শুরু হয় এবং ব্যাপক সংখ্যক পূর্ব পাকিস্তানবাসী আত্মরক্ষার নিমিত্তে ভারত সীমান্ত অতিক্রম করতে থাকে বিশেষত: পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসাম সীমান্ত দিয়ে। এই তিন রাজ্যের জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ অতীতে ভারত বিভক্তির পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন। স্বভাবতই ১৯৭১ সনের শরণার্থীদের জন্য এদের সহানুভূতি থাকা স্বাভাবিক মনে করে নকশাল আদর্শ থেকে দৃষ্টি ভিন্নপথে চালিত করার জন্য ভারত সীমান্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীর জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হয় জঅড এর পরামর্শ ও সাহায্য সহযোগিতায়। জঅড এর দূরদৃষ্টি ফলপ্রসূ হয়, নকশাল আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং বিপ্লবী নেতা চারু মজুমদার গ্রেফতার হন এবং বিনা চিকিৎসায় জেলে তার মৃত্যু হয়। সামপ্রতিকালে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে বিচারাধীন মোস্তাক আহমদের মৃত্যুর সঙ্গে তুলনীয়। একই সঙ্গে ভারত সরকার দশ দিনের মধ্যে সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দীন আহমদের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে পূর্ণ সাহায্য সহযোগিতা নিশ্চিত করে এবং মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ১৭ই এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রবাসী সরকারের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার ব্যবস্থা করে দেন।

    কেবলমাত্র প্রবাসী সরকার নির্ধারিত ব্যক্তিদের এফ এফ (Freedom Fighter) মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে ভারত সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও প্রবাসী সরকারের অগোচরে জঅড এর মেজর জেনারেল উবান (৬) “মুজিব বাহিনী” নামে একদল তরুণদের ভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর ভারত অনুগত বাংলাদেশ সরকার সৃষ্টিতে সাহায্য করবে। এই লক্ষ্যে মুজিব বাহিনী ট্রেনিং শেষ করে ১৯৭১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে প্রবেশ করেই দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত: বামপন্থীদের হত্যা শুরু করে এবং নিরস্ত্র করে। এমনকি কতকক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর সাথেও সংগ্রামে লিপ্ত হয়। জঅড “র” মুজিব বাহিনীর মধ্যেও সতর্কতার সাথে শেখ ফজলুল হক মণি ও সিরাজুল আলম খান গ্রুপ সৃষ্টি করে। জঅড এর মদতে শেখ ফজলুল হক মণি তাজউদ্দিন আহমদের প্রধানমন্ত্রিত্ব অনৈতিক বলে প্রচার করতে থাকেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভারত সরকারের অগোচরে খন্দকার মুশতাক ৪২ জন পার্লামেন্ট সদস্য নিয়ে কনফেডারেশনের ভিত্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে শেখ মুজিবের মুক্তির প্রচেষ্টা চালানোর কারণে তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে প্রত্যাহার করার জন্য ভারত সরকার প্রবাসী সরকারকে বাধ্য করে। বাংলাদেশকে পুরোপরি ভারতের নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে দীর্ঘ স্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের পরিবর্তে সরাসরি সম্মুখ সমরের মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার নিমিত্তে সেপ্টেম্বর মাসে ভারত সরকার প্রবাসী সরকারের সাথে ৭ দফা চুক্তি করে।

    ১) ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড পাকিস্তানের সাথে সম্মুখযুদ্ধ পরিচালনা করবেন, এমএজি ওসমানী যৌথ কমান্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

    ২) বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর, অনির্ধারিত সংখ্যক ভারতীয় সেনা বাংলাদেশে অবস্থান করবে।

    ৩) বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের পূর্বে বাংলাদেশ সরকারকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ নিতে হবে।

    ৪) ভারতের রপ্তানি সুবিধার্থে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য হবে খোলা বাজার (Free Market) ভিত্তিক।

    ৫) বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী থাকবে না।

    ৬) অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মুজিব বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ভারতীয় সেনাধ্যক্ষদের নেতৃত্বে একটা পারামিলিসিয়া বাহিনী (রক্ষীবাহিনী) গঠিত হবে, যারা কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর নিকট জবাবদিহি করবেন, অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট নয়।

    ৭) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাড়া অন্য কেউ প্রশাসনিক পদে থাকবেন না। শূন্যপদ সমূহ কতক সময়ের জন্য ভারতীয় বাঙালি কর্মকর্তারা পূরণ করবেন সহজে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও অন্তর্কলহ দমনের নিমিত্তে।

    চুক্তি প্রণয়নে কর্নেল ওসমানী জড়িত ছিলেন না। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রমুখ জড়িত ছিলেন। এই ৫, ৬ ও ৭ শর্তে কর্নেল এমএজি ওসমানী ভয়ানক আপত্তি করেন। শর্ত প্রয়োগ সংক্রান্ত একটি মিটিং কর্নেল ওসমানী বলেন, শেষ তিনটি শর্ত অপ্রয়োজনীয় এবং অসম্মানজনক। বহু বাংলাদেশি সিএসপি আমলা আছেন। কিছু অংশ প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কার্যরত আছেন। অধিক সংখ্যক সিএসপি (ঈঝচ) আমলা পাকিস্তানে আটক আছেন। তারা নিশ্চয় বিজয়ের পর দেশে ফিরে দায়িত্বভার নিতে পারবেন। ভারতীয় বাঙালি কর্মকর্তাদের বেসামরিক প্রশাসনিক কার্যে নিয়োজিত দেখলে দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হবে এবং প্রচারের সম্ভাবনা রয়েছে যে, বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা ভারতের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। ইসলামাবাদের পরিবর্তে দিল্লি কর্তৃক বাংলাদেশ শাসিত হচ্ছে। সেনাবাহিনীবিহীন স্বাধীন দেশ হাস্যকর। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও অন্য সৈনিকদের কি হবে? স্বাধীনচেতা ওসমানীকে ভারত একটি বড় সমস্যা বিবেচনা করে যৌথ কমান্ডে যুদ্ধ পরিচালিত হলেও কর্নেল ওসমানীকে বিভিন্ন যুদ্ধ ক্ষেত্র পরিদর্শনে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। যুদ্ধের ফলাফল পর্যবেক্ষণের জন্য ওসমানী লেখককে এবং কেএম ওবায়দুর রহমানকে ৫ই ডিসেম্বর যশোর পাঠান। ফিরে এসে লেখক কর্নেল ওসমানীকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যশোর ক্যান্টনমেন্ট লুটের তথ্য জ্ঞাত করালে তিনি লেখককে সঙ্গে নিয়ে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জ্ঞাত করেন এবং প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মন্তব্য করলেন, ‘সব সৈন্যদের একই চরিত্র’। তাজউদ্দীন আহমদের চাপে পড়ে ১০ই ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনের জন্য কর্নেল ওসমানীকে একটি সামরিক হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে ভারত সরকার রাজি হয়। ‘‘র” সুপরিকল্পিতভাবে যৌথ কমান্ডকে অস্বীকার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংগ্রামকে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে রূপ দেবার লক্ষ্যে ১৬ই ডিসেম্বরে (১৯৭১) তারিখে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কর্নেল ওসমানীর অনুপস্থিতি নিশ্চিত করে।

    সিলেটের আকাশে একই দিনে অতর্কিতে ওসমানীকে বহনকারী হেলিকপ্টার অজ্ঞাত বিমানের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে কর্নেল ওসমানীকে হত্যার চেষ্টা মূল পরিকল্পনার অংশ বিবেচনা করলে ভুল হবে কি? এত বড় ঘটনার কোন তদন্ত ভারত ও বাংলাদেশে হয়নি। ভারতীয় পরিকল্পনায় বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসের সংগ্রামে জয়ী হয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এত অল্প সময়ে স্বাধীনতা অর্জনের দ্বিতীয় কোন উদাহরণ নাই।

    বাংলাদেশ সৃষ্টিতেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও “র” এর দূরদর্শিতার আলোকে ভারতের বিনিয়োগ আলোচনা প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতের ব্যয় বিনিয়োগের হিসাব ভারত কখনও প্রকাশ করেনি, তাই হিসাবটা কতক অনুমাননির্ভর। প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীদের প্রায় ১০ মাস আহার-বাসস্থানের ব্যবস্থাপনায় প্রায় ছয়শত থেকে নয়শত কোটি রুপি এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ ও প্রত্যেক সৈনিককে মাসে দেড়শত রুপি ভাতা প্রদানে সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। নগদ টাকায় ভাতা দেবার ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতপ্রীতি ও নির্ভরশীলতা ক্রমেই বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে ভারত পকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণে শতাধিক ভারতীয় সৈনিকের প্রাণহানি হয়েছে। শরণার্থী ক্যাম্পে উদ্বেগজনক সংখ্যক বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে দুর্যোগ অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসার অপ্রতুলতার কারণে। প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ পেলে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতার পরিবর্তে ভয়ানক ক্ষোভের সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাকে রহিত করার নিমিত্তে ভারত সরকার ও ভারতীয় রেডক্রস সোসাইটি মৃত ব্যক্তিদের তথ্য অদ্যাপি বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করেনি। ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে সর্বনিম্ন দশ লাখ এবং ঊর্ধ্বে বিশ লাখ বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে যাদের অধিকাংশ শিশু, গর্ভবতী ও বয়োবৃদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সিডিসি’র কাছে প্রায় ৭ লাখ মৃত্যুর হিসাব আছে, সকল মৃত্যুর হিসাব তারা সংগ্রহ করতে পারেনি।

    বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতের বিনিয়োগে, ভারত চার ভাগে লাভবান হয়েছে-

    (১) পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানকে মোকাবিলা করতে হয় না বিধায় ঐ অঞ্চলের জন্য কয়েক হাজার কোটি রুপি সামরিক ব্যয় কমেছে।

    (২) বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

    (৩) বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় শ্রম ম্যানেজারগণ প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ভারতে প্রেরণ করেন।

    (৪) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাধীনতা কর্মীদের (বিচ্ছিন্নতাবাদীদের) সংগ্রাম আন্দোলনে ভারত অনুগত বাংলাদেশ সরকারের (?) সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবার ফলে ভারতীয় জনগণের ক্ষতি হলেও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বেড়েছে এবং আপাতত ভারত বিভক্তি আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়েছে।

    বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে ভারতের বিভিন্ন সমপ্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা বিভক্তি সৃষ্টিকারী গুজরাটের কসাই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ করে বাংলাদেশ ধর্মান্ধ সামপ্রদায়িক ভারতীয় কূটচালে জড়িয়ে পড়ছে এবং প্রায় ত্রিশ কোটি সংখ্যালঘু ভারতীয়দের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে, সঙ্গে অসমপ্রদায়িক বঙ্গবন্ধুকেও অপমান করা হচ্ছে।

    মেজর খালেদ মোশাররফের সাবধান বাণী- অক্টোবর মাসে সম্মুখ যুদ্ধে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই নম্বর সেক্টর এবং কে ‘ফোর্সের’ অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ ভারতীয় সেন্ট্রাল কমান্ডের লক্ষ্ণৌ সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় লেখকের সঙ্গে সাক্ষাতে বলেন, ‘‘ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমূহ বিপদ, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের থেকে ভারত উন্নতমানের চৈনিক অস্ত্র উঠিয়ে নিয়ে নিম্নমানের ভারতীয় অস্ত্র দিচ্ছে যাতে ভারতের প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা নিশ্চিত হয়। সত্বর হয়তো আমরা বাংলাদেশের পতাকা অর্জন করবো কিন্তু ক্রমে সিকিমে পরিণত হবো।’’ এটা প্রতিহত করার নিমিত্তে তাকে চিকিৎসার উপলক্ষে অন্যদেশে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে তিনি লেখককে অনুরোধ করেন এবং যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের জন্যও কর্নেল ওসমানীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। খালেদ মোশাররফের চিন্তার স্বচ্ছতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

    মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি এবং পরবর্তী সমস্যাসমূহ

    দেশত্যাগের জন্য তাজউদ্দীন, ওসমানীর অনুরোধ উপেক্ষা করে শেখ মুজিব বাড়িতে অবস্থান করলে, তিনি পাকিস্তানীদের হাতে বন্দি হন এবং নয় মাস পাকিস্তানের জেলে আটক থাকেন, মুক্তি পান ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৭১ সনে। মিয়ানওয়ালী জেল থেকে মুক্তি পাবার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দু’বার দেখা করে অনুরোধ করেন পাকিস্তানের সঙ্গে একটা সম্পর্ক (? কনফেডারেশন) অব্যাহত রাখতে। পরে জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর ৮ই জানুয়ারি (১৯৭২) লন্ডন যাত্রায় প্রাক্কালে উপস্থিত থেকে শেখ মুজিবকে প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই তথ্য ইতালীয় সাংবাদিক ওরিয়ানো ফালাসির ‘ইন্টারভিউ’ উইথ হিস্ট্রি, গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সাংবাদিক, অ্যান্থনি মাসক্যারেনহাসের ‘‘এ লিগাসি অব ব্লাড’’ বইতে উল্লেখ আছে।

    ১০ই জানুয়ারি দেশে ফেরার পর শেখ মুজিব সুতা ছিঁড়ে ফেলার কথা বলেন। তিনি দুপুরে দিল্লি থেকে বৃটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের প্লেনে ঢাকা পৌঁছেন। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে শুরু করে সকল রাজপথ ছিল লোকে লোকারণ্য। তাতে বঙ্গবন্ধু অভিভূত হয়ে পড়েন। রেসকোর্স অতিক্রম করার সময় বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ ১৬ই ডিসেম্বর (১৯৭১) পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের কথা জানালে, তিনি মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করেন ‘তোরা কে কে ছিলি ভারতীয়দের সঙ্গে’? পুরো আলাপের তথ্য সরকারি ভাষ্য কখনও প্রকাশিত হয়নি। তার অনুপস্থিতিতে তার নামে স্লোগান দিয়ে প্রবাসী সরকারের অপরিসীম শ্রম, বুদ্ধিমত্তা ও রণকৌশলে নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে বঙ্গবন্ধু কিভাবে দেখেছেন তা বুঝার জন্য কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন।

    ১৯৭১ সনের ১২ই জানুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা পুনর্গঠিত হলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী এবং তাজউদ্দীন আহমদ অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী নির্বাচিত হন। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে শেখ মুজিব প্রশ্ন করেন, এনএসআই প্রধান এবিএস সাফদার, পুলিশ বাহিনীর আব্দুর রহিম এরা কোথায়, এদের তো দেখছি না। তাজউদ্দীন জানান যে, আগরতলা মামলা ও মুক্তিযুদ্ধে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে বলেন, তাদের কাজে যোগ দিতে। পরের দিন, সাফদার, রহিম ও ই এ চৌধুরী কাজে যোগ দেন।

    শেখ মুজিব প্রবাসী সরকারের মন্ত্রীদের কাছ থেকে কখনও মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী শুনেননি, আলোচনা করেন নি। কোন মানসিক বাধার কারণে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুনতে পারেননি বা চান নি, তার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তিনটি ক্যাবিনেট মিটিংয়ের অন্যান্য এজেন্ডার সঙ্গে একটি এজেন্ডায় নয় মাসের জীবনমরণ মুক্তিযুদ্ধের আলোচনা ছিল। তৃতীয়টিতে একটি মাত্র এজেন্ডা ছিল মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনা, সেটাও হয়নি।

    তার সাড়ে তিন বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব কালে, তিনি একবারও মুক্তিযুদ্ধের শপথ অনুষ্ঠানস্থল ‘মুজিবনগর’ পরিদর্শন করেননি। ১৯৭৪ সনের ২৬শে অক্টোবর তিনি তাজউদ্দীন আহমদকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তিনি প্রবাসী সরকার ও ভারত সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করে লাহোরে ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং তার পূর্বে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বাংলাদেশে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

    স্মরণযোগ্য যে, ১৯৭২ সনের ৭ই মার্চ জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদেশ এবং ১৭ই মার্চে ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরকালে ২৫ বৎসর মেয়াদী ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিপরীত ঘটনা ‘বাকশাল’ সৃষ্টি যেখানে একনায়কত্বের ছায়া লুকায়িত। অপর পরিবর্তিত রূপ হচ্ছে সমপ্রতি প্রবর্তিত মৌলিক অধিকারবিরোধী ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট।

    তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে বিনীত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করছি।

    তথ্য সূত্র: ১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, দ্বিতীয় খণ্ড, ঢাকা।

    ২. একে খন্দকার, মঈদুল হাসান ও এস. আর মির্জা, ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর: কথোপকথন’ প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।

    ৩. মার্কিন রাষ্ট্রদূতের স্টেট ডিপার্টমেন্টে প্রেরিত টেলিগ্রাম- ন্যাশনাল আর্কাইভস, সেন্ট্রাল ফাইল ১৯৭০-৭৩, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডকুমেন্ট ১২১, ভলিউম ই-৭।

    ৪. Brecher.M, Nehru: A Political Biography, Oxford University Press, London,1959.

    ৫. মাসুদুল হক ‘‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ”, প্রচিন্তা প্রকাশনী, ঢাকা- ২০১০।

    ৬. মেজর জেনারেল এসএস উবান ‘ফ্যান্টমস অব চিটাগং, ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ এলায়েড পাবলিশার্স, নিউ দিল্লি-১৯৮৫।

    ৭. ওরিয়ানা ফ্যালাসি, ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি হুটন মিফলিন কোম্পানি, বোস্টন-১৯৭৬।

    ৮. অ্যান্থনি মাসকারেনহাস, ‘বাংলাদেশ: এ লিগাসি অব ব্লাড,’ অনুবাদক ডক্টর মাজহারুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা -১৯৭৩।

    পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

    জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    cdbl
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close