• বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১ বৈশাখ ১৪২৮
  • ||

আমাদের অতিবাম এবং মধ্যবামদের বুঝতে হবে

প্রকাশ:  ২৫ মার্চ ২০২১, ২১:২৬ | আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২১, ০০:২৭
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে পত্র/পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হচ্ছে। দেশের বিজ্ঞজনরা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে যাচ্ছেন।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের দল, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তিকে সমর্থন করে থাকে, তারা মনে প্রানেই বিশ্বাস করে থাকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ভাষনের মাধ্যমেই আমাদের মহাকাব্যিক

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল। দেশের গুটিকয়েক বিরুদ্ধবাদী ছাড়া বৃহৎ অংশ জনগন মনে করে বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমেই আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলে গিয়েছিলেন।

আমাদেরকে একটা কথা মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন বলেই, নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করতে চাইতেন না এবং অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকান্ড সমূহকে পছন্দও করতেন না। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষনে এ দেশের বাঙ্গালীদেরকে বলে গিয়েছিলেন ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার জন্য। তার মানেই হল বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে কোনো সময় আমাদের দেশের জনগনের উপর নির্বিচারে অত্যাচার চালাতে পারে। মানুষকে হত্যা করতে পারে এবং আমাদের এই মাতৃভূমিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে।

বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষকে ভালবাসতেন বলেই বুঝতে পেরেছিলেন, এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানীরা কেমন ভয়ংকর অত্যাচার নির্যাতন চালাতে পারে। বঙ্গবন্ধু তার প্রবল অনুভূতি থেকে বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানীরা যেকোনো সময় এদেশের মানুষের উপর সকল প্রকার আইন কানুন ও আন্তর্জাতিক বিধি বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অত্যাচার নির্যাতন শুরু করবে এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাঙ্গালীর রক্ত পান করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানীরা

পাগল হয়ে উঠবে। তাই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তিনি যদি হুকুম নাও দিতে পারেন, তারপরও যেন বাঙ্গালীরা রাস্তাঘাট সবকিছু বন্ধ করে প্রতিরোধ যুদ্ধে এগিয়ে আসে। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর ভাষনের এসব দিকের বিচার বিশ্লেষন করি, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবো বঙ্গবন্ধু কিভাবে তার ৭ই মার্চের ভাষনের মাধ্যমে দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।

আমাদের দেশে এখনও একশ্রেণির লোক আছেন, যারা জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান করেন না কিংবা আমাদের জাতীয় পতাকা ও আমাদের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলেন, তাদের মতো লোকরা মনে করে আমাদের এই দেশমাতৃকা আগেই ভালোছিল, এখন জিনিসপত্রসহ অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় জিনিস পত্রের দাম বাড়ছে শুধু মাত্র স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির লোকজনের ভুল সিদ্ধান্তের জন্যে। এই শ্রেণির লোকেরা ভালো করে জানে আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে তার চেয়েও অধিক হারে পশ্চিম পাকিস্তানে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়েছে। এই শ্রেনীর লোকেরা তাদের পূর্বের প্রেম ভুলতে পারে না, বলেই আজ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য নিজেদের মনগড়া মতো কথাবার্তা বলে থাকে। আমরা যারা বিশ্বাস করে থাকি আমরা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পেরেছি শুধুমাত্র ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, তারা মনে করি যে আজ আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো। এমনও শোনা যায় পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার তার কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়ে সমস্যায় পরে থাকে।

আজ আমরা বলতে পারবো দারিদ্রতাকে অনেক অংশে দূর করতে পেরেছি আমাদের কর্মক্ষমতার মাধ্যমে এবং আমাদের কর্মক্ষমতাকে সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারছি এই জন্য যে, আমরা ১৯৭১ সালে আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম বলে। আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী থাকার পরও তার নামে এদেশের মুক্তি পাগল মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। আমরা যদি একটু ঠান্ডা মাথায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের প্রতিটি লাইনের কিংবা প্রতিটি শব্দের বিচার বিশ্লেষণ করতে যাই, তাহলে দেখতে পাবো বঙ্গবন্ধু তার ৭ই মার্চের ভাষনেই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে গেছেন। এছাড়া ২৫ মার্চ কাল রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করার আগেই বঙ্গবন্ধু মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে যান এবং তিনিই হলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র ঘোষক।

আজ দেখা যায় বিরুদ্ধবাদীরা বিভিন্ন মিথ্যা এবং বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করে বিভিন্ন কথা বলতে চান। অথচ যারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনা তার পক্ষে রেডিওতে পাঠ করেছেন, তারা কোনোদিন তাদের জীবন কালে অর্থাৎ জীবিত থাকা অবস্থায় কোনোদিন দাবি করেননি যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সমতুল্য সাহসী নেতা বাঙ্গালী আর পাবে কিনা সন্দেহ আছে। যারা ঠান্ডা মাথায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তারা এই জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে যে, হত্যাকারীরা বুঝতে পেরেছিল বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে জীবিত রেখে কোনো দিন তাদের দক্ষিণপন্থী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেনা। বঙ্গবন্ধুর হত্যকারীরা ভালো করেই জানতো যে, বঙ্গবন্ধু যদি দেশের মানুষকে ডাক দেন তাহলে মানুষ আবার অবশ্যই জেগে উঠবে।

আমাদের দেশে একশ্রেণীর প্রগতীশীল লোক আছেন যারা নিজেদেরকে নিরপেক্ষ বলে দাবি করে থাকেন। তারা দুই দিক রক্ষার করার জন্য এমন ভাবে কথাবার্তা বলেন যা শুনলে, যে কোনো মানুষেরই মনে হবে এসব দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরাই নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি সাজিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতি করে যাচ্ছেন। প্রত্যেক সমাজে স্বার্থান্বেষী লোক আছে, যারা কেবল নিজেদের স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো কিছু বিষয় আশয় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে না। এই সব লোকেরা ভয়ংকর। এই সব লোকদেরকে বলা হয় ভবঘুরে সর্বহারা। তারা বিপ্লবের পক্ষে থাকলেও ক্ষতিকর। আবার বিপক্ষে থাকলেও ক্ষতিকর। তাই তাদেরকে কোনো পক্ষেই রাখা ঠিক না। ওরা যখন বুঝবে নিজের স্বার্থে আঘাত পরবে, তখনই তারা স্বপক্ষ ত্যাগ করে বিপক্ষ দলে চলে যাবে। অনেকেই বলাবলি করে থাকেন এই শ্রেণির ভবঘুরের দল এখন বর্তমান সরকারি দলেও আছে। সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়ে ভবঘুরে সর্বহারাদের এখন প্রাধান্য বেশি। যাদের বাপ দাদারা কোনো কালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না তাদের উত্তরপুরুষরা এখন দেখা যায় বর্তমান সরকারি দলের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে তৎপর।

এমনও লোকজনকে এখন বর্তমান সরকারি দলে দেখা যায়, যারা এক সময় সুযোগ পেলেই বঙ্গবন্ধুসহ বর্তমান সরকারি দলের সমালোচনা অশ্লীল ভাবে করতো, তারা এখন নাকি সরকারি দলের মধ্যে ত্যাগী নেতাদের মাথার উপর লাঠি ঘুরিয়ে থাকে। যারা বর্তমান সরকারি দলে নীতি আদর্শের বিশ্বাস রাখেনা, তারা যতই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অনুসারী সাজুকনা কেন, তারা কোনোদিন মনে প্রানে চাইবেনা বর্তমান সরকারি দল ক্ষমতায় থেকে জনগনের সেবা করে যাক। তারা মুখে মুখে যতই বঙ্গবন্ধুর গুনগান করুকনা কেন, ভিতরে ভিতরে তারা অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শের পরিপন্থী চিন্তা ভাবনা করে যাবে। কথাটা আজকের বর্তমান সরকারি দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা কর্মদের মনে রাখা খুবই দরকার। তা না হলে বর্তমান সরকারি দলকে খেসারত দিতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে বর্তমান সরকারি দল যদি হারে তাহলে শুধু মাত্র বর্তমান সরকারি দলই হারে না। তার সাথে সাথে এদেশের বৃহৎত্তর জনগোষ্টির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির বৃহৎত্তর অংশের ক্ষতি হয়ে থাকে।

লেখাটা শুরু করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের ওপর। কিন্তু কথার পিঠে এখানে অনেক কিছু এসে গেছে একশ্রেণির মানুষের অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য। আজ এমন এক অবস্থার মধ্যে দেশের মানুষ আছে, যেখানে বিরুদ্ধবাদীরা উৎপেতে আছে কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির সরকারকে ক্ষমতা থেকে ফেলে দেয়া যায়। বিরুদ্ধবাদীদের সাথে একশ্রেণীর বামপন্থীরাও আছেন, যারা মনে করে থাকেন বর্তমান সরকার যদি ক্ষমতা থেকে চলে যায়, তাহলেই দেশের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এই শ্রেণীর বামপন্থীরা বুঝেননা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছেন বলেই তারা মাঠেঘাটে কথা বলতে পারছেন। বর্তমান সরকারি দল এখনও দেশের প্রগতিশীল বিষয় আশয়কে মূল্যায়ন করে থাকেন। এখনও তারা অর্থাৎ বর্তমান সরকারি দল শতবাধার মুখেও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে থাকেন। আমাদের অতিবাম এবং মধ্যবামদের বুঝতে হবে তারা যেভাবে মাঠে ময়দানে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন এবং সরকারি দলের সমালোচনা করে যাচ্ছেন, তা কেবল করতে পারছেন বর্তমান সরকারি দল ক্ষমতায় আছে বলে।

আবার একশ্রেণীর লোক আছেন যারা মনে করেন, বর্তমান সরকারের আমলে কোনো কথা বলা যায় না। এটাও মিথ্যা কথা। আমরা পত্র/পত্রিকায় কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রায়ই দেখতে পাই এই শ্রেণীর নেতিবাচক ব্যক্তিরা প্রতিনিয়িত সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছেন। তাদের সব সমালোচনাই নেতিবাচক। তাদের মুখ থেকে কখনও ইতিবাচক কথাবার্তা বের হয় না। তারা কিছুতেই সরকারের ভালো কিছু দেখতে পান না।

অনেকেই মনে করে থাকেন এই শ্রেণীর লোকেরা দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রীয়াশীল রাজনৈতিক পন্থার প্রতিনিধি হিসাবে পত্র/পত্রিকায় এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মধ্যরাতের টকশোতে নেতিবাচক কথাবার্তা বলে থাকেন। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা করলেই চলে না। সরকার ভাল কাজ করলে তার প্রশংসা করতে হবে। তাই বলছিলাম যারা বর্তমান সরকারি দলের সমালোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনেরও নেতিবাচক ব্যাখ্যা করে থাকেন এবং বর্তমান সরকারের ভাল কাজেরও সমালোচনা করে থাকেন, তারা যেন মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় না নেন। তাতে জনগনের লাভ না হয়ে ক্ষতিই হবে বেশি।

লেখক: আইনজীবী, কবি ও গল্পকার।


পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএস

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close