• শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭
  • ||

আমরা কোন গণতন্ত্র চাই

প্রকাশ:  ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬:৪৮
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

আমার লেখার পাঠক/পঠিকাদের মধ্যে যেমন আমার পরিচিতজন ও অপরিচিতজনও আছেন, তেমনি করে আমার খুব কাছের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরাও আছে। অপরিচিতজন পাঠক/পাঠিকাদের কাছ থেকে আমার লেখার কোনো প্রতিক্রীয়া না পেলেও, আমার পরিচিতজন আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে আমার লেখার প্রতিক্রীয়া মাঝে মধ্যে আমার কানে আসে কিংবা ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে বন্ধুরা যেসব কথাবার্তা বলেন, তা আমার নজরে আসে। আমার বন্ধু বান্ধবদের ধারনা আমার লেখায় অনেক সময় সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো কখনো আসে না। আবার আরেক দল বন্ধু বান্ধবরা মনে করেন আমার লেখার মধ্যে বিভিন্ন অনাচারের কথা গুলো এমন ভাবে আসে, যেন আমাদের সমাজের চারপাশে ভালো কোনো কিছু ঘটে না কিংবা ঘটেনি। আমি আমার লেখায় সকল সময় সমাজের অনিয়ম গুলোর চিত্র আমার ক্ষমতা বলে যতটুকু পারি, তা তুলে ধরার চেষ্টা করি। তাতে যদি কারো মন খারাপ হয়ে যায় কিংবা কারো মন আনন্দে দিশেহারা হয়ে যায়, তাতে নিশ্চয়ই আমার মত নগন্য একজন লেখকের কোন দোষ কিংবা দায় থাকতে পারে না।

পাঠক/পঠিকারা নিশ্চয়ই জানেন, আজ আমরা কোন অবস্থার মধ্যে বসবাস করছি । আজ একদিকে দায়িত্ব জ্ঞানহীন একশ্রেণীর মাথা মোটা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, আমরা যেন মেধাহীন কিংবা জ্ঞানপাপীদের করতলগত হয়ে বসবাস করছি। অন্যদিকে ধর্ষকদের উলঙ্গ নৃত্য দেখে কেন জানি বলতে ইচ্ছে করে, ধর্ষকরা আমাদের সব ভালো বিষয় আশয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করার জন্য বিশেষ ভাবে তৎপর হয়ে উঠছে । আবার মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম দেখে মনে হয়, পর্দার অন্তরাল থেকে একটা বিরুদ্ধ শক্তি বর্তমান সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য ধর্ষনের উৎসব কিংবা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বিরোধী রাজনীতিবিদরা এসব ব্যাপারে তেমন জোরালো ভাবে কোনো কিছু বলেন না। তাদের টার্গেট একটাই, আর তা হল বর্তমান সরকারকে যেনতেন ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, মানুষের অধিকারের কথা বলেন কিংবা মানুষের ভালো থাকার ব্যাপারে বক্তব্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা এ কথা বুঝেন না গণতন্ত্র কখনো ধর্ষকদের ধর্ষন কর্ম থেকে বিরত রাখতে পারে না। আবার গণতন্ত্র মাদক ব্যবসায়ীদেরকে তাদের মাদক ব্যবসা থেকে হটাতে পারে না। পাঠক/পাঠিকা আমার আপনারা যারা পত্র/পত্রিকা পাঠ করেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন বর্তমান সরকার মাদক ব্যবসা বন্ধ করার জন্য মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বলতে গেলে যুদ্ধ ঘোষনা করে। অনেক মাদক ব্যবসায়ী বন্দুক যুদ্ধে মারা যায়। যা সংখ্যায় ২৫০ থেকে তারও অধিক হবে। মাদক ব্যবসায়ীরা বন্দুক যুদ্ধে মারা গেছে ঠিকই, তাই বলে কি মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়েছে। অনেকেই মনে করে থাকেন মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়নি, বরং তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফেন্সিডিল, ইয়াবা, ঠিকই রাষ্ট্রের বর্ডার পার হয়ে আমাদের কোমলমতি ছেলে মেয়েদের হাতে পৌছে যাচ্ছে। সেখানে গণতন্ত্র আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েদের মাদকের নীল ছোঁবল থেকে রক্ষা করতে পারছে না।

আমার লেখা পড়ে অনেকেই ভাবতে পারেন আমি কি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী নই কিংবা আমি কি স্বৈরতন্ত্রের পক্ষপাতি। এখানে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন যে, আর কথাটি হল কোনো মত কিংবা বিষয়ের চর্চা করতে গেলে প্রথমই যে কাজটা করতে হয়, তাহল যে বিষয় কিংবা মত নিয়ে চর্চা করা হবে, তাকে গ্রহন করার যোগ্যতাও আগে অর্জন করতে হবে। মূলত আমরা, বলতে গেলে বলতে হয় আমাদের মধ্যে যারা নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা নিয়ে চলাফেরা করেন, তারা মনে করেন গণতন্ত্র হল সেই পদ্ধতি, যে পদ্ধতির মাধ্যমে যেমন ভাবে ইচ্ছা চলাফেরা করা যায় কিংবা অন্যের ক্ষতি করে যা ইচ্ছে করা যায়।

আমাদের একশ্রেণীর বিরোধী রাজনীতিবাদরা আছেন, যারা মনে করেন রাষ্ট্রের সকল সমস্যা কোনো সমস্যা নয়। একমাত্র সমস্যা হচ্ছে যে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের রাষ্টীয় ক্ষমতায় থাকাটা। আজ এই যে দেশের মধ্যে দুর্বৃত্তরা দেশের উন্নয়ন কাজকে নষ্টামীর মাধ্যমে কলংকিত করছে , তা নিয়ে কারো যেন মাথা ব্যাথা নেই। তারা কেবল কি ভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়, সেই রাজনীতিতেই ব্যস্ত আছেন। যে গণতন্ত্র মানুষের মুখে খাবার দিতে পারে না কিংবা যে গণতন্ত্র মানুষকে ঘর-দরজা দিতে পারে না, সেই গণতন্ত্রের চর্চা করে আমাদের কি লাভ। বর্তমান সরকার উত্তরবঙ্গের মত জায়গায় গরীব শীতার্ত মানুষদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন। যেখানে আমরা ছোট বেলায় শুনতাম যে, উত্তরবঙ্গের মত জায়গায় কার্তিক মাস থেকেই নিরব দুর্ভিক্ষ চলত। আজ সেই উত্তরবঙ্গে নিরব দুর্ভিক্ষ বলতে কিছু নেই। সেখানে এখন সবার মুখে খাবার আছে। এই যে উত্তরবঙ্গের দরিদ্র মানুষের মুখে আজ খাবার জুটছে, তা কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ফল নয়। তা হচ্ছে বর্তমান সরকার প্রধানের আন্তরিকতার ফল। উত্তরবঙ্গে কার্তিক মাস হতে যে নীরব দুর্ভিক্ষ দেখা দিত, তা এখন অতীতের গল্প। সেখানকার বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাদের মুরুব্বীরা দুঃখের কথা বলতে গিয়ে, তা গল্প হিসাবে বলে থাকেন। পৃথিবীর অনেক বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশ বলে দাবীদার রাষ্ট্র প্রধানরা তাদের দেশের নাগরিকদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন না। এমনও সংবাদ পত্র/পত্রিকায় দেখা যায়, সেই সব দেশের দরিদ্র জনগোষ্টির একটি অংশ এখনো শিক্ষার আলো থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। এমনও শুনা যায় সেই সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের দারিদ্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেখানে একজন মা তার শিশু সন্তানের কান্না থামানোর জন্য অনেক সময় মিষ্টি জাতীয় একপ্রকার মাটি শিশুদের মুখে খাবার হিসেবে তুলে দেয়। যা খেয়ে শিশুরা অসুস্থ হয়। পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং তাদের শরীর ক্ষীনকায় হলেও তাদের পেট হয় অনেক মোটা।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে যদি শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকতে হয় কিংবা কোনো মাকে যদি তার সন্তানের কান্না থামাতে সন্তানের মুখে মাটি তুলে দিতে হয়, তাহলে সেই গণতন্ত্রের আমাদের কি প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্র তখনই সমৃদ্ধতা লাভ করে, যখন সেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্ত কাঠামোর উপর অবস্থান করে। পৃথিবীর মধ্যে এমন সব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আছে যেখানে কন্যা শিশু এবং দরিদ্র যুবতী মেয়েদের গরু ছাগলের মতো বেচা-কেনা হয়ে থাকে। বিভিন্ন রাষ্ট্রে যেমন প্রকাশ্যে গরু ছাগলের হাট বসে, ঠিক তেমনি করে পৃথিবীর এমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও আছে, যেখানে প্রকাশ্যে কন্যা শিশু ও দরিদ্র যুবতী নারীদের বেচা-কেনার হাট বসে। অথচ আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলতেই বুঝে থাকি সেই সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে, যে সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ভাষায় কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তব অবস্থার বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যায় শুধু মাত্র গণতান্ত্রিক রীতিনীতি কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকের মুখের অন্ন যোগাতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন হয় মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি।

প্রচলিত গণতান্ত্রিক রীতিনীতি দ্বারা কিছুতেই জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন করা সম্ভব নয়। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আনয়ন করতে গেলে আমাদের প্রয়োজন পড়বে, সেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির, যে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির মধ্যে দরিদ্র অসহায় কৃষক শ্রমিক অর্থাৎ রাষ্ট্রের দরিদ্র নাগরিকের বৃহৎ অংশ তাদের বাঁচা মরার পথ খোঁজে পাবে। অসহায় দরিদ্র মানুষকে অর্থাৎ কৃষক শ্রমিক জেলে ক্ষেতমজুর দিনমজুরসহ সবাইকে মুক্তির পথ দেখাতে পারে শোষিতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আজকে যেসব বিরোধী নেতারা গণতন্ত্র গেল গণতন্ত্র গেল বলে চিৎকার করছেন, তারা কি দেশের অসহায় দরিদ্র জনগোষ্টির মুক্তির জন্য শোষিতের গণতন্ত্রের কথা বলবেন। নিশ্চয়ই না। তারাও আজ যদি ক্ষমতায় যান, এখন যেরকম অবস্থা চলমান আছে, সেই ব্যবস্থাকে মজবুত করে অতীতের মতো বিভিন্ন ভবন সৃষ্টি করে জনগণের শাসনের পরিবর্তে নিজেদের মন মতো শাসন ব্যবস্থা চালু রাখবেন।

আজ এই যে নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিরুদ্ধবাদীরা এত কথা বলছেন, জনগণ কি তাদের কথায় কান দিচ্ছে। নিরপেক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে জনগন তাদের কথায় কান দিচ্ছে না। তার মানে এই নয় যে, চলমান সকল ব্যবস্থাকে জনগন মেনে নিচ্ছে। জনগন বিরুদ্ধবাদীদের কথায় মাঠে নেমে আন্দোলন করছে না এই জন্য যে, আজ যারা গণন্ত্রের জন্য মায়া কান্না বা চিৎকার করছেন কিংবা ভোটের ব্যবস্থা নিয়ে কথাবার্তা বলছেন, তাদেরকে অতীতে জনগন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখেছে। জনগন দেখেছে বিভিন্ন ভবন সৃষ্টি করে তারা কি ভাবে দেশ শাসন করেছেন। তাদের আমলে নির্বাচন ব্যবস্থা কেমন ছিল তা জনগন দেখেছে। মাগুরার নির্বাচন কিংবা ১৫ইং ফেব্রুয়ারীর মত নির্বাচন দেশের জনগন দেখেছে বলেই, জনগন তাদেরকে আর যাই মনে করুক, তাদেরকে কিছুতেই গণতান্ত্রিক মনোবৃত্তিসম্পন্ন জনগনের বন্ধু বলে মনে করেনা। যার জন্য দেশের মানুষ তাদের কথাবার্তা আমলে নিচ্ছে না এবং সরকার বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে না। আজ সরকারের বিরোধীতা করতে গিয়ে বিরুদ্ধবাদীরা সরকারের ভালো কাজেরও এমন ভাবে সমালোচনা করছেন, যা শুনে জনগন ভানু বন্দোপাধ্যায়ের কৌতুক শুনে যে রকম ভাবে হাসা হাসি করে, ঠিক তেমনি ভাবে হাসা হাসি করে থাকে।

আইনের একটা কথা আছে, যিনি ন্যায় বিচার চাইবেন, উনাকেও ন্যায়বান হতে হবে। আজ যারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কিংবা আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছেন, তাদেরকে কথা বলার আগে চিন্তা করে দেখতে হবে, নিজেরা গণতন্ত্রের প্রতি এবং অবাদ কারচুপিহীন নির্বাচন অনুষ্টানের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক। তারা যদি জনগনের কথা ভাবতেন তাহলে সরকারের বিরোধীতা করতে গিয়ে জনগনের বিরোধীতা করতেন না। কথাটা এই জন্য বললাম যে, সরকার যেখানে কোভিড-১৯ ভাইরাসের ভ্যাকসিন জনগনকে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, ঠিক তখন একশ্রেনীর কান্ডজ্ঞানহীন নেতারা ভ্যাকসিন সম্পর্কে যেসব কথা বলছেন, তা তাদের মুখে শোভা পায় না। তাদের কথায় জনগন বিভ্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নেয়ার ব্যাপারে যদি নেতিবাচক চিন্তাভাবনা করে, তার দায় কে নিবে। তার দায়ভার নেতিবাচক নেতাদেরকেই নিতে হবে।

তাই বলছিলাম, বিরুদ্ধবাদী নেতাদের উচিত হবে এমন সব কথা না বলা, যেসব কথা বলার জন্য জনগনের ক্ষতি হয়ে থাকে। দেশের মানুষ তাদেরকে তাদের কথাবার্তার জন্য হাসির পাত্র মনে করতে পারে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানীর ভাষায় রাজা যেখানে ভালো হয়, তাহলে যেমন সেখানে আইনের প্রয়োজন হয় না। তেমনি করে রাজা যদি খারাপ হয় সেখানেও আইনের প্রয়োজন হয় না। বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়ন করার জন্য যেমন ভাবে জনগনকে ঘরবাড়ি বানিয়ে দিচ্ছেন, তা বর্তমান সরকারের আন্তরিকতারই ফল। তা দেশের মানুষ ভালো করেই জানে। শুধু আমাদের নেতিবাচক নেতারা জানেন না।

লেখক: আইনজীবী, কবি ও গল্পকার।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এনএন

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close