• মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭
  • ||

পৃথিবী সৃষ্টির মানুষের লড়াইটা তারপরও চলুক আমৃত্যু

প্রকাশ:  ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:২৭
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী। ফাইল ছবি

কথাটা অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে যতই অদ্ভুত মনে হোক না কেন পৃথিবীর পিছনে পৃথিবী থাকে। পৃথিবীর ভিতরে পৃথিবী থাকে। দৃশ্যমান পৃথিবীর কোথাও না কোথাও অদৃশ্যমান একটা পৃথিবী নির্ঘুম রাত জেগে থাকে। পৃথিবী নামক ভূখণ্ডকে আমরা হয়তো চিনি। সে চেনার গভীরতা কতটুকু সেটা হয়তো কোনোদিনই জানা হয় না। তারপরও একখন্ড মাটির উপর ঠাঁই দাঁড়িয়ে মানুষ অনেকটা গর্বের সাথে বলতে পারে যতটুকু মাটির উপর আমি দাঁড়িয়ে আছি ততটুকুই আমার ঠিকানা। তবে সব মানুষ সেটা বলতে পারেনা। বলবার মতো সাহস রাখেনা। কারণ পৃথিবী খুব নিষ্ঠুর হয়। যে মানুষটা নিজের অধিকারের বিশুদ্ধ মন্ত্রটা জানে সেই পৃথিবীতে নিজের জায়গাটুকু করে নিতে পারে। শক্তি দিয়ে, অর্থ দিয়ে, নিজেকে বিকিয়ে এ অধিকারের জায়গাটা তৈরী করা যায়না। নিজের আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব, ত্যাগ ও উদারতা দিয়ে এই অধিকারের শক্তিটা অর্জন করতে হয়।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কালজয়ী চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’। খুব চেনা অসাধারণ একটা শিল্পকর্ম। একটা মানুষের জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে টিকে থাকার প্রানান্ত চেষ্টার কল্পচিত্র যেন এটি। গরুর গাড়ির দুটো কাঠের চাকা কাঁদার ভিতর এতটাই দেবেছে যে সেটা কাদাঁমাটিকে যেন আঁকড়ে ধরেছে। এমনভাবে বোঝা নিয়ে দেবেছে যে সে বোঝাটা যেন একটা মানুষের জীবন যন্ত্রণার বোঝা। গাড়িটিকে কাদার গর্ত থেকে ঠেলে প্রাণপণ এগিয়ে নেবার দুঃসহ চেষ্টা মানুষটার। যে কাদামাটিতে থেকে পা দুটো শক্তি নিয়ে গরুর গাড়িটাকে টেনে নিতে চাচ্ছে, সে পায়ে শক্তির যোগান দেওয়া কাদামাটিতে মানুষটা পৃথিবীকে গড়েছে। এটাই মানুষটার নিজের পৃথিবী। এমন অনেক জীবনের সাথে লড়াই করা মানুষের পৃথিবী। ছবির ভিতরের ছবি। কল্পনার স্বপ্নভঙ্গ করে বাস্তবতার ছবি। তবে ছবি অনেক সময় কথা বলে। বোবার দুর্নাম ঘুচিয়ে ছবি মানুষকে পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখে, মর্যাদা দেয়। মানুষ যদি ভিতরের চোখ দিয়ে দেখার মতো ইতিবাচকশক্তির উম্মেষ ঘটাতে পারে তবে ছবির মধ্যে মানুষ পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে পারে।

অনেক সময় মানুষ জড় পদার্থ হয়। মানুষ শোপিচের মতো সাজানো একটা সৌখিন পণ্য হয়ে মরার মতো পড়ে থাকে কোনো একটা শুন্যতায়। সেখানটায় তার কোনো পৃথিবী থাকেনা, পৃথিবী গড়ার অধিকার থাকেনা। তবে পৃথিবীকে নিজের মধ্যে দেখার স্বপ্ন মানুষের থেমে থাকেনা। যেমন রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মানুষের ভিতরের আজন্ম লালিত পৃথিবীকে দেখে অভিভূত হয়ে বলেছেন "তবু মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে থেকেছে সে পৃথিবীর বয়সের দিকে, আলো আর আঁধারের দিকে, বৃত্তাবদ্ধ জীবনের দিকে। কিছু সে চায়নি তবু, চেয়েছে সে সবচেয়ে বেশি- একখানা গৃহ নয় সারাটা পৃথিবী"। হয়তো মানুষ পৃথিবীতে মতো বড়ত্বকে গৃহ হিসেবে দেখতে চায়। ইট-পাথরের দেওয়াল বন্দি গৃহের জীবন থেকে মানুষ পৃথিবীকে দেখতে চায়না। আসলে এভাবে সংকীর্ণ একটা জায়গা থেকে পৃথিবীর অনেক অদৃশ্যমান উপাদানকে দেখা সম্ভব নয়। মানুষের চোখ বড় হয়না, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বড় হতে হয়। সেটা হলেই মানুষ পৃথিবীকে অতিক্রম করতে পারে। মানুষ অবধারিতভাবে পৃথিবীর বাসিন্দা হয়।

আবার পৃথিবী মানুষের ভিতরে বাসিন্দা হয় মানুষের কল্পনাশক্তিতে। নতুন চিন্তা সৃষ্টির সূক্ষ্ম আবরণে। পৃথিবীর ভিতর পৃথিবী সৃষ্টির রহস্যটা যেন এমনই। পৃথিবীর বাইরে মানুষ নিজের পৃথিবী তৈরী করতে পারে। সে পৃথিবীতে কোনো মানুষ থাকেনা, তবে এই পৃথিবী যে গড়ে সে এই পৃথিবীর রাজা হয়। রাজাদের রাজা হয়। ষ্টিফেন হকিংসের পৃথিবী ছিল একটা হুইল চেয়ার। ভেঙে পড়া দেহটাকে সেখানে কোনোমতে ধরে রেখে তিনি চিন্তা আর কল্পনার সমন্বয়ে নিজের পৃথিবী গড়েছিলেন। সেখানে ঢাল, তলোয়ার, আধুনিক মরণাস্ত্র, প্রজা, উজির, নাজির, মন্ত্রী কেউ ছিলোনা। কিন্তু একটা পিপাসার্ত মনের স্বপ্ন দেখার গভীর অরণ্য ছিল। নিজের পৃথিবী গড়ে তিনি সে অসীম সীমান্তের পৃথিবীর রাজাদের রাজা হতে পেরেছিলেন বলেই মাটির পৃথিবীর মুখোশধারী মানুষেরা তাকে কখনো আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলতে পারেনি। যেমন পারেনি পৃথিবীর ইতিহাস। আইনস্টাইন পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মতো কোনো পরীক্ষাগার পাননি। তাতে তিনি ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে যাননি। বরং নিজের পৃথিবীটা তিনি নিজেই গড়ে নিয়েছেন।

এই পৃথিবীকে আপাতদৃষ্টিতে পৃথিবী বলে মেনে নিতে অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও এ বিষয়ে তিনি ছিলেন অসঙ্কোচিত ও অকুতোভয়। বিজ্ঞানের গবেষণায় কাগজ, কলম ও চিন্তাশক্তি দিয়ে তিনি পৃথিবী গড়েছিলেন। চিন্তাশক্তিতে যদি ইতিবাচকতা থাকে, মানবিক মূল্যবোধ থাকে ও পিন পতন নীরবতার মতো বিশুদ্ধতা থাকে তবে তা মানুষের মধ্যে এমন পৃথিবী গড়ে দেয় যে পৃথিবী চোখের আলোয় দেখা যায়না, মনের আলোয় দেখতে হয়। গোলপোস্টের সামনে গোলরক্ষক স্যাম বাট্রামের ঘন কুয়াশায় কুঁজো হয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকার ছবিটাতে একটা অপরাজিত পৃথিবীর গন্ধ আছে। ছবিটা ১৯৩৭ সালের হলেও এতটুকু পুরোনো হয়নি, বরং অনেক মানুষের বিবেকের দরজায় কড়া নেড়ে নতুন পৃথিবীর জন্ম জন্মান্তরের কাহিনী যেন সেখানে রচিত হয়েছে। এটা যেন দায়বদ্ধতা ও মূল্যবোধের পৃথিবী, যা ফেলে দিলেও নষ্ট হয়না। যা যুগ যুগ ধরে রেখে দিলেও পুরোনো হয়না, মরিচা পড়েনা, পচন ধরে না।

সেদিন ফুটবল ম্যাচটি ছিল চেলসি ও চার্লটনের মধ্যে। ঘন কুয়াশার তীব্রতায় রেফারি মাঝপথে খেলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেন। এ ঘোষণার পর দু'দলের সব খেলোয়াড় যার যার মতো করে ড্রেসিং রুমে চলে গেলেন। সেদিকে স্যাম বাট্রামের কোনো খেয়াল নেই। গোলবার সুরক্ষিত রাখতে তিনি দায়বদ্ধতার বোঝা মাথায় নিয়ে শক্ত প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। কুয়াশার তীব্রতা যত বাড়ছে স্যাম বাট্রামের ঝাপসা চোখ বিরূপ প্রকৃতির সাথে লড়তে লড়তে আরও জ্বলে উঠছে। গোলবার আগলে রাখার দৃঢ় মনোবলের শক্তি নিয়ে তিনি পৃথিবীর মতো দাঁড়িয়ে আছে নতুন পৃথিবী তৈরী করবেন বলে। তার নিজের পৃথিবী হিমশীতল ঠান্ডার সাথে লড়ছে তো লড়ছেই। খেলা শেষের বাঁশি যে রেফারি বাজিয়েছেন গ্যালারি ভর্তি উপচে পড়া মানুষের টান টান উত্তেজনার কোলাহলে তা তার কানে এসে পৌঁছেনি। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবার পর মাঠের এক নিরাপত্তা কর্মী তাকে জানালেন খেলা তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এই বিরাট মাঠে কেউ নেই। কেবল তিনি একা দাঁড়িয়ে আছেন। স্যাম বাট্রাম কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা তার সহযোদ্ধারা তাকে একা ফেলে চলে গেছেন। একটা গভীর কষ্ট বিন্দু বিন্দু জল হয়ে স্যাম বাট্রামকে আঘাত করলো। মানুষকে নতুন করে চিনলো সে। তবে তিনি নিজে মানুষের জন্য পৃথিবী গড়ে দিলেন।

যে পৃথিবীতে মানুষ আসলেই মানুষ হয়ে জেগে উঠতে পারে। এ পৃথিবী দেখা যায় না তবে অনুভব করা যায়। একটা মমতাময়ী মা তার সন্তানদের নিয়ে তার নিজের পৃথিবী গড়ে তোলে। সে পৃথিবীতে ভালোবাসা, মায়া-মমতার বন্ধন থাকে। অনেক স্বপ্ন থাকে। কিন্তু সব যেন মিছে হয়ে যায়। যে মায়ের আদরের হাত ধরে সন্তানরা বড় হয়ে উঠে তার সে হাত একদিন ছেড়ে দেয়। সন্তানরা নিজের পৃথিবী গড়ে তোলে। তবে সেটা কখনো পৃথিবী হয়ে উঠেনা, উঠতে পারেনা। যে পৃথিবীতে মা নেই সে পৃথিবীর কোনো অস্তিত্ব নেই। মায়ের চেয়েও বড় জন্মভূমির মাটি- সেটাও তো মা। সে মায়েরও পৃথিবী থাকে। সে পৃথিবী অনেক বড় হয়ে উঠে যখন মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকে, দেশের প্রতি আনুগত্য ও আবেগ থাকে। একটা কৃষক মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিবে বলে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া দেহ নিয়ে নতুন ফসলের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার পৃথিবী গড়ে। একটা খালি গায়ের অসহায় শ্রমিক। দুমুঠো ভাতও যার ভাগ্যে জোটেনা তারও জীবনযুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকার পৃথিবী থাকে। সবার পৃথিবী থাকেনা, কারো কারো পৃথিবী থাকে। সবাই পৃথিবী সৃষ্টি করতে পারেনা, কেউ কেউ পারে। পৃথিবী সৃষ্টির মানুষের লড়াইটা তারপরও চলুক আমৃত্যু।

লেখক: ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এনএন

পৃথিবী,অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close