• শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
  • ||

চিন্তার শক্তিটা মাথা তুলে দাঁড়াক 

প্রকাশ:  ২০ জানুয়ারি ২০২১, ১০:২৯ | আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২১, ১৫:১০
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

পৃথিবীর প্রায় সব মানুষ স্বার্থপর। স্বার্থপরতার কাছে উদারতা বার বার ধাক্কা খেয়েছে। হোঁচট খেয়েছে, পদদলিত হয়েছে। তবে কখনো ভেঙে পড়েনি। স্বার্থপরতার সাথে সাথে হিংসা নেতিবাচক শক্তির একটি উৎস হিসেবে কাজ করেছে। যার প্রভাবে অনেক প্রতিভা বিকশিত হবার আগেই ঝরে পড়েছে। কেউ যখন জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে এগিয়ে যাবার প্রচেষ্টা চালায় তখন স্বার্থপরতা ও হিংসা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্বার্থপর মানুষ তার যুক্তিহীনতা, গোষ্ঠীবদ্ধতা ও অনেকসময় পেশিশক্তি ও প্রাণনাশের মাধ্যমে এগিয়ে থাকা মানুষটিকে টেনে নামানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখে। এর সাথে এগিয়ে থাকা মানুষের বিরুদ্ধে নানাধরণের কল্পিত অপপ্রচার, অপবাদ ও মিথ্যাচারের কৌশলও গ্রহণ করা হয়। এটা নিছকই হীনমন্যতা ও ছোট মনের পরিচয়।

তবে মানুষ আরেকজন মানুষের উপর নেতিবাচকতার কৌশল যতভাবেই চাপিয়ে দিক না কেন, তা ব্যর্থ হতে বাধ্য যদি মানুষের এগিয়ে যাবার প্রধানতম উপাদান হিসেবে কাজ করে চিন্তাশক্তি। মানুষ মানুষের সবকিছুকে থামিয়ে দিতে পারলেও তার চিন্তাকে কখনো কেউ থামিয়ে দিতে পারেনি, পারবেও না। এটাই চিন্তার পুঞ্জীভূত শক্তি যা অভুতপূর্ব মানবিকবোধ দ্বারা তাড়িত হয়। এই চিন্তা থেকেই প্রতিভার উম্মেষ ও নান্দনিক সৃষ্টির যাত্রা শুরু হয়। মানুষকে অবহেলা, মানুষকে অপমান, মানুষের সৃষ্টিকে দেখেও না দেখা, মানুষকে ছোট করা সব কিছুর মধ্যেই স্বার্থপর মানুষের নিজের অক্ষমতার পরিচয়টি প্রবল হয়ে উঠে।

মানুষ বড় হয় তার কর্ম, সৃষ্টি ও উদারতায়। এর পিছনে মূল ফ্যাক্ট হিসেবে কাজ করে চিন্তার শক্তি। যে চিন্তারশক্তি বড়র বড় শক্তিকে দমিয়ে দিয়ে তার অগ্রযাত্রার ভিত্তিকে আরো বেশি সুসংহত করে। মানুষকে আরো এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। এই চিন্তার রূপটি কেমন। তার কতটুকু আমাদের প্রভাবিত করতে পারে তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তর্ক বিতর্ক থাকতে পারে। তবে আপাতভাবে চিন্তার মধ্যে মৌলিকত্ব ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। এর প্রভাব এমন একটা জায়গায় পৌঁছাতে হবে যেটাকে দেখা গেলেও সেটা আজীবন অধরাই থেকে যাবে। চিন্তা দিয়ে মানুষ বড় হয়ে উঠে। তার জীবনবোধের ভিতরের সুপ্ত অগ্নিয়গিরির অগ্নুৎপাত ঘটায়। মানুষ তার ভিতর অদেখা একটা জগত তৈরি করে নেয়। যে জগতে কল্পনার জন্ম হয়। সে কল্পনা কুমোরের মতো কাদা মাটি দিয়ে একটা আবরণ গড়ে দেয়। সে আবরণ অনেকটা ডিমের শক্ত আবরণের নিচে অবহেলায় পড়ে থাকা পাতলা সাদা রঙের আবরণ। যেটিকে আঁকড়ে ধরে ডিমের তরল অংশ নিজেকে টিকিয়ে রাখার প্রাণপন লড়াই চালায়। এই আবরণটিই চিন্তাশক্তি। যাকে জাপটে ধরে ঘুমন্ত সৃষ্টি জাগ্রত হয়। মহানন্দে মেতে উঠে। কেননা সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মানুষ সাধারণ থেকে অসাধারণ মানুষে পরিণত হয়। উদার মানুষের সহজ সরল ভাবনা তাদের গুণীজন হিসেবে মর্যাদা দেয়।

এক একটা পথ তাদের চিন্তাশক্তির কঠিন থিওরি হয়ে এক একটা নতুন পৃথিবী তৈরি করে। হয়তো সেটা ভিন্ন কিংবা অভিন্ন। কিংবা এক আকাশের নিচে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ তারার আলো। এমন আলোর ঝলকানিতে কেউ নিভৃতে কাজ করে যায়, কেউ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তার চিন্তার আজন্ম লালিত স্বাধীনতার বিকাশ ঘটায়। কি পায় তারা, কতটুকু পায়, যা দেবার মতো বদন্যতা পৃথিবীর থাকে না। মানুষের থাকে না। কেউ কেউ বলেন, সবাই মানুষ নয় কেউ কেউ মানুষ। হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস। স্বার্থ আর হিংসার দাবানল মনের ভিতরে জ্বালিয়ে প্রতিভাধর মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। এগিয়ে যাওয়া অসাধারণ মানুষটার পথে কাটা বিছিয়ে মানুষের মনে রক্তক্ষরণ ঘটায়। হয়তো স্বার্থপর মন আর হিংসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। অন্ধ মানুষ যেমন নিজে অসহিষ্ণু আগুনে পুড়ে, অন্যকে ও তেমনি পোড়াতে চায়। পোড়ামাটির নগ্ন খেলায় মেতে উঠে, মানব দানব হয়। পৃথিবীতে পরিবর্তন আনবে বলে যে মানুষেরা এগিয়ে যায় সংখ্যাধিক্যের জোরে তাদের টেনে ধরে মাটিতে আছাড় মারতে চায়। হায়রে গুণীমানুষ।

যে মানবিক মূল্যবোধহীন মানুষদের দ্বারা প্রতিদিন শোষিত হয়। লাঞ্চিত হয়। অধিকার বঞ্চিত হয়। তবে একটা কথা সব সময় মনে রাখা দরকার তা হলো যে জনগোষ্ঠী তার গুণীজনদের সন্মান দিতে জানেনা সে জনগোষ্ঠী কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মূল্যায়ন না হয়ে সংখ্যাতাত্বিক চর্চার মূল্যায়ন হয় সেখানে আগাছা বাড়লেও সৃজনশীলতার অপমৃত্যু ঘটে। মুখ থুবড়ে পড়ে বিবেক, মাথা তুলে দাঁড়ায় হিপোক্রেসি। এমন অনেক ঘটনা প্রতিদিন দেখছি। যেখানে প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতার দালালরা সংখ্যার ধুয়া তুলে মিথ্যাকে সত্য, সত্যকে মিথ্যা বানায়। ভালোকে মন্দ, মন্দকে ভালো বানায়। মানবিক মূল্যবোধহীন দানবিক জয়ের উল্লাসে উন্মাদনায় মত্ত হয়। তাদের কলংকিত চোখ হাততালি দেয়, সে হাততালি তাদের বিবেকের চাকাকে উল্টো ঘুরিয়ে তাদের পচনশীল গায়ে আঘাত হানে। পঙ্গপালরা সংখ্যায় বেশি হলেও তারা ধ্বংস ডেকে আনে। ঠিক তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট গোষ্ঠীতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষেরা সংখ্যার মিছিল ডেকে সব চিরায়ত নিয়ম বদলে ফেলতে যায়। সেখানে বিবেচনাবোধ থাকে না। বিচারের সক্ষমতা থাকেনা। সংখ্যাতাত্বিক শক্তির দম্ভ থাকে, ভ্রান্তিবিলাস থাকে। তবে কি গণতন্ত্রে কোনো গলদ আছে। নাকি গণতন্ত্রকে মানুষ নিজের মতো করে বানিয়ে এর অপব্যবহারে মেতে উঠেছে।

চিন্তাটা কি তবে গণতন্ত্রের কাছে এসে আটকে গেলো নাকি গণতন্ত্র যা ছিল তাই আছে মানুষ সে গণতন্ত্রের পোস্টমর্টেম করে কাটাছেড়া করছে। হয়তো সেটাই, যেটা হওয়া উচিত নয়। যে কোনো তন্ত্রের ক্ষেত্রে মানুষ সেটা পজেটিভ না নেগেটিভ দৃষ্টিভঙ্গির কোন এঙ্গেলে দেখছে তার উপর নির্ভর করছে। একটা শৈশবের গল্প মনে পড়ে গেলো। ঠিক মনে নেই স্বাধীনতা না গণতন্ত্র কোনো বিষয়টাকে গল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছিল। দুই ভাই বোন, দুটো আম। দুটো আম ভাইকে দিয়ে তা দুজনের মধ্যে ভাগ করে দেবার দায়িত্ব দেওয়া হলো। আম দুটো হাতে পেয়ে ভাই দেখলো একটা আম পচা ও আরেকটা আম ভালো। ভাই নিজে পচা আমটা নিয়ে ভালো আমটা বোনকে খেতে দিলো। এর অর্থ হচ্ছে নিজে ত্যাগ করে অন্যের জন্য ভালো চাওয়াটাই হচ্ছে গণতন্ত্র। এই ভালো চাওয়াটাই স্বাধীনতা।

ইসরাইল সবকিছুকে বাদ দিয়ে চিন্তাকে তাদের প্রধান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই চিন্তা দিয়ে তারা পৃথিবীর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের নতুন নতুন ধারণা দিচ্ছে। খুব কম লোকসংখ্যার এই দেশটির প্রযুক্তিগত নতুন চিন্তাশক্তির কাছে সারাবিশ্বের মানুষ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। চিন্তাকে বিজ্ঞানমুখী করে তারা পৃথিবীর অন্যতম মেধাশক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অনেক পরাশক্তিধর ও অধিক জনসংখ্যা সমৃদ্ধ রাষ্ট্রকে পর্দার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ করছে এই কম লোকসংখ্যার দেশটি। চিন্তার জাদুকরী শক্তিই এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আমার একজন কাছের মানুষ অধ্যাপক ড. নাছিম আখতার ভাইয়ের একটা কথা মনে পড়ে গেলো। কথাটা এমন, ‘গনতন্ত্র নয় মানবতন্ত্রই হবে উন্নত পৃথিবী গড়ার উপযুক্ত শাসন ব্যবস্থা। যেখানে মাথা গুনে সংখ্যাধিক্য বিচার করা হবে না। মাথা গোনার সময় মাথার মধ্যে কি আছে সেটাও বিবেচনায় আনা হবে। অর্থাৎ নাগরিকের চারিত্রিক গুণাবলী ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজও মূল্যায়িত হবে।’

সব তো শেষ নয়। কারণ শেষ থেকেই শুরু হয়। যে মানুষটাকে বার বার হারানোর খেলায় যারা নিজেদের বিজয়ী ভাবছে তাদের সংখ্যাধিক্যের সাজানো বাগান আছে। তবে সে বাগানে সাপও আছে। যে মানুষটা বারবার মরে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়েছে তাকে আর কতবার স্বার্থপর মানুষ মারবে, কতভাবে মারবে। সব বিধাতা জানে। প্রকৃতি বদলে যায়, সময়ও বদলায়।। মরা গাঙের ডাক একদিন মানুষের পাষান হৃদয়ে আঘাত হানবে হয়তোবা। তবে চিন্তার শক্তিকে হারায় এই সাধ্য কারো নেই। মানুষ মানুষ হোক চিন্তার শক্তিতে। মানুষের মাথা গুণে নয়।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close