• শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭
  • ||

পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞাপন দিয়েও তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না!

প্রকাশ:  ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ২০:৫২ | আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ২১:১২
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

আমাদের দেশে এক শ্রেণির লোক আছেন, যারা আমাদের একাত্তরের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের অমর শ্লোগান শুনলে তেলে-বেগুণে জ্বলে ওঠেন। তারা কারা? ওরা কোন দেশের কিংবা কোন দলের লোক। এমন প্রকৃতির লোকেরা কি প্রকৃত অর্থেই আমাদের এই দেশ মাতৃকাকে ভালোবাসে। তারা কি আমাদের মাতৃভূমির সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। নাকি এখনও মনে করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভূমি তাদের আনুগত্যের মাতৃভূমি নয়। যারা এখনও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদেরকে নিয়ে অগ্রহণযোগ্য কথা বার্তা বলে, তারা কোন দর্শন কিংবা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে চলাফেরা করে থাকে।

অনেকই বলে থাকেন, এ শ্রেণির লোকেরা এখনও নাকি বিশ্বাস করে আমার এই প্রাণ প্রিয় বাংলাদেশ আবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে। এই প্রকৃতির লোকদেরকে দেশপ্রেমিক মানুষেরা বলে থাকেন মাতৃভূমি ধর্ষণকারী। এখন প্রশ্ন হল যারা আমাদের মুক্তিযুদ্বের শহীদেরকে সম্মানের চোখে দেখেনা, তারা কি আমাদের এই সবুজ বাংলার অর্থাৎ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ও এিশ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করা জাতীয় পতাকাকে সম্মান করে চলে। যারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শ্লোগান জয় বাংলা শুনলে তেলে বেগুনে জ¦লে ওঠে কিংবা কানে তুলা গুজে দেয়, তারা কোথায় জন্ম গ্রহন করেছে? যারা আমাদের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীতকে সম্মানের চোখে দেখে না, তারা কি আমার প্রাণ প্রিয় বাংলাদেশের আলো বাতাস এবং আহার গ্রহন করছেনা। যারা আমার দেশের সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহন করে ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, কবি, লেখক, শিক্ষক ও অধ্যাপক হয়, তারা কেন আমার প্রাণ প্রিয় দেশমাতৃকার সকল অর্জন নিয়ে বাঁকা কথা বলবে? আবার এমন কথাও বলা যায়, যারা আমার দেশের সকল অর্জনকে নিজেদের কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করেন কিংবা রাজনীতি করে আবার ক্ষমতার স্বাদও পেয়ে থাকেন, তারা কেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শ্লোগান জয় বাংলা শুনা মাত্রই তেলে বেগুনে জ¦লে উঠবেন। তবে কি তারা আমার স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না কিংবা বলা যায়, যারা আমাদের একাত্তরের চেতনায় রাঙ্গানো জয় বাংলা শ্লোগান শুনলে তেলে বেগুনে জ¦লে ওঠে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে, সেই সব দেশ দ্রোহীদের জন্ম কোথায়? তাদেরকে কোথা হতে আমদানি করা হয়েছে। আজ সময় এসেছে দেশ বিরোধী লোকদের কে চিহ্নিত করার। আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে সময় চলে গেলে আমাদেরকেই পস্তাতে হবে।

আমাদের সমাজে এমন সব দেশদ্রোহী লোকজন আছে, যারা মনে করেআমাদের জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা পরিবর্তন করা উচিত। এদের মধ্যে এমন সব লোকজনও আছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের কথাও বলে কিংবা এমন মানুষজনও আছেন,যারা সভা সমাবেশে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বড়বড় বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এই শ্রেণীর লোকেরা সভা সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বক্তব্য দিলেও তারা বাস্তব চাল চলনে এবং কথা বার্তায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হেয় প্রতিপন্ন করে থাকে। এমন মন মানসিকতা সম্পন্ন লোকেরাও কখনও লুকিয়ে কিংবা কখনোবা প্রকাশ্যে বলে বেড়ান আমাদের জাতীয় সংগীত এবং জাতীয় পতাকা বদলানো উচিত। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে এই শ্রেণীর লোকেরা কি মন প্রাণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনের গভীরে ধারণ করে থাকেন। নাকি অন্য কোন নেতিবাচক দেশ বিরোধী নেতিবাচক স¦প্ন দেখে থাকেন। সবাই বলবেন যারা সৎ চিন্তাধারা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে থাকেন, তারা কোন দিন বলবেন না আমাদের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীত বদলানো উচিত।

কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে একাত্তরের আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে কথা বলে কিংবা অবস্থান করে, তাহলে কি আমরা এমন মনোবৃত্তি সম্পন্ন মানুষদেরকে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ বান্ধব দেশপ্রেমিক নাগরিক বলতে পারি। সচেতন দেশপ্রেমিক ব্যক্তিরা অবশ্যই বলবেন, এমন মনমানসিকতা ধারন করা ব্যাক্তিরা কখনও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হতে পারেনা। এই প্রকিৃতির লোকেরা সেই পক্ষের লোকজন, যে পক্ষ আমাদের একাত্তরের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল শ্লোগানই ছিল জয় বাংলা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধই হয়েছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মৌলিকচেতনার ওপর ভিত্তি করে । তার বাইরে আর কোন বির্তকিত শ্লোগান বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এই সবুজ বাংলার মানুষের মুখ থেকে বের হয়নি। এদেশে বির্তকিত শ্লোগান এসেছে ৭৫ এর পট পরিবর্তনের মাধ্যমে। তখনই পাকিস্তান এর ধারায় জয় বাংলার পরিবর্তে জিন্দাবাদ শ্লোগান এক শ্রেণীর লোকজন দিতে শুরু করে। আবার দেখা যায় পাকিস্তানের রীতিনীতিকে অনুসরণ করে বাংলাদেশ বেতারকে করা হয় তখন রেডিও বাংলাদেশ। এক কথায় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জনকে বিনাশ করে বিরুদ্ধবাদীরা সর্বস্তরে পাকিস্তানি ভাব ধারা ফিরিয়ে আনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে।

দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যতভাবে পারা যায় বির্তকিত করার চেষ্টা করতে থাকে,পাকিস্তানি ভাব ধারায় আছন্ন ১৯৭৫ এর পট পরবর্তিনের পর তৎকলীন অন্ধকার সময়ের বিরুদ্ধবাদী ক্ষমতাবান লোকজন। তারা ভেবেছিল তাদের অবৈধ কর্মকান্ড দ্বারা মানুষের মন থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে লাভ করা সকল অর্জন ধ্বংস করে ফেলবে। কিন্তু বিরুদ্ধবাদী বোকারা বাস করত অন্ধকারে আছন্ন অন্ধ অবস্থানে। বিরুদ্ধবাদীরা ভাবত যেহেতু তারা অন্ধকারে বাস করে আলোর জ্যোতি দেখতে পায়না, তাহলে মনে হয় আর কেউ আলোর জ্যোতিতে অবগাহন করে সত্যের সন্ধান পাবেনা।তাদের চরিত্রটা ছিল অনেকটা অন্ধকারে বাস করা মাংসাশী হিংস্র জীবজন্তুর মতো। অন্ধকারে বাস করা মানুষরুপী প্রাণীরা মনে করে সত্যকে বন্দুকের নলের মাধ্যমে ভুল পথে টেনে নেয়া যায়। কিন্তু বিরুদ্ধবাদীরা জানে না কিংবা বুঝেও না সত্য চিরন্তন। সত্যের কোন বিকল্প নেই। তেমনই করে সৃজনের আলোকরাশিকে কোন ভাবেই অন্ধকার দ্বারা ঢেকে রাখা যায়না। সুন্দরের আলোক রেখার কাজই হল সত্য সুন্দরকে পবিত্রতার মাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরা। তাইতো আমরা দেখি ২১ বছর(১৯৭৫-১৯৯৬)পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিযখন ক্ষমতায় আসে, তখন যেন মানুষ আবার নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দেশের সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আপন প্রাণের তাগিদে ব্যাকুল হয়ে উঠে।

আমাদের সকলেরই একটি কথা মনে রাখা অবশ্যই প্রয়োজন একাত্তরের জয় বাংলা শ্লোগান শুধু মাত্র একটি সাধারণ শ্লোগান নয়। এই শ্লোগান এর ওজন অনেক। এই শ্লোগানের ওজন নির্ধারণ করার মতো কোন ওজন মাপার যন্ত্র আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও আবিস্কৃত হয়নি এবং হবেও না। অনন্ত বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের বিস্তৃতি যেমন অনন্ত অসীম ব্যাপি, ঠিক তেমনই জয় বাংলা শ্লোগনের ওজন অনন্ত অসীম। কেননা এই জয় বাংলা শ্লোগান আমরা পেয়েছি ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের এবং দুই লক্ষ মা-বোনের মান সম্মানের বিনিময়ে। জয় বাংলা শ্লোগান যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন শুনেন তখনই তাদের মনে পড়ে যায় একাত্তরের রক্তাক্ত দিনগুলোর কথা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাকিস্তানি সেনাদের এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের ভয়াবহ অত্যাচার নির্যাতনের কথা। কিভাবে পাকিস্তানি সেনারা এদেশের নারী-পুরুষ ও শিশুদের ওপর অত্যাচার করেছিল, তা তারাই বলতে পারবে,যারা পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর দ্বারা নির্মম অত্যাচরের শিকার হয়েছিল।

পাঠক আমরা যদি একটুসূক্ষ্ম ভাবে বিচার বিশ্লেষণ করতে যাই, তাহলে দেখতে পাব জয় বাংলা শ্লোগান শুনলে তারাই তেলে বেগুনে জ¦লে ওঠে, যারা ঊনিশত একাত্তর সালের আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের সময় সরাসরি পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার নির্যাতনে সহযোগিতা করে সরাসরি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। আবার জয় বাংলা শ্লোগান শুনলে সেইসব লোকেরা তেলে বেগুনে জ¦লে ওঠে, যাদের পূর্বসূরীরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। আর এখন করছে বুঝে না বুঝে কিছু লোকজন । আবার একাত্তরে আরেক দল ছিলেন, যাদেরকে বলা হত চায়নাপন্থি বামপন্থি। অভিযোগ আছে এসব বামপন্থিরা আমাদের ঊনিশত একাত্তরের আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে নাকি তারা দুই কুকুরের লড়াই বলতেন। এইসব চায়নাপন্থি বামপন্থিরাও জয় বাংলা শ্লোগান শুনলে তেলে বেগুনে জ¦লে ওঠেন। এইসব চায়নাপন্থি বামপন্থিরা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বিলীন হতে হতে কোথায় যে হারিয়ে গেছেন, তা এখন আর কেউ বলতে পারেনা। কেউ কেউ বলেন এসব অতিবিল্পবী চায়নাপন্থি বামপন্থিদের পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞাপন দিয়েও খোঁজে পাওয়া যায়না। আবার বেরসিকরা বলেন এসব চায়নাপন্থিদের দূরবীন দিয়েও নাকি দেখা যায় না। ছোট হতে হতে চায়নাপন্থি বামপন্থিরা একেবারে বিলোপ হয়ে গেছে।

পাঠক/পাঠিকা আমার উপরের অলোচনার বিচার বিশ্লেষণ করলে আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো, চলমান সময়টা দেশপ্রেমিক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের জন্য কতটা ভয়াবহ। তাই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ না করে এখনই সময় নষ্ট না করে ঐক্যবদ¦ হতে হবে।

লেখক: আইনজীবী, কবি ও গল্পকার।

পূর্বপশ্চিমবিডি/ এনএন

বিজ্ঞাপন,পত্রিকা,শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close