• বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭
  • ||

জো বাইডেন-কমলা হ্যারিসের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ 

প্রকাশ:  ১১ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:১০ | আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২০, ২২:৩৪
এম আর ফারজানা
এম আর ফারজানা

গত ৩ নভেম্বর আমেরিকা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। নির্বাচনে বাইডেন-হ্যারিস জয়ী হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা মেনে নেয়নি। তিনি নির্বাচনে কারচুপির সুক্ষ অভিযোগ এনে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। গিয়েছেন আদালতে, দিয়েছেন রাজনৈতিক চাপ।কিন্তু কোনকিছুই তার অনুকূলে যায়নি। তিনি নিজের পরাজয় স্বীকার করতে নারাজ। আমেরিকার ইতিহাসে তিনি একমাত্র প্রেসিডেন্ট যে এমন সুষ্ঠ নির্বাচনে কালিমা লেপন করে দিয়েছেন। এমন কি নিজের পরাজয় স্বীকার করে জয়ী প্রার্থী জো বাইডেন-ও কমলা হ্যারিসকেও জানাননি কোন শুভেচ্ছা বার্তা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার নির্বাচনের যে গ্রহনযোগ্যতা ছিল, ঐতিহ্য ছিল তাতে কালো ছায়ার প্রলেপ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। কিন্তু নিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ছাড়তেই হবে হোয়াইট হাউজ। মনের অতৃপ্ত বাসনা নিয়েই তাকে ক্ষমতার সিঁড়ি থেকে নামতে হবে। এমন কি ক্ষমতা থেকে নামার পর এ যাবত তার মিথ্যা তথ্যে বিভ্রান্তি ছাড়ানোর জন্য টুইটার একাউন্ট হারাতে হবে। এমনি বলা হচ্ছে যেতে হবে জেলে এমন কথা এখন সর্বজনবিদিত । তবুও তিনি তার ভাঙ্গারেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছেন।

বেসরকারিভাবে বাইডেন হ্যারিস জয়ের মাল্য বহু আগেই পরেছেন। তবে ২৩ ডিসেম্বর ইলেকটোরাল ভোট প্রদান শুরু হবে। ৬ জানুয়ারি ইলেকটোরাল ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। যদিও ইলেক্টোরাল ভোটের হেরফের হবার সম্ভবনা নেই। নিয়মতান্ত্রিক মধ্যে দিয়ে চলা এই যা। সে প্রেক্ষিতেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ নিতে যাচ্ছেন। এ বছরের পারসন অব দ্যা ইয়ারের টাইমেও বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হয়েছেন জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস। তাদের কাছে জনগণেরও প্রত্যাশা বেশী। আমেরিকার জনগণ ট্রাম্পের অহেতুক বাকোয়াজবাজিতে বিরক্ত। তাই তারা বাইডেন ও হ্যারিসকেই নির্বাচিত করেছেন ভালো কিছুর প্রত্যাশায়। যার ফলে বাইডেন ও হ্যারিসের দায়িত্বের পাল্লা একটু ভারীই হবেই।

ক্ষমতা পাওয়ার চেয়ে ক্ষমতা রক্ষা কঠিন হয়ে যাবে বাইডেন ও হ্যারিসের জন্য। কারণ সিনেট এখনো রিপাবলিকানদের অনুকূলে। ৩ নভেম্বর নির্বাচনে ডেমোক্রেট পেয়েছে সিনেটে ৪৮ আসন, আর রিপাবলিকান ৫০। জর্জিয়ায় দুই আসনের ‘রানঅফ’ নির্বাচন হবে ৫ জানুয়ারি। দুটিই ছিল রিপাবলিকানদের। তাদের অনুকূলে থাকার সম্ভবনাই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডেমোক্রেট না পাওয়ার সম্ভবনাই বেশী। আর সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলে কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। সিনেট রিপাবলিকানদের অনুকূলে থাকলে ক্ষমতার দাপটে রিপাবলিকানরা যে কোন ইস্যুতে বা বিলে ভ্যাটু দিতে পারে। এবং দেয়ার সম্ভবনাই বেশী। তাহলে বাইডেন এবং কমলার জন্য কঠিন হয়ে যাবে পথ চলা। বিশেষ ইমিগ্রশন কাজের ক্ষেত্রে। বাইডেন তার নির্বাচনী ইশতেহারে ইমিগ্রেশনের কথা বলেছিলেন। যদিও ট্রাম্প ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেক ইমিগ্রেশনের কাজ বন্ধ রেখেছে। এবং বিভিন্ন ইমিগ্রেশন ফি দ্বিগুণ করে দিয়েছে। মূলত এই একটা দিক কেন্দ্র করে অনেক অভিবাসী বাইডেনকে ভোট দিয়েছে। বাইডেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছে ক্ষমতা গ্রহনের পর প্রায় ১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রদানের বিল পাসে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। ইতিমধ্যে সুপ্রিমকোর্ট ইমিগ্রশনের ব্যাপারে রায় দিয়েছে তাতে অনেক অবৈধ অভিবাসী বৈধতা পাবে বিশেষ করে যারা বাবা-মায়ের হাত ধরে এসেছে আমেরিকায় ছোট বেলায় কিন্তু তাদের বৈধতা ছিল না।

আমরা অতীতে দেখেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা অবৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের ইস্যুতে সিনেটে কমপ্রিহেনসিভ বিল উত্থাপন করেছিলেন কিন্তু রিপাবলিকানদের অসহযোগিতার কারণে তা পাস হয়নি। এবার ও সিনেটে রিপাবলিকানরা এগিয়ে তাই সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে বাইডেনের জন্য। শুধু ইমিগ্রেশন না, মোকাবেলা করতে হবে কোভিড-১৯ ক্ষেত্রে ও। বাইডেন তার নির্বাচনী প্রচারণায় করোনা ভাইরাসকে গুরুত্ব দিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেছিলেন আমরা নির্বাচিত হলে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনার চেস্টা করবো। এখন চলছে করোনা দ্বিতীয় ঢেউ। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ, মারা যাচ্ছে শত শত। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক দোকানপাট।

ব্যবসায় হচ্ছে নিন্মমুখী। কিছুদিন পর বাইডেন হ্যারিস শপথ গ্রহনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা বসবেন। ততদিনে হয়তো বাজারে ভ্যাকসিন চলে আসবে। কিন্তু ভ্যাকসিন আগে পাবে স্বাস্থ্যকর্মিরা তারপর জাতীয় পর্যায়ে যারা কাজ করে তারা। তারপর সাধারণ জনগন। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছে, এই সাধারণ জনগণের কাছে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে পৌঁছাতে ততদিনে অনেক লোক হারিয়ে যাবে পৃথিবীর বুক থেকে। জনগণের আশা বাইডেন তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। কিন্তু তিনি যখন প্রশাসনে বসবেন তখন সকলের সম্মতিতেই কাজ করতে হবে। যদিও হাউজ অব রিপ্রেজেটেটিভ ডেমোক্রেটদের দখলে। কিন্তু সিনেট এ নিয়ে কি হয় তা দেখা যাবে ভবিষ্যতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ট্রাম্প ক্ষমতা থেকে নেমে গেলে ও রিপাবলিকানরা বাইডেন ও হ্যারিসকে সহজে ছাড় দেবে না কাজের ক্ষেত্রে। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে। বর্তমানে ভাইরাসের কারণে আমেরিকার অর্থনীতি অনেক ডাউনের দিকে। ফলে কোটি কোটি বেকার বসে আছে। তাদের জবের ক্ষেত্র তৈরী করা, অর্থনিতির গ্রাফ উপরে তোলা সহজ হবে বলে মনে হয় না। আর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে হলে সবাইকে নিয়েই কাজ করতে হবে। যদিও বাইডেন ইতিমধ্যে করোনা পর্যবেক্ষন, ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কমিটি ঘোষণা করেছেন। তিনি হয়ত আন্তরিকভাবেই হ্যারিসকে নিয়ে কাজ করতে চাইবেন।

কিন্তু বাধ সাধতে পারে রিপাবলিকানরা। ভোটের ব্যবধানের হিসেব করলে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা কম ভোট পাননি, বরং কিছু জায়গায় লড়াই হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি একেবারে অল্প ব্যবধানে বাইডেন জিতেছেন। কাজেই যেসব রাজ্য রিপাবলিকানদের দখলে সেসব রাজ্যে হিসাবনিকাশ করেই কাজ করতে হবে। ইতিমধ্যে জো বাইডেন তার অর্থমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেছেন। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন জ্যানেক ইয়ালেন। ভবিষ্যতে বলে দেবে তার কাজ কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতি। আর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার না করতে পারলে কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হবে বাইডেন, হ্যারিস। আমেরিকার প্রশাসনিক কাঠামো অনেক জটিল। চাইলে ক্ষমতার ব্যবহার বা অপব্যবহার করা যায় না। ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নিয়ে করতে হয়। তাই যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক তাকে জবাবদিহি করতে হয়। এই জবাবদিহিতার জায়গায় এসে কতটুকু বাধা অতিক্রম করতে পারবেন এবং রিপাবলিকানদের কাজের দৌড়ে তাদের সাথে কতটুকু তাল-মেলাতে পারেন তা দেখার বিষয়।

সারাবিশ্ব অপেক্ষায় আছে বাইডেনের শপথ গ্রহনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় বসার। কারণ ট্রাম্প যেসব দেশের সাথে বৈরী সম্পর্ক ছিল তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করবে বাইডেন এমন আভাস তিনি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে সুসম্পর্ক তৈরী করে অন্যান্য দেশের সাথে চুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় লেনদেনের মাধ্যমে অর্থনীতি এগিয়ে নিতে পারে। যদিও বাইডেন বলেছেন, তার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাবেন। তাছাড়া জলবায়ু চুক্তি, বর্ণ বৈষম্য এ গুলো তো থাকছেই।

বাইডেন বয়সের ভারে নুইয়ে আছেন। এক্ষেত্রে কমলা হ্যারিসের উপর তাকে অনেকখানি নির্ভর করতে হবে। কমলা হ্যারিস, দক্ষ ও তুখোড় একজন রাজনীতিবিদ তাতে কোন সন্দেহ নাই।

ইতিমধ্যে বাইডেন তার ক্যাবিনেটে কারা কারা থাকছেন তার একটা ছক কষে ফেলেছেন। এই ক্যাবিনেটের উপর অনেকখানি নির্ভর করবে তাদের সফলতা। জনগণ ও হিসাব নিকাশ করবে যে ট্রাম্পেকে বিদায় দিয়ে তারা আসলেই কি সঠিক কাজ করেছে নাকি ভুল করেছে! সময় বলে দেবে সেটা। বাইডেন–কমলার সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন সময়।

লেখক: এম আর ফারজানা, নিউ জার্সি থেকে।


পিপি/জেআর

এম আর ফারজানা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close