• বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭
  • ||

তরুণদের স্বপ্ন যেন ভেঙে না যায়

প্রকাশ:  ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১৩:৫৪
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

তরুণরা আমাদের শক্তি। তাদের মধ্যে যে অমিত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে তার কতটা খবর আমরা রাখি। উল্টো তাদের সাহসী কাজগুলোতে বাধা তৈরি করে অনেক সম্ভবনায়ময় প্রতিভাকে আমরা গলাটিপে হত্যা করি। ফুল ফোটাবার আগেই তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেই। তাদের প্রেরণা দেবার পরিবর্তে ভৎসনা করি।

এভাবে অবহেলা, অপমান ও অবজ্ঞার শিকার হয়ে প্রতিদিন কত প্রতিভাবধর তরুণ পথের ধুলোয় পদদলিত হয়। হারিয়ে যায়। সেখান থেকে আমি তরুণদের ঘুরে দাঁড়াতে বলবো। তরুণদের বলবো কারো উপর নির্ভরশীল হয়ে নিজের শক্তিকে ছোট করে ফেলো না। তোমার মেধা ও প্রতিভাকে অন্যের দাসত্বে পরিণত না করে নিজের প্রাণ শক্তিতে জেগে উঠো। কারণ পৃথিবীর ইতিহাস তোমরাই বদলাতে পারো। পুরাতন প্রথাগত ধারণার অচলায়তন তোমরাই ভেঙে পরিবর্তনের ডাক দিতে পারো। তোমরা যা পারো অন্যরা তা পারে না। তবে সেটি যেন সব সময় ইতিবাচক চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়।

তরুণদের আমি গবেষণায় সম্পৃক্ত হতে বলবো। কেননা তরুণদের চিন্তাশক্তি বিশুদ্ধ থাকে। নতুন নতুন ধারণা প্রতিনিয়ত তরুণদের আবেগ তাড়িত করে। তরুণরা যে মৌলিক চিন্তার জন্ম দিতে পারে সেটি আর কেউ দিতে পারে না। তরুণরা রিস্ক নিতে পিছপা হয় না। এটাই তরুণদের ধর্ম। আর রিস্ক না নিলে কোনো কিছু অর্জনও করা যায় না। নো রিস্ক নো গেইন। কিন্তু নিজের মেরুদন্ড শক্ত করে প্রতিভা বিকাশের একটা যথাযথ প্লাটফর্ম তরুণদের কখনো গড়তে দেওয়া হয় না। কেন হয় না। সেটা বুলেটবিদ্ধ বিবেক হয়তো উত্তর দিতে পারবে। যদি দেবার মতো সাহস থাকে। প্রতিদিন আমার কাছে অনেক তরুণ তাদের নতুন নতুন ধারণার স্বপ্ন নিয়ে আমার কাছে আসে। তাদের চিন্তাশক্তির বৈচিত্র্য আমাকে বিস্মিত করে। কিন্তু কোথায় যেন একটা পা টেনে ধরা, রক্ষনশীলতার দেয়াল।

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য। তারুণ্যকে বন্দি করে দমিয়ে দেবার কৌশল। তরুণদের অসহায় মুখগুলোকে তখন অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করি। বড় বড় বিজ্ঞানীদের স্বপ্ন জয়ের গল্প শুনাই। ওরা পুলকিত হয়। আলোড়িত হয়। তখন বিজ্ঞান আর দর্শন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। অনেক গবেষক মনে করেন বয়সের সাথে প্রতিভার এক ধরনের দৃশ্যমান সম্পর্ক আছে। বিজ্ঞান, সাহিত্য, অর্থনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভাধর মানুষদের বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন তারুণ্যে একজন মানুষের মধ্যে প্রতিভার যে বিকাশ ঘটে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা দ্রুত কমে যায়। এ কথাটি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও বিশ্বাস করতেন। তিনি মানুষের প্রতিভা আর বয়সের মধ্যে সম্পর্কের তুলনা করতে গিয়ে বলেই ফেলেছেন- ‘যে ব্যক্তি ত্রিশ বছর বয়সের আগে বিজ্ঞানে কোনো অবদান রাখতে পারেনি, সে আর কখনোই পারবে না’।

যদি আমরা আইনস্টাইনের ক্ষেত্রে বিষয়টি চিন্তা করি তবে দেখি ১৯০৫ সালটিকে তার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর বছর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। এই বিস্ময়কর বছরটিতে তিনি ব্রাউনীয় গতির উপর গবেষণা করে অনুর অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন। আলোর কনিকা বা কোয়ান্টাম তত্ত্ব গবেষণাও এসময় সফল হয়েছে। ঠিক একই সময়ে তিনি সবচাইতে জনপ্রিয় আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বটি দিয়েছেন যা পৃথিবীর আগেকার সব ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। তার বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 যুক্তি, প্রমাণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাত্র তিন পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। এজন্য পরবর্তীতে তিনি নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জন করেন। এই অভাবনীয় ও বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর পর তিনি আরো ৫০ বছর বেঁচে থাকলেও আর কোনো বড় ধরনের আবিষ্কার করতে পারেননি।

বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ, আলোর বিচ্ছুরণসহ তার সফল এবং বিখ্যাত আবিষ্কারগুলো তরুণ বয়সেই করে ফেলেছিলেন। আরো পরিষ্কার করে বললে তার ২৪ বছর বয়সের মধ্যেই। ১৯৫৩ সালে এইচ.সি লেহম্যান তার গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন পৃথিবীর বেশিরভাগ সফল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো মূলত তরুণ বিজ্ঞানীরাই করেছিলেন, বয়স্ক বিজ্ঞানীরা নয়। ২০০৩ সালে সাতোশি কানাজাওয়া ২৮০ জন বিজ্ঞানীর ওপর তার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখেন যে, বয়ঃসন্ধির সময় থেকে প্রতিভা ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে যৌবনে তা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায় এবং ত্রিশ বছরের পর প্রতিভার বিকাশ ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

এ গবেষণাগুলো প্রমাণ করছে আমাদের দেশে যে তরুণরা রয়েছে তাদের ভিতরের প্রতিভাকে বের করে এনে তা দেশের উন্নয়নের কাজে প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইসরাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণরা উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর সমাধান করে দিচ্ছে। সেগুলোর উৎকষতায় তাদের মেধার প্রয়োগ করছে। এর ফলে তরুণদের মেধাশক্তি অর্থনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে। এখন আমরা বলছি ইসরাইল হচ্ছে সারা পৃথিবীর রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্টের তীর্থস্থান।

ভাবা যায় কি? প্রযুক্তিগত বিস্ময়কর বিপ্লব তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় এনেছে। যা আমরা পারিনি। এখানেই আমাদের দায়িত্বহীনতা। এখানেই আমাদের পশ্চাৎমুখিতা। এখান থেকে আমাদের এখনই বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাকে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহার করে তরুণদের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই তারুণ্যের শক্তি জেগে উঠবে। উল্লসিত মন বিস্ফোরিত হয়ে উঠবে ‘জয়তু তরুণ’ এর জয়গানে। স্বপ্ন ও বিশ্বাস হবে আমাদের শক্তি। সেই পথ ধরেই জয় আমাদের হবেই হবে। কেননা কান পেতে শুনছি ‘মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়’।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close