• রোববার, ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১০ মাঘ ১৪২৭
  • ||

মানসিক রোগী, মাদকাসক্তি ও কানাডার বেগমপাড়া

প্রকাশ:  ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:১০
এ বি এম কামরুল হাসান
এ বি এম কামরুল হাসান

পুলিশ অফিসার আনিসুল করিমের দুঃখজনক মৃত্যু এবং পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীতে আমি বেশ ভাবনায় পড়েছি। ডা. মামুন আটক হবার পর সাইকিয়াট্রিস্ট এসোসিয়েশনের মুখপাত্র লাইভ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দেশে ১৭ কোটি মানুষের ভেতর দুই কোটি মানসিক রোগী। তার মানে প্রতি নয়জনে একজন। তথ্যটি মোটেই বাহুল্য বলে মনে হয় না। এপ্রিল ২০১৮ তে প্রকাশিত এক নিবন্ধ মতে, বিশ্বে শতকরা দশ দশমিক সাত ভাগ লোক কোন না কোন মানসিক রোগে আক্রান্ত। যাদের ভেতর বেশিরভাগই বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ক্ষুধামন্দা জনিত মানসিক রোগ বা সিজোফ্রেনিয়া, এলকোহল বা অন্য কোন মাদকাসক্ত জনিত মানসিক রোগে ভুগছেন। গতবছর পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সার্ভের তথ্যমতে, দেশে শতকরা প্রায় ‘সতেরো ভাগ’ লোক কোন না কোন মানসিক রোগে ভুগছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ ভাগ কখনোই কোন মানসিক চিকিৎসকের দারস্থ হননি। বিষয়টি আসলেই ভাবনার কারণ। এত বিশাল সংখ্যক চিকিৎসাবিহীন মানসিক রোগী এই জনারণ্যে লুকিয়ে আছে। নিজের, পরিবারের ও সমাজের জন্য একটা বিপদজনক পরিস্থিতির ক্ষেত্র সৃষ্টি করে যাচ্ছে, যা সত্যিই আতংক জনক। এই মানসিক রোগীদের কেউ চাকরি করছেন, ব্যবসা করছেন অথবা অন্য কোনো পেশায় জড়িত আছেন। কেউবা সরকারি অথবা বেসরকারি পর্যায়ে এমন কোন পদে আছেন যার কোন পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আয়, রোজগার, জীবন, মরণ, বর্তমান, ভবিষ্যতের উপর ভীষণ ভাবে প্রভাব ফেলছে।

পত্রিকার ভাষ্যমতে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে সম্প্রতি সন্দেহভাজন ১০৫ জনকে ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। পজিটিভ রিপোর্ট মিলেছে ৪০ জনের। যাদের অনেকেই চাকরি হারাচ্ছেন। নিশ্চয়ই এরা একদিনে মাদকাসক্ত হননি। মাদকাসক্ত থাকা অবস্থায় তারা চাকরি করেছেন, সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বা বাস্তবায়ন করেছেন, ধরপাকড় করেছেন। মাদকাসক্ত থাকার কারণে মানসিক বিকারগ্রস্ত অবস্থায় এ সকল সরকারি কর্মচারীদের সব সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ কি যথাযথ যুক্তিযুক্ত হয়েছে? কোন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাবার পরে তাকে সহি করার চেষ্টা হলেও তা কি সমাজের চোখে বৈধ হয়েছে? যারা এসব সহি করার চেষ্টায় আছেন তারা কি কখনো সমাজের দেয়াল লিখন পড়ে দেখার অথবা বোঝার চেষ্টা করেছেন? বিষয়গুলো আসলেই ভাববার বিষয়। পরিবার, সমাজ এবং নীতি নির্ধারকদের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসে গেছে।

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ৪১ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সাথে সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হবার পূর্বে তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। ডা. মামুন একজন বিসিএস কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি করেন। ধরে নেয়া যাক, ডা. মামুন আইনের চোখে একজন অপরাধী। কিন্তু তার গ্রেপ্তারের সময়ে সরকারি চাকরি আইনের এ ধারাটি কি তার ক্ষেত্রে মানা হয়েছে? যদি না মানা হয়ে থাকে, তবে কেন মানা হয়নি তার কোনো ব্যাখ্যা আজ অবধি পাওয়া যায়নি। তাহলে যারা মামুনকে উঠিয়ে নেয়ার সাথে জড়িত বা অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে বলে সাফাই গান - তারা ‘শতকরা সতেরো ভাগের’ ভেতর পড়েন কিনা- সে প্রশ্ন জনমনে উঠতেই পারে।

বলা হলো, ডা. মামুন সরকার অননুমোদিত একটি হাসপাতালে রোগী রেফার করেছেন। অথচ হাসপাতালটির নাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের ফেসিলিটি লিস্টে আছে। তাহলে আম-জনতা বা আম-ডাক্তাররা কিভাবে বুঝবে যে সেটি সরকার অনুমোদিত নাকি অননুমোদিত? ওয়েবসাইটটি দেখলে মনে হবে তালিকাটি কোন এককালে করা হয়েছিল। দেশের সব হাসপাতালের নাম আছে সেখানে। হালনাগাদের কোন বালাই নেই। নবায়ন স্টেটাস দিয়ে একটা কলাম যোগ করলেই তো ঝামেলা চুকে যায়। কিন্ত কেন সেটা করা হচ্ছে না এবং কার বা কাদের স্বার্থরক্ষায় তা করা হচ্ছে না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

আবার ধরুন ব্যবসায়ীদের কথা। কোভিডের সময় শুধু ব্যবসায়ীরা কেন, কারোরই নিজের বাঁচার গ্যারান্টি নেই। তারপরও কোভিডকে পুঁজি করে নকল মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ, টেস্ট না করে টেস্টের ফলাফল দেয়া, কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল খুলে ব্যবসা করা-সবই দেখা গেল। যারা মানুষের জীবনকে পুঁজি করে ব্যবসা করে তারা ওই ‘সতেরো ভাগের’ ভেতর পড়লে অবাক হবার কিছু নাই। যারা দুর্নীতি করে, দেশের সম্পদ লুট করে, মানি লন্ডারিং করে কানাডার বেগমপাড়ায় স্ত্রী, সন্তানদের পাঠাচ্ছেন অথবা সুইজ ব্যাংকে জমাচ্ছেন, কিংবা দৈত্ব নাগরিকত্ব নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত তারাও কি এই ‘সতেরো ভাগ’ মানসিক রোগীদের অন্তর্ভুক্ত? এসব নিয়ে সবাই একটু ভাবুন, সমাধানের পথ বের করা এখন সময়ের দাবি। নয়তো এসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড সমাজকে গ্রাস করে জাতিকে ধ্বংস করে দিবে।

আমাদের সমাজে মানসিক রোগকে সবাই গোপন করতে চায়। অনেকেই জানেনই না যে তিনি মানসিক রোগী। জানলেও আবার লোকলজ্জার ভয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। সেজন্যই শতকরা ৯৯ ভাগ মানসিক রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়ে গেছে। এদেরকে খুঁজে বের করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি চাকরিজীবীদেরও প্রতিবছর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন প্রনয়ণ কালে মানসিক টেস্টকে অত্যাবশ্যক করে দেয়া যেতে পারে। দেশকে মুক্ত করতে হবে মাদক, মানসিক নিপীড়ন, ঘুষ, দুর্নীতিসহ নানাবিধ অপরাধ থেকে। চাপ কমাতে হবে কানাডার বেগমপাড়ায়। সমাজকে মুক্ত করতে হবে মানসিক বিকারগ্রস্তদের হাত থেকে। কাজটি শুরু করা প্রয়োজন নিজ নিজ পরিবার থেকেই। কেননা পরিবারই পারে নিজ পরিবারের মানসিক রোগীকে চিহ্নিত করে তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুস্থ করে তুলতে। ভারসাম্যহীন সমাজকে সঠিক পথে চালিত করা হোক বিজয়ের মাসে আমাদের সংকল্প।

লেখকঃ প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

এ বি এম কামরুল হাসান
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close