• রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

প্রাথমিক শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির উপায়

প্রকাশ:  ০৭ নভেম্বর ২০২০, ১২:৩৫
সন্ধ্যা রানী সাহা
সন্ধ্যা রানী সাহা

করোনার কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মতোই নিজেদের বসতবাড়িতে আবদ্ধ রেখেছেন। এ অবস্থায়ও অনেকে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ‘শ্রেণীকাজ’ প্রচার করে যে দক্ষতা প্রদর্শন করে চলেছেন, তা অভাবনীয়। অথচ তাদের এ বিষয়ে আগে থেকে কোনোরূপ প্রশিক্ষণ ছিল না। হ্যাঁ, তারা ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু পারেন। শুধু একটু মোটিভেট করতে পারলেই হলো। মোটিভেশনের প্রথম কাজ হলো, যেসব শিক্ষক কর্মস্থলে নেই, তাদেরকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা। অতঃপর প্রধান শিক্ষক স্টাফ মিটিং করবেন। অন্যান্য সরকারি অফিসে কাজটি আগে থেকেই চলে আসছে। বেঞ্চমার্ক হিসেবে গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কতটুকু ছিল, তা দেখতে হবে। করোনার ক্ষতিপূরণে প্রচারিত ক্লাস, জেলাভিত্তিক বিভিন্ন অনলাইন ক্লাস, সেলফোনে পাঠদান ইত্যাদি থেকে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির পরিমাপ করবেন। পাশাপাশি আরো কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় দেখতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়াকে শিক্ষক সংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করে একেকজনকে একেক এরিয়ার দায়িত্ব দেবেন। অতঃপর দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাঠদান করবেন। পাশাপাশি বাড়ির শিক্ষার্থীদের একত্র করে একই শ্রেণীর হলে ছোট ছোট দল করেও শিক্ষাদান করতে পারেন। এতে যেমন শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত হবে, তেমনি জনগণের কাছে শিক্ষকের জবাবদিহিতার বিষয়টিও স্পষ্ট হবে। শিক্ষককে কাছে পেয়ে তার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। উল্লেখ্য, সব ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

করোনার কারণে স্কুলে ক্লাস বন্ধ থাকায় শিক্ষকদের কেউ কেউ কর্মস্থল থেকে দূরে অবস্থান করছেন। তাদের ধারণা: স্কুল খোলার নির্দেশ আসুক, পাঠবিষয়ক পরিকল্পনা-নির্দেশনা আসুক, তারপর যাওয়া যাবে, পড়ানো যাবে, ততক্ষণ একটু জিরিয়ে নেয়া যাক। আমার মনে হয়, উপর থেকে পাঠ পরিকল্পনা আসার অপেক্ষায় বসে থাকার অবকাশ নেই। শ্রেণীকক্ষে তো কাজ করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। শিখন-শেখানোর কার্যক্রমটি মূলত পরিচালিত হয় শিক্ষকের সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে। তাই তো পাঠ পরিকল্পনার কাঠামো ব্যবহারে শিক্ষক স্বাধীন। শিক্ষার্থীদের শিখন চাহিদার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষক শিখন-শেখানোর কৌশল ও পাঠ পরিকল্পনার কাঠামো বিন্যাসেও নতুনত্ব আনতে পারেনশ্রেণীর কোন শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি কতটুকু আর কোন শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের বিশেষ যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন, সেটা তো শিক্ষকই ভালো জানেন। কাজেই করোনার ক্ষতিপূরণে রিকভারি প্ল্যান বিদ্যালয়ে বসে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময়পূর্বক শিক্ষকদেরকেই তাড়াতাড়ি ঠিক করে নিতে হবে। বিদ্যালয়ের অফিস বন্ধ রেখে কোনোভাবেই যথাযথ রিকভারি প্ল্যান তৈরি করা সম্ভব নয়। অতএব, বিদ্যালয়ের অফিসে বসে নিজের অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা-আলাদাভাবে স্বপ্ন দেখুন এবং আপনার স্বপ্ন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য আগে প্রস্তুতকৃত শিডিউল মোতাবেক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি চলে যান। যতদিন বিদ্যালয় না খোলে ততদিন শিক্ষার্থীদের এভাবে সহযোগিতা করুন। এ অবস্থায় শিক্ষকরা বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখবেন, এমনটিই শোভনীয়।

দুর্যোগ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যেতে হবে না ঠিক। কিন্তু আগেই বলেছি, স্কুলের অফিসটি তো সরকারি অফিস। তাই শিক্ষা কার্যক্রম যেকোনো উপায়ে পরিচালনার জন্য স্কুলের অফিসটি খোলা রেখে সেখান থেকে পরিকল্পনা ও শিডিউল মোতাবেক অগ্রসর হওয়া উচিত। তা না করে আমরা যে যার মতো করে ঘরের মধ্যে থেকে অনলাইন ক্লাস, জুম-ভার্চুয়াল মিটিং, মোবাইলে পাঠদান ইত্যাদি চালাচ্ছি। সেটা কতিপয় সচ্ছল শিক্ষার্থীর জন্য ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। তাদের এসব অনলাইন ক্লাসের সুবিধা গ্রহণের সুযোগ কম। এ থেকে বোঝা যায় যে আমরা এই করোনা সংকটকালে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীর বিভিন্ন অসুবিধার প্রতি অনেকটাই উদাসীন। এ মুহূর্তে আমার পরামর্শ, শিক্ষকরা দ্রুত কর্মস্থলে হাজির হোন। সেখান থেকে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পাঠদান এবং অন্যান্য বিষয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। শিক্ষার্থীরা পুনরায় বিদ্যালয়ে না ফেরা পর্যন্ত স্কুলকে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি নিয়ে যান আপনার মাধ্যমে।

করোনার এই সংকটকালে প্রাথমিক শিক্ষাকে কীভাবে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সব শিক্ষার্থীর দ্বারে পৌঁছাবেন, তা শিক্ষকরা ভালোভাবেই জানেন। শিক্ষার্থীদের হোম ভিজিট নামে একটি কাজও শিক্ষকরা নিয়মিত করে থাকেন (১৬/০৩/২০২০ পর্যন্ত)। শিক্ষার্থীদের বাড়িগুলোও তারা চেনেন। কাজেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষকরা প্রথমত বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে যান। অতঃপর সেখান থেকে প্রধান শিক্ষকের নির্দেশনা মোতাবেক শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করুন। করোনাকালে শিশুর শারীরিক বিকাশ থেমে নেই। কিন্তু অপরাপর বিকাশগুলো বিশেষত চরিত্র গঠন এবং নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা যে সময় শিশুরা বড় হতে থাকে তখনই দিতে হবে। শিশুর বিকাশের সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক, সমাজের অন্যান্য ব্যক্তি, খেলার সাথী, পরিবার, পরিবেশ, পরিস্থিতি সবই সম্পৃক্ত। বিশেষ করে শিক্ষকের ভূমিকা এখানে অগ্রগণ্য। কর্ম সম্পর্কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২০ ধারায় (১৯৯৯) যথার্থই বলা হয়েছে—কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী—এ নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।’ তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান—দেশের এই সংকটকালে সব শিশুর সার্বিক বিকাশের সহযোগিতায় স্বীয় যোগ্যতা প্রদর্শন করুন এবং দেশপ্রেমের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।

সন্ধ্যা রানী সাহা: উপজেলা শিক্ষা অফিসার কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

সন্ধ্যা রানী সাহা,প্রাথমিক শিক্ষা,শিক্ষক
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ঘটনা পরিক্রমা : শিক্ষক

cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close