• রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
  • ||

পরবর্তী প্রজন্মকে আশার আলো দেখাবার দায়িত্বটা বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে

প্রকাশ:  ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৬:২০
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষের কথা কেন জানি মনে হয় আমরা ভুলতে বসেছি। দিন যতোই যাচ্ছে আমাদের মনের গভীর থেকে যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি চিহ্নের কণাটুকু। আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত তারাই, যারা একাত্তরে ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, হারিয়েছেন। সব হারানো মানুষ গুলো এখনো মনের স্মৃতি কোঠায় খুঁজে বেড়ান আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের তথ্যগুলো। কেবল যেন তারাই শুনতে পান অর্থাৎ যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অনেক কিছু হারিয়েছেন সেইসব মানুষের আর্তনাদ।

মানুষের আর্তনাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে এদেশের কিছু সুবিধাভোগী মানুষ সবকিছু নিজেদের স্বার্থে নিজেদের করতলগত করে ফেলতে চান। যারা অনেক কিছু হারিয়েছেন আমার এই দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করতে গিয়ে, তারাই কেবল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে লালন-পালন করছে।

সুবিধাভোগীরা কেবল নিজেদের লাভের হিসাব বাড়াবার জন্য পাকা অভিনেতার মত চিৎকার করে যাচ্ছেন- মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ বলে। আর বাস্তবে এসব অভিনেতারা উভয় দিক রক্ষা করার জন্য বিরুদ্ধ শিবিরেও উঁকি মারেন, যাতে সময়মতো বিরুদ্ধবাদীদেরকেও কাজে লাগিয়ে নিজেদের লাভ লোকসান বাড়াতে পারেন।

সব হারানো মানুষের বেদনাময় চিৎকার উপর তলার মানুষেরা শুনতে চান না। সব হারানো মানুষকে নিয়ে উপর তলার মানুষেরা তখনি সজাগ হন, যখন দেখা যায় নিজেদের অন্যায় আবদার গুলো রক্ষা করা যাবে। অথচ একাত্তরের আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, সেই সব শহীদের আত্মদানকে পুঁজি করে আমাদের নীতি বর্জিত অতিলোভী হীনস্বার্থ উদ্বারকারী একশ্রেণীর রাজনীতিবিদরা নিজেদের ব্যাংকের হিসাব বৃদ্ধি করছেন, পাকা ঘর-বাড়ী বানাচ্ছেন এবং দেশের সকল সুখ-শান্তি নিজেদের ড্রয়িং রুম, বেড রুমে নিয়ে যাচ্ছেন।

আর অন্যদিকে অসহায় ও সবকিছু থেকে বঞ্চিত মানুষেরা পথে পথে ঘুরে বেড়ায় একটু আনন্দ আর সুখের অভিপ্রায়ে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কপালে সুখ আর আনন্দ ধরা দিতে চায় না। ধরা দেবে কি করে, মানষের সব সুখ-আনন্দ নিয়ে গেছে এক শ্রেণীর নীতি বর্জিত আমলা ও অসৎ রাজনীতিবিদরা। এই শ্রেণীর মানুষেরা ২৬শে মার্চ ও ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে অর্থাৎ বিশেষ দিবসে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া শহীদদের জন্য মায়াকান্না করে চোখের জলে নিজেদের জামা কাপড় ভিজিয়ে ফেলেন। তারপর দিবসগুলো চলে গেলে এই শ্রেণীর মানুষেরা চোখের জলে ভেজা জামা কাপড় উন্নত মানের লন্ড্রিতে ধুয়ে ইস্ত্রি করে আলমিরাতে রেখে দেন আগামী বছরের বিশেষ দিবসগুলোতে পরিধান করার জন্য।

বিশেষ দিবস ছাড়া দুর্নীতিবাজ ব্যাক্তিরা আমাদের এই মাতৃভূমি স্বাধীন করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছিল, তাদের কথা আর মনেই রাখতে চান না। আজকাল এক শ্রেণীর মানুষ, যেমন আমলা, রাজনীতিবিদ, কবি, লেখক, সাংবাদিকরা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে বুঝাতে চান, তারা জনগনের অতি কাছের মানুষ। বাস্তবে এই শ্রেণীর মানুষেরা হচ্ছে গণশত্রু।

হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলায় অবস্থিত ছায়া সুনিবিড় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কৃষ্ণপুর গ্রাম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর সম্মিলিতভাবে কৃষ্ণপুর গ্রামে গণহত্যা শুরু করে। সংবাদ ভাষ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কথামত হত্যাযজ্ঞের দিন পাকিস্তানি সেনা থেকে এদেশীয় পাকিস্তানিদের সহযোগীরাই সংখ্যায় বেশী ছিল। তারা এমন নির্দয় ভাবে গ্রামের মানুষকে হত্যা করে যে, যা আক্রান্ত ব্যাক্তিরাই চিন্তা করতে পারে নাই।

কৃষ্ণপুর গ্রামে প্রথম গুলি করে হত্যা করা হয় রাম চরণ রায়কে। এ দৃশ্য দেখে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন দিকে ছুটাছুটি করতে থাকে। কেউ কেউ গ্রামের মজা পুকুরের কচুরীপানায় লুকিয়ে থেকে প্রাণ বাঁচায়। গ্রামের মানুষের মতে গ্রামটি বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দূরের গ্রাম থেকেও সংখ্যালঘু হিন্দুরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য এই গ্রামে আশ্রয় নেয়। এই খবর পাকিস্তানি সেনাদের দেশীয় সহযোগীরা জানার পর পাকিস্তানি সেনারা তা জেনে যায় এবং পাকিস্তানি সেনারা ও তার সহযোগীরা কৃষ্ণপুর গ্রামে হামলা করে গণ্যহত্যা শুরু করে। গ্রামবাসীদের বক্তব্যমতে ঐ দিন প্রাণ বাঁচানোর জন্য গ্রামের মানুষ গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের হাতে নিহত গ্রামবাসীদের লাশ সৎকার না করে বলভদ্র নদীতে ফেলে যান। গ্রামবাসীদের অভিযোগ মহান মুক্তিযুদ্ধে কৃষ্ণপুর গ্রামের এতোসব মানুষ প্রাণ হারানোর পরও, নারীরা ইজ্জত হারানোর পরও কেউ তাদের কোন খোঁজ-খবর নেন না।

অভিযোগ আছে তারা কোন সাহায্য পান না। অনেক দুঃখ কষ্টে জীবন-যাপন করছেন। যদিও এখন ক্ষমতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকারী দল। অনেকের মতে ঐ দিন কৃষ্ণপুর গ্রামের গণহত্যায় ১২৭জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। অনেকে পাকিস্তানি বাহীনির গুলি খেয়ে মরার মত পড়ে থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচান।

অভিযোগ আছে বর্তমান সরকারের আমলেও এখনো পর্যন্ত যুদ্ধে আহত কিংবা নিহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোকজনের নাম তালিকায় নেই। এমনো হয়েছে যে, একসঙ্গে এতো মানুষের লাশ সৎকার করতে না পেরে লাশের গলায় কলসি বেধে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। সংবাদ ভাষ্যমতে, পকিস্তানি বাহিনী ১২৭জন পুরুষকে স্থানীয় কমলাময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে লাইন ধরিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে আগুন দেয়া হয় নিরীহ মানুষের ঘর-বাড়ীতে।

এছাড়া নিরীহ নারীদেরকেও ধর্ষণ করা হয়। স্বামী হারানো বিধবাদের কান্নার ধ্বনি এখনো কৃষ্ণপুর গ্রামের বাতাসকে ভারী করে তোলে।

১৯৭১ সালের অপমান অর্থাৎ গণহত্যার কথা এখনো হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ভুলতে পারেননি। এখনো তাদেরকে পীড়া দিয়ে যায়, ১৯৭১ এর সেই দিনের ভয়াবহ দৃশ্যাবলী। তার মধ্যে যখন সব হারানো মানুষের দল দেখতে পায়, এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নিহত আহত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম স্থান পায় না, তখন তারা অর্থাৎ নিহত আহত ব্যক্তিদের আত্মীয় স্বজনরা বিপুল যন্ত্রণা নিয়ে কেঁদে ওঠে। তাদের অর্থাৎ সব হারানো মানুষের কান্নার ধ্বনি ভাগ্যবান ব্যক্তিরা শুনতে পান না। কর্তা ব্যাক্তিরা মনে করেন, তাদের ইচ্ছা মতোই সব কিছু চলবে। মানুষের মন অপমান যন্ত্রণায় আরো ব্যাথিত হয়ে ওঠে যখন তারা দেখতে পায়, সেদিন যারা আমাদের দেশের গ্রামে গ্রামে গণহত্যায় পাকিস্তানি সেনাদের সাহায্য সহযোগিতা করেছিল কিংবা পাকিস্তানি সেনাদের আমন্ত্রণ নিমন্ত্রণ করে আমাদের এই দেশের গ্রামগঞ্জের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট করে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল, তাদের আত্মীয় স্বজনরা যখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী বর্তমান সরকারি দলে ভালো পদবী নিয়ে স্থান করে নেয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আহত নিহত মানুষের আত্মীয়-স্বজনরা ভাগ্যকে দোষ দিয়ে কেবল ক্রন্দন করতে পারে। এছাড়া তাদের আর কি করার আছে।

আমরা দেশবাসী চাইবো, যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, সম্পদ হারিয়েছেন, মান-সম্মান হারিয়েছেন কিংবা যারা নিজেদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশমাতৃকার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তাদের যেন সঠিক মূল্যায়ন করা হয়। এই সব মুক্তিযোদ্ধাদের কিংবা সব হারানো মানুষেকে যেন পথে ঘাটে, অফিস আদালতে অপমানিত হতে না হয়। সেদিকে বর্তমান সরকারি দলকে অবশ্যই যথাযথ ভাবে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

কেননা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল। তাদের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা কিছুতেই অবহেলা পেতে পারেন না কিংবা সহ্য করতেও পারবেন না। তাই পরিশেষে বলতে চাই, হবিগঞ্জ জেলার লাখাই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে ১৯৭১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশের সহযোগী দোসরদের হাতে নিহত আহত মানুষকে যেন সঠিক মূল্যায়ন করে তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ওঠে। সেদিকে সবারই দৃষ্টি দেয়া উচিত। তবে দায়িত্বটা বর্তমান সরকারেরই বেশি। তাতে পরবর্তী প্রজন্ম আশার আলো দেখতে পাবে।

লেখক: আইনজীবি, কবি ও গল্পকার।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close