• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও কিছু কথা

প্রকাশ:  ১৪ অক্টোবর ২০২০, ২০:৩৭
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল। ফাইল ছবি

ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া চার শিশুকে বিচারিক আদালতের আদেশে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর পর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তা প্রচার হলে মহামান্য হাইর্কোটের নজরে আসলে বিচারপতি মোঃ মজিবুর মিয়া ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের ভার্চুয়াল হাইর্কোটের বেঞ্চ চার শিশুর জামিনের আবেদন নিষ্পত্তির আদেশ দেন। একই সঙ্গে চার শিশুকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোবাসের মাধ্যমে তাদের বাড়ি পৌঁছে দিতে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালতের আদেশে।

এদিকে চার শিশুকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যাখ্যা দিতে বরিশালের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম এনায়েত উল্লাকে হাইর্কোটে হাজির হতে বলা হয়। ঘটনার বিবরণ ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন শিশুটির বাবা। বাদীর ভাষ্যমতে আসামি চার শিশুর মধ্যে একজনের বয়স এগার বাকী তিন জনের বয়স দশ।

জানা যায় যে, মামলা পাওয়ার পর পুলিশ চার শিশুকে গ্রেপ্তার করে বাকেরগঞ্জ জ্যেষ্ঠ বিচারিক আদালতে সোর্পদ করে। যতটুকু জানা যায় যে, চার শিশুর বাবার সাথে বাদীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চরম বিরোধ থাকায় চার শিশুর পরিবারের লোকজনকে শায়েস্তা করার জন্য এই মামলা দায়ের করা হয়। এই গেল একটি ঘটনা।

অন্য এক সংবাদ ভাষ্যে বলা হয় যে, এক মহিলার সঙ্গে চার যুবকের যৌন কর্ম করার জন্য দুই হাজার টাকায় চুক্তি হয়। কিন্তু চার যুবক তাদের যৌন তৃষ্ণা মেটাবার পর চুক্তিমত টাকা না দেয়ায় সংশ্লিষ্ট মহিলা চার যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। তার মধ্যে পুলিশ সংশ্লিষ্ট চার যুবকের একজনকে গ্রেপ্তার করে। বাকীরা পালিয়ে যায়।

সংবাদ ভাষ্যমতে বাকীদের গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমাদের দেশে আইন প্রণেতারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম আইন প্রনয়ন করে থাকেন দেশের জনগনের জানমাল রক্ষার জন্য। অপরাধের বিনাশ ঘটানোর জন্য আইন প্রণেতারা তাদের সদিচ্ছা থেকেই আইন প্রনয়ন করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় প্রণীত আইন সাধারণ জনগনের উপকারে না এসে তা জনগনের জন্য ভয়াবহ উপদ্রব হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশের শিশু ও নারী নির্যাতন আইন করা হয়েছিল আমাদের দেশের নারীদেরকে বিভিন্ন নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনটি প্রকৃত নির্যাতিত নারীদের উপকারে আসেনি এই আইনের অপব্যবহারের জন্য।

এক ধরণের টাউট-বাটপাররা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য মিথ্যাবাদী সাজিয়ে লোকজনকে হয়রানী করার জন্যে এই আইনটিকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে। এমন অনেক কথাই শোনা যায় কোন ব্যক্তির সাথে হয়তো অন্য কোনো ব্যক্তির জায়গা জমি বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ রয়েছে। দেখা গেলো, রাস্তা থেকে কোন যৌনকর্মীকে তুলে এনে বাদীনি সাজিয়ে কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে দিলো।

দেখা যায়, নির্দোষ ব্যক্তিটি যৌনকর্মীর দায়ের করা মিথ্যা মামলার খেসারত দিচ্ছে। অর্থাৎ নির্দোষ ব্যক্তিটি জেল হাজত খাটছে। এমনও শোনা যায় এক ব্যক্তির সাথে অন্য ব্যাক্তির বিরোধ রয়েছে। এক পক্ষ অপর পক্ষকে দমন করার জন্য কিংবা তার সম্পদ আত্মসাত করার জন্য এক মাসের মধ্যে তিন থেকে চারটি নারী নির্যাতন মামলা দায়ের করে প্রতিপক্ষকে আপোসে আনতে বাধ্য করছে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই যখন আইনের ব্যবহার তখন আইন যতোই কঠিন করা হউক না কেন, তা দিয়ে প্রকৃত অপরাধীকে দমন করা যাবে বলে মনে হয় না। আমরাতো চোখের সামনেই দেখেছি মাদক নির্মূল করার জন্য দেশের মাঝে ক্রসফায়ার করে মাদক ব্যবসায়ী কিংবা অনেক মাদক বাহকদের হত্যা করা হলো। কিন্তু মাদক ব্যবসা কি কমেছে? সবাই অবশ্যই বলবেন, না কমে নাই। বরং ব্যবসার কিংবা বহনের নতুন নতুন কৌশল মাদক ব্যবসায়ীরা আবিষ্কার করে তাদের ব্যবসা ঠিকই চলিয়ে যাচ্ছে। এখন লাশের গাড়িতে করে মাদক পাচার হয়। এমনও সংবাদ আমরা খবরের কাগজে দেখতে পাই যে, মানুষ তার শরীরের ভিতরে করে মাদকদ্রব্য পাচার করতে থাকে। অনেক সময় হতভাগ্য পাচারকারী শরীরের ভিতরে মাদকদ্রব্য রেখে মাদকদ্রব্য পাচার করতে গিয়ে মারা যায়।

তাই দেখা যাচ্ছে ক্রসফায়ার মাদক ব্যবসাকে দমন করতে পারেনি। যতোই ক্রসফায়ার করা হউক না কেন রাঘব বোয়ালদের তাতে কিছু যায় আসেনা। কেননা তারা জানে অর্থাৎ রাঘব বোয়ালরা জানে ক্রসফায়ারে মারা পরবে বাহকরাই কেবল। তারা থাকবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাতে চুনোপুঁটিরা ক্রসফায়ারে পড়ুক না কেন, একটা মরলে আরেকটা পাওয়া যাবে। দেশে কি গরিবের অভাব পড়েছে।

দেশের মধ্যে চলমান নারী নির্যাতনের বিনাশ ঘটাতে হলে প্রথমেই আমাদেরকে চিত্তের শুদ্ধি সাধন করতে হবে। চিত্তের শুদ্ধি সাধন করতে গেলে আমাদেরকে অসৎ রাজনীতিবিদ, অসৎ পুলিশ কর্মকর্তা, অসৎ সংস্কৃতি কর্মী, অসৎ কবি ও সুশীল সমাজের অসৎ সুশীলদেরকে চিহ্নিত করে আমাদেরকে অবশ্যই যেকোন আইন প্রনয়নের চিন্তা ভাবনা করতে হবে।

প্রতিবেশী দেশে ধর্ষণের সাজা হিসাবে মৃত্যুদণ্ড প্রণয়ন করা হয়েছে। তাতে কি সেই দেশে ধর্ষণ কমেছে? বরং বেড়েছে। আমাদের এই ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করা হয় না। মেয়েদেরকে মিষ্টি জাতীয় খাদ্যের মত এক শ্রেণীর লোকজন মনে করে থাকেন। আরেক শ্রেণীর লোকজন মেয়েদেরকে মানুষ বলে গণ্য না করে বাজারের আলু বেগুন বা অন্যান্য পণ্যের মত পণ্য মনে করেন। এই মনে করাটা যে কেবল লেখা পড়া না জানা মানুষ মনে করে তা নয়। অনেক বড় বড় লেখাপড়া জানা জ্ঞানী ব্যক্তিরাও মেয়েদেরকে বাজারের পণ্যের মত কিংবা মিষ্টি জাতীয় খাদ্যের মত ভোগের সামগ্রী মনে করেন।

অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন সর্বোচ্চ আইন যদি প্রণীত না হয়, তাহলে কি ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধের বিনাশ হবে। যারা ভাবেন তারা হয়তো অপরাধের ভয়াবহ রূপ দেখে তা ভেবে থাকেন। যারা বাস্তব অবস্থার খবরা খবর রাখেন, তারা জানেন যদি ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রণীত হয়, তাহলে টাউট-বাটপারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করার জন্য এই আইনটিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করবে।

হয়তো পাশের বাড়ির সাথে হাঁস-মোরগ নিয়ে কোন লোকের ঝগড়া হলো, দেখা যাবে যার সাথে ঝগড়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এই দেশে ধর্ষণের মামলার বাদীনির অভাব হয় না। অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি অপরাধ না করেও সাজা ভোগ করে থাকে।

ধর্ষণের মত অপরাধকে নির্মূল করতে হলে প্রথমেই আমদের এক শ্রেণীর নেতাদেরকে সন্ত্রাসী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, ধর্ষকদের লালন-পালন করা বন্ধ করতে হবে। একটা কথা সবাই স্বীকার করবেন, আজকে যারা রাস্তায় রাস্তায় বখাটেপনা করে বেড়ায়, মেয়েদের ইভটিজিং করে, নিরীহ মানুষের ঘুম ভাঙ্গায় মাতলামি করে, যারা চাঁদাবাজি করে মানুষের শান্তি হরণ করে, কিংবা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা আমাদের দেশের কোন না কোন নেতাদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে থেকে তাদের অপকর্ম করে থাকে। কোন সন্ত্রাসী কিংবা কোন চাঁদাবাজ কিংবা কোন ধর্ষকের কিংবা কোন মাদক ব্যবসায়ীর অপকর্ম করে যাওয়া সম্ভব হবে না, যদি না তারা এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদের সুনিবিড় প্রশ্রয়ের ছায়া না পেয়ে থাকে।

কিন্তু আমরা দেখতে পাই এলাকার সন্ত্রাসী, চিহ্নিত ধর্ষক কিংবা সকল অপকর্মকারীরা এলাকার ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদের কিংবা জনপ্রতিনিধিদের সাথে সাথে ঘুরে বেড়ায়। সন্ত্রাসী-ধর্ষকরা বড় বড় নেতাদেরকে কিংবা জনপ্রতিনিধিদেরকে ফুলের তোঁড়া দিয়ে অভিনন্দন জানায়।

একটা সমাজের সন্ত্রাসী-ধর্ষকরা যদি এলাকার জনপ্রতিনিধি কিংবা এলাকার এক শ্রেণীর নেতাদের সাথে ঘুরে বেড়ায়, তখন কি আইন প্রণয়ন করে সম্ভব হবে অপরাধের বিনাশ ঘটানো। আমরা সংবাদপত্রে প্রায়ই দেখে থাকি বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসী, ধর্ষক, চাঁদাবাজরা মাথায় পরোয়ানা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পুলিশ তাদেরকে ধরে না। পুলিশকে আসামি ধরার কথা বললে বলবে আসামিকে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ এলাকার মানুষ বলে, সন্ত্রাসীরা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঠিকই এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। তারা একশ্রেণীর নেতাদের সভা-সমাবেশে যায়। এলাকার জনপ্রতিনিধিকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানায়। সেখানে ধর্ষণ কিংবা অন্য কোন অপরাধের বিচার চাইতে মানুষ কি সাহস পাবে?

যে ব্যবস্থায় দশ এগারো বছরের শিশুরা ধর্ষণ কিংবা অন্য কোন বড় বড় মামলার আসামি হয় কিংবা যে ব্যবস্থায় মহিলার সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে কিংবা পাশের বাড়ির লোকজনকে দমন করার জন্য ধর্ষণের মত মিথ্যা মামলার আসামি করা হয়, সেখানে কি সম্ভব প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা। বরং প্রকৃত অপরাধীরা ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড হলে এই আইনটিকে ব্যবহার করবে সাধারন মানুষকে নির্যাতন কিংবা ব্ল্যাকমেইল করার জন্য।

অনেকে বলছেন ধর্ষকের সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় জনগণ স্বস্তিতে আছে। হয়তো আপাতত মানুষের মনের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনের এই স্বস্তি যেন টাউট-বাটপারদের অপতৎপরতা দেখে শেষে আতঙ্ক হয়ে না আসে।

অনেক সহজ সরল মানুষ এই আইনের ভিকটিম হবে যা আমরা চলমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করলেই অনুধাবন করতে পারবো। সন্ত্রাসী ও চিহ্নিত ধর্ষকসহ অপরাধীদের কঠিন বিচার হউক, তা আমরা সকলেই চাই। কিন্তু আমরা কিছুতেই চাইবো না প্রণীত আইন দ্বারা অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলুক। সরকার অবশ্যই দেশের মানুষের ভালোর জন্য আইন প্রণয়ন করবেন। তবে আইন প্রণয়ন করার আগে এটাও চিন্তা করতে হবে প্রণীত আইন দ্বারা যাতে নির্দোষ সাধারণ মানুষ হয়রানীর শিকার না হয়।

লেখক: আইনজীবি, কবি ও গল্পকার

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close