• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

তারিক আলী দৃঢ় প্রত্যয়ে ভরা সত্য সুন্দরের চেতনার জ্বলন্ত মশাল

প্রকাশ:  ১২ অক্টোবর ২০২০, ২০:৫০
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল। ফাইল ছবি

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী মারা গেছেন। সংবাদটি শুনার পর থেকেই মনটা যেন কেমন করে উঠে। একে একে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকেরা চলে যাচ্ছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মৃত্যু সংবাদ শুনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সৃজনশীল লোকেরা অবশ্যই বলবেন, জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মৃত্যু প্রগতির জন্য বিরাট ক্ষতির ব্যাপার হয়ে গেল।

প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার ধারক বাহক জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য রেখে গেছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে ভরা সত্য সুন্দরের চেতনার জ্বলন্ত মশাল। যে মশালের প্রজ্জ্বলিত আলোক শিখার পবিত্রতাকে প্রগতিশীল চিন্তা চেতনার বাহকদেরকেই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

পত্রিকার ভাষ্যমতে জিয়াউদ্দিন তারিক আলী ২৩ ভাদ্র সোমবার ১৪২৭ বাংলা ইংরেজি ৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ সোমবার সকাল এগারোটায় বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল পঁচাত্তর বছর। রেখে গেছেন স্ত্রী, পুত্র-কন্যা সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী।

আলোর পথের যাত্রীরা মনে করেন তার চলে যাওয়ায় সুন্দরের পথের যাত্রীবাহী গাড়িটাকে যেন মাঝে পথে কেউ থামিয়ে দিতে না পারে, সে ব্যাপারে তার ভাব-শিষ্যদেরকেই সজাগ থাকতে হবে। কেননা আজকাল দেখা যায় অশুভ শক্তির ধারক বাহকরা আমাদের প্রগতির মশালকে নিভিয়ে দেয়ার জন্য বিশেষভাবে তৎপর হয়ে আছে। অশুভ শক্তির ধারক বাহকরা আজ ঘরে-বাইরে, এমনকি আপনদলের মধ্যেও লুকিয়ে থেকে আমাদের চরম ক্ষতি করে যাচ্ছে। জিয়া উদ্দিন তারিক আলীর গুনগ্রাহীরা মনে করেন, ওনার আরো অনেক বছর বাচাঁর প্রয়োজন ছিল প্রগতির লড়াইয়ের স্বার্থে। এখন সময় অন্যরকম। দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আমাদের সমস্ত অর্জন ধূলায় মিশিয়ে দিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে চায়। আমাদের চেতনার বিরোধীরা গলা তুলে কিংবা চোখ রাঙ্গিয়ে আমাদেরকে যখন গালমন্দ করতে চায়, তখনি প্রয়োজন জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মত সৎ ও প্রগতির চেতনায় নিবেদিত লোকদের। আমরা যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে থাকি, তাদের পরম বন্ধু ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী।

দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী লোকজন জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর শূন্যতা প্রতি মুহূর্তেই অনুভব করবেন। প্রয়াত জিয়াউদ্দিন তারিক আলী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। তার না ফেরার দেশে চলে যাওয়া অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে বিরাট শূন্যতাময় চিন্তার ব্যাপার হয়ে দেখা দেবে।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। ফাইল ছবি

প্রগতি বিরোধী লোকেরা তাকে পছন্দ করতেন না। পছন্দ করার কথাও নয়। কেননা তিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন যেমন নিজে দেখতেন এবং অন্যদেরকেও দেখতে বলতেন। যে ব্যক্তি নিজের শুভ চেতনায় শানিত হয়ে তার চেতনার আলোক রেখা সুন্দরের অভিপ্রায়ে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান, তাকে কি প্রতিক্রিয়াশীলরা ভালবাসতে পারে। নিশ্চয়ই কোন প্রগতি বিরোধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মত মানুষকে ভালবাসতে পারে না।

যারা রাজনৈতিক সচেতন তারা সকলেই জানে জিয়াউদ্দিন তারিক আলী গণমানুষের লোক ছিলেন। যেখানেই মানুষের ওপর অন্যায় হয়েছে, সেখানেই তিনি স্বতস্ফূর্ত ভাবে প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছেন। নিজে যেমন অন্যায় করেননি, ঠিক তেমনি ভাবে অন্যায়কে কখনো আশ্রয় প্রশ্রয় দেননি। এমন একজন সৎ মনোভাবাপন্ন সাদা মনের মানুষ যখন না ফেরার দেশে চলে যান, তখন আমাদের মত সাধারণ মানুষের মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে আগামী দিনের চিন্তায় মন প্রাণ অন্তর ভয়ার্ত হয়ে ওঠে। এমন প্রকৃতির মানুষ সামাজিক জীবনে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মনের গভীর গোপনে চিরদিন অম্লান হয়ে থাকেন। সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থেই জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মত মানুষকে বন্ধুর মত দেখে থাকে এবং আপন দলের লোক মনে করে সারা জীবন ভালবেসে যায়।

সংগীত পাগল মানুষ মাত্রই জানেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী গান পাগল মানুষ ছিলেন। সুরের দোলায় দোলে তিনি মানুষের মনের কথাগুলো সংগীতের সুরেলা সুরে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন। তার গানের মধ্যে সাধারন শ্রোতারা পেত তাদের মনের ভিতরের কথাগুলো। তিনি গানের লোক ছিলেন। তাই ১৯৭০-১৯৭১ সালে গণসংগীতের দলে যুক্ত হয়ে দেশ এবং জাতীর অধিকার নিয়ে রাজপথে গণমানুষের গান গেয়ে বেরিয়েছেন।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধকালে পথে প্রান্তরে বাধ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করে দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। তার গান শুনে দেশের আবাল-বৃদ্ধ-জনতা মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে অংশ গ্রহণ করেছে। তিনি গান গেয়ে যেমন পথে প্রান্তরে ঘুরে বেরিয়েছেন তেমনি করে দেশমাতৃকার টানে মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে, শরণার্তী ক্যাম্পে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং শরণার্থী ক্যাম্পের মানুষদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

দেশের জন্য এমন একজন মহৎ প্রাণ মানুষ ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। তিনি শুরু থেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অনেকের মত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। সংবাদপত্রের ভাষ্যমতে লিয়ার লেভিন ধারনকৃত সেই দলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ফুটেজ কয়েক দশক পর উদ্ধার করেন। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ এবং তাদের সঙ্গী ছিলেন। নিউজার্সিতে সেই সময় কর্মরত ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। তারেক মাসুদ নির্মাণ করেন মুক্তির গান প্রামাণ্য চিত্র। তারেক মাসুদের নির্মাণ করা প্রামাণ্য চিত্র মুক্তির গান সাধারণ মানুষের কাছে খুবই প্রশংসিত হয়।

তারেক মাসুদ নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র ‘মুক্তির গান’ দেশের মাঝে এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করে যে, যা দেখে সাধারণ মানুষের মাঝে বিশেষ করে, যুব সমাজের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরো ধারালো হয়ে ওঠে। তারেক মাসুদের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র ‘মুক্তির গানে’ মধ্যমণি ছিলেন জিয়া উদ্দিন তারিক আলী।

আজীবন বিপ্লবী সমাজ সেবক জিয়াউদ্দিন তারিক আলী সমাজের সর্বস্তরে চেয়েছেন সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব ঘটিয়ে মানুষকে সুন্দরের পথে নিয়ে যেতে। একথা বলার প্রয়োজন হয় না যে, তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতো চেয়েছেন গানে গানে সকল পিছু টানের বন্ধন ছিন্ন করতে। ছায়ানট থেকে শুরু করে বুলবুল ললিতকলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সহ বিভিন্ন সংগীত প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি লতার মতো জড়িয়ে থেকেছেন। তিনি সংগীতকে গণসংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছেন।

কাজ পাগল মানুষ কখনো কাজ ছাড়া থাকতে পারে না। জিয়াউদ্দিন তারিক আলীও একজন কাজ পাগল মানুষ ছিলেন। তিনিও কাজ ছাড়া থাকতে পারতেন না। সামাজিক আন্দোলন ছিল তার কর্মক্ষেত্রের আরেকটি দিক। তাই জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মৃত্যু আমাদের সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিরাট এক শূন্যতা নিয়ে আসবে।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর মত মানুষরা হলেন সৃজনশীল মানুষ। তাদের মত মানুষরা কেবল সৃজনের গান গেয়ে যান। সৃজনশীল মানুষরা হয়ে থাকেন হৃদয়বান। তাদের হৃদয়ের গভীর গোপনে খেলা করে কেবল মানুষের উন্নয়নের বিপ্লবী চিন্তা ভাবনা। কোন ধরনের নেতিবাচক চিন্তাকে সৃজনশীল মানুষেরা কখনো হৃদয়ের মধ্যে স্থান দেন না। ইতিবাচক চিন্তা ভাবনাকে নিয়ে তারা চলাফেরা করেন বলেই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন।

আমরা যদি চারিদিকে তাকাই তাহলে দেখব যারা সৃজনশীল মানুষ অর্থাৎ যারা নতুন কিছু সৃজন করে থাকেন, তারা সকল সময় ইতিবাচক চিন্তা চেতনাকে সকল ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিয়েছেন। জিয়াউদ্দিন তারিক আলী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে আপন সন্তানের মত গড়ে তুলেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ছিল তার ধ্যান জ্ঞান প্রেম। তিনি দেশের অসহায় অধিকারহীন মানুষকে যেমন ভালবাসতেন ঠিক ততটাই শ্রদ্ধা ও ভালবাসতেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের। আমাদের উচিত হবে জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর অসমাপ্ত কাজ তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে সমাপ্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের মধ্যে আরো দৃঢ় ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। তবেই তার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে আমরা নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবো এবং মানুষের মাঝে একাত্তর এর মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সকল ক্ষেত্রে মেলে ধরতে পারবো।

তাই পরিশেষে এ কথাই বলতে চাই, আমরা তখনই জিয়াউদ্দিন তারিক আলীকে তার যোগ্য সম্মান দিতে পারবো, যদি আমরা সকল লোভ লালসার ঊর্দ্ধে উঠে তার সকল প্রগতিশীল কর্মকে আপন সত্তা দিয়ে বিপ্লবী ভালবাসায় সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারবো।

লেখক: আইনজীবি, কবি ও গল্পকার।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close