• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

ধর্ষণকাণ্ড বন্ধে করণীয় কী?

প্রকাশ:  ০৮ অক্টোবর ২০২০, ২১:০৬
এইচ রহমান মিলু
এইচ রহমান মিলু

ধর্ষণ, পৃথিবীতে নতুন কোনো নাম নয়। বাংলাদেশে হঠাৎ মঙ্গলগ্রহ থেকে আসা কোনো বিষয় এটা নয়। মানতে কষ্ট হলেও, বিশ্বের কোনো দেশই ধর্ষণমুক্ত নয়, এটাই বাস্তবতা। হুজুগে না ভেসে আসুন একটু মগজে ভাসি।

ধর্ষণ মানেই শুধুমাত্র নারীরা ভুক্তভোগী, বিষয়টা তাও নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা ধর্ষণের শিকারর হচ্ছেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনা ঘটছে বেশি, যাতে করে সে ধর্ষককে শনাক্ত করতে না পারে। একবার যদি ধর্ষণের শিকার নারী, পুরুষ বা শিশুর জায়গায় নিজেকে ভাবি, তাহলে ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠতে বাধ্য। জেলখানায় এবং উন্নত বিশ্বে পুরুষের ধর্ষণের শিকার হবার ঘটনা বেশি।

আমেরিকার মতো উন্নত দেশে প্রতি ৬ জন নারীর একজন যেখানে ধর্ষণের স্বীকার হচ্ছেন সেখানে মোট ধর্ষণের অভিযোগের ৩০ শতাংশ পুরুষ ধর্ষিত হবার ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে সেই তুলনায় তা অনেক কম বলে খুশি হবার কোনো সুযোগ নেই। একটি ধর্ষণের ঘটনাও কাম্য নয় এবং তা অমানবিক।

ধর্ষণ বন্ধে বা ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে সরকারের কি করণীয় আছে তা যেমন মগজ দিয়ে ভাবতে হবে, তেমনি পরিবার ও সমাজের কি করণীয় তাও ভেবে দেখা জরুরি। কে কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে ধর্ষণ করবে তা আগাম যেমন বলা সম্ভব নয়, তেমনি ধর্ষণের ঘটনা আগাম বন্ধ করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। দুদিন আগে যে শ্বশুর তার পূত্রবধূকে ধর্ষণ করে গ্রেপ্তার হলেন, তার বিষয়ে কি তার সন্তান বা পরিবারের অন্য কেউ আগাম কিছু বুঝতে পেরেছিলো? পারেনি, কখনও তা সম্ভব নয়।

এখন আসুন ভেবে দেখি এখানে সরকারের কি করণীয় আছে। সরকারকে প্রথমত ধর্ষণের স্বীকার নারীটির পাশে এমনভাবে দাঁড়াতে হবে যেন তিনি আশ্বস্ত হতে পারেন যে আমার পাশে শক্ত একটি সাপোর্ট আছে। মেডিকেল টেস্ট ও চিকিৎসা, মামলা গ্রহণ এবং আসামি গ্রেপ্তার এই তিনটি কাজ সরকারের তরফ থেকে দ্রততম সময়ে এবং সরকারি খরচে করতে হবে।

এমন একটি আইন করতে হবে যেখানে মামলা রুজু করা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বিচারের রায় কার্যকর করতে সর্বোচ্চ এক বছর সময় লাগবে। ধর্ষণের স্বীকার বাদীর মামলার যাবতীয় খরচ সরকারকে বহন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকারের কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা তার লোক যদি ধর্ষণ ঘটনা ঘটায় তবে তাকে কোনো প্রকার ছাড় না দেওয়া হবে সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এতে করে স্বল্প সময়ে যদি ধর্ষক মৃত্যুদন্ডের মতো শাস্তি ভোগ করে, তবেই দেশে ধর্ষণের ঘটনা কমে যাবে।

আমাদের স্কুল-কলেজের কোথাও কোনো রকম নৈতিক শিক্ষার ক্লাস নেওয়া হয় না। আর একারনেই নৈতিক চরিত্র গঠনে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে আছি। এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে একটি নির্দেশনা আসতে হবে। ছোটবেলায় কোন বাবা মা এখন আর তাদের সম্তানকে বলেন না নারীদের সন্মান করো, কখনও তাদের বিপদের কারণ হবেনা, এখানে পারিবারিক শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। সমাজ এখনও ব্যাস্ত আছে তাদের সেই পোশাক আর নানা ধর্মীয় অপব্যাখ্যার ফতোয়া নিয়ে। যার ফলে সমাজ থেকে ভালো কিছু শিখতে পারছে না আমাদের সন্তানেরা।

আদর্শহীন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজ দলের ধর্ষকদের বাঁচাতে চেষ্টা করেছে, তেমনি মাদ্রাসার শিক্ষকের ধর্ষণ ঘটনা চাপা দিতে ব্যস্ত মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও একই দশা। এসবের পরিবর্তন না হলে সরকার এই দেশে ধর্ষণ বন্ধে কিছুই করতে পারবে না।

বিয়ের কথা বলে যৌনমিলন করে পরবর্তীতে বিয়ে না করবার কারণে ধর্ষণ মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের এক নেতার বিরুদ্ধে এবং অভিযোগ পাওয়া মাত্র কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করেছে সরকার। একই ঘটনা সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ঘটনার পরবর্তী পুলিশি পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এগুলো ভালো পদক্ষেপ ছিলো।

কিন্তু স্ববিরোধিতা দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা মামুন, ভিপি নুরু সহ ছয়জনের ক্ষেত্রে। এদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট মামলা থাকা সত্বেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্যদের বেলায় তদন্ত লাগলো না অথচ এই ছয় ধর্ষকের ক্ষেত্রে তদন্তের কেন প্রয়োজন হবে?

দেশে এখন ধর্ষণকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ে এবং সরকার পতন করে ক্ষমতায় যাবার জন্য রাজপথে নেমেছে বিএনপি-জামাত। অথচ এদের আমলে গণধর্ষণের স্বীকার হয়েছিলো কিশোরি পূর্ণিমা শীলসহ হাজার হাজার নারী। মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করেছে তারা। চিৎকার করে কেঁদে মা বলেছিলেন তোমরা একজন একজন করে এসো, আমার মেয়েটা ছোট, মরে যাবে।

কেউ কি বলতে পারবেন সেই ধর্ষকদের বিএনপি-জামাত সরকার কোনো বিচার করেছিলো কিনা? যখনই দেশের সাধারণ মানুষ একটি গণদাবিকে সামনে নিয়ে আন্দোলন করেছে, তখনই এসব সুবিধাবাদীরা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে মাঠে নেমে তা নস্যাৎ করে দিয়েছে।

আমার সোজা কথা, কারো বাসা বাড়িতে কে কাকে কখন ধর্ষণ করবে তা সরকার কেন কেউই বন্ধ করতে সক্ষম নয়। তবে ধর্ষককে গ্রেপ্তার এবং বিচারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে শাস্তির ব্যবস্থা সরকারের অবশ্যই কর্তব্য এবং তা তাকে নিশ্চিত করতেই হবে।

সুতরাং, ধর্ষণকে পুঁজি করে নোংরা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা না করে বরং সরকারকে বলুন আইনের কি কি সংষ্কার জরুরি। একটি খসড়া আইনের রুপরেখা দিন সরকারকে, তারপরে দেখুন সরকার তা গ্রহণ করছে কিনা। যদি যৌক্তিক প্রস্তাবনা থাকে আর সরকার তা মেনে না নেয়, তবে আপনাদের সাথে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আমিও সেদিন শামিল হবো।

মনে রাখবেন, এই সরকার এই দেশটাকে বিশ্বের একটি সম্মানজনক দেশে পরিণত করেছে। মানুষের জীবনের মান বাড়িয়েছে, দেশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে যা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুকরনীয়। সুতরাং দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববান একটি সরকারকে হুট করে বললেই বদল করা যায়না, এটা কোন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের দাবি হতে পারেনা।

এই দেশের ইতিহাসে একমাত্র এই সরকারই নিজ দলের পরিচয়ে ধর্ষণ ও অপরাধ করা ব্যক্তিদের সবার আগে গ্রেপ্তার করেছে, বিচারের মুখোমুখি করেছে। বিএনপি-জামাত সরকারের মতো নিজ দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ধর্ষণকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠোপোষকতা দেয়নি। তাই বলছি, হুজুগে নয় মগজে ভাবুন।

লেখক: সমাজকর্মী

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

এইচ রহমান মিলু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close