• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা নতুন অপরাধের জন্ম দেয়!

প্রকাশ:  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৪৬
মোঃ পলাশ খান

নারী ও শিশুদের প্রতি নৃশংসতা, ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরর্বতী হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার দোষ আমি শুধু প্রশাসনকে দিতে চাই না। কারণ প্রশাসন তখনই তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে সক্ষম হয় যখন সমাজের সচেতন মানুষ ও জনপ্রতিনিধিগণ সমাজকে অন্যায়-অবিচার মুক্ত রাখতে প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরর্বতী হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করে প্রকৃত অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপণ করা যেত তাহলে আমার জেলায় গত পাঁচ বছরে এতগুলো ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত হত না। নিম্নে আমি কয়েকটি ঘটনা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরছি।

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় ২০১৫ সালের ১১ মার্চ অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া চাঁদনী আক্তার হেনা নামক এক ছাত্রী স্কুল থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হয়। ১৩ মার্চ পরিত্যক্ত একটি খালের পাড়ে পাওয়া যায় তার ক্ষত-বিক্ষত লাশ। শরীয়তপুর জেলায় ইতোপূর্বে এতোটা নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। চাঁদনীর মুখের একপাশ একেবারেই নষ্ট করে দেয়া হয় এবং তার গোপনাঙ্গে শুকনো খরি ঢুকানো অবস্থায় পাওয়া যায়। ময়না তদন্তের রিপোর্টে জানা যায় তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে অজ্ঞাতনামা ও পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৯ জনসহ অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে মামলা করে চাঁদনীর পরিবার। পুলিশ তদন্ত শুরু করার কিছুদিন পর হঠাৎ অজ্ঞাত কারণে মামলার কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। পরে মামলার কাজ সমর্পণ করা হয় সিআইডি'র কাছে। শুরু হয় সিআইডির তদন্ত। অবশেষে ৪ বৎসরের মাথায় ২০১৯ সালে সিআইডির পক্ষ থেকে একটি চার্জশিট দেয়া হয়। মামলার মূল আসামির নাম বাদ দিয়ে নামকাওয়াস্তে একটি চার্জশিট দেওয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য আসামিরাও জামিনে বেড়িয়ে আসে । আর এখন এই মামলার সকল আসামি জামিন পেয়ে মুক্ত অবস্থায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর চাঁদনী হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আন্দোলন করা আন্দোলনকারীদের প্রতিনিয়ত হুমকি ধমকি দিচ্ছে।

২০১৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা ইউনিয়নের ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া রিমা আক্তার। ৩ দিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর একটি পরিত্যক্ত ভিটায় পাওয়া যায় রিমার ক্ষতবিক্ষত লাশ। সন্ত্রাসীরা ধর্ষণ করে ব্লেড দিয়ে পেট কেটে নৃশংস ভাবে হত্যা করে রিমাকে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট থেকে এসব তথ্য জানা যায়। হত্যাকারীদের আটক করতে প্রায় ১ বছর সময় লাগে প্রশাসনের। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৯ সালে চারজনের ফাঁসির রায় হয়, কিন্তু আজো তা কার্যকরের নাম গন্ধ নেই।

২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার চর মহিষ কান্দি এলাকার প্রাথমিক সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষার্থী তাসলিমা আক্তারকে ক্রমাগত ধর্ষণের পর অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়ায় গোপনে গর্ভপাত করানোর সময় তার মৃত্যু হয়। আজ ২০২০ সাল। দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রশাসন ধর্ষক ও হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি।

২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার আড়াচন্ডি এলাকায় দুই সন্তানের জননী ঝর্ণা আক্তারকে ধর্ষণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে যায় ঘাতকেরা। প্রশাসনের তৎপরতায় হত্যাকারীরা যথাসময়ে গ্রেফতার হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ৩ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও হত্যাকারীদের কোন প্রকার শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে বিচার বিভাগ।

২০১৮ সালের ১৯ মার্চ শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার জামাল মাদবর কান্দি এলাকায় ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া শিক্ষার্থী শ্যামলী আক্তারকে নিজ বাড়ির পিছনে ডোবা থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। ময়না তদন্তে উঠে আসে মৃত্যুর আগে সে গর্ববতী ছিল। আজও পর্যন্ত চার্জশীট প্রদান তো দূরের কথা হাত্যাকারীদের সনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি প্রশাসন।

২০১৮ সালের ২ মে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরভাগা এলাকায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হলেও আজ পর্যন্ত বিচারকার্য শেষ হয়নি।

২০১৮ সালের ১৫ মে শরীয়তপুরের আংগারিয়া এলাকায় খাদিজা বেগমকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোক কর্তৃক শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড় মূলনা এলাকার বাসিন্দা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রুবিনা আক্তার নিখোঁজ হয় এবং ২৫ শে সেপ্টেম্বর নিজ বাড়ির পিছন থেকে বিভৎস অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। মামলার অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হলেও ৩ মাস না যেতে না যেতেই সকল অভিযুক্ত জামিনে মুক্ত হয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসে।

উপরে আমি গত ৫ বছরে বাংলাদেশের মাত্র একটি জেলায় ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরলাম। সারাদেশে ঘটে যাওয়া জানা-অজানা এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের ঘটনার চিত্র তুলে ধরতে গেলে সংখ্যাটা কতটা ভারী হবে পাঠক তা বুঝতেই পারছেন আশা করি।

আমি মনে করি সেই ২০১৫ সালে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাণ্ডের সাথে জড়িতদের যদি তৎক্ষণাৎ শাস্তি বাস্তবায়ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপণ করা যেত তাহলে আজ মাত্র একটি জেলায় এতগুলো ঘটনার বিবরণ আমাদের দেখতে হত না। নারী ও শিশুদের সাথে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও ধর্ষণের বিচার কার্য যদি দ্রুত এবং কঠোরতর না হয় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সমাজের সচেতন নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিরা যদি প্রশাসনকে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে না পারে তবে এমনভাবে আরো বিস্তর ঘটনার স্বাক্ষী আমাদের হতে হবে।

মোঃ পলাশ খান

সদস্য সচিব, নারী নির্যাতন দমন চাঁদনী মঞ্চ

ই-মেইল: [email protected]


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

ধর্ষণ,বিচার
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close