• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

অগ্রজের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

প্রকাশ:  ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:৩৭ | আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:৪৩
এস. এম. আব্রাহাম লিংকন
আবু সালেহ মো. জহিরুল হক। ফাইল ছবি

আমরা যারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি তারা ভুক্তভোগী হিসেবে যেমন জানি, যারা এখানে পড়েননি তারাও জানতেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলবাদীদের ত্রাসের রাজত্বের কথা। ১৯৭৩ সালে রাজশাহীর সদর আসনের উপনির্বাচনে জাতীয় সংসদে বিজয়ী হয়েছিলেন জাসদের মাইনুদ্দিন আহমেদ মানিক। এর অর্থ এই ছিল না যে জাসদ এখানে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাকে অতিক্রম করেছিল বরং বলতে পারি জাসদের পক্ষে নিজেদের স্বার্থে অবস্থান নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মহল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ড. জোহা, শহীদ হবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আব্দুল কাইয়ুমের মতো আলোকিত মানুষের স্পর্শ ছিল, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সেখানে মৌলবাদীদের অঙ্কুরিত বীজ থেকে বড় বড় গাছও জন্ম নিয়েছিল। আমাদের দেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের অপসারণের দীর্ঘ আন্দোলন ও অনশন করার ইতিহাসটি বোধকরি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের উপাচার্য আব্দুল বারীর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন সেটির বড় উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

সম্পর্কিত খবর

    বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বৃহত্তর রাজশাহী জেলার ১৮টি সংসদীয় আসনের ১৫টি বিএনপি, ১টি মুসলিম লীগ ও মাত্র ২টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের মো. মোহসিন ও ইয়াজউদ্দিন প্রামানিক। ১৬টি আসনে নির্বাচিতদের হাত ধরে সমগ্র রাজশাহী মৌলবাদীদের রাজনীতির উর্বর ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। বেপরোয়াভাবে মাথাচারা দিয়ে ওঠে জামায়াত-শিবির। তারা সদালাপী ও সশস্ত্র রাজনীতি- এ দুটো ধারাকেই ধারণ করে পুরো রাজশাহীতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। সব দখলে নিতে পারলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ তারা নিতে পারেনি। তাদের মূল টার্গেট ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এটিকে তারা তাদের দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা নেয়। মৌলবাদীদের এ প্রচেষ্টার মাতবর হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যসহ একাধিক মৌলবাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক শিক্ষকও বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

    মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের অবদান ইতিহাসে স্মরণীয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ যেমন সামরিক স্বৈরাচারদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তেমনি সমান তালে লড়েছেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে। যে লড়াইয়ে অনেক ছাত্রের প্রাণ ও রক্ত ঝরেছে। এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পঁচাত্তরের পর বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও রাজনীতির সঙ্গে সমানতালে অবদান রেখেছিলেন একদল সাহসী তরুণ। যার একজন ছিলেন সদ্য প্রয়াত সাবেক আইন সচিব আবু সালেহ মো. জহিরুল ইসলাম। যিনি দুলাল নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন।

    আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাই তখন তিনি বিচারক জীবনে প্রবেশ করেছেন। তার সঙ্গে ক্যাম্পাসে পরিচিত হবার বা কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে একই ধারায় সামরিক স্বৈরাচার ও মৌলবাদবিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত থাকায় ক্যাম্পাসের অগ্রজদের সম্পর্কে নানা বিষয় অবগত হওয়ার সুযোগ পাই।

    এভাবেই তার সম্পর্কে আমার জানা হয়। মনে হতে থাকে যেন আমাদের সঙ্গে মতিহারের সবুজ ক্যাম্পাসে লড়াই করেছেন। তিনি আইন বিভাগের শুধু মেধাবী ছাত্রই ছিলেন না, রাজনীতিও তার মজ্জায় ছিল। আমি যে রাকসুর এজিএস নির্বাচিত হই তার আগের রাকসুর তিনি কমন রুম সম্পাদক ছিলেন। ওই রাকসুর নেতা ফজলে হোসেন বাদশাহ ভাই, জাহাঙ্গীর কবির রানা ভাই, শাহা আলম ভাই সবার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। বাদশাহ ভাইয়ের সঙ্গে এক মিছিলে হেঁটেছি, এক পুলিশের দাবাড় খেয়েছি।

    তাদের কাছে দুলাল ভাই সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছি। একটা কথা সবাই একবাক্যে বলতেন তিনি যেখানে উপস্থিত থাকতেন সে উপস্থিতির প্রাণসঞ্চারী হতেন তিনি। অন্যদের মনে হতো ছাত্র। সবাই তার বলা গল্প ও বক্তব্যকে এনজয় করতেন। সে কথাগুলোর অনেক পরে আমিও তার সঙ্গে পরিচিত হই। তার কাছে গেলে সময়গুলো যে কখন চলে যেত তা বুঝতেই পারতাম না। পৃথিবীখ্যাত ফেলানী হত্যা মামলায় আমাকে নিযুক্ত করার বেশ পরে তার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। আমি তার আগ থেকে জেলার প্রসিকিউটর। প্রথম দেখাতেই তিনি আমায় বলেছিলেন, তুমি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ হয়ে গেছো। তুমি বলো ভালো। আইনজীবী হিসেবেও নাম করেছ। তবে মনে রাখবে তুমি খুনির বিরুদ্ধে, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নও। কথাটি এখনও কানে বাজে। প্রথম দেখাতেই আপন হওয়া। যেন কত আগ থেকে কথা ও পরিচয়। এরপর বহুবার তার সঙ্গে নানা কাজে নানা সভায় দেখা হয়েছে। তার কথাবার্তায় আমি অনুভব করতাম তিনি বিভাগীয় অগ্রজই শুধু নন, আমার অভিভাবকও বটে। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু নয়, দেশের স্বাধীনতার চেতনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত মানুষ ছিলেন। আবার বহু মতপথের মানুষকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার দারুণ সক্ষমতাও তার ছিল।

    আমরা জানি আইন সচিবের পোস্টটি বিচার বিভাগ থেকে আসা ব্যক্তিদের থেকেই পূরণ করা হয়। এ বিভাগটির সচিবগণ খাঁটি আমলাতন্ত্র থেকে আগত নন। সংগত কারণে আমলাতন্ত্রের অন্য সচিবদের মতো মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তাদের থাকবে না। এই সুযোগটি আমলাতন্ত্রের অন্য বিভাগগুলো নিতে চাইলেও একাগ্রতা ও পারঙ্গমতা দিয়ে সকল সীমাবদ্ধতাকে তিনি এবং তার নেতৃত্বে সমসাময়িকরা সামলিয়ে উঠতে পেরেছেন।

    আমাদের আমলাতন্ত্র সব সময় সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হওয়ায় তারা সরকারপ্রধানের কাছাকাছি থাকেন। সরকারকে প্রভাবিত রাখার সক্ষমতা তাদের বহুভাবে প্রমানিত। উচ্চ ন্যায়ালয়ের নির্দেশ থাকার পরও তারা মাঝেমধ্যে চেষ্টা করেছেন অধস্তন বিচার বিভাগ ফিরে যাক আমলাতন্ত্রের হাতে। সে চেষ্টা সফল হয়নি সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভূমিকার কারণে। প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি অবিচল থেকেছেন।

    আবু সালেহ মো. জহিরুল হক দুলাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেও বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। তদানীন্তন প্রধান বিচারপতির কারণে নির্বাহী ও বিচারবিভাগের মুখোমুখি হওয়ার টালমাটাল সময়ে তিনি চরমতম সাহস নিয়ে লড়াই করেছিলেন। তার বর্ধিত চাকরির সময়সীমাকে বেআইনি করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তিনি তা আইনী পথে মোকাবেলা করেছিলেন। সেই দুর্দিনে তিনি মনোবল হারাননি। বরং সাহস নিয়ে অসম লড়াই করেছিলেন।

    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তার অসম্ভব ভালোবাসা ছিল। ২০১৭ সালে বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রাক্তন ছাত্র-শিক্ষককে এক করার অসম্ভব আয়োজনকে সফল করতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সাবেক ছাত্রনেতা মনোয়ারুল হক ভাই বাইরে মূল ফোকাসে থাকলেও তিনিই ছিলেন ভেতরের স্কেলিটন। তিনি একটি জায়গা ও ভবনের কথা ভেবেছিলেন। আমরা আইন বিভাগের ছাত্ররা তার সে অনুভূতিকে ধারণ ও সম্মান করতে পারিনি। নেতা হিসেবে প্রয়াত বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা ভাই প্রিয়পাত্র থাকলেও ফজলে হোসেন বাদশাহর প্রতি তার অসীম শ্রদ্ধা ছিল।

    আমার এলাকার একটি বড় উপকার তিনি করেছিলেন। আমাদের বর্তমান জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেসি আদালত ভবনটি যাতে বর্তমান স্থানে নির্মিত না হয়। সেটি যাতে কুড়িগ্রাম জজ কোর্ট ও কালেক্টরেট ভবনের মাঝে অবস্থিত নিউটাউন পার্কের পুকুরকে ভরাট করে নির্মিত হয় সে ধরনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন তদানীন্তন জেলা জজ। আমিসহ শহরবাসী ও আইনজীবী সমিতির অনেকেই পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে যাই। বর্তমানে নির্মিত এলাকাটিতেই যাতে আদালত ভবন হয় সে জন্য দৌড়ঝাঁপ করি। এক্ষেত্রে সাবেক আইন সচিব ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস, পরিবেশ সচিব মেছবাহ উল আলম এবং পরবর্তী সময়ে প্রয়াত দুলাল স্যার অনেক অবদান রাখেন। সর্বশেষ জুডিশিয়াল বিল্ডিং হবার পর আইনজীবীদের বসার স্থান ছিল না। তদানীন্তন জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. ফেরদৌস খান আমাদের জমি প্রদান করেন।

    সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন আইনজীবী ভবন তৈরি করতে প্রচলিত বাজেটের বাইরে সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমপি। অস্থায়ী ভবনের জন্য তখন পর্যন্ত সেই বরাদ্দ ছিল যে কোনো বার সমিতির জন্য সর্বোচ্চ। এটি পাওয়া অসম্ভব হতো যদি প্রয়াত দুলাল স্যার এবং বর্তমান আইন সচিব সারওয়ার স্যার (তখন বাজেটের দায়িত্বে ছিলেন) অর্থ ও প্রথাগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরতেন। এ ভবনটির নির্মাণের ফলে কুড়িগ্রাম শহরের নান্দনিক সৌন্দর্য পৃথক মর্যাদা পেয়েছে। যে কেউ এই এলাকাটি ঘুরে না গেলে তার কুড়িগ্রাম সফর অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

    প্রয়াত দুলাল স্যার আইনমন্ত্রীকে নিয়ে কুড়িগ্রামে আসতে চেয়েছিলেন এ কাজটি দেখতে। এও বলেছিলেন তিনি এলে উত্তরবঙ্গ জাদুঘর পরিভ্রমণ শেষে ব্রহ্মপুত্রের লাল রুই মাছ দিয়ে আমার বাসায় আহার করবেন। সে সব আর হলো না স্যার। আপনি আপন কর্মে বেঁচে থাকবেন বহুকাল।

    লেখক: আইনজীবী, সাবেক রাকসু নেতা ও সিনেট সদস্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

    পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

    এস. এম. আব্রাহাম লিংকন
    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    cdbl
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close