• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭
  • ||

ভাসানীসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকে স্বাগত জানান যারা!

প্রকাশ:  ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৩৪ | আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২০:৪৫
সোহেল সানি
সোহেল সানি

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সুকঠিন বাস্তবতা ছিল এই যে, বঙ্গবন্ধুর ঘরেবাইরে সর্বত্রই ছিল শত্রুদের সমারোহ। কিছু ঘনিষ্ঠ সহচর থাকলেও তারা ছিলেন কার্যত নির্বিকার। ভীতসন্ত্রস্ততায় কার্যত তারা জড়পদার্থ হয়ে যান। নিহত শিশুপুত্র শেখ রাসেলের আত্মচিৎকার যেখানে নেতাদের প্রতিবাদী করতে পারেনি সেখানে জনগণ কি করে ক্ষোভ প্রকাশ করবে? বরং জনগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা যেমন জাতীয় ইতিহাসের ট্রাজেডি। তেমনি খুনী বেষ্টিত হয়ে মন্ত্রীত্বগ্রহণ ও রাজনীতিকদের হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাওয়াটাও আরেকটা ট্রাজেডি। ভাসানীর মতো হত্যাকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দেন পূর্ব-পাক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, কাজী জাফর আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, দিলীপ বড়ুয়াদের মতো বামপন্থী কমিউনিস্ট দলগুলোও।

বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা হয়েও ভাসানীর পদধূলি নিতে ভোলেননি কখনো। বঙ্গবন্ধু মজলুম জননেতার অসুস্থতার খবরশুনে ছুটে গিয়েছিলেন সন্তোষে। রাষ্ট্রপতি এএসএম সায়েম ’৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন কিন্তু ভাসানী ’৭০ নির্বাচনের ন্যায় বিরোধীতা করে বলেন, ‘দেশের জনগণ এখন নির্বাচন চায় না।’ তিনি জেনারেল জিয়াকে আর্শীবাদ বার্তাও পাঠান। ’৭৬ সালেই ভাসানী ইন্তেকাল করেন। ন্যাপ ভাসানীর সাধারণ সম্পাদক স্বাধীনতা বিরোধী মশিউর রহমান যাদুমিয়া কারামুক্ত হয়ে জিয়ার মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করেন। ন্যাপ ভাসানীর নেতারা বিএনপিতে শামিল হন।

আতাউর রহমান খান বাকশাল-এ যোগ দিয়েছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধু তাকে লন্ডনে পাঠান চিকিৎসার জন্য। ৯ আগস্ট আতাউর রহমান খানের দু’মেয়েকে গণভবনে ডেকে চিকিৎসার খোঁজ খবরও নেন বঙ্গবন্ধু। সেই আতাউর রহমান খান বঙ্গবন্ধু হত্যাকে স্বাগত জানান। ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনকালে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে অনন্য সাধারণ ভুমিকা রেখেছিলেন আমেনা বেগম। তিনিও বঙ্গবন্ধু হত্যার পক্ষে বিবৃতি দেন। বিবৃতির তালিকায় মাক্সবাদী-লেলিনবাদী সাম্যবাদী দলের নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা-দিলীপ বড়ুয়ার নামও অগ্রগণ্য।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকে সমর্থন করে জাসদ ক্ষমতাদখল করতে চেয়েছিলো। কারামুক্ত জাসদ সভাপতি মেজর (অবঃ) এমএ জলিল, সাধারণ সম্পাদক আসম আব্দুর রব রাতারাতি বঙ্গবন্ধুকে স্বৈরাচারী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান বলা শুরু করেন। জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও হাসানুল হক ইনুর গণবাহিনী ৭ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের নায়ক খালেদ মোশাররফকে হত্যা করেন। কিন্তু জেনারেল জিয়া জাসদের ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। তাহেরকে দেন ফাঁসি। মেজর জলিল ও আবু ইউসুফ খানকে যাবজ্জীবন ও সিরাজুল আলম খান, আসম রব, হাসানুল হক ইনুকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেয় জিয়ার সামরিক আদালত।

নেতারা বিবৃতিতে যা বলেছিলেন

মওলানা ভাসানী বিবৃতিতে বলেন, ‘‘১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের পরিবর্তন অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সচলতার ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের শুভ সূচনা করেছে।’’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরবর্তী চারবছরকে কুশাসন, হানাহানি ও দুর্নীতির বছর হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। ’৭৬ সালের ১৩ ও ১৮ সেপ্টেম্বরে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয় ভাসানীর ওই বিবৃতি। তিনি ’৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মারা যান।

আতাউর রহমান খান বলেন, ‘‘১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থান ছিল অবশ্যম্ভাবী। গণতন্ত্র উত্তরণে যা সহায়ক হয়েছে।’’ জেনারেল জিয়া হত্যার পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দল থেকে বেরিয়ে জেনারেল এরশাদের প্রধানমন্ত্রী হন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সরকারের এই মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান। রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে সংলাপে বসতে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়া তাকে দেখে ‘জাতীয় বেঈমান’ বলে বৈঠক স্থান ত্যাগ করেন।

জাতীয় দলের আহবায়ক ও আওয়ামী লীগের এককালীন মহিলা সম্পাদিকা আমেনা বেগম বঙ্গবন্ধু হত্যাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “১৫ আগস্ট মানব ইতিহাসের জঘন্যতম স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটায়।’’ ১৫ আগস্টকে দেশের গণমানুষ স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে অভিনন্দন জানায় বলেও দাবী করেন তিনি। ৩-৭ নভেম্বরের সময়কে প্রতি অভ্যুত্থান বলে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘‘সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশ দেশকে ভারতের চিরগোলামীর নিগড়ে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিলো। কিন্তু ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে তাকে পর্যদুস্ত করে ও সেনাবাহিনী সার্থকতার সঙ্গে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।’’

মোহাম্মদ তোয়াহা ও দিলীপ বড়ুয়ার সাম্যবাদী দল এক বিবৃতিতে বলে, ‘‘১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানে মুজিব উৎখাতকে আমরা স্বাগত জানাই। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান রুশ-ভারত চক্রকে প্রতিহত করেছে।’’ আওয়ামী লীগ, মনি সিং এর কমিউনিস্ট পার্টি, মোজাফফরের ন্যাপ এবং জাসদকে নিষিদ্ধ করারও দাবি জানায় দলটি। ’৭৬ সালের ৩১ অক্টোবর দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক খবরে দেখা যায় আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে এসে তোয়াহা বলেন, ‘‘১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের পরিবর্তনের পর প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছি।’’

’৭৬ সালের ৪ নভেম্বর ইউনাইটেড পিপলস পার্টি (পিপিপি) সাধারণ সম্পাদক কাজী জাফর আহমেদ বলেন, ‘‘১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাবার আকাঙ্খায় জনগণ অপেক্ষা করছে। এখন তা দেয়া হলে দেশের বুকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে।’’

কাজী জাফর বলেন, ‘‘প্রথম শত্রু তারা যারা জাতীয় বিশ্বাসঘাতক ফ্যাসিস্ট মুজিবের সহযোগী।’’ স্বাধীনতাত্তোর ন্যাপ সাধারণ সম্পাদক কাজী জাফর পিপিপি গঠন করে জেনারেল জিয়ার জাতীয়বাদী ফ্রন্টে যোগ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী হন। পরে এরশাদের প্রধানমন্ত্রীও হন। আবার এরশাদকে ত্যাগ করে পাল্টা জাতীয় পার্টিও গঠন করেন।

এরশাদের আরেক মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খান জাতীয় গণমুক্তি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন ’৭৬ সালের ২৮ নভেম্বর বলেন, ‘‘১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে দেশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলী বাংলাদেশের ওপর ভারত-রাশিয়ার শোষণ আধিপত্য শিথিল হয়।’’

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

পূর্বপশ্চিমবিডি/জেডআই

সোহেল সানি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close