• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

ত্যাগীদের খুঁজে খুঁজে মূল্যায়ন করছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা

প্রকাশ:  ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:২৩
রফিকুল ইসলাম রনি
রফিকুল ইসলাম রনি

সাহেদ করিম-পাপিয়াদের ভিড়ে যখন আসল আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে কোণঠাসা, কেউ কেউ অভিমানে রাজনীতি ছেড়ে দিচ্ছেন, কেউ নিষ্ক্রিয় হচ্ছেন তখন তাদের আশার মশাল জ্বালিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি কয়েকটি উপনির্বাচন ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শূন্য হওয়া ৫টি আসন নিয়ে গত রোববার আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভা হয়েছে। ওই সভায় ৫টি আসনেই দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে (সূত্র: কালের কণ্ঠ-১ এপ্রিল)। সংবাদটিতে শিরোনাম করা হয়েছে ‘পাঁচ উপনির্বাচনে নৌকার পাঁচ প্রার্থীই চুড়ান্ত।’ খবরটিতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনগুলোতে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে মাঠের সংগঠককে। এতে করে ত্যাগী নিবেদিতরা বিপুল উৎসাহিত হয়েছেন। ত্যাগীদের ঘাম, পরিশ্রম ও অবদান যে এখনো সাহেদ-পাপিয়াদের ভিড়ে শেষ হয়ে যায়নি সেটাই প্রমাণিত। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জননেতা মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে প্রয়াত নেতার ছেলে সাবেক এমপি প্রকৌশলী তানভির শাকিল জয়কে। জয়ের পেছনে স্থানীয় কাজীপুরবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। একইভাবে আরেক নিবেদিত, কর্মীপ্রাণ আজীবন সংগ্রামী নেত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে স্থানীয় নেতা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিব হাসানকে। হাবিব হাসান দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা স্থানীয়রাই এমনটা জানিয়েছেন। ’৭৫-র পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। জেলও খেটেছেন একাধিকবার। একইভাবে জেলা পর্যায়ে মাঠ কাঁপানো নেতা দুঃসময়ের কাণ্ডারি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ঈশ্বরদী থেকে বারবার নির্বাচিত এমপি প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর আসনে মনোননয়ন দেওয়া হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওই অঞ্চলের মুজিব বাহিনীর কমান্ডার পুরোনো ও পরীক্ষিত নেতা নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে। নুরুজ্জামান বিশ্বাস শুধু মুজিব বাহিনীর কমান্ডারই ছিলেন না, তিনি তিনবারের নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানও। নৌকা বা ধানের শীর্ষের প্রতীক নিয়ে এ দেশে অখ্যাত লোকও এমপি হয়েছেন। কিন্তু প্রতীক দুটি নির্বাচনে (সর্বশেষ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছিল) বিজয়ী হওয়া কঠিন ব্যাপার। জীবন সায়াহ্নে বঙ্গবন্ধুকন্যা দলের জন্য অবদান রাখায় তাকে মূল্যায়ন করছেন। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বিশ্বাসঘাতকতা না করলে বঙ্গবন্ধুকন্যার আকাশমতো জনপ্রিয়তা এবং ব্যক্তি ইমেজ কাজে লাগিয়ে নৌকা নিয়ে বিজয়ী হয়ে আইন প্রণেতা হতে যাচ্ছেন এমনটা দাবি অওয়ামী লীগের নিবেদিত কর্মীদের।

প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলমের মৃত্যুতে সে আসনে দলীয় মনেনায়ন দেওয়া হয়েছে পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ রানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন হেলালকে। তিনি বিগত বিএনপি জোট সরকারের আমলে দলের সমর্থন নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে দলীয় প্রতীক নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। বয়সেও বেশ প্রবীণ ব্যক্তি। এবার নৌকার মাঝি তিনি।

২ তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সংবাদে বলা হয়েছে, ‘নাজমা সমর্থকদের বিক্ষোভ আওয়ামী লীগ অফিসে, বিভিন্ন আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত।’ এতে বলা হয়েছে, ঢাকা-১৮ আসনে ৫৬ জনের প্রার্থী ভেতরে ছিলেন যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আকতারও। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তার কর্মী-সমর্থকরা দলীয় সভানেত্রীর অফিসে গিয়ে বিক্ষোভ করেছেন এবং নানা রকম স্লোগান দিয়েছেন। দুঃসময়ে ছাত্রলীগ করে উঠে আসা পোড় খাওয়া নাজমা এই বিদ্রোহ কার বিরুদ্ধে করলেন সে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ যারা দল করেন দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বা সবাই মেনে নেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনীতিক ক্যারিয়ারে নাজমা শেষ পেরেকটা সেদিন মেরেছেন কি না সময়ই সেটা বলে দেবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের খবরে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা-৫ আসনে তিন প্রার্থীর নাম রাখা হয়েছে তবে কাউকে চূড়ান্ত করা হয়নি। এই তিনজনের মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত এমপি গণমানুষের নেতা হাবিবুর রহমান মোল্লার বড় ছেলে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান সজল, যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু এবং ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবু আহমেদ মন্নাফী। তিনজনই মাঠের পোড় খাওয়া লোক। আওয়ামী লীগের অন্দরমহলের খবর হচ্ছে ঢাকার প্রবেশদ্বারখ্যাত ঢাকা-৫ আসনের মনোনয়ন স্থানীয়দেরই দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর পাওয়ার সম্ভাবনা কমে এসেছে। এখন লড়াই চলছে স্থানীয় দুই নেতা কাজী মনিরুল ইসলাম মনু এবং মশিউর রহমান সজলের মধ্যে। প্রয়াত হাবিবুর রহমান মোল্লা ছিলেন এই এলাকার গণমানুষের নেতা। প্রতিটি ঘরের হাঁড়ির খবর রাখতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ’৭৫-র পরবর্তী ঘরে ঘরে গিয়ে নৌকার কর্মী তৈরি করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে ৪বার এই এলাকা থেকে নৌকা নিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন, প্রয়াত হাবিবুর রহমানের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন! যেহেতু নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, সেহেতু দু-একদিনের মধ্যেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। স্থানীয়দের প্রশ্ন, মেজর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে আশির দশকে বৃহত্তর ডেমরা থানা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু হবেন নৌকার মাঝি নাকি ছাত্রলীগ-যুবলীগ শেষে আওয়ামী লীগের হাল ধরা মোল্লার ছেলে সজল! ঢাকার প্রবেশদ্বারখ্যাত আসনটিতে কাকে প্রার্থী করলে ভালো হবে সেটি ভালো করেই রপ্ত করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর কাছে সব ধরনের রিপোর্ট আছে। তিনি কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন না, নেবেনও না। এই আসনের স্থানীয়দের মধ্যে ভীষণ আকারে ইজম কাজ করে। মোল্লা পরিবারের নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক রয়েছে। সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধুকন্যার। বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী নবিউল্লাহ নবীর বিপরীতে কাকে দাঁড় করালে সহজেই বৈতরণী পাওয়া যাবে সে সিদ্ধান্ত নেবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

এ উপনির্বাচন ছাড়াও কিছুটা আগে ফিরে গেলে দেখা যাবে এমন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদেরকেই বেছে নিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যারা মন থেকে আওয়ামী লীগ করে তারা কিছু পাওয়ার আসায় করে না। তারা মানুষের কল্যাণেই রাজনীতি করে। যারা চাওয়া-পাওয়ার রাজনীতি করেন তারা অল্পতেই হতাশ হন। কেউ কেউ জার্সি খুলে অন্য জার্সি গায়ে দেন। কিন্তু সম্প্রতি চিত্র দেখে মনে হচ্ছে গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ এখন ব্যবসায়ীদের উপর ভর করছে। অথবা ব্যবসায়ীরা ক্ষমতার রাজনীতিতে ভালো করছে। কিন্তু ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হতে চলেছে। বর্তমানে ত্যাগী ও পুরোনো ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে মূল্যায়ন শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। করোনার কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের দিকে চোখ বুলালে দেখা যায় সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিমকে। আবার স্থগিত হওয়া সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন আরেক পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ খোরশেদ আলম সুজনকে। এর কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম-৮ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। এক সময়ে ফেনী কাঁপানো নেতা জয়নাল হাজারীকে গণভবনে ডেকে চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের নগদ সহায়তাই করেননি, তাকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী সূত্র মতে, সাহেদ করিম ও পাপিয়াদের হাত থেকে দলটাকে রক্ষা করে আওয়ামী লীগকে আওয়ামী লীগের হাতেই ফিরিয়ে দিতে চান বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া স্বাধীনতার নেত্বত্বদানকারী দলটিকে। সে কারণেই আগাছা-পরগাছামুক্ত করা শুরু করেছেন জাতির পিতার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

রফিকুল ইসলাম রনি
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close