• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা

প্রকাশ:  ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:২৪ | আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:৩০
এম আর ফারজানা

বিশ্বের মোট জনসংখ্যা অর্ধেক নারী। তাদের পদচারনা এখন সর্বক্ষেত্রে। নারী এখন আর ঘরে বসে নেই। জীবনের তাগিদে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করছে অবিরাম। সেটা শ্রমিক থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ে, সবখানে তাদের অবস্থান।

অপ্রিয় হলে সত্য একজন পুরুষ যতটা নির্ভয়ে কাজ করতে পারে সমাজে একজন নারী তা পারেনা। তাকে পারিপার্শ্বিকতার কথা চিন্তা করতে হয়। বিশেষ করে আমাদের এশিয়ার দেশগুলোতে। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি সামাজিক নিপীড়নের বেড়াজালে ঘুরপাক খায় প্রতিনিয়ত। নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে সর্বদা।

ক্ষমতার যে পর্যায়ে থাকুক না কেন তারা আক্রমনের শিকার হয় সহজেই। সেটা হতে পারে সেক্সুয়েল হেরেসম্যান্ট, হতে পারে অসৎ মানুষের দ্বারা নিগৃহীত, হতে পারে রাজনৈতিক হাতিয়ারের খুটি। অর্থাৎ একজন নারী দেশের যে পর্যায়ে কাজ করুক না কেন তাকে সর্বদা সতর্কতার সাথেই পথ চলতে হয়। তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয় তুমি নারী তাই তোমার পথ সীমাবদ্ধ।

আর চরিত্র হনন তো আছেই। একটু থেকে একটু এদিক-সেদিক হলেই চরিত্রে কালিমা লেপন করতে দ্বিধা করে না। কিন্তু উৎসুক হায়েনা তো বসেই থাকে চরিত্রের সার্টিফিকেট দেবার জন্য। অথচ এদের নিজেদের চরিত্রের ঠিক থাকে না।

আজকে নিউজে দেখলাম, দুর্বৃত্তের হামলায় আহত হয়েছে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার অবস্থা সকটাপন্ন। হাতুরি দিয়ে তার মাথায় এমনভাবে আঘাত করা হয়েছে যে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব না।

মাথার খুলির হাড় ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে। কি জঘন্য, কি নির্মম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু তিনি নন তার বাবা তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলে তাকে ও আহত করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে এমন একজন কর্মকতার জন্য সরকারী বাসভবনে সিকিউরিটি গার্ড বা পুলিশের নিরাপত্তার বেষ্টনী নাই কেন? কেন তার নিরাপত্তা এত দুর্বল। আজ যদি কড়া সিকিউরিটি বেষ্টনীর মধ্যে থাকত তাহলে এমন ঘটনা ঘটত না। এর দায়ভার এখন কি প্রশাসন এড়াতে পারবে?

আমাদের সমাজে একটা মেয়ে এমনিতেই অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। সেখানে মেধাবী হলে, সাহসী, সৎ হলে তো আরো কঠিন অবস্থা হয় তার জন্য পথ চলা। সমাজের শিয়াল, কুকুর ওত পেতে থাকে কিভাবে তাকে হেনস্তা করা যায়। এখন তো আবার এমন এক পর্যায়ে সমাজ চলে গেছে কিছু হলেই আগে ধর্মটাকে টেনে নিয়ে আসে। একেকটা ঘটনা ঘটে কিছুদিন হৈ চৈ হয় আর চাপা পরে যায়। অন্য ইস্যু সামনে চলে আসে। এভাবেই চলছে।

সমাজের জন্য, দেশের জন্য সামগ্রিক উন্নয়ন করতে হলে নারীর যেমন ক্ষমতায়ন দরকার তেমনি নিরাপত্তা ও খুব প্রয়োজন । যাতে সে নির্ভয়ে কাজ করতে পারে। আজকে যে (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ঘটনা ঘটল তা দেখে অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজ করা মেয়েরা সাহস হারিয়ে ফেলবে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হবে। যে কোন সিদ্ধান্ত দিতে এক পা আগালে দুই পা পিছাবে। আর পরিবারের চাপ তো আছেই। কোন পিতামাতা নিশ্চয়ই চাইবে না তার সন্তান এমন পরিস্থিতির শিকার হোক। যাদের সন্তান দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে তারা কি আজ শঙ্কিত না? সমাজে এধরণের একটা ঘটনা প্রভাব ফেলে আরো অন্য দশজনের ওপর।

আরেকটা ব্যপার খেয়াল করে দেখলাম, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের উপর হামলাগুলো হচ্ছে বেশী । ইদানিং কোন ঘটনা ঘটলে তার গভীরে মর্ম মুল খুঁজলে দেখা যায় পরিবারটি মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোন না কোনভাবে জড়িত। তবে কি বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে কিংবা অলিখিত ভাবে জানিয়ে দেয়া হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার নিশ্চিহ্ন করে দাও।

১৯৭২ সালে রচিত আমাদের সংবিধানে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব নারীরা অবদান রেখেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সেসব নারীর পুর্নবাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নারী পুর্নবাসন বোর্ড গঠন করেন শেখ মুজিব সরকার। এরপর ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ। কিন্তু নারীদের অবস্থার খুব

কি একটা পরিবর্তন হয়েছে? কাগজে কলমে যতই সমান অধিকারের কথা বলা হোক না কেন বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটুকু তা সমাজের আয়নায় দেখা যায়।

একটা সমাজ সুন্দর হয় তখন, যখন পুরুষের পাশাপাশি নারী নির্দ্বিধায় কাজ করতে পারে। সমাজের উচ্চ পর্যায়ের কিছু নারী নিশ্চিত ভাবে কাজ করলেই তারমানে এই নয় সমাজ এগিয়েছে। আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্পীকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী।তাতে কি বলতে পারি নারীর ক্ষ্মতায়ন হয়েছে তারা নিরাপদ ভাবে কাজ করছে। অবশ্যই না। সমাজের সর্বস্তরের নারীরা যখন সানন্দে কাজ করবে, ঘর থেকে বাইরে পা ফেলবে নিঃসংকোচে, পরিবারে সাপোর্ট থাকবে যে কোন পরিস্থিতে তবেই বলা যাবে নারী এগিয়ে গেছে। আমরা যদি শুধু গার্মেন্টস নারী শ্রমিকদের দিকে তাকাই সেখানে হাজার হাজার নারী কাজ করছে, কিন্তু তাদের কি সেরকম নিরাপত্তা আছে? ঝুলন্ত বাসে করে, পায়ে হেটে হাজারও পুরুষের কালো হাতের থাবা খেয়ে কাজে যেতে হয়, কাজ করতে হয়। কয়জন আর তা প্রকাশ করে। বেশীর ভাগ চেপে যায় অযাচিত হয়রানী হবার ভয়ে। ভাবে কাজ তো যাবেই সাথে হেনস্তা, হয়রানী, সামাজিক কালিমা কপালে জুটবে। তাই চেপে যাওয়াই ভালো।

শিক্ষিত শ্রেণী কর্পোরেট লেবেলে ও একি অবস্থা। পর্দার আড়ালে কালো পশুর থাবা অনেকের শরীরে পড়লে ও তা চেপে যায় সমাজিকতার ভয়ে। দেখা যায় ঘটনা যাই ঘটুক না কেন শেষ পর্যন্ত ঐ নারীটির ওপর দোষ বর্তায়।

আজকে (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের অবস্থার জন্য প্রশাসন কি দায়ী না? যাকে দায়ী করিনা কেন তিনি কি আগের অবস্থানে ফিরে আসতে পারবেন? মনে হয় না। সুস্থ হলেও কতটা স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারবেন তা অনিশ্চিত। সবচেয়ে বড় কথা তার অবস্থা এতোটা সংকটাপন্ন যে কি হবে সামনে বলা মুশকিল। তবু আশাকরি তিনি সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরবেন। এমন পর্যায়ে যদি নিরাপত্তা না থাকে তাহলে কি মেয়েরা সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে পারবে? অনেকে বলবেন একটা ঘটনা দিয়ে বিচার করবেন না। আমি বলি ঐ একটা ঘটনা অন্যদের হতাশ করবে এ পথে আসার জন্য। ভাল কোন কাজ দেখে যেমন উৎসাহ পায় তেমনি খারাপ কাজ ও প্রভাব ফেলে সমাজের উপর। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে এতদূর এসে একটা মেয়ের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে অন্যরা কি করবে?

পরিশেষে বলব, এর থেকে উত্তরণের একটা উপায় হল আইনের মাধ্যমে অপরাধীর কঠোর শাস্তি। সমাজে এমন ঘটনা ঘটলে অপরাধীকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দ্রুতবিচারের মাধ্যমে তা সমাধান করা।

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে পারে এর থেকে উত্তরণের উপায়। একবার উদাহরণ তৈরী হলে অপরাধী দ্বিতীয়বার ভাববে অপরাধ করতে। হয়ত সন্ত্রাস,খুন, হেনস্তা একেবারে শেষ হয়ে যাবে না,তবে নিশ্চিত বলা যায় সঠিক বিচার হলে কমে আসবে অপরাধ। আর তখন সমাজের মানুষ ও প্রতিবাদ করতে সাহস পাবে অনায়াসে।

লেখক: এম আর ফারজানা, নিউ জার্সি থেকে।

ফারজানা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close