• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

‘বঙ্গবন্ধু হত্যা কমিশন’ গঠন সময়ের অনিবার্য দাবি

প্রকাশ:  ১৪ আগস্ট ২০২০, ০১:৪৩
সাইফুল আলম
সাইফুল আলম

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী

মেঘনা বহমান,

ততকাল রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান।’

-অন্নদাশঙ্কর রায়

বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে জাতিসত্তা’র অপর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কালের স্বর্ণাক্ষরে লেখা এই নামটিকে মুছে ফেলার জন্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিপথগামী যেসব সেনা সদস্য এক বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল বিচার করে তাদের ১২ জনের শাস্তির রায় দেয়া হয়েছে। কার্যকর করা হয়েছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কয়েকজনের ফাঁসির আদেশও। তবে বাঙালি জাতির ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার যে কেবল ১২ জন অপরাধীর শাস্তির মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সম্পন্ন হয়েছে এ কথা বলা সঙ্গত নয়।

আগস্ট শোকের মাস। প্রতি বছরই আমাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ মাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা করার ঘটনা ঘটেনি বরং এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল সমস্ত জাতির প্রাণভোমরাকে হত্যারই চেষ্টা বটে। বাঙালি জাতির স্বাধীন অভ্যুদয়কে অন্ধকারে ঢেকে দেবার সীমাহীন অপপ্রয়াস। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ঘটনাটি ছিল সুদূরপ্রসারী এক ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনার অংশ। এর সঙ্গে শুধুমাত্র ১২ জন অপরাধীই জড়িত ছিল না, জড়িত অপরাধীর সংখ্যা এখনও অশনাক্ত অনেক। এমন বহুস্তর বিশিষ্ট ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। একদল বিপথগামী প্রত্যক্ষভাবে ঘটিয়েছে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড। আরেক দল রচনা করেছে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো অনৈতিক দায়মুক্তির অধ্যাদেশ। প্রায় এর সমান্তরালে ঘটিয়ে চলেছে জেলখানায় চার নেতার হত্যাকাণ্ড। খুনিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমাজে পুরস্কৃত ও পুনর্বাসনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে অভিযাত্রা- রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সুফল বাঙালি জাতির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার অন্তর্নিহিত প্রত্যয়- তাকে থামিয়ে দিয়ে দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় তারা। তাই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের মধ্যে দিয়ে প্রাথমিকভাবে যে ১২ জনের শাস্তি হয়েছে তারা এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ওপরের মুখোশ মাত্র- এই মুখোশের অন্তরালে আরও যে সমস্ত মুখ লুকিয়ে ছিল- যারা এই ঘটনার নেপথ্যে থেকে ঘটাতে সহযোগিতা করেছে- হত্যাকাণ্ডের পর নানাভাবে সাক্ষ্য প্রমাণ ধামাচাপা দিয়ে চলেছে এবং এই হত্যা থেকে নিজেদের ফায়দা হাসিল করেছে- আজ বিচারের সময় এসেছে তাদেরও।

যাদের দায়িত্ব ছিল এ রকম একটি জঘন্য হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের। যাদের দায়িত্ব ছিল এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের বরং তারা নিজেরা নিষ্ক্রিয় থেকে, সমাজকে নিষ্ক্রিয় করে, বর্বর খুনিদের ফায়দা হাসিলের সমস্ত সুবিধা সম্পন্ন হতে দিয়েছে। এভাবে তারা কেবল একজন ব্যক্তির মানবাধিকারকেই কবর দেয়নি সমস্ত জাতির মৌলিক মানবাধিকারকে কবর দেবার কাজে শামিল হয়েছে।

শোকের মাস আগস্ট আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় বৎসরান্তে। তাই আমরা মনে করি, আজ সময় এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নেপথ্যের সেই সব খলনায়কদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার। প্রয়োজন ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড কমিশন’ গঠন করে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হাসিলের প্রয়াসে জড়িত অন্য খুনিদের বিচারের আওতায় আনার।

বাংলা ভাষার মহৎ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন-

‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে একদল অন্যায় করেছে আর একদল সে অন্যায়কে সহেছে, সমাজকে ব্ল্যাকমেইল করে আর একদল সে অপরাধ বহেছে-। এখন সেই অপরাধকে শেকড় থেকে উৎপাটনের প্রয়োজন তীব্রভাবে উপলব্ধি হচ্ছে। কেননা আগস্টের হত্যাকাণ্ড কেবল কোন ব্যক্তির ওপর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নয়, আগস্টের হত্যাকাণ্ড একটি জাতির জাতিসত্তা বিনাসের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। আজ সেই ষড়যন্ত্রকে সমূলে উৎপাটনের অন্য কোন বিকল্প নেই। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা কমিশন’ গঠন করে সে ষড়যন্ত্র উম্মোচন করা সময়ের অনিবার্য দাবি। এবারের আগস্টে আমরা সেই দাবিই উত্থাপন করছি বাংলাদেশের বিবেকের কাছে।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক যুগান্তর

সূত্র: দৈনিক সংবাদ

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,সাইফুল আলম
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close