• বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

করোনায় নয় বরং এর প্রভাবে...

প্রকাশ:  ৩০ জুলাই ২০২০, ১০:২৪
মনজুর রশীদ
মনজুর রশীদ

কিছুদিন আগে ফেসবুকে কোন এক বন্ধুর একটা পোস্ট পড়েছিলাম - যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এ লেখাটা লিখতে। করোনাকালীন এই দুঃসময়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিদিন শুধু মৃত্যুর খবর শুনছি। এই মৃত্যুগুলোর সবই কিন্তু করোনার কারণে নয়। মৃত ব্যক্তিদের গড়পড়তা বয়স ৩৫ থেকে শুরু করে ৫০/৫৫ বছরের মতো। তবে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশী। এদের অধিকাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জন সক্ষম ব্যক্তি। প্রায় সবার মৃত্যু আকস্মিক এবং বেশীরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে, কিন্তু আগে থেকে এরা কেউই হৃদরোগী ছিলেন না। এদের কাউকে করোনা স্পর্শ করেছে বলে শুনিনি।

এমন সুস্থ, সবল ও প্রাণবন্ত মানুষ - যারা নিয়মিত ব্যায়াম করতেন, হাঁটতেন, নিয়ম করে পরিমিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতেন, ধুমপান বা মাদকতো দূরের কথা বাইরের যে কোন খাবার গ্রহণে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন, তারা হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা যাবেন এ কথা কি ভাবা যায়? এসবের পিছনে নানারকম কারণ থাকতে পারে, তবে বর্তমান সময়ের অপ্রত্যাশিত আর্থিক অনিশ্চয়তা যে এর একটা অন্যতম প্রধান কারণ, তা সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যেতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিদায়ী প্রায় সবাই বিভিন্ন বেসরকারী অফিসে মোটামুটি বেশ ভালো চাকুরী করতেন, আর কেউ কেউ ব্যবসা করতেন। আর্থিকভাবে তারা স্বচ্ছল ছিলেন। ভালো ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন, বাচ্চারা ভালো স্কুলে লেখাপড়া করে। কিন্তু করোনার হঠাৎ আগমনে এদের সবার জীবন ওলট-পালট হয়ে গেছে। কেউ চাকুরী হারিয়েছেন, কারো বেতন বন্ধ, কারো তা কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেকে সারাক্ষণ আতঙ্কিত - কখন অফিস জানিয়ে দেয় অমুক দিন থেকে আপনার আর অফিসে আসার দরকার নেই।

ব্যবসায়ীদের অবস্থাও তথৈবৈচ। ব্যবসায়িক কারণে নেয়া অফিসের ভাড়া ঠিকই দিতে হচ্ছে, কিছু স্টাফও রাখতে হচ্ছে, ফ্যাক্টরী বন্ধ অথবা দীর্ঘদিনের লাভজনক ব্যবসা করোনার কারণে স্থবির হয়ে আছে, কিন্তু ব্যাংকের লোনের কিস্তি ঠিকই টানতে হচ্ছে। অথচ আয় বলতে গেলে শূণ্যের কোঠায়। এরা সবাই এ আকস্মিক আর্থিক পতনে ভীষণ বিপদগ্রস্ত। এ থেকে সহসা উত্তরণেরও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। এক ধরনের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত কেউ হঠাৎ এমন তীব্র আর্থিক বিপর্যয়ে পড়লে শরীর ও মনে তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। তার ওপর এদেরকে কোন আর্থিক প্রণোদনা বা মানসিক সহযোগিতা করারও তো কেউই নেই! সবাই ভাবে এরাতো বেশ আছেন!

অথচ এদের সবার আয় কমে গেছে বা নেই, কিন্তু খরচ বেড়েছে বৈ কমেনি। তাই এদের অনেকেই ছিলেন দিশেহারা। কেউ কেউ আবার দুশ্চিন্তা আড়াল করার জন্য পরিবার বা কাছের নিকটজনকেও এ বিপর্যয়ের কথা বলেননি। অনেকের আবার ইগোতেও লেগেছে। তার মতো মানুষ এমন দূর্দশার কথা অন্যকে জানাবে? তাই পুরো চাপ একাই বহন করে চলেছেন নিজের ভেতরে। পরিবার-পরিজনের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, যথারীতি হেসেছেনও বটে। কিন্তু সে হাসির পেছনে যে কি যন্ত্রণাময় বেদনা লুকিয়ে ছিলো তা কাউকে বুঝতে দেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ চাপ আর সইতে পারেননি। যার ফলে বুকের তীব্র ব্যথা হয়তো মারাত্মক হার্ট অ্য্যাটাকে পরিণত হয়ে এ ধরনের মৃত্যু ঘটছে। এ মৃত্যুগুলো যে কী ভয়াবহ কষ্টের, একটি সক্ষম পরিবারকে কয়েকদিনের ব্যবধানে যে কোথায় ঠেলে দিচ্ছে, সে খবর ক'জনাই রাখে!

তাই এ অবস্থায় টিকে থাকতে হলে আমাদের সনাতনী পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার কথা গুরুত্ব সহকারে ভাবা উচিত। যে কোন সমস্যা নিজেদের পরিবার বিশেষত ভাই-বোনের সাথে শেয়ার করুন। পরিবারের যে ভাই বা বোন বিপদে পড়েছে, তাঁকে অন্যরা আগলে রাখুন। টাকা গেলে টাকা আসবে। ভাই-বোন চলে গেলে তাকে কিন্তু আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না। রাগ-অভিমান থাকলেও এই কঠিন সময়ে সবাই এক ছাতার নীচে মানসিকভাবে আশ্রয় নেয়ার সময় এসেছে। সবাই সবার উষ্ণতা দিয়ে পরিবারের অন্যদেরকে রক্ষায় এগিয়ে আসুন।

যৌথ পরিবারের ধারণাটা সেকেলে মনে হলেও সেখানে ফিরে যাওয়ার কথা চিন্তা করা যেতেই পারে, অন্তত বর্তমানের বাস্তবতায়। পরিবারের সবার সম্মিলিত আয় যদি সবার কাজে লাগানো যায়, তাহলে সবাই উপকৃত হবে। একা কেবল নিজ পরিবারকে নিয়েতো অনেক থাকা হল, এবার না হয় একটু সেক্রিফাইজ করে সবাই মিলে থাকার চেষ্টা করতে অসুবিধা কি? স্থায়ী বেদনাকে আমন্ত্রণ জানানোর চেয়ে এটা কি একটা ভালো পদক্ষেপ হতে পারেনা? মনে রাখা দরকার, যে মেষশাবক পালছুট হয় - তারই কিন্তু বাঘের কবলে পড়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে!

সেইসাথে নিজের এই দুঃসময়ের কথা অতি কাছের বন্ধুদেরকেও বলুন। যেসব বন্ধুরা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে তাদেরকে সেই প্রবাদ কথাটার কথা মনে রাখা দরকার যে, বিপদের দিনেই প্রকৃত বন্ধু চেনা যায়। বিপদগ্রস্ত বন্ধুর পাশে দাড়ানো তাদের মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কতো বিখ্যাত ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও তো এ সময়ে বিদায় নিতে হল কতোটা নিঃসঙ্গ অবস্থায়। এতো অর্থকড়ি, সন্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি জীবন বাচাতে কোন কাজে আসেনি। তাই এসব ধনী বা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় থাকা বন্ধুরা একসাথে পাশে দাঁড়ালে বিপন্ন বন্ধুটি কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি ও সাহস ফিরে পাবে। ধনী বন্ধুরাও মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকবেন।

পরিবারের সবার মনে রাখা দরকার, যা কিছু দরকার সবকিছু নিশ্চিত করতে যিনি একা একাই লড়াই করে যাচ্ছেন সবাই মিলে তাকে স্বস্তি দিন, যত্ন করুন, মায়ায় ডুবিয়ে রাখুন। তিনি যাতে অতিরিক্ত মানসিক বা শারিরীক চাপে অবস্বাদগ্রস্ত হয়ে না পড়েন সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। তাকে হারিয়ে ফেললে জীবনের গতিধারা কোন দিকে ধাবিত হবে তা সময় হলেই টের পাবেন। কিছুক্ষণের বুক ব্যথায় যিনি মারা যাচ্ছেন, তা আসলে কিছুক্ষণের নয় - দিনের পর দিন বয়ে বেড়ানো ব্যথার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। অনিশ্চয়তার এ দীর্ঘ ব্যথার চাপ আসলে তিনি আর সহ্য করতে পারেননি। আগে থেকেই সবার সম্মিলিত দায়বদ্ধতার মুষ্টিবদ্ধ হাত তার বুকে রাখলেই কিন্তু এ ব্যথার অনেকটাই উপশম হতে পারে!

মনজুর রশীদ

সমাজ গবেষক ও বিশ্লেষক

৩০ জুলাই ২০২০।


পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

মনজুর রশীদ,করোনাভাইরাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close