• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭
  • ||

ওপারে অরুণ সেনের আত্মা শান্তি পাক

প্রকাশ:  ০৫ জুলাই ২০২০, ১৬:০৭ | আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২০, ১৬:১৩
এসকে মেহেদি হাসান

বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক ও গবেষক অরুণ সেন ২০০২ সালের সম্ভবত মার্চে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি অতিথি হয়েছিলেন নাট্যকার সেলিম আল দীনের বাসায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই দিন আমিও উপস্থিত ছিলাম তাঁর ডেড়ায়। বৈকালিক ভ্রমণ শেষে রাত অব্দি আড্ডা।

অরুণ সেনকে ঘিরে সেলিম স্যার, গালিব, মাদল, উল্লাস, রুবাইয়াৎ অনেকেই আসর মাতিয়ে তুলেছিল। অরুণ নামে আরও একজন তরুণ ছিল আমাদের আসরে। পারুল ভাবী তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, অরুণদা, ও আমার পুত্র। আড্ডার এক পর্যায়ে সেলিম স্যার নির্দেশ দিলেন, মেহেদী তুই থেকে যা, সকালে ঢাকায় যেতে হবে অরুণদার একটি কাজ আছে। আহার শেষে ড্রয়িং রুমে শুয়ে পড়ি বেতের খাটে। রাত সাড়ে তিন টায় আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। অরুণ স্যারকে দেখলাম আমার মাথার কাছে সোফায় বসে পড়ছেন। আমি মুখে জল দিয়ে বসলাম তাঁর পাশে। তিনি পড়া বাদ দিয়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন অনেকক্ষণ। সকালে নাস্তা সেরে আমাকে একটি রিপোর্ট দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার বরাবর। ওদিন বিকালে আবারও গিয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর। তারপরও অরুণ স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।

সেলিম আল দীন তখন নিমজ্জন নাটক লিখছেন। উল্লাস প্রতিদিন নাটকের পাণ্ডুলিপির পাঠ-উদ্ধার করেন। তার হাতের লেখা বইয়ের কম্পোজের মত সুন্দর। স্যার, কয়েক পাতা লেখে আবার ছিড়ে ফেলে। এক পর্যায়ে তৈরি হয় পাণ্ডুলিপি। বাচ্চু ভাই অরুণ সেনের সঙ্গে কথা বলেছেন, শিল্পী যোগেন চৌধুরী প্রচ্ছদ এঁকে পাঠাবেন। দিন যায়। সেলিম স্যার বিশাল আবেগ নিয়ে ফোন করেন, অরুণদা, প্রচ্ছদ তো এখনও পেলাম না।

কলকাতা থেকে প্রচ্ছদ এল। সঙ্গে আরও তিনটি ইলাস্ট্রেশন। সেলিম স্যারের সে কি উত্তেজনা। বাচ্চু ভাই, আফজাল ভাই, হিমু ভাইকে ফোন দিয়ে জানালেন। গালিব নিমজ্জন বই হিসেবে প্রকাশ করতে আগ্রহী। আমাদের উৎসব শুরু হলো। মনে পড়ে, গালিবের প্রকাশনীর নামটি নিয়ে অরুণ সেনের সঙ্গে বেশ আলাপ হয়েছিল। মাস দুই পর একদিন রাহমান পলাশ আর সোহেল হাসান গালিব বই ছেপে নিয়ে এলেন। সকালবেলা, আলী তখনও আসেনি। স্যার আমাকে রুটি গরম করতে বললেন। দেখলাম, স্যার নিমজ্জন হাতে নিয়ে মুখের কাছে নিয়ে শুখে দেখলেন। ভীষণ আনন্দিত। নিমিশেই আনন্দয় ভাটা পড়ল। কারণ প্রথম পাতায় দুটো বানান ভুল। তারপর কিচেন রুমে ঢুকে ধমকের সুরে বললেন, তাওয়া সরা। আমাদের চোখের সামনে নিমজ্জন বইয়ের কয়েক পাতা তিনি পুড়িয়ে দিলেন। আমরা আতঙ্কিত। পারুল ভাবী, কাজরী উঠে এলেন ড্রয়িং রুমে। পরেরটা ভাবী সামলে নিলেন। তিনি বললেন, ছাপায় ভুল হতেই পারে। প্রয়োজনে আবার ছাপা হবে। এমনি মায়ের ভূমিকা রেখেছেন তিনি, বহুবার।

সেলিম আল দীন নাই। পারুল ভাবী নাই। চলে গেলেন অরুণ সেন (১৯৩৬-২০২০)। পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের সাবেক শিক্ষক। খ্যাতিমান নন্দনতাত্ত্বিক। অনেক দিন ধরেই তাঁর লেখালেখি, আগ্রহর নানা ক্ষেত্রের সঙ্গে আমরা পরিচিত। বাংলাদেশের সমাজ ও সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়েও তাঁর চর্চা অনেককাল। বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর কয়েকটি বই: দুই বাঙালি, এক বাঙালি, বাংলা বই বাংলাদেশের বই, সেলিম আল দীন: নাট্যকারের স্বদেশ ও সমগ্র, দুই বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য। এ বিষয়ে তাঁর সম্পাদিত বই: বাঙালি ও বাংলাদেশ, দেশে বাংলাদেশে/বাঙালির আত্মসত্তার নির্মাণ, বাংলাদেশের নির্বাচিত উপন্যাস সংকলন, মোহাম্মদ রফিকের নির্বাচিত কবিতা ইত্যাদি।

প্রিয় অরুণ সেন, আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি। অশেষ শ্রদ্ধা।

পূর্বপশ্চিম-এনই

অরুণ সেন
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
cdbl
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close