• বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

আক্রান্ত না হওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ:  ০৩ জুলাই ২০২০, ১২:০০ | আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ১৪:২৮
ফারহানা নীলা

দেশে করোনা আক্রান্ত সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ালো। গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছেন ৩৮ জন।১৯২৬ মোট মৃত্যু। সনাক্ত বিবেচনায় মারা যাওয়ার হার ১.২৬%।২৪ ঘন্টায় মোট সনাক্ত ৪০১৯ জন। সারা বিশ্বে করোনা আক্রান্ত সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে। মারা গেছে পাঁচ লাখের বেশী।যুক্তরাষ্ট্রের আক্রান্ত সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছেই। বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ হচ্ছে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকমত না মানায় সংক্রমণ বাড়ছে।

বিএসএমএমইউতে কোভিড চিকিৎসার জন্য ২৭০ শয্যার ইউনিট চালু হচ্ছে। কেবিন ব্লকে এবং বেতার ভবনে শুরু হবে এই করোনা চিকিৎসা।

সংবাদ সম্মেলনে গ্লোব বায়োটেক করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রাথমিক ধাপে আছে বলে দাবী করেছে।৫-৭ মিলিয়ন টিকা তৈরীর প্রস্তুতি আছে তাদের। আমরা আশাবাদী হতে চাই। আমরা সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করি। এখনো মানবদেহে এই ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ শুরু হয়নি।আন্তর্জাতিক অনুমোদনের ধাপগুলো পার হতে হবে। মেমোরি সেল তৈরী হলে ভাইরাসের বিরূদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরে থাকবে।

মার্চ মাসের আট তারিখে কাজ শুরু হয়। কিট,ভ্যাকসিন এবং করোনার চিকিৎসার জন্য বায়োলজিক ওষুধের কাজ শুরু হয় একসাথে। প্রাণীদেহে আরো পরীক্ষা করতে ৬-৮ সপ্তাহ লাগবে। তারপর বিএমআরসির এথিকাল এপ্রুভালের জন্য আবেদন করবে। মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ হবে অনুমতি সাপেক্ষে। হিউম্যান ট্রায়ালের তিনটি ধাপ পেরোতে হবে। সেপ্টেম্বর নাগাদ আমরা কোনো আশার খবর পেতে পারি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য সবাই স্পাইক প্রোটিন টার্গেট করেই কাজ করছে। অক্সফোর্ডের ফেজ থ্রি ট্রায়াল প্রায় শেষের পথে।

আমাদের দেশের আবিষ্কারকে আমরা স্বাগত জানাই। চেষ্টা করছি আমরা, আমাদের গবেষণার জায়গা আছে, আমাদের এক ঝাঁক বিজ্ঞানী আছেন.... আমরা নিশ্চয়ই আশাবাদী। (সূত্র: একাত্তর জার্নাল)

আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে চারটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বলা হয়েছে, যে কেউ এই নম্বরে ফোন করে জানতে পারবেন কোন হাসপাতালে সিট খালি আছে,কোথায় আইসিইউ বেড খালি আছে। মানুষকে আর হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে হবে না।

গত কয়দিন আগেই লিখেছিলাম কল সেন্টারের মত একটা সেবা থাকলে মানুষকে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে হবে না। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে মানুষকে হতে হবে না অসহায়। কোন হাসপাতালে সিট খালি আছে, সেটা জেনেই রোগী তার গন্তব্য নির্ধারণ করে যাত্রা করতে পারবেন। আইসিইউর জন্যও ঘুরতে হবে না।করোনায় আক্রান্ত মানুষের জন্য এটা নিশ্চয়ই কিছুটা হলেও আশাব্যঞ্জক।

ভারতে সংক্রমণ সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। গত পাঁচদিনেই আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ। ১৪৪ ধারা জারি করেছে মুম্বাই। ভারতে সংক্রমণ বাড়ছেই। এটা আমাদের জন্যও উদ্বেগজনক।ভারতে করোনায় মারা গেছে ১৭৮৭৩ জন। নিউজিল্যান্ডকে করোনা মুক্ত ঘোষণা করার পরও বেড়েছে সংক্রমণ নতুন করে। সমালোচনার মুখে নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্য মন্ত্রীর পদত্যাগ।

কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের ছয় চিকিৎসক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার। সাধুবাদ জানাই।

এখন থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খোলা থাকবে দোকানপাট। জনাকীর্ণ এলাকায় কোরবানির হাট বসবে স্বাস্থ্য বিধি মেনে।রাত দশটা থেকে সকাল পাঁচটা পর্যন্ত চলাচলের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কোরবানি আমাদের ধর্মে ওয়াজিব। ওয়াজিব নিয়ে আমাদের ভাবনার কোনো পথ খোলা আছে কি?

আগামী ৪ঠা জুলাই থেকে ওয়ারী ২১ দিনের জন্য লক ডাউন হতে যাচ্ছে। পূর্ব রাজাবাজার লক ডাউন সফল হওয়ায় উঠে গেছে লক ডাউন। স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে বলা হয়েছে সবাইকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আজ বলেছেন সুস্থ হবার পর দ্বিতীয়বার পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। গতকাল থেকে করোনা টেস্ট করার জন্য ২০০( বুথে) এবং ৫০০(বাসায়) টাকা চার্জ নির্ধারন করা হয়েছে।দরিদ্র রোগীদের ক্ষেত্রে ফি মওকুফ হবে।লক্ষন উপসর্গ মুক্ত হলে চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টিনে থেকে তারা কাজে ফিরতে পারবেন।

সাধারণত ১১ দিন পর করোনা ভাইরাস আর ছড়ায় না। সেক্ষেত্রে চৌদ্দ দিন পর পরীক্ষা ছাড়াই কাজে ফেরা যাবে। চৌদ্দ দিন পর পজিটিভ পাওয়া গেলেও সেটা মৃত ভাইরাস। মৃত ভাইরাস কাউকে আক্রান্ত করে না।

প্যানডেমিকে কিটের সাশ্রয় করতে হবে। অযথা টেস্ট করা অপচয়।কিটের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বন্ধ করে যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সম্পূর্ণ নতুন ভাইরাসের ক্ষেত্রে নির্দেশনা পরিবর্তন হতেই পারে। এতদিন নেগেটিভ টেস্ট রিপোর্টের জন্য আবার টেস্ট করতে হতো। ২৭ মে WHO গাইডলাইনে দ্বিতীয় টেস্ট করার প্রয়োজন নেই বলেছে।

উপসর্গ চলে যাওয়ার ১০-১৪ দিন পর তিনি সুস্থ। উপসর্গহীন রোগী ১০-১৪ দিন পর পূর্ণ সুস্থ। তিনি আবার রোগ ছড়াবেন না।তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবেন।

প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ নিয়েও বিড়ম্বনার শেষ নেই। আমরা এন্টিবডি টাইটার না করে প্লাজমা থেরাপির সুফল পাবো না। শুরুতেই প্লাজমা থেরাপির দরকার নেই। আবার ভেন্টিলেটরে গেলেও সুফল পাওয়া যাবে না। চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন কখন প্লাজমা থেরাপির প্রয়োজন।

আমরা নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি দেখতে পারছি না। অতএব যেই প্লাজমা দেওয়া হলো,সেটা ভাইরাসকে কতটুকু নিউট্রালাইজ করতে পারছে? প্রশ্নটা থেকেই যায়। বাইন্ডিং এন্টিবডি দেখে খুব আশাবাদী হবার সুযোগ কতটুকু? তবুও ট্রায়াল হিসেবে প্লাজমা থেরাপির সাফল্য কম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপির জন্য ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে। কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপির জন্য ডোনারদের উদ্বুদ্ধ করার কাজ করছে অনেকেই।

প্লাজমা দানে ডোনারের কোনো ক্ষতি হবার ভয় নেই। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হবার পর মাসে দুবার প্লাজমা দান করতে পারেন। প্লাজমা রক্তের জলীয় অংশ। মেশিনের মাধ্যমে বাকী রক্ত শরীরে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ২৪-৪৮ ঘন্টার মধ্যেই এই প্লাজমা পূরণ হয়ে যায়।

করোনার সাথে বাঁচার কৌশল আমাদের এখন রপ্ত করে নিতে হবে। করোনার আগে আগেই আমাদের হাঁটতে হবে। যার যার সুরক্ষা তার তার...। আপনার সুরক্ষা আপনি নিশ্চিত করুন । আমার সুরক্ষা আমি নিশ্চিত করছি।

মাস্ক ছাড়া বাহিরে যাবেন না। সঠিকভাবে মাস্ক পরুন এবং খুলুন।যেখানে সেখানে ব্যবহৃত মাস্ক ফেলবেন না। কারণ মাস্ক থেকেই আবার ছড়াবে করোনা। মাস্কের উপর নীচ মাইক্রোপোর দিয়ে আটকে নিন। বাড়ী থেকে মাস্ক পরে যাবেন, বাড়ীতে এসেই খুলবেন। বারবার মাস্ক খুলবেন না। মাস্কে হাত দেবেন না। মাস্কে লেগে থাকা জীবানু আপনাকেই সংক্রমিত করবে।

বারবার সাবান পানিতে হাত ধোবেন। অফিসে হাত স্যানিটাইজ করুন। গ্লাভস পরলে, গ্লাভস স্যানিটাইজ করুন।

তিন থেকে ছয় ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন।

হাঁচি কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন।

অপ্রয়োজনে বাহিরে যাবেন না। নিজেই নিজেকে লক ডাউন করুন।

আক্রান্ত হলে বা সন্দেহ হলে আইসোলেশনে থাকুন। চৌদ্দ দিন নিজেকে ঘরবন্দী করুন। পারলে টেস্ট করিয়ে নিন। উপসর্গ আছে কিন্তু রিপোর্ট নেগেটিভ, আপনি করোনাকে মাথায় রাখুন।

শতকরা ৩০ শতাংশ নেগেটিভ রিপোর্ট আসতে পারে। তার মানে এই নয় যে আপনার উপসর্গ আছে, কিন্তু করোনা নেই.... এটা ভাবার অবকাশ নেই।যদিও পাগলের সুখ মনে মনে!

বাসায়ই থাকুন। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। পালস অক্সিমিটার দিয়ে অক্সিজেন মাত্রা দেখুন। অক্সিজেন মাত্রা ৯৩ এর নীচে নামলে হাসপাতালে ভর্তি হোন। অথবা শারীরিক অসুস্থতা বেশী মনে হলে, অন্য কোনো রোগ যেমন ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, ব্লাড প্রেসার,হার্ট ডিজিজ ইত্যাদি থাকলে হাসপাতালে ভর্তি হোন।

ভয় তো আগে নিশ্চয়ই পাননি। তাই আক্রান্ত হবার পর ভয় পাবেন না। পুষ্টিকর খাবার খান। নিজেকে চাঙ্গা রাখুন। কারণ পালাবার কোনো পথই খোলা নেই।

শতকরা আশি জন ঘরে চিকিৎসা নিয়েই সুস্থ হয়ে যাবেন। তবে আক্রান্ত না হওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

একমাত্র সচেতনতাই পারে আপনাকে জিতিয়ে দিতে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

পূর্বপশ্চিম-এনই

ফারহানা নীলা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close