• মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

করোনার চারমাস: হারিয়ে ফেলছি দেশের সূর্য সন্তানদের!

প্রকাশ:  ০২ জুলাই ২০২০, ২১:২০
মনজুর রশীদ

২০২০ এর কেবল ছয় মাস পেরিয়েছে। এ সময়টিতে শুধু বিশ্ব নয়, আমাদের সোনার বাংলাকে মারাত্মকভাবে তছনছ করে দিচ্ছে করোনাভাইরাসের আগ্রাসী আক্রমণ। প্রতিদিনই হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত ব্যক্তি আর মৃতের সংখ্যা। এই তালিকায় প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে বিলিয়নিয়ার, খ্যাতনামা ব্যক্তি, শিল্পপতি, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক, পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি সদস্য, সেনা সদস্য, ব্যবসায়ী, আমলা, ব্যাংক কর্মকর্তা, দুদক কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্বসহ সাধারণ মানুষ। তরুণ, যুবক, মধ্যবয়সী, প্রবীণ কেউ-ই বাদ যাচ্ছে না অদৃশ্য এই ভাইরাসের ছোবল থেকে। ইতিমধ্যে ঝরে গেছে অনেক প্রিয় মুখ, দেশ মাতৃকার জন্য নিবেদিত অনেক গুণী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। করোনার কারণে আগে থেকেই দূর্বল ব্যবস্থাপনার স্বাস্থ্যসেবায় ভয়ংকর ধ্বস নেমে আসায় একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা। করোনা আক্রান্ত রোগী ছাড়াও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত দেশের লক্ষ লক্ষ রোগীদের অনেকেই এ সময় কেবল চিকিৎসার অভাবেই মারা যাচ্ছে প্রতিদিন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিদিনের অনলাইন স্বাস্থ্য ব্রিফিংয়ে করোনায় আক্রান্ত, নিহত ও সুস্থ হয়ে ওঠার চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে শুরু থেকেই। করোনায় বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ ও প্রথম তিনজন নিহত হয় ১৮ মার্চ। তবে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় বিশিষ্টজনদের মধ্যে করোনা চিকিৎসক সিলেটে গরীবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ডা. মো. মঈন উদ্দিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিহত হন। অতঃপর একে একে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসারত অবস্থায় প্রাণ হারান।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরীর মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল বিদায় নিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ট্রান্সকম গ্রুপের মালিক শামীম লতিফুর রহমান। দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা যথাক্রমে প্রথম আলো ও ডেইলী ষ্টার এর মালিক এই ব্যবসায়ী সমাজে কেবল একজন ভালো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হিসাবেই পরিচিত ছিলেন না, ছিলেন সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ, সুশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত। তার মৃত্যু অবশ্য করোনাজনিত কারণে নয়। গত ২৫ জুন মারা যান ইসলা‌মিক ফাউন্ডেশনের সা‌বেক মহাপ‌রিচালক (ডিজি) শামীম মোহাম্মদ আফজাল। তি‌নি দীর্ঘ‌দিন দূরা‌রোগ‌্য ব‌্যাধি ক‌্যানসা‌রে ভুগ‌ছি‌লেন।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বদর উদ্দিন আহমদ কামরান মারা যান গত ১৫ জুনে। এর আগে গত ১৩ জুন করোনা সহ অন্যান্য রোগে মারা যান সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ নাসিম। এর পরের দিনই করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মো. আব্দুল্লাহ।

এর আগে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে মহান একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। একইসঙ্গে ভারত সরকার খুশী হয়ে তাকে পদ্মভূষণ পদক প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাবেক এমপি হাজী মকবুল হোসেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অ্যাপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর স্ত্রী সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী প্রিন্সিপাল নিলুফার মঞ্জুর করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়ের স্ত্রীও মারা গেছেন করোনার কারণে। একই ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত কোটি টাকার মালিক এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ড. নাজমুল করিম করোনায় মারা গেছেন। শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস (প্রা.) লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমামুল কবীর শান্ত করোনায় আক্রান্তের পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। খ্যাতিমান প্রকৌশলী জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী এপ্রিল মাসে রাজধানীর কলাবাগানের নিজ বাসায় ম্যাসিভ ‘হার্ট অ্যাটাকে’ ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পরে তার করোনা পরীক্ষায় পজেটিভ ধরা পড়ে। এসময় আমরা আরো হারিয়েছি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা’দত হুসাইন। তিনি অবশ্য করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেননি। সাবেক অর্থ এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব) আনোয়ারুল কবির তালুকদার করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। বিসিএস ২২তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা দুদক পরিচালক জালাল সাইফুর রহমান করোনায় মারা যান। সদ্য অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়া অতিরিক্ত সচিব তৌফিকুল আলম মারা গেছেন করোনায়। রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব বজলুল করিম চৌধুরী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবরিনা ইসলাম সুইটির।

স্কয়ার হাসপাতালের পরিচালক ও সুচিকিৎসক হিসাবে পরিচিত ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিফ হেমোটোলজিস্ট দেশের অন্যতম হেমাটোলজিস্ট এবং ল্যাবরেটরি মেডিসিন স্পেশালিষ্ট অধ্যাপক কর্নেল (অব.) মো. মনিরুজ্জামান, ইবনে সিনার রেডিওলজি বিভাগ প্রধান অধ্যাপক মেজর (অব.) আবুল মোকারিম মো. মহসিন উদ্দিন সহ করোনার সম্মুখ সারির আরো ৫০ জনেরও বেশী চিকিৎসক এখন পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

টিভি ব্যাক্তিত্ব, প্রযোজক, নাট্য নির্দেশক ও আবৃত্তিকার মোস্তফা কামাল সৈয়দ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। সাংবাদিক নেতা মোজাম্মেল হক, দৈনিক ভোরের কাগজের সাবেক সহকারী সম্পাদক ও এনটিভির সাবেক বার্তা সম্পাদক সুমন মাহমুদ, দৈনিক সময়ের আলোর নগর সম্পাদক হুমায়ুন কবীর খোকন, ভোরের কাগজের ক্রাইম রিপোর্টার গীতিকার আসলাম রহমান, সাবেক যুগ্ম সচিব, মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ইসহাক ভুইয়া, দৈনিক সময়ের আলোর মাহমুদুল হাকিম অপু, টেলিভিশন নৃত্যশিল্পী সংস্থার সাবেক সভাপতি নৃত্যশিল্পী হাসান ইমাম, এশিয়ান কারাতে ফেডারেশনের রেফারি, বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশনের সদস্য ও বাংলাদেশ আনসার কারাতে দলের কোচ হুমায়ুন কবীর জুয়েল সহ আরো অসংখ্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অল্প সময়ের ব্যবধানে করোনা আক্রান্ত হওয়ার কারণে আমরা হারিয়েছি। এই তালিকায় আরো বিশিষ্ট ব্যক্তি আছেন, যাদের নাম হয়তো তাৎক্ষনিকভাবে মনে পড়ছেনা বলে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত পুলিশের ৪৪ জন গর্বিত সদস্য করোনাযুদ্ধে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে জীবন উৎসর্গ করেছেন। এরইমধ্যে মোট আক্রান্ত প্রায় ১১ হাজারের দ্বারপ্রান্তে এবং সকল পেশার মধ্যে এককভাবে এই বাহিনীর সবচেয়ে বেশী সদস্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

এখনো এ ভাইরাস নানা বেশে আঘাত হেনেই চলেছে। কবে নিস্তার পাওয়া যাবে কেউ জানেনা। আমাদের মতো দেশ হারিয়ে যাওয়া এমন সব মেধাবীদের শূণ্যতা কিভাবে পূরণ করবে কারো জানা নেই! অথচ, এই মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিশেষজ্ঞদের দেয়া উপদেশগুলো কেনো গ্রহণ করা হচ্ছেনা তা বোধগম্য নয়। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে গঠিত টাস্কফোর্সের সদস্যরা প্রায়ই টিভির টকশোতে এসে এ নিয়ে বিষোদগার প্রকাশ করছেন। আমাদের নিকটবর্তী ও এশিয়ার কিছু দেশ যেমন মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম এসব দেশ থেকেও আমরা কোন শিক্ষা গ্রহণ করছিনা অদৃশ্য কোন কারণে। কিন্তু বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশের। বিশেষ করে আমরা যেভাবে দেশবরেণ্য বিশিষ্ট ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণী, পেশার মেধাবী মানুষদের ক্রমাগতভাবে হারাচ্ছি, সে করোনার কারণেই হোক বা না হোক - এই শূণ্যতা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক: উন্নয়ক গবেষক, সমাজ বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

মনজুর রশীদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close