• শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||

ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত নিজের চেষ্টায় বাঁচতে হবে

প্রকাশ:  ৩০ জুন ২০২০, ২২:২৩
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)

রুমি আপা আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রোকেয়া হলের বড় বোন, আমার ছেলের প্রাণ প্রিয় বন্ধু নান্দিকের মা। ছোট্ট মাত্র কয়েক মাস বয়সী নাতনীসহ রুমি আপাদের বাসার সবাই করোনা আক্রান্ত। কাল রুমি আপার সাথে কথা হলো। গত চার মাস কেউ বাসার বাইরে যাননি কিন্তু এসি সার্ভিসিং করার জন্য বাইরে থেকে লোক এসেছিল। সেই লোকের মাধ্যমেই সবাই করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। পরিচিত একজন ভাই বাজার করতে গিয়ে করোনা সংক্রমণের শিকার হয়েছেন। পরিচিত আরেকজন ভাবী কাজের জন্য ব্যাংকে গিয়ে করোনা নিয়ে ঘরে ফিরেছেন। অনেকে আবার ঘরে বসে থেকেই নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সাথে আসা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

করোনা শনাক্ত আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ নেতা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন দরিদ্র মানুষের সেবায় ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে। অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্যি করোনা মোকাবেলার জন্য বরাদ্দকৃত হাসপাতালের ডাক্তাররা আপেক্ষিক নন কোভিড হাসপাতালের ডাক্তারদের থেকে কম সংক্রমিত হচ্ছেন, কারণ একটাই সচেতনতা। ৪ মাসের অধিক কাল করোনা প্রতিদিন তার শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। সরকারি হিসেবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৪৮৩ জন আক্রান্ত। বেসরকারি হিসেবে অনেকের মতে এই হিসেবের ৪ গুণ বেশি হওয়ার শঙ্কা। জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মোশতাক হোসেন বলেছিলেন, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শনাক্তের সংখ্যার চেয়ে ১০ থেকে ৪০ গুণ বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ আরো এক মাস আগে বলেছেন আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশি আর একটি পর্যবেক্ষক দল কিছুদিন আগে বলেছেন কেবল ঢাকা শহরেই সাড়ে সাত লাখ এবং পুরো দেশে ৩০ লাখের অধিক লোক সংক্রমিত হয়েছে।

এই মত ভিন্নতারও কারণ আছে, সংক্রমিত মানুষের জন্য পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা কঠিন দুরূহ ব্যাপার। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা অপ্রতুল, হাসপাতালগুলো জায়গা দিতে পারছে না, আইসিইউতে সিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ। স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা দেখে ঢাকা শহরের সংক্রমিত অধিকাংশ মানুষ রোগ নির্ণিত হওয়ার আগেই কেবল মাত্র লক্ষণ দেখে বাসায় বসেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, অক্সিজেন নিচ্ছেন। কোনো রকম আশঙ্কা দেখা না দিলে, বাসায় বসেই বেশিরভাগ রোগী সেরেও যাচ্ছেন। গার্মেন্টস কর্মী, বস্তিবাসী স্বল্প আয়ের মানুষদের করোনা নিয়ে ভাবার বা চিন্তা করার সুযোগ কম, একমাত্র আল্লাহ্‌র উপরই ভরসা তাদের। জ্বর সর্দি কাশি করোনার সমগ্র উপসর্গ থাকার পরেও সাধারণ অ্যালার্জি এবং জ্বরের ওষুধ খেয়ে সেরে উঠছেন অনেকে। করোনা আতঙ্কে পুরো শহরটাকেই মৃত বলে ভ্রম হয়, সবার মাঝেই আতঙ্ক। কিন্তু ঘরে বসে থাকা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, কাজে বের হতেই হয়। যারা একদম ঘরে থাকেন তাদের অনেকের বাসার দারোয়ান, ড্রাইভার, কাজের বুয়া, খাদ্যদ্রব্য এবং ওষুধ সরবরাহের সাথে সবার অলক্ষ্যে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে করোনাও ঘরে ঢুকে যাচ্ছে।

জন্ম-মৃত্যু আল্লাহ্‌র হাতে কিন্তু এটাও সত্য বাসায় বসে থাকা সম্ভব নয়। অফিস বাদেও দৈনন্দিন কোনো না কোনো কাজে আমাদের বাইরে বের হতেই হচ্ছে। কিন্তু নিজেকে রক্ষার জন্য সাবধানে থাকতে হবে। মতিঝিলে আমার নিজের অফিসের দুতলার ব্যাংকে ৬ জন লোক করোনা আক্রান্ত, অনেক অবিবেচক মানুষ করোনা নিয়েই ঘুরাঘুরি করে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়, কেউ আবার অজানাতেই ছড়ায়। মগবাজারে বাসার চতুর্দিকে করোনা আক্রান্ত রোগীতে ভরপুর। আমি কেবল নিজস্ব দুটি এলাকার খবর জানি, কিন্তু এটা হয়তো পুরো দেশেরই চালচিত্র।

করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারে টানা তৃতীয় ট্রায়ালেও সফল হয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি করা ভ্যাকসিন। ফলে বৈশ্বিক এই মহামারি রুখতে বিশ্বের অন্যান্য ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারীদের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে গিয়েছে তারা। বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়াতে দাবি করেছে, সব ঠিক থাকলে জুলাই মাসের প্রথমেই অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন চলে আসতে পারে বাজারে।

এদিকে আরব আমিরাত ও চীনের যৌথভাবে তৈরি একটি ভ্যাকসিনেরও তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। এই গবেষণা করছে আমিরাত ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোস্পানি জি৪২ এবং চীনা কোম্পানি সিনোফার্ম গ্রুপ। প্রথম দুই ট্রায়ালে সাফল্য পেয়েছে এই ভ্যাকসিনও। অক্সফোর্ড ও অক্সফোর্ডের অধীনস্থ জেন্নার ইউনিভার্সিটির গবেষকদের ডিজাইন করা ভ্যাকসিন ক্যানডিডেটের চূড়ান্ত পর্যায়ের ট্রায়াল চলছে যুক্তরাজ্যে। দুটো ভ্যাকসিনই প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এদিকে লাদাখ সীমান্তকে ঘিরে চীন-ভারত চরম উত্তেজনা। চীন শুরুতে আমাদের দেশে ট্রায়ালের কথা বললেও এখনও পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। অপরদিকে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন পেতে হলে ভারতের সাথেও সুসম্পর্ক থাকতে হবে। আমরা কোন ভ্যাক্সিন কখন অর্থাৎ কতদিন আগে কিংবা পরে পাবো তার পুরোটাই আমাদের দেশের সাথে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক আর দক্ষতার উপর নির্ভর করছে।

তবুও আশায় থাকি, এই নিষ্প্রাণ শহর, জীবন আর জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, মানুষের অসহায় ভয়ার্ত মুখ ভালো লাগে না আর। একসময় ডাক্তারদের পিপিই, মাস্কের জন্য আমরা চিৎকার করেছি কিন্তু এখন পিপিই, চশমা আর মাস্কে বাজার সয়লাব। আপনার নিজের যথোপযুক্ত ব্যবহার করা চাই। সংক্রমণ এড়ানোর দায়িত্ব সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যকর্মীর সচেতনতা সৃষ্টির চেয়েও সব থেকে বেশি আপনার, কারণ তাদের কাছে আপনি বা আমি কেবলই একটি সংখ্যা কিন্তু আপনার নিজের এবং পরিবারের কাছে আপনিই পুরো পৃথিবী। বাসার বাইরে বের হওয়ার আগে কাপড়-চোপড়, ফ্যাশনসহ অন্য কোন চিন্তার আগে নিজেকে প্যাকেটে মুড়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। মনে মনে ভাবুন আপনার চারিপাশে করোনাভাইরাস কিলবিল করছে, আপনাকে ছুঁতে চাচ্ছে। সবার আগে নিজের সুস্থতা আর বেঁচে থাকা। করোনার ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতেই হবে। অবশ্যই মৃত্যুর চেয়ে জীবন অনেক বেশি সুন্দর এবং প্রত্যাশিত।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close