• শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

কোথায় যাবে মানুষ?

প্রকাশ:  ০২ জুন ২০২০, ২১:১৪
ফারহানা নীলা

পাবনা সরকারী এডওয়ার্ড কলেজের হোষ্টেল সুপারের বাসায় তখন থাকি আমরা। স্কুলেও ভর্তি হইনি তখনো। বিশাল মাঠে খেলা করি। জুঁই, পটা, নাহরিন আপা, কচি ভাই,শামীম আপা.... ভাইয়া, আমি। বয়সের ব্যবধান থাকলেও আমরা বন্ধু ছিলাম। শোভন তখন ছোট। আম্মার সাথে বিথী আপা আর নাসিম ভাইয়ের বিয়ে খেতে যাই। সব বন্ধুরা সেদিন সেই বিয়েতে অনেক মজা করেছিলাম।নাসিম ভাই আর বিথী আপা আব্বার ছাত্র, ছাত্রী।

নাসিম ভাইকে চিনি তখন থেকে.... মিছিল হলেই নাসিম ভাইকে দেখতাম।

আজ সন্ধ্যায় আমার নব্বই বছরের বাবাকে বললাম...

নাসিম ভাইয়ের করোনা হয়েছে। আব্বা বললো... আমার ছাত্র। তারপর চিন্তিত হলো আব্বা।

জি আমাদের সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকালই বেসরকারি এক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে। তিনি আইসিইউতে আছেন। এর আগে বিথী আপা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তিনি সুস্থ হয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। মাননীয় সাবেক মন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে জেনেছি। তাঁর আশু রোগমুক্তি কামনা করছি। মাননীয় ডিজি মহোদয় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন এবং কাজে যোগদান করেছেন। তিনি সিএমএইচে চিকিৎসা নিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলার পৌর কমিশনার এবং তাঁর স্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরপাক খেয়ে স্কয়ারে ভর্তি হয়েছেন। এমন করে কতজন ঘুরপাক খেয়ে চলেছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে।

হাসপাতালে সিট নেই। রোগী মেঝেতেও রাখতে হচ্ছে কোথাওবা। কোভিড নির্ধারিত হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই। তাহলে কোথায় যাবে মানুষ?

চেইন শপগুলোর কথাই যদি বলি! আড়ং, অঞ্জনস, কে ক্র্যাফট... কোনো একটা ব্রাঞ্চে গেলে পছন্দের পোশাকটি মাপ মত না থাকলে তারাই অন্য ব্রাঞ্চের সাথে যোগাযোগ করে জানিয়ে দেয় ক্রেতাকে কোথায় পাওয়া যাবে। এতে করে ক্রেতার ভোগান্তি কমে। তিনি আশ্বস্ত হয়ে সেই নির্দিষ্ট ব্রাঞ্চটার খোঁজ পেয়ে যান।

আমাদের কোভিড হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসার জন্য এরকম একটা ব্যবস্থা জরুরী হয়ে পড়েছে। সেন্ট্রাল ভাবে অথবা হাসপাতাল ভিত্তিক কোনো ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেমের ব্যবস্থা করতে পারলে রোগী বাসা থেকেই জেনে যাবেন কোথায় সিট খালি আছে। তিনি গন্তব্য জেনেই রওনা হতে পারবেন। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরতে হবে না। এতে আশংকা কমবে,রোগী চটজলদি চিকিৎসার আওতাধীন হতে পারবেন।সরকারী, বেসরকারী সব হাসপাতালকে নিয়েই এই ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সামর্থ্য বিবেচনা করে রোগীই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তিনি কোথায় চিকিৎসা সেবা নেবেন।

পথে পথে ঘুরে রোগীরাও নিরাপদ নন, সাধারণ মানুষও নিরাপদে থাকতে পারবেন না।

টেস্ট করা এখন সোনার হরিণ পাওয়ার মত। টেস্ট করার জায়গা গুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেস্ট করার জায়গা বন্ধ হয়ে গেছে। টেস্ট করতে গিয়ে আক্রান্ত হবার আশংকা আর ঝুঁকি..... এড়ানো যায় না। বিশাল লাইনে মানুষ..... টেস্ট করার জন্য।

এই মুহূর্তে এন্টিবডি টেস্ট করতে পারলে আমরা অফিসের নিরাপত্তা হয়তো নিশ্চিত করতে পারতাম। যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, এন্টিবডি তৈরী হয়ে গেছে।তাঁরা নিশ্চিন্তে অফিস করতেন। আর যারা আক্রান্ত হননি তারা ওয়ার্ক ফ্রম হোম... এন্টিবডি টেস্ট করে আমরা লাল, হলুদ, সবুজও বেছে নিতে পারতাম।

এন্টিবডি টেস্ট চিকিৎসার জন্য ব্যবহার না করলেও, মানুষকে কাজে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারবে। নির্বিঘ্নে মানুষ ফিরতে পারতো কাজে,ঘুরতো অর্থনীতির চাকা।

সামনে আরো রোগী বাড়বে। কত বাড়বে কেউ জানি না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটুকু সক্ষমতা রাখে এই ঝড় সামলাতে তাও জানি না। আমরা তো যাবতীয় দূর্বলতা নিয়েই যুদ্ধরত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ সকল জেলায় আইসিইউ খোলার এবং অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের আইসিইউ বিশেষজ্ঞ খুবই অপ্রতুল।

গাজীপুর মেডিকেল করোনা নির্ধারিত হাসপাতাল কিন্তু ওখানে খুবই কম রোগী ভর্তি আছেন। ডিজিটাল টেকনোলজি নিয়ে আমরা এই খবরটা কি রোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি? তাহলে সরাসরি তিনি গাজীপুরে চলে গেলেন এবং চিকিৎসা সেবা নিতে পারলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পতাকায় লাল, সবুজের বুকে হলুদ মানচিত্র ছিল। পরে হলুদ আর নেই। এখন কেবলই লাল সবুজ।

আক্রান্ত হবার সংখ্যা দেখে লাল,হলুদ আর সবুজ জোনে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে দেশকে।

নিউ নর্মাল লাইফ শুরু হয়েছে ৩১ মে থেকে। ধীরে ধীরে সব শুরু হচ্ছে।

গণপরিবহনের ভাড়া ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রেনের হুইসেল বেজেছে। লঞ্চ ছেড়ে গেছে ঘাট। বিমান উড়েছে আকাশে। শতকরা ২৫ শতাংশ অফিস করবেন বলে মাননীয় জন প্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন।

কিন্তু আমরা তো অবুঝ সন্তান এই দেশের! আমরা গত ৬৬ দিনেও সচেতনতা দেখাতে পারিনি। যার নয়ে হয় না, তার তো নব্বইয়েও হয় না! কথাটা আমাদের জন্যই বোধ করি প্রযোজ্য।

কেউ স্বাস্থ্য বিধি মানছে না। মাস্ক না পরলে জেল জরিমানার কথাও বলা হয়েছে। বাসগুলোতে ঠাসাঠাসি ভীড়।লঞ্চ গুলোতে উপচানো মানুষ।

শুধু বিমানে আর ট্রেনে বেশ নিয়মের কড়াকড়ি ছিল।

আজ যাত্রী না থাকায় কোনো বিমান ওড়েনি।

লাল,হলুদ আর সবুজ.... এই জোন ভাগ করে আমরা কতটা সক্ষম হবো করোনাকে আটকে দিতে? যদিও স্বপ্ন দেখি কোনো লাল,হলুদ জোন নেই। আমাদের কেবলই সবুজে বসবাস।

আজও একজন ডাক্তার মারা গেলেন। ডা মঞ্জুর রশিদ চৌধুরী, তিনি ইউরোলজিস্ট ছিলেন। কোভিড আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতি করুন।

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশীর দাফন হয়েছে আজ। তাঁরা সুন্দর জীবনের জন্য বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে দালালের খপ্পরে পড়ে মারা গেলেন। কোথাও কোনো ভাল খবর নেই। এই ২৬ বাংলাদেশীর পরিবারের মানসিক অবস্থা এখন কেমন? আমরা জানি না।

I Can't Breath....

আমেরিকার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। রাস্তায় রাস্তায় হাজারো মানুষ। সবাই একসাথে বলছে I can't breath. রেসিসিজম বা বর্ণবাদ কতটা প্রকট এখনো? করোনার থাবাও আমাদের পরিবর্তন করতে পারেনি।মৃত্যু সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে ওখানে। তবুও জর্জ ফ্লয়েডকে নয় মিনিট শ্বাস আটকে মারে ডেরেক।

সুরতহাল প্রতিবেদন বলেছে জর্জ শ্বাসকষ্টে মারা গেছে।

আচ্ছা করোনার শ্বাসকষ্ট আর জর্জের শ্বাসকষ্ট কি একই রকম ছিল?

করোনার বিভৎসতা কি এই বিভৎস চিন্তাচেতনাকে মারতে পেরেছে?

মন ভাল হয় না,মন ভাল থাকে না আর! আমরা ক্রমশ আঁধারে নিক্ষিপ্ত হই। আজ জুন মাসের দ্বিতীয় দিন। এই সপ্তাহের শেষের দিকে আমরা কোন চূড়ায় উঠতে যাচ্ছি জানি না।চূড়ার উচ্চতা কতদূর? আমরা আর উঠতে চাই না। আমরা মাটিতে নামতে চাই। মাটি ডাকছে আমাদের..... আমরা সমতলে যেতে চাই। আমরা সবুজে যেতে চাই।

ফারহানা নীলা

সহযোগী অধ্যাপক

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

(লেখকের ফেসবুক থেকে নেওয়া)

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

করোনাভাইরাস,ফারহানা নীলা,ফেসবুক স্ট্যাটাস
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close