• শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২০, ১৯ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

একজন আকন্দ ভাইকে

প্রকাশ:  ০১ জুন ২০২০, ২০:১৪ | আপডেট : ০১ জুন ২০২০, ২০:১৬
ফারহানা নীলা
ফারহানা নীলা

খুব ব্যস্ত হয়ে করিডোর দিয়ে ডিপার্টমেন্টের দিকে হাঁটছি। অফিসে পৌঁছাতে দেরী হয়ে গেছে। কাজ করি জাতীয় বক্ষব্যধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। হাসপাতালের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই আমি। চারিদিকে এত সবুজ। বিশাল হাসপাতাল, বিশাল করিডোর। থাকিও তখন হাসপাতাল কোয়ার্টারে। বাচ্চা দুটো ছোট তখন।

পেছন থেকে ডাক শুনি।... নীলা! নীলা দাঁড়াও। আকন্দ ভাই ডাকছেন। আজ তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি। কথাটা শুনে হাসতে হাসতে বলি সাদা কালো না রঙিন? উনি হাসেন। তারপর কাজের কথা শেষ করে ডিপার্টমেন্টে যাই।

আমাদের আকন্দ ভাই। ওয়াহিদুজ্জামান আকন্দ। তিনি বক্ষব্যধি বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁর আরেকটি পরিচয়, তিনি কবি ছিলেন। করোনা নিয়ে এই কয়দিন তিনি অনেক লিখেছেন। নিজেকে তিনি পবন মাঝি নামে ডাকতেন। মজা করে কথা বলতেন। ফেসবুকে সরব ছিলেন তিনি। তাঁকে অনেকেই কবি হিসেবে চেনেন।

দীর্ঘ তেইশ বছর বক্ষব্যধি হাসপাতালে কাজ করেছি। আকন্দ ভাইকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। তিনি কিছুদিন আমাদের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন। কোনো কাজ নিয়ে গেলে তিনি তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা করতেন। দীর্ঘ দিন তিনি মাল্টি ড্রাগ রেজিট্যান্স টিউবারকুলোসিস নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর হাতের লেখা ছিল অদ্ভুত সুন্দর।

ছোট মাছ খেতে পছন্দ করতেন, পছন্দ করতেন বাজার করতে। আর ভাবী বিরক্ত হতেন মাছ কুটতে... কথাগুলো উনার কাছেই শোনা। খুব একটা খারাপ সময় গেলো আকন্দ ভাইয়ের। উনার ছেলেটা মারা গেলো। আমরা উনাকে স্বান্তনার কথা বলতে পারিনি। কয়দিন উনার খুব মন খারাপ ছিল।

ওয়াহিদুজ্জামান আকন্দ ভাই আজ রাত ১২ টা ১৮ মিনিটে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। বেশ কয়দিন উনি হাসপাতালে ভর্তি খবর পাচ্ছিলাম। আর কখনোই ভাতৃত্ব নিয়ে আসবেন না আকন্দ ভাই। ভাইয়ের মত কাউকে হারালাম আর দেশ হারালো একজন নিষ্ঠাবান ডাক্তার। উনার মেয়েটা ডাক্তার। এইবার নবনিযুক্ত ২০০০ জন ডাক্তারের একজন সে। বসুন্ধরা কোভিড হাসপাতালে পোষ্টিংয়ের খবরটা ফেসবুকেই পেয়েছি। আকন্দ ভাই লিখেছিলেন।

করোনায় প্রতিদিন মৃত্যু বেড়েই চলেছে। কত পরিচিত জন চলে যাচ্ছেন। তাঁরা প্রত্যেকে এখন সংখ্যায় পরিণত হয়ে গেছেন। বিশিষ্ট গন্যমান্য ব্যক্তিরা এই মিছিলে শামিল হচ্ছেন প্রতিদিন। মানুষ মরছে,মরছে জীবন। আর কতবড় হবে মিছিল? আর কত বড় হবে শোকার্ত পরিবারের দীর্ঘশ্বাস?

আমরা নিজেদের বদলে নিয়েছি বেশভূষায়। মাস্ক, গ্লাভস, ফেস শিল্ড, পিপিই... এইসব এখন আমাদের নিত্য সঙ্গী। কেউ কারো কাছে যেতে পারে না। নিজের চেহারা নিজেরই অচেনা। বৈশ্বিক এই মহামারী কেড়ে নিচ্ছে স্বজন, আত্মীয়,বন্ধু, পরিচিত, অপরিচিত সবাইকে।

আর আমরাও হয়তো অপেক্ষায় আছি! হয়তো কোনোদিন আকন্দ ভাইয়ের মত সংখ্যা হয়ে যাবো? এত বিষাদের সময় কাটে না। দীর্ঘ রাত,দীর্ঘ দিন.... আতংক তাড়া করে। বারবার হাত ধুয়েও শঙ্কা কাটে না। বড় বিষণ্ণ এই বেঁচে থাকার সময়।

ওয়াহিদুজ্জামান আকন্দ ভাইয়ের ফেসবুক একাউন্ট এখন রিমেম্বারিং হয়ে যাবে। তাঁর লেখা আর আসবে না নিউজফিডে? আজ হয়তো আরো অনেকেই যুক্ত হবেন এই মিছিলে! আড়াইটার সময়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আপডেট আবার বিষণ্ণ করবে আমাদের! আমরা মুক্তি খুঁজি। আমরা নির্ভাবনার দিন খুঁজি।

আজ আমার ছোট ভাইয়ের বউ কুর্মিটোলা হাসপাতালে দশদিনের রোষ্টার শুরু করলো। আমরা কুঁকড়ে থাকি ভয়ে। এই দশদিন আমাদের কাছে দশবছর সমান মনে হয়। দশ দিন আর চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টিনে... মোট চব্বিশ দিন। হাসপাতালে জায়গা নেই। আইসিইউ খালি নেই। ডাক্তারের কোনো জীবন নেই।রোগীদের আর্তনাদ আর একটু অক্সিজেনের হাহাকারে ক্রমশ ভারী হয় বাতাস।

ওয়াহিদুজ্জামান আকন্দ ভাইয়ের এবং কোভিডে মৃত সবার আত্মার শান্তি কামনা করি। আল্লাহ সবাইকে জান্নাতি করুন। আর আমাদের এই মহামারী থেকে বাঁচান। আমরা আর কোনো মৃত্যুর খবর চাই না, চাই না বড় হোক মৃত্যুর এই মিছিল।

আকন্দ ভাইয়ের লেখা একটি কবিতা। উনি ২৩ এপ্রিল এটা পোস্ট করেছিলনে উনার ওয়ালে।

পারি না সান্ত্বনা দিতে স্বজনেরে

যে যাবার সে চলে যায়

পেছনে তাকায় না ফিরে আর

কে কাঁদল কার বুক ভাঙ্গল

সে আর রাখে না খবর তার

কাল গেল একজন

আজও একজন

এমনিকরে প্রতিদিনই যাচ্ছে

তোমার আমার কেউ না কেউ

ছোঁয়া যায় না কাছে যাওয়া যায় না

দূর থেকে দেখি প্যাকেটবন্দি লাশ

কারো হয় দাফন-কাফন কারোবা নির্দয় মাটিচাপা

ছুটে যেতে পারি না সান্ত্বনা দিতে স্বজনেরে

করোনার করালগ্রাসে সংসার হয় চৌচির

কে দিবে আশা কোথায়ইবা ভরসা

অদৃশ্য শত্রু শাণিত কৃপাণ লয়ে ঘুরে চারিদিক

হায়! লুটিয়ে পড়ছে সব

শিশুকিশোর তরুণযুবা আবালবৃদ্ধবনিতা চোখেরই পলকে

বিনম্র শ্রদ্ধা আকন্দ ভাই।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

ফারহানা নীলা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close