• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২২ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

উত্তাল আমেরিকা, চলছে বিক্ষোভ 

প্রকাশ:  ৩১ মে ২০২০, ০৯:১৬
এম আর ফারজানা

জর্জ ফ্লয়েড এখন একটি প্রতিবাদের নাম। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চলছে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ। রাস্তায় নেমে এসেছে শত শত মানুষ। আমেরিকার মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনেপোলিস শহরে পুলিশের নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েড নামের ব্যক্তির মৃত্যু হয়। জর্জ ফ্লয়েডকে পঁচিশে মে সন্ধ্যায় প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মৃত্যুর আগে জর্জ ফ্লয়েড বলেছিলেন, ‘আমি নি:শ্বাস নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তাতে পুলিশ অফিসাররা কর্নপাত করেনি। তারা উল্টা তাকে হাঁটু দিয়ে গলা চেপে ধরে হাতকড়া পরায়। ফ্লয়েড তখন মিনতি করে বার বার বলে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অবশেষে সত্যি তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জর্জ। এ ঘটনাটা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা দশ মিনিটের একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। ফলে মানুষ দ্রুত জেনে যায়। এ খবর সারা দেশে ছড়িয়ে যায় যে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কতৃক হাতকড়া পরা অবস্থায় জর্জ ফ্লয়েড নামের কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। শুরু হয় বিক্ষোভ। । অনেক স্টেটে লকডাউন উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চলছে, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, গাড়ি ভাংচুর, সমাবেশ। ইতোমধ্যে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরে বিক্ষোভের সময় গুলিতে বিক্ষোভরত এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। প্রতিবাদ অনলাইনেও চলছে।

ফ্লয়েডের জন্য ন্যায়বিচার চেয়ে শুধু কালোরাই নয়, শ্বেতাঙ্গরাও গর্জে উঠেছে। হলিউডের অনেক নামকরা অভিনেতা-অভিনেত্রী তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা ক্ষোভ এবং নিন্দা জানিয়েছেন এই ঘটনার বিরুদ্ধে। জাস্টিন বিবার লিখেছেন, ‘এসব অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এগুলো আমাকে অসুস্থ করে দিচ্ছে। এই মানুষটির মৃত্যুতে ভীষণ রাগ হচ্ছে। বর্ণবাদ খুব খারাপ। আমাদের এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা উচিত। নিক জোনাস ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘জর্জ ফ্লয়েড ও তার পরিবারের জন্য প্রার্থনা করছি। সাহায্যের চাইতে গিয়ে একটি পরিবার তাদের প্রিয়জন হারালো। এটি অমার্জনীয়।

স্টার ওয়ার্স’ অভিনেতা জন বয়েগা নিহত ফ্লয়েডের একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না, আমার ঘাড় ব্যথা করছে। পুরো শরীর ব্যথা করছে। তারা আমাকে হত্যা করবে’। এদিকে জর্জ ফ্লয়েডের গলায় হাঁটু চেপে ধরা পুলিশ অফিসার ডেরেক চাউভিনকে তার স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদের নোটিশ পাঠিয়েছে। বলেছে, এমন নিষ্ঠুর লোকের সাথে সংসার করবে না। এবং জর্জের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের সাথে যে বিষয়টা উঠে এসেছে তা হল বর্ণপ্রথা। বর্ণবৈষম্য নতুন কিছু নয়।

একটা সময় ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গরা চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করত। শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে মিশত না। এমনকি, শ্বেতাঙ্গ মানুষ বাসে উঠলে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে সিট ছেড়ে দিতে হতো, একই সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খাবার খেত না। অতীতে বর্ণ বৈষম্য ছিল প্রকট।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রই প্রথম মানুষ, যিনি আমেরিকায় কালো মানুষের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদ শুরু করেন। মূলত ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর আনুষ্ঠানিক সিভিল রাইটস মুভমেন্ট শুরু হয়। ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বরে রোসা পার্কস নামের এক আফ্রিকান-আমেরিকান মহিলাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। পার্কসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি অফিস থেকে বাসে করে ফেরার সময় আরেক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান যাত্রীকে কেন নিজের আসন ছেড়ে দেননি। তখন মার্টিন লুথার কিং এবং সোসাইটির সবাই মিলে এর প্রতিবাদ স্বরূপ আন্দোলন শুরু করেন। বাস সার্ভিস বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন, কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ নিজের গাড়ি চালিয়ে অফিসে আসা-যাওয়া করতে থাকেন। এই আন্দোলন অনেক দিন চলার পর অ্যালাবামা রাজ্যে যানবাহনে শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গদের ভেদাভেদকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট ওয়াশিংটন ডিসির লিঙ্কন মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিক মুক্তি, চাকরির ক্ষেত্রসহ সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের দাবিতে এক বিশাল সমাবেশ করেন। এই সমাবেশ ছিল আমেরিকার ইতিহাসে অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশ। ওয়াশিংটন থেকে লিঙ্কন মেমোরিয়াল পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ মানুষের উপস্থিতিতে তাঁর দেওয়া বিখ্যাত ভাষণ ‘অ্যাই হেভ অ্যা ড্রিম’—জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক স্মরণীয় ঐতিহাসিক ভাষণ। তিনি তাঁর ভাষণে তুলে ধরেন কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্যমূলক আচরণ, বিদ্বেষ, নির্যাতনের কথা। বলেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো প্রাপ্তি নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত কালোরা নির্যাতনের শিকার হবে, হোটেলে, মোটেলে থাকার অধিকার না পাবে, কেবল শ্বেতাঙ্গদের জন্য—‘এমন সাইন বোর্ড থাকবে’। আমি জানি, আজ বা কাল আমাদের সময় সংকটময়। তবুও আমি স্বপ্ন দেখি, এ জাতি জাগ্রত হবে, মানুষের বিশ্বাসের মূল্যায়ন হবে। জাতিগত বৈষম্যের অবসান হবে। সব মানুষ জন্মসূত্রে সমান। আলোড়ন তোলা ‘অ্যাই হেভ অ্যা ড্রিম’ ভাষণের প্রভাবেই ১৯৬৪ সালে আমেরিকায় নাগরিক অধিকার আইন ও ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন প্রণয়ন করা হয়।

কিন্তু, অতীতের মত বর্ণবৈষম্য প্রকট না হলেও এখনো সমাজে তা বিদ্যমান। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আজ সাদা-কালোর দূরত্ব কমে এলেও কিছুটা রয়ে গেছে অলিখিত ভাবেই। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে তা আবার সামনে এসেছে। করোনার মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে । সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে এই প্রতিবাদে শুধু যে কালোরা সামিল হয়েছে তা নয়, বিবেকবান সাদা’রা ও সামিল হয়েছে।

একদিকে করোনার কারণে বিপর্যস্ত আমেরিকা, চলছে কিভাবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হয়। ভাবা হচ্ছে লকডাউন তুলে দিবে। নিউ ইয়র্কে ৮ জুন সবকিছু খুলে দিবে। এমনিতেই গবেষকরা বলছে , জনসমাগম থেকে যেন মানুষ দূরে থাকে, না হয় আবার ও ভাইরাসের কবলে পড়বে মানুষ । কিন্তু জর্জ ফ্লয়েডের ঘটনা কোন দিকে মোড় নিবে তা অনিশ্চিত। যা মনে হচ্ছে উত্তাল আমেরিকা জনসমাগম বেড়েই চলেছে।

এম আর ফারজানা

৩০ মে , ২০২০।

নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম

এম আর ফারজানা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close