• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭
  • ||

নাহ! কোনো মিথ নয়: করোনা, কালের ঘটমান বর্তমান

প্রকাশ:  ২৯ মে ২০২০, ০১:০৫ | আপডেট : ২৯ মে ২০২০, ০১:৪৫
অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী
অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী

রুপালি পর্দার তিন ঘন্টার কোনো বাংলা ছায়াছবি অথবা HBO টাইপের কোনো চ্যানেলে দু" ঘন্টার টানটান উত্তেজনায় ভরপুর কোনো মুভি অথবা সায়েন্স ফিকশন অ্যাকশান হরর মুভি হলেও বেঁচে যেতাম । কিন্ত না । এ তো জীবন্ত চলচ্চিত্র । কী বিরল ভাগ্য বর্তমান প‌্রজন্মের মানবজাতির । প‌্রতিমূহুর্তে ভয় -ভীতি, আতঙ্ক- আশঙ্কা , আশা নিরাশার অদ্ভূত এক সময়ের ক্রমবিবর্তণ । সময় কিন্ত থেমে থাকছে না , মহাকালের মহাপরিক্রমায় অজেয় সময়ের ফ‌্রেমে জীবন্ত লাশ হয়ে সাহসী স্বপ্নবাজ মানুষ তবুও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে কোভিড ১৯ এর বিরুদ্ধে । সারাবিশ্বে মৃত্যুর মিছিল তো থামছেই না বরং নিত্য নতুন সব তাজা তাজা খবরে আতঙ্কের মাত্রা যেনো বেড়েই চলেছে । হাঁসফাঁসে নাভিশ্বাস করা জীবনে স্বাভাবিকতা নেই কোথাও । প‌্রাণসংহারী যমদূতের নিষ্ঠুর থাবায় লন্ডভন্ড পৃথিবীর খেলাঘর ।

মানবতাবাদী ধর্ম বৌদ্ধধর্মের সমর্থনে চর্যাপদে বলা হয়েছিলো :

"ভবনই গহণ গম্ভীর বেঁগে বাহী দু আন্তে নিখিল মজেঝ ন থাহী !!

অর্থাৎ বৌদ্ধধর্মে সমগ‌্র অস্তিত্ব প‌্রবাহকে একটি নদী প‌্রবাহের সাথে উপমিত করা হয়েছে । একটি নদী প‌্রবাহের মধ্যে দেখা যায় , প‌্রত্যেক মূহুর্তের প‌্রতিটি জলকণা অপর জলকণা হতে আলাদা বা ভিন্ন । কিন্ত সব মিলে অখন্ড প‌্রবাহের ধারা বয়ে চলেছে । ঠিক সেই রকম সংসারধর্ম "। ( বুদ্ধ ও চর্যাপদ : বাংলা নাটকের উত্তরাধিকার , দর্শন ও প‌্রগতি , ১ম ও ২য় সংখ্যা পৃ ৩৯ ) । তেমন করেই বোধ হয় ব্যাপক অর্থে বলা উচিত " জগত - সংসার- ধর্ম "। বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণ নশ্বর এই পৃথিবীকে যেনো এক অভিন্ন স‌্রোতধারায় মিলিয়ে দিয়েছে । থেমে গিয়েছে পৃথিবীর কোলাহল , কিছু ব্যতিক্রমী বিষয় বাদ দিলে আজকের বিশ্ব এক অভিন্ন সংসার , এক প‌্রাণপ‌্রবাহে গ‌্রথিত । সকলেই যেমন যার যার তার তার তেমনি সকলেই আজ সবার । বৈরিতা নেই , ভিন্নতা নেই , আত্ম অহংকারের বাড়াবাড়ি নেই , নেই কোনো পারষ্পরিক বিষোদগার । সম্মুখসমরে অংশগ্রহণকারী কোভিড যোদ্ধারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও দিয়ে চলেছেন স্বাস্থসেবা , আইন শৃঙ্খলা রক্ষাসহ ব্যাংকার , সংবাদকর্মী , মাঠ প‌্রশাসনের কর্মকর্তা , সশস্ত্র বাহিনী , র‌্যাব সদস্যবৃন্দ উদয়াস্ত জনসেবা করে চলেছেন । মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, দক্ষ ব্যবস্থাপনা দেশ বিদেশের সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ , আস্থাশীল অভয়বাণীতে তাঁর সুসমন্বিত ভূমিকায় এই সংকটকালেও দেশের সকল পর্যায়ের জনগণ ঐক্যবদ্ধ থেকে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন ।

মৃত্যুবরণ করেছেন এ পর্যন্ত কোভিড যোদ্ধা খ্যাত তিনজন বিশিষ্ট চিকিৎসক । করোনা সংক্রমিত হয়ে প‌্রথম মৃত্যু ঘটে সিলেটের মেধাবী চিকিৎসক ডাঃ মঈন উদ্দিনের । আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে ২৭ মে পর্যন্ত আক্রান্ত চার হাজারেরও ওপরে ; এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ১৪ জন পুলিশ সদস্য । অনেকেই রয়েছেন আইসোলেশনসহ কোয়ারেন্টাইনেও। সুস্থ হয়ে যারা ঘরে ফিরছেন তাদের দেয়া হচ্ছে বীরোচিত সম্মান , কোভিড যুদ্ধে জয়ী সদস্যরা সাধারণ মানুষের জন্য সাহস যোগাচ্ছেন , শোনাচ্ছেন অভয় বাণী । পুলিশে কর্মরত আমার এক ভাগ্নে পিবিআই এ দায়িত্ব পালনকালে জ্বর ঠান্ডায় আক্রান্ত হলেও মনোবল হারাননি , দেখা গেলো মৌসুমী ফ্লু তেই তার এই অসুস্হতা । প‌্রায় প‌্রতিদিনই ওর সাথে নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় ; বিদ্যমান সময়ে ঘটমান থানা সম্পৃক্ত বিষয়গুলির ঝুঁকিটাও ওর মুখ থেকেই শুনে বুঝতে পারি । ভালো থাকুন আমাদের অগণিত বীর কোভিড যোদ্ধারা ..... জাতি আজীবন কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করবে এই সাহসী সন্তানদের ।

সময়ের সবচেয়ে বড়ো বিসর্জন সর্বজনশ‌্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান স্যার । যিনি দীর্ঘ ছয় দশক ধরে জাতিকে আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখিয়েছেন । করোনার ছোবল স্যারকে শেষ যাত্রাতেও নিঃসঙ্গ করে দিলো । স্বাভাবিক মৃত্যুও এসময়ে কারো কাম্য নয় তবুও বড়ো অসময়ে জাতির এই ক্রান্তিকালে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে না ফেরার দেশে চলে গেলেন দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব আরেক জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী । একই পথে হাঁটলেন বিপিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. সা"দত হোসাইন । এইসব গুণী ব্যক্তিত্বদের মহাপ‌্রয়াণে জাতি শোকাভিভূত , স্তম্ভিত । অসময়ে জাতির অভিভাকদের এমন গুচ্ছ বিদায় মেনে নেয়া যায় না ; বড়ো হৃদয়বিদারক , বড়ো মর্মন্তুদ সে বিসর্জন ।

মানবিক মন চিরকালই সমুন্নত দরদী হৃদয়ের সজীব স্পর্শে । কোভিড " হটজোন " রেডজোন" বলতে এ মূহুর্তও নারায়নগঞ্জকেই বোঝানো হয় , ঢাকা সিটি তো বটেই । এর মাঝেই নারায়নগঞ্জের ঘরে ঘরে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন র‌্যাব সদস্যবৃন্দ । বন্ধ ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে " দরজা খুলুন , র‌্যাব থেকে খাবার নিয়ে এসেছি " । কে সৈনিক কে অফিসার বোঝার কোনো উপায় নেই , খাবারের বস্তা কাঁধে নিয়ে হাঁটছেন বাসাবাড়ির দরজার দিকে । দিনে যারা "লকডাউন পালনে বাধ্যতা আরোপ করেন , রাতের আঁধারে তারাই আবার মানবিক মন নিয়ে ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেন ।( সমকাল, ১৬ মে )

সম্মুখযোদ্ধা খ্যাত গণমাধ্যমকর্মীদের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে । সময়ের আলোর"

সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকনও জীবনের কাছে হেরে গিয়েছিলেন করোনা সংক্রমণের কারণে । দেশে তিনজন সংবাদকর্মী করোনার থাবায় অকালে ঝরে গেলেন । জনাব হুমায়ুন কবীরের কর্মস্থলের সহযোগী তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী এবং সংবাদকর্মী সাব্বিরও করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনে ছিলেন দীর্ঘদিন । সারাবিশ্বে প‌্রায় পঞ্চাশোর্ধ গণমাধ্যমকর্মী করোনার নিষ্ঠুর শিকারে প‌্রাণ হারিয়েছেন । করোনাকালের ইতিহাসে যেমন রয়েছে বিসর্জনের গল্প তেমনি অর্জনের পাশাপাশি রয়েছে মনুষ্যত্বহীনতার নগ্ন প‌্রকাশ আছে মমত্ববোধেরও সুমহান মহিমা ।

প‌্রথম পুলিশ সদস্যের মৃত্যু ঘটেছিলো ঢাকা মেডিকেলে কোয়ারেন্টাইন পালনরত কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কনস্টেবল জসিম উদ্দিনের । এ পর্যন্ত সারাদেশে ১৪ জন পুলিশ সদস্য করোনার কালো শিকারে পরিণত হয়েছেন । আক্রান্ত বাড়ছে মাঠ প‌্রশাসনে ,,চিকিৎসাক্ষেত্রে , গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবী সংগঠনে । ২৭ মে পর্যন্ত কোভিড পজিটিভ সনাক্ত হয়েছেন এক হাজার ডাক্তার । সূত্র: চ্যানেল আই । পুলিশে করোনাকালে নজীর স্থাপন করেছেন এ এসপি এনায়েত । করোনা সংক্রমণে মৃতদেহকে অনেক গ‌্রামেই দেওয়া হচ্ছে না দাফনের অনুমতি , অনেক ক্ষেত্রে মিলছে না মৃতের খাটিয়া বহনের মানবিক মানুষ কোথাও বা কবর খোঁড়ার জন্য কোদালও পাওয়া যাচ্ছে না । এমন ভয়ংকর অসহায় পরিস্থিতিতে মানিকগঞ্জে নিজের কেনা ১০ শতাংশ জমি দান করলেন পুলিশ কর্মকর্তা এনায়েত, করোনা সংক্রমণে মৃতদের সৎকারের জন্য ।

করোনার মহাসংকটকালে সংকট যেমন সারাবিশ্বে বেড়ে চলেছে তেমনি মানবিক হৃদয়ের গল্পও কম নয় । সংকটে - সংঘাতে - সহিষ্ণুতায় - সহমর্মীতায় এগিয়ে চলেছে করোনাক্রান্ত বসুমতি ।

নারায়নগঞ্জের ইউএনও জনাব নাহিদা বারিক তাঁর ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে ভুপেন হাজারিকার সেই কালজয়ী গানের দুটো লাইন তুলে ধরেন , ""মানুষ যদি সে না হয় মানুষ , দানব কখনও হয় না মানুষ " করোনা আক্রান্ত চিকিৎসক পরিবারকে ( নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা ) এলাকার একশ‌্রেণির মানুষ নামধারী অমানুষ , উচ্ছৃঙ্খল জনতা এলাকা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করে । যেখানে ডাঃ শিল্পী আক্তার নিজেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোভিড যোদ্ধা হয়ে সাধারণের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন । অবশেষে স্থানীয় ইউএনও জনাব নাহিদা বারিকের হস্তক্ষেপে বিষয়টির মীমাংসা ঘটে ।

আধুনিক জামানার আধুনিক মনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে করোনা উপসর্গ নিয়ে বাবা মৃত্যুবরণ করলে ভয়ে সে ছেলে সংস্কার অনুযায়ী বাবার মুখাগ্নিও করতে আসে না .... করোনা কতো শিক্ষাই না পৃথিবীকে দিয়ে যাচ্ছে । করোনা পরবর্তীকালে যারা বেঁচে বর্তে থাকবেন তারা কী আদৌ কোনো শিক্ষা গ‌্রহণ করবেন না কি দাম্ভিকতা আত্মম্ভরিতা বেড়ে গিয়ে আবারও ভুল করে ইতিহাস ভুলে যাবেন বেমালুম । কী জানি সময় বড়ো উত্তম বিবেচক আর বিচারকও বটে । প‌্রিয়জন , প‌্রিয়মুখ প‌্রিয় স্বজনেরা করোনা ভয়ে মৃত্যুপথযাত্রী আপনজনকে দুরদুর করে তাড়িয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করতে গিয়ে এতোকালের ভালোবাসার মানুষটিক অন্ধকার পৃথিবীর প‌্রেমহীন অনিশ্চিত জীবনে ঠেলে দিচ্ছে । মানুষ এতোটাই নিঃসঙ্গ আজকের পৃথিবীতে ।

কোভিড- ১৯ বিশ্ববিবেক আর মানবিকতার নগ্নরুপ প‌্রকাশিত করেছে , করেছে নির্বোধ মানুষদের নির্লজ্জ বেহায়াপনার পশুবৃত্তিক চিত্র । জীববৃত্তিটাকে অনুজ্জ্বল করে পশুবৃত্তিটাকে করেছে উন্মোচিত । তাই তো দেখি , করোনার এ মহাক্রান্তিকালে সখীপুরেরে শাল গজারীর অন্ধকার বনে পশু সন্তানেরা ৫০ বছর বয়সী মাকে করোনা সন্দেহে বড়ো নির্মমভাবে মাকে বিসর্জন দিতে । জানা যায় সেই মাও করোনা আক্রান্ত ছিলেন না । প‌্রশাসনের হৃদয়বান ব্যক্তিত্ববৃন্দ সেই অসহায় মাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন । দিনটি ছিলো " বিশ্ব মা দিবস " ।

নারায়নগঞ্জের সফল ব্যবসায়ী খোকন সাহা । সাত বন্ধু মিলে একত্রে বাড়ি করলেও তাঁর অসুস্থতার খবর শুনে কোনো ফ্ল্যাট থেকে একজনও এগিয়ে আসেননি .... বাড়ির চারতলার সিঁড়িতেই তিনি প‌্রাণ হারান । দীর্ঘসময় তাঁর মরদেহ সিঁড়িতে পড়ে থাকার সংবাদ পেয়ে ছুটে এসেছেন নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খোরশেদ । যিনি মানবতার ফেরিওয়ালা হয়ে আরও অসংখ্য করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ সৎকার করেছেন । জানা যায় , সনাতন ধর্মের মৃতদেহের মুখাগ্নির কাজটিও অনুমতিসাপেক্ষে পূর্ণ সম্মান ও

সাহসিকতার সাথে তিনিই করে থাকেন ।

করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে এমন নারীর জানাজায় শরীক হননি নিজ পরিবারের সদস্যরা ( গাইবান্ধা , সুন্দরগঞ্জ ) । উপরন্ত ওই মরদেহ বাড়িতে আনার সংবাদ শুনে বাড়ি থেকেই সব উধাও । অন্যদিকে , মানবিক হৃদয়ের প‌্রসারিত বুকে প‌্রজ্জ্বলিত আলোক শিখা হয়ে কোয়ান্টামের একদল স্বেচ্ছাসেবক ফোন পেলেই ছুটছেন কখনও মুগদা হাসপাতালে , কখনও কুর্মিটোলা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে কখনও বা করোনা রোগীর মরা বাড়িতে । রাত কিবা দিন , হোক সেটা সেহেরি বা ইফতারিতে । নিয়ম মেনে , বিধি মেনে , আদরে - সাদরে, সম্মানের সাথে পরিজনহীন মৃতদের শেষ যাত্রায় পাশে থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছেন । মানবধর্মকে উন্নত অভিধায় প‌্রতিস্হাপিত করে চলেছেন ।

করোনাকাল একসময় সময়ের নিয়মেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে । কিন্ত কিছু ক্ষত দগদগে হয়ে পৃথিবীর বুকে , মানবিক মনে কখনও ঘৃণা , কখনও করুণা কখনও উষ্মা আবার কখনও বা শ‌্রদ্ধাবনত হৃদয়ে মানব প‌্রজাতির মনে অমরত্ব নিয়ে জেগে থাকবে । শেষ যাত্রায় হোক আর অসুস্থতায় হোক সেই সময়টাতে মানুষ প‌্রিয়জনদের স্নেহ , ভালোবাসা , সান্নিধ্য , স্পর্শ প‌্রত্যাশা করে ।কোলজুড়ে বুকজুড়ে আপনজনদের ভালোবাসার অকৃত্রিম পরশ অনুভব করতে চায়। নিভু নিভু প‌্রশ্বাসকালেও মানুষ পরম মমতা আর বিশ্বাসে আপনজনের হাতটি বুকের ভেতরে আঁকড়ে ধরে থাকে ।

হায় করোনাকাল ! দেশে দেশে , অঞ্চলে অঞ্চলে চিরায়ত বন্ধনে , আচরিত জীবনে নির্মমতার নিগড়ে মৃত্যুর ভয়াবহ ছোবলে পৃথিবীকেই কলুষিত করে গেলে ; মানবিকতাকে দানবে , ভালোবাসাকে ভীতিতে পরিণত করে প‌্রিয় ধরিত্রীর ভাঁজে ভাঁজে এঁকে দিয়ে গেলে করোনার জীবনচক্র , বড়ো ভয়ঙ্কর সে চিত্র । মুষড়ে পড়া পৃথিবী আজ নির্জীব নিথর নিস্তেজ হয়ে তার সন্তানদের জন্য করুণা ভিক্ষা করে চলেছে । নভেল করোনার মহাপ‌্রলয়ে বিশ্বমাতা বিহ্বল বিধ্বস্ত এক ধ্বংসস্তুপ ; অপসৃয়মান - অবসন্ন যুক্তিহীন মূক বধির নীল গ‌্রহ ।

শুরুটা করেছিলাম "মিথ " প‌্রসঙ্গ টেনে ; তাই বলছি , বর্ণিত ঘটনাগুলো কোনো মিথ নয় , করোনাকালের নানান অধ্যায়ের আখ্যান - উপাখ্যান । গ‌্রিক পুরাণে "প্যান্ডোরা" নামে পৃথিবীর একমাত্র স্বর্গীয় মানবীকে বলা হয়ে থাকে অকল্যাণের ধারক বাহক । পৃথিবীর অকল্যাণগুলোকে সেখানে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে ঈশ্বরের প‌্রতি মানুষের অবাধ্যতার কারণ হিসেবে । পুরাণে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী , এপিমেথেউস ও প‌্রমিথিউস নামে দুইভাইকে পৃথিবীতে মানুষ" সৃষ্টির দায়িত্ব দেয়ার এক পর্যায়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতাসম্পন্ন ছোটো ভাই প‌্রমিথিউস সৃষ্ট মানুষকে উপহার হিসেবে স্বর্গ থেকে "আগুন" চুরি করে এনে মরণশীল মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন । আগুন চুরির অপরাধে দেবরাজ "জিউস" প‌্রতিশোধপরায়ণ হয়ে কৌশলে "এপিমেথেউস - প্যান্ডোরার" বিয়েতে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন অপূর্ব এক বাক্স । বাক্সটি খুলতে নিষেধও করেছিলেন দেবরাজ ; কিন্ত প্যান্ডোরা দেবরাণী "হেরা"র কাছ থেকে পাওয়া উপহার " কৌতুহল" এর কাছে পরাস্ত হয়ে সেই কৌতুহলবশতঃই অপূর্ব বাক্সটি খুলে ফেলেন । বিপর্যয় সেখানেই ঘটেছিলো । স্বর্গের সমস্ত নীচতা - রোগ , জরা , ব্যাধি , হিংসা , দ্বেষ বাক্সবন্দী থেকে আচমকা বেরিয়ে আসে । হতবিহ্বল প্যান্ডোরা বাক্সটি দ‌্রুত বন্ধ করতে করতে বন্দী থেকে যায় শুধু " আশা " নামের বিস্ময়কর স্বপ্নময় সেই মহাঐশ্বর্য । তাই বুঝি স্বাপ্নিক মানুষ আশা নিরাশার দোলাচলে ঘুরপাক খেতে খেতে অবশেষে আশার ভেলাতে চেপেই কল্যাণ আর মঙ্গলের পথে ব‌্রতী হয় । আজও সেই ঐক্যবদ্ধ মানুষই পারবে প‌্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মানবপ‌্রেমে উজ্জীবিত হয়ে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতিকে কাজে লাগিয়ে মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসকে জয় করতে । রাত গভীর হলেও আলোকিত স্নিগ্ধ প‌্রভাতের প‌্রত্যাশা পৃথিবীবাসীকে জাগিয়ে রাখবে ।

লেখক: অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী , দর্শন বিভাগ ; সাধারণ সম্পাদক , সরকারি তিতুমীর কলেজ , ঢাকা ।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

করোনা উপসর্গ,অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী,দর্শন বিভাগ,সরকারি তিতুমীর কলেজ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close