• শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২০, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭
  • ||
শিরোনাম

ব্যক্তিগত গাড়ি করোনামুক্ত ভাবার অবকাশ নেই

প্রকাশ:  ২৩ মে ২০২০, ০১:১৩
ফারহানা নীলা

আমাদের শতবর্ষী পুরাতন বাড়িটাকে আমাদের শৈশব, কৈশোর আর যৌবন ঘুমিয়ে আছে। আমরা গেলে ওরা কলকলিয়ে ওঠে। আমরা স্মৃতির সাথে কথা বলি। সেই কুয়োতলা,বরই গাছ, মাধবী লতার গাছ, হাস্নাহেনার ঝাড়, নারিকেল গাছ, পেয়ারা গাছ.... কথা বলে।

.... এতদিন আসোনি যে?

অপরাধীর মত বলি সময় পাইনি। চাইলেই আর আসতে পারি না।

..... তোমাদের কথা মনে পড়ে যে খুব!

আরো সংকুচিত হয়ে বলি আমারও মনে পড়ে। রোজ মনে পড়ে।

আমার পড়ার টেবিলটা গাল ফুলিয়ে রাখে। বুক শেলফ মুখ ফুলিয়ে থাকে।

আমি ওদের ছুঁয়ে দেই। অভিমান ভাঙাই। আমার বুকের ভেতর তোলপাড় চলে।

অনেকদিন ওই বাড়িটায় যাই না। বছর দুই আগে বোধ হয় শেষ গিয়েছি। আবার কবে যাবো তাও জানি না।

১৯৮৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়তে চলে আসি। তারপর প্রতি ঈদেই বাড়ি যেতাম। আরিচা নগরবাড়ী... ফেরিতে সময় কাটে না। কতদিন ফেরি ছেড়ে গেছে আমার চোখের সামনে। আমি ঘাটে অপেক্ষা করি আরেকটা ফেরির জন্য। এখন যমুনা সেতু দিয়ে যাওয়া আসা। ফেরিতে চড়ি না কতদিন?

ঈদ আসন্ন। সবাই বাড়ি ছুটছেন। নাড়ীর টান, শেকড়ের টান.... কথাগুলোয় আটকে আছে বাঙালির মন। আমরা এই মানসিকতার উপরে উঠতে পারি নাই। ঈদ মানে তো আনন্দ। কোথায় আনন্দ?

মানুষ কাতরাচ্ছে হাসপাতালে, বাড়িতে। মরছে মানুষ দেদারসে।

আমাদের ঈদ কোথায় তবে?

ধুঁকছে জীবন। আমরা তবুও পারি নাই নাড়ীর টান আর শেকড়ের টান উপেক্ষা করতে!

দলেবলে পায়ে হেঁটে সবাই পরিব্রাজক হয়ে গেলাম। বন্ধ তোরণদ্বার, তবুও আমরা প্রত্যন্ত এলাকার পথে ধাবমান। ছুটছি সবাই.... বাড়ি যাবো।

বাড়িতে মানুষগুলো হয়তো বা ভালই ছিল। কিন্তু আমাদের আবেগ তাদের ভাল থাকতে দেবে কি?

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল চষে বেড়াবে করোনা এবার।

ফটক খুলে গেছে। ব্যক্তিগত যানবাহনের নিষেধাজ্ঞা নেই। কোথাও নেই কোনো বাঁধা। কিন্তু বাঁধা তো নিজের ভেতরে তৈরি হওয়ার কথা ছিল। আমরা এতটাই নির্বোধ এবং অবিবেচক হলাম কিভাবে?

আজ আমার এক টেকনোলজিস্ট বললো দুই মাস বাড়ি যায় না। আরেকজনের বাবা অসুস্থ খবর এসেছে। কিন্তু যেতে পারবে না। এরা স্বেচ্ছায় নিজেদের নির্বাসিত রেখেছে। কারণ পরিবারের সুরক্ষা চায়।

কোভিড নির্ধারিত হাসপাতালে যারা কাজ করছেন, তারা হোটেলে থাকেন। তারা বাড়িতে যেতে পারেন না। পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা এটা মেনে নিয়েছেন।

হাসপাতালে হাসপাতালে জায়গা নেই। রোগীদের কষ্টের সীমা নেই। আইসিইউ খালি নেই। ডাক্তার আর নার্স থাকলেই হবে না। হাসপাতালে সিট থাকতে হবে।

অনেকেই আবার বাড়িতে থেকেই সুস্থ হয়ে গেছেন। তারা ভাগ্যবান।

এটা জেনে আবার কেউ কেউ সাহসী হয়ে গেলেন। মুদ্রার একপিঠ দেখেই খুব সাহসীকতার সাথে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে দিলেন। মুদ্রার অপর পিঠটা কি দেখেছেন?

সস্তা সেন্টিমেন্ট আমাদের ঘোর আঁধারে নিক্ষেপ করছে.... এটা যখন বুঝবেন,তখন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।

অনেকে আবার হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে কথা বলছেন। কোভিডের এন্টিবডি কতদিন থাকে কেউ কি জানি? কতদিন সুরক্ষা দেয় কেউ কি নিশ্চিত করে বলতে পারি? হার্ড ইমিউনিটি হতে গেলে কতগুলো প্রাণ হারাতে হবে হিসেবটা কি সহজ?

প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ শুরু হয়েছে। সবাই এখন এই দিকে তাকিয়ে আছে। প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে রোগীর উপসর্গ কমবে বলে আশাবাদ। কিন্তু মৃত্যু আটকানো কি যাবে? প্লাজমা থেরাপির সিদ্ধান্ত ডাক্তারের উপর ছেড়ে দিন। নিজেরা অনর্থক প্লাজমার জন্য দৌড়াদৌড়ি করার দরকার নেই।

ডোনারের সংকট। আজ কুর্মিটোলা হাসপাতালে আইসিইউতে একজন রোগীর বি পজেটিভ প্লাজমা প্রয়োজন। ডোনার পাওয়া যায়নি। এখনো জোগাড় করতে পারিনি প্লাজমা। অসহায়ত্ব গ্রাস করে বিপন্ন অস্তিত্ব।

প্লাজমা দানে এগিয়ে আসুন। যারা ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছেন, তারা ২৮ দিন পর প্লাজমা দান করতে পারবেন। এর আগে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার পরিমাপ জানতে টাইটার করে রাখুন।

১৮-৬০ বছরের যে কেউ ডোনার হতে পারবেন। রক্তদানের চাইতেও নিরাপদ এই প্রক্রিয়া। শুধু মাত্র আপনার রক্তের জলীয় সাদা অংশ নেয়া হবে। বাকীটা আপনার শরীরে ফেরত চলে যাবে মেশিনের মাধ্যমে। আপনার দানকৃত প্লাজমা পূরণ হতে ৪৮ ঘন্টা সময় লাগবে। আর আপনার কাছ থেকে প্লাজমা নিতে সময় লাগবে দেড় ঘন্টার মত।

যারা জানেনই না তারা কোভিড পজিটিভ ছিলেন কিনা, অথচ অসুস্থ হয়ে সুস্থ হয়েও গেছেন। তারা আসুন। আপনার টাইটার করেই জানা যাবে আপনি কোভিড১৯ রোগী ছিলেন কিনা।

আর স্ক্রিনিংয়ে জানা যাবে আপনি আরো পাঁচটা রোগমুক্ত কিনা?

হেপাটাইটিস বি ও সি, এইডস, ম্যালেরিয়া এবং সিফিলিস... এগুলো আলাদাভাবে আপনাকে করতে হবে না।

ডোনার না পেলে প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ মুখ থুবড়ে পড়বে। আপনার নিকটজনের প্রয়োজন হলেও তখন আপনি অসহায় হবেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ আপনাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।

আপনি ডোনার হতে চান?

আসুন তবে সামান্য রক্ত নিয়ে আগে আপনার টাইটার দেখে নেই।

১ঃ১৬০ টাইটার হলে আনুষঙ্গিক সবকিছু বিবেচনা করে তবেই আপনার থেকে প্লাজমা নেয়া হবে। সেখানে আপনার সম্মতির প্রয়োজন। আপনি সম্মতি না দিলে... নেবো না আমরা।

ভয়ের কিছু নেই। এত সাহসী হয়ে থোড়াই কেয়ার করছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন.... শুধু প্লাজমা দানেই ভয়?

বুঝতে পারছেন না.... এত রোগীর চিকিৎসা করার সামর্থ্য আর জনবল নেই। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরপাক খাবেন। তারপর আল্লাহ আল্লাহ করবেন আর ডাক্তারের পিণ্ডি চটকাবেন।

ঈদে সেমাই, পোলাও খাবেন... ভাল কথা। কতজনকে আক্রান্ত করছেন এই নাড়ীর টান আর শেকড়ের টানে? জানেন কি?

জি জন্ম মৃত্যু আল্লাহর হাতে। কিন্তু বিবেচনা আপনার নিজের। এতক্ষণে অনেকেই পৌঁছে গেছেন বাড়ি। কত কষ্ট করে গেলেন, সেই গল্প করছেন। পাশাপাশি বসে আর শুয়ে।

সামাজিক আর শারীরিক দূরত্বের বালাই নেই।

হাত ধোয়ার কথাও মনে নেই।

মাস্কের কথাও মনে নেই। আর থাকলেও সেটা ঝুলছে থুতনিতে।

বিন্দাস ঘোরাঘুরি করছেন। করোনা কিন্তু বসে নেই।

করোনা আপনার সাথে সাথে পৌঁছে গেছে বাড়ি।

ব্যক্তিগত গাড়ি করোনামুক্ত ভাবার অবকাশ নেই। আপনার ড্রাইভার করোনামুক্ত ভাবার কোনো কারণ নেই।

বেশী দিন নয়, আর পনেরো দিন পরই বুঝতে পারবেন নাড়ীর টান আর শেকড়ের টান! বাড়িতে মা, বাবা, মুরুব্বি.... কাউকেই ছাড়বে না করোনা।

আপনার বিবেক আপনাকে ছাড়বে তো বাকীটা জীবন?

যারা স্বল্প আয়ের মানুষ, তারা খেটে খাওয়া মানুষ। রোদ,ঝড়,বৃষ্টিতে কাজ করা মানুষ। তারা আক্রান্ত হবে বেশী। সেরেও যাবে বেশী। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদেরকে রক্ষা করবে।

যারা ফার্মের মুরগীর মত জীবন কাটায়... গাড়ী, এসি, অফিস... তাদের কিন্তু ভয়াবহ বিপদ। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদেরকে কতটুকুই আর সুরক্ষা দেবে?

দেখাও যাচ্ছে তাই, নিম্ন আয়ের মানুষগুলো টিকে যাচ্ছে। আর ফার্মের মুরগীর মত আমরা কিন্তু আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর খোঁজ করছি।

আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন আর হেদায়েত করুন।

আপনাদের এই স্মৃতিময় ঈদ সুন্দর হোক।

আমার কোনো ঈদ নেই। বোকাদের ঈদ থাকে না। বোকারা লকডাউন থাকে। বোকারা গৃহবন্দিত্ব মেনে নেয় জীবনের জন্য।

জি আমি বোকাসোকা মানুষ। আপনি চালাক চতুর.... তাতে আমার কি? তবে করোনার কিন্তু পোয়াবারো!

লেখক: ফারহানা নীলা, চিকিৎসক ও কবি।


পূর্বপশ্চিমবিডি/ওআর

ফারহানা নীলা,হাসপাতাল,করোনা,ঈদ
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close