• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

দুটি সংবাদ এবং করোনায় করনীয়

প্রকাশ:  ১৮ মে ২০২০, ২১:২৬
এইচ রহমান মিলু

আজ সংবাদ মাধ্যমে দুটি সংবাদ দেখলাম। আমি চিকিৎসা বিজ্ঞানী নই তবুও এই দুটি সংবাদ আমাকে করোনায় করণীয় একটি জরুরি বিষয় অবগত করলো বলে মনে হলো। পুলিশ হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে থাকা করোনা রোগীর দেহে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে বিস্ময়কর সাফল্য পাওয়া গেছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৬০ থেকে একদিনেই ৩০ এ নেমে গেছে। আরেকটি সংবাদ হচ্ছে গ্রামে পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ পালনের জন্য ঢাকা শহর ছেড়ে যেতে মানুষের ঢল নেমেছে। এই সাথে পুরনো সংবাদ, ঈদ শপিং এর জন্য বিপনী বিতানগুলোতে মানুষের ভিড়।

সাধারণ ছুটি বা লকডাউন অথবা সামাজিক দুরত্ব যে নামেই উল্লেখ করিনা কেন, সরকারের মুল লক্ষ্য ছিলো তীব্র ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস থেকে দেশের মানুষকে নিরাপদে রাখা। বাস্তবে তা চরমভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে।

মানুষ মানুষের গায়ে লেগে ব্যাংকে টাকা তুলবার জন্য লাইনে দাড়াচ্ছে, হাটে বাজারে কেনাকাটা করছে, বিভিন্য কারখানায় কাজ করছে, শপিং সেন্টারে ঈদের পোশাক কিনছে, মসজিদে নামাজে যাচ্ছে এবং ঠাসাঠাসি করে কেউ শহরে ঢুকছে কেউ বা শহর ছাড়ছে।

বিষয়টা অনেকটা এরকম যেন নাচছি আবার ঘোমটাও দিচ্ছি। ফলে, না হচ্ছে নাচ, না হচ্ছে পর্দা। দুই মাস ধরে সামাজিক দুরত্ব মানতে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী মানুষেরাও আজ অতিষ্ট এবং হতাশ। কাজকর্ম না করতে করতে এদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক শক্তি কমছে বৈ বাড়ছে না। সেই সাথে যোগ হয়েছে বাড়তি বয়সের শিশুদের অস্থিরতা ও মেজাজ খিটমিটে রোগ। কোনভাবেই তারা আর নিজেকে ঘরে বন্দী রাখতে চাইছে না।করোনায় আক্রান্ত না হলেও এক ধরনের ডিপ্রেশনে তারা আক্রান্ত।

যদি পিছনে ফিরে তাকাই তবে বলবো, প্রথম দিনের লকডাউনটা যদি কঠোর কারফিউ ধরনের একটা পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হতো তবে আজ হয়তো দেশ শতভাগ করোনা মুক্ত হতে পারতো, যেভাবে সফল হয়েছে কম্বোডিয়া সহ বেশ কিছু দেশ।

অথবা প্রথমেই যদি আমরা দেশের এয়ারপোর্ট এবং স্থল বন্দর দিয়ে প্রবেশ করা যাত্রীদের ভালো মানের হোটেলে সরাসরি তুলে দিয়ে বাধ্যতামূলক ২০ দিনের থাকা খাওয়া নিশ্চিত করতে পারতাম, তাহলে দেশটা স্বাভাবিকভাবেই তার কাজকর্ম চালাতে পারতো এই দুই মাস ধরে, অথচ সেগুলো কিছুই হয়নি।

মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ৪ মাস ধরেই বলে আসছেন আমরা করোনা মোকাবেলায় প্রস্তুত আছি, অথচ এখনও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সকলকে পিপি এবং মাস্ক পর্যন্ত সরবরাহ করতে তিনি অক্ষম হয়েছেন।

আজ হাইকোর্ট থেকে পর্যন্ত এই বিষয়ে একটি নির্দেশ এসেছে মন্ত্রণালয় বরাবর, যেখানে এসব পেশার লোকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। লোকসংখ্যার হিসেবে যেখানে আমাদের দিনে ১০ লাখ করোনা শনাক্তের পরীক্ষা করা দরকার সেখানে আমরা সর্বোচ্চ করতে পেরেছি দৈনিক ৭ হাজারের কিছু বেশি। যার ফলে মোট জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ পরীক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। হাজার হাজার শিক্ষিত বেকার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকলেও তাদের জরুরি ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে করোনা রোগী শনাক্তের পরীক্ষার পরিধি বাড়াচ্ছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এখন সব কিছু মিলিয়ে যা বলা যায় তা হলো, আমরা করোনা মোকাবেলায় নাগরিক হিসেবে নিজেরা ব্যর্থ হয়েছি, তেমনি ব্যর্থ হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

মানুষ কোনভাবেই ঘরে থাকছে না, আবার আমরা কিছু মানুষজন আজ দুই মাস ধরে ঘরের বাইরে বের হইনি। একটি দেশে করোনা মোকাবেলায় এমন দ্বৈত ও বিপরিতমুখি কর্মকান্ড চলতে পারেনা।

সব বিবেচনায় রেখে আমার মতামত হলো দেশটাকে স্বাভাবিক করে দেওয়া হোক। সকল বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে সবাইকে সবার কাজে যোগদানের ব্যবস্থা করা হোক। যেহেতু আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যুর হার অত্যন্ত কম এবং অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশে করোনার শক্তি অনেকটাই কম তাই সব কিছু খুলে দিলে অধিক মানুষ আক্রান্ত হবে সত্যি তবে মৃত্যুহার ততটা বেশি হবে না।

অধিক মাত্রায় করোনা রোগী শনাক্তের জন্য পরীক্ষার ব্যাপ্তি কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। সারা দেশের সকল হাসপাতালে করোনা রোগী শনাক্তের পরিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সাথে করোনা থেকে সুস্থ হওয়া রোগীদের তালিকা তৈরি করে তাদের কাছ থেকে দ্রুত প্লাজমা সংগ্রহ করে নতুন আক্রান্তদের দেহে তা প্রবেশ করাতে হবে।

করোনায় আক্রান্ত হলে যেহেতু শ্বাসকষ্টের তীব্রতায় রোগী মারা যাবার সম্ভাবনা বেশি, এক্ষেত্রে পুলিশ হাসপাতালের আজকের থেরাপির ফলাফল আমাদের সেই সমস্যার সমাধান দিচ্ছে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৬০ থেকে যদি একদিনে ৩০ এ নেমে রোগী সুস্থ বোধ করেন, তবে তো বলাই যায় এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে আমাদের অতটা মৃত্যুভয়ের তেমন কিছু থাকবে না।

একটি কথা মনে রাখা জরুরি, আমাদের কোন কিছু নিয়ে প্যানিক হওয়া চলবে না, মৃত্যুর ঝুঁকি কিন্তু অনেক সাধারণ ভাইরাস জ্বরেও থাকে যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নেওয়া না যায়।

এখানে আরেকটি নতুন দুঃসংবাদ হলো বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে সর্বোচ্চ ৫ মাত্রার ঘুর্ণিঝড় ‘আমফান’।এই ঝড়ের কবল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের বাঁচাতে হলে তাদের কে কাঁচা ঘরবাড়ি থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসা জরুরি। এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে যে কোনভাবেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব না, তা নিশ্চয়ই আমরা সবাই বুঝি। এছাড়াও এই ঝড় যদি আঘাত হানে তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ব্যাপক ত্রাণকার্য এবং অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতার জন্য বড় ধরনের জনশক্তির প্রয়োজন হবে। তখনও কিন্তু সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে না।

আমাদের এখন সামনে দুটি পথ খোলা, বেশি ভালো পথটি হলো লাগাতার এক মাসের কারফিউ দিয়ে দেশকে করোনামুক্ত করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে মানুষের খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরকারের তরফ থেকে সবার বাসায় পৌছে দিতে হবে, যা অনেকটাই অসম্ভব এই মুহূর্তে। অন্যটি হলো সব কিছু খুলে দিয়ে সবাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। এক্ষেত্রে আমরা অনেকেই করোনা আক্রান্ত হবো এবং প্লাজমা থেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হবো এমন বিষয়টি মাথায় রাখা।

আশা করি চিকিৎসক এবং সমাজের বিজ্ঞজনেরা বিষয়গুলো একটু ভেবে দেখবেন এবং বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্তে যেতে সরকারকে সহযোগিতা করবেন।

এইচ রহমান মিলু: লেখক ও সমাজকর্মী

এইচ রহমান মিলু
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close