• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

প্রসঙ্গ: আফ্রিদি ম্যারি মি প্রজন্ম 

প্রকাশ:  ১৮ মে ২০২০, ০০:১৬
এইচ রহমান মিলু

১৯৮৮ বা ৮৯ সাল হবে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তী জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাহ ঢাকা স্টেডিয়ামে একটি পেস বোলার হান্টিং ক্যাম্প শুরু করেছেন। ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি ও এর অধিক উচ্চতার ফার্স্ট বোলারদের তিনি এখানে পেস বোলার হিসেবে গড়ে উঠবার ট্রেনিং দেবেন।

অনেকের মতো আমিও সেই ক্যাম্পে যোগ দেই এবং প্রায় ১৫ দিন বা তারও বেশি সময় ধরে নিজেকে পেস বোলার হিসেবে গড়ে তোলার তালিম নিতে থাকি। সপ্তাহ যেতে খারাপ পারফর্ম করা ছেলেদের বাদ দেয়া হতো, সেই কারনে দুই শতাধিক ছেলে বাদ পড়ে যায়। সবশেষে আমরা ৩০ জনের মতো সেই ক্যাম্পে শেষ অব্দি থাকবার সুযোগ পাই।

সম্পর্কিত খবর

    আমরা যখন ঢাকা স্টেডিয়ামে তালিম নিচ্ছিলাম তখন কোচ আলতাফ ভাই আরেকটি ক্যাম্প পরিচালনা করছিলেন একই মাঠে। একদিন হঠাৎ সেখানে পাকিস্তানী ক্রিকেটার সে সময়ের দুনিয়া সেরা অলরাউন্ডার ইমরান খান এসে হাজির। দুই ক্যাম্পের প্রায় সকলেই তখন দৌড়ে গিয়ে ঘিড়ে ধরেছে ইমরান খানকে। ইউনিসেফের একটি ভ্যাকসিন প্রোগ্রামে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন।

    আমার ভীষন পছন্দের একজন বোলার ছিলেন সে সময়ে ইমরান খান। তার বলিং স্টাইল এমনকি চুলের স্টাইল পর্য়ন্ত কপি করতাম। কিন্তু যখন তাকে মাঠে সামনাসামনি দেখলাম, আমি অনুভব করলাম ইনি ক্রিকেটার ইমরান খান নন, ইনি পাকিস্তানের একজন নাগরিক মাত্র। যে পরিচয়টা তখন আমার মনে ঘৃনার জন্ম দিতো। আমি সৌজন্যবোধ এবং উন্মাদনার তফাত বুঝি, তাই যখন বাদশাহ ভাই আমাদের লাইন করে দাড় করিয়ে ইমরান খানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, হ্যন্ডশেক করেছি। পরবর্তিতে সবাই যখন অটোগ্রাফ নিচ্ছিলো তখন আমি তা করিনি। কয়েকদিন পর শুনলাম আমাদের সার্টিফিকেট দেবার দিন ইমরান খান চিফ গেস্ট থাকবেন, কেউ হয়তো বিশ্বাস করবেনা যে আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে সার্টিফিকেট নেবো না।

    অনেকের কাছে হয়তো মনে হতে পারে আমি বাড়াবাড়ি করেছি, খেলা বা খেলোয়াড় নিয়ে এমনটা করা উচিত না। আমি তাদের কে বিনয়ের সাথে বলতে চাই, দুনিয়াতে এমন কোন দেশ নেই যার কোন রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যেহেতু সব দেশ এর পরিচয় ই রাজনৈতিক পরিচয় তাই তার সকল কিছুই রাজনৈতিক, হোক সে খেলা বা অন্য কিছু। অবশ্য, শেষ পর্যন্ত কি একটায় ঝামেলার কারনে ইমরান খান আসেননি, আমি আরামে আমার সার্টিফিকেট এনেছিলাম।

    বেশ কিছু বছর পরে বলতে পারেন এক যুগ পরে, বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, পাকিস্তান দল খেলছে সেই একই ঢাকা স্টেডিয়ামে। সম্ভবত ভারতের বিরুদ্ধে বা অন্য কোন দল হতে পারে মনে নেই। শহিদ আফ্রিদি তখন তরুন খেলোয়াড় হিসেবে খেলছে মাঠে। গ্যালারীতে বসা আমাদের সবার হাতে প্ল্যাকার্ডে চার ছক্কা লেখা, শুধু এক তরুনী লিখে নিয়ে গিয়েছে “আফ্রিদি ম্যারি মি”।

    বাংলাদেশের একটি মেয়ের এহেন কর্ম সেদিন আমাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো।নিজের চোখ কে যেনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে মনে শুধু একটি কথা ঘুড়ছিলো, এই মেয়ে কি জানে আফ্রদির পূর্ব পুরুষদের কথা? এই মেয়ে কি জানে তারই বয়সী মেয়েদের ঘর থেকে তুলে বিশ পচিশজন পাকিস্তানী সেনা লাগাতার ধর্ষন করতো? ধর্ষণ শেষে যখন আবারও নতুন মেয়ে ধরে নিয়ে আসতো, তখন পুরনোদের দুই হাত বেধে সিলিংয়ের ফ্যানের হুকে ঝুলিয়ে রেখে বেয়নেট দিয়ে যোনিপথ কেটে ক্ষত বিক্ষত করতো?

    এই মেয়ে কি জানে, চাকু দিয়ে সেই মেয়েদের স্তন কেটে ফেলতো এই আফ্রিদির পূর্বপূরুষেরা? কাটা মুরগির মতো শুধু যন্ত্রনায় ছটফট করতো সেই সব অসহায় মা ও বোনেরা?

    আমি জানতাম যে এই মেয়ে তা জানেনা। কারন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ও স্বাধীনতার সেই ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন জিয়া ও এরশাদ সরকার। পরবর্তিতে সেই একই কাজ করেছেন খালেদা জিয়া সরকার।

    তাদের লেখা ইতিহাসে পাকিস্তান বেশ একটা ভালো অবস্থানে ছিলো। তাদের তৈরি ইতিহাসে তারা খারাপ অবস্থানে রেখেছিলো মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করা ভারতকে। এজন্য তারা বেছে নিয়েছিলো ধর্মটাকে বর্ম হিসেবে।

    দুই তিন প্রজন্ম সেই ভুল ইতিহাসের মধ্যেই পাকিস্তানকে ভালোবেসে বেড়ে উঠেছে। কাদামাটির মতো তাদের নরম মনে তৈরী করে নিয়েছিলো পাকিস্তান প্রেমের মতো দানব ভাস্কর্য।

    আজ জাতীয় ক্রিকেট দলের মুশফিকুর রহমান তার ব্যাট নিলামে তোলেন দেশের করোনা কালীন দুর্যোগে মানুষের পাশে দাড়াতে, অথচ সেই ব্যাট কেনা আফ্রিদির জয়গান গাইছে আমার দেশের সেই সব পাকিস্তান প্রেমীরা। এদের কাছে নিজ দেশের ক্রিকেটারের এই অবদান বাহবা পায়না, পায় পাকিস্তানের সেই শহিদ আফ্রিদি।অথচ এরাই আবার জয়গান গাইছে অন্য দেশের নিলামে বল ব্যাট বিক্রি করা খেলোয়াড়দের।

    আমাদের এবার সময় এসেছে, সেই সময়ের কাদামাটি দিয়ে গড়া এই পাকিস্তান প্রেম নামক ভাস্কর্যটি ভেঙ্গে ফেলবার। সময় এসেছে ধর্মের নামে আফিমের নেশা থেকে এদেশের মানুষকে সুস্থ্য ও সত্যের জীবনে ফিরিয়ে আনবার। নয়তো কিছুদিন আগে কপালে বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে নতজানু হয়ে পাকিস্তানের পতাকা চুম্বনের মতো ঘটনা করোনার মহামারির চেয়েও দ্রুত ছড়াতে থাকবে।

    মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এই সকল প্রজন্মের কাছে পৌছে দিতে হবে, সেই সাথে পৌছে দিতে হবে ৭১ সালে পাকিস্তানীদের সেই অমানুষিক ও পৈশাচিক অত্যাচারের ঘটনাগুলো।

    প্রকৃতপক্ষে ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়তে হলে, পাকিস্তান কে তার কৃত অপকর্মের জন্য ঘৃনা নিয়েই এদেশের মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে, যেভাবে বিশ্ব এগিয়ে গেছে নাৎসীদের প্রতি তীব্র ঘৃনা অন্তরে পোষন করে।

    এইচ রহমান মিলু: লেখক ও সমাজকর্মী

    পূর্বপশ্চিম- এনই

    মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
    • সর্বশেষ
    • সর্বাধিক পঠিত
    close