• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

সেলুলয়েডে মহামারী: ভাইরাস সমাচার

প্রকাশ:  ১৬ মে ২০২০, ২০:২১ | আপডেট : ১৬ মে ২০২০, ২০:২৫
অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী
অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী

সুনীল সৌকর্যের রত্নাধার এ ধরিত্রী তার বিষবাষ্প সব শুষে নিয়ে প‌্রকৃতিকে করে তুলেছে স্বচ্ছ স্নিগ্ধ সুষমামন্ডিত দূষণবর্জিত এক ভূ-স্বর্গ। পরিশুদ্ধ প‌্রকৃতি স্বরুপে স্ব- নিয়মে- স্বমহিমায় মেলে ধরেছে নিজেকে। অথচ প‌্রকৃতির এমন বাহারিরুপে সৌন্দর্য পিয়াসী সেরা জীব মানুষ আজ গৃহাভ্যন্তরে স্বেচ্ছা কারাবন্দী। ইট পাথরের মূর্তিমান দালান কোঠাও ঠায় দাঁড়িয়ে; কোথাও কোনো সাড়া নেই শব্দ নেই। শুধুই অদৃশ্য এক অনুজীব করোনা ভাইরাস দখল করে নিয়েছে বিশ্ব-রাজত্ব। দাপুটে এক হিংস‌্র প‌্রতাপশালী শাসকের ভূমিকায় আবির্ভূত করোনা দানবীয় মূর্তিতে পুরো গ‌্রহটিকে কুক্ষিগত করে যেনো খুবলে খুবলে খেয়ে চলেছে। বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী, গবেষক-চিকিৎসকদের সব জ্ঞান গরিমাকে ধুলিসাৎ করে দিয়ে নিজের রুদ‌্রমূর্তিকে করেছে স্ব-প‌্রকাশিত। নির্মল পৃথিবীর নির্মল প‌্রকৃতি এখানেই তার নিজের সৌন্দর্য মহিমাকে অক্ষুন্ন রাখতে অপারগ। দারুণভাবে বিধ্বস্ত! বিধ্বংসী এক অদৃশ্য মারণাস্ত্র নভেল করোনা।

ভাইরাস বিজ্ঞানীরা যুগে যুগে তাঁদের মনন মেধাকে নিয়োজিত করেছেন নতুন নতুন ভাইরাসের গতি প‌্রকৃতি ধরণ ও বিস্তারের প‌্রেক্ষাপটে নব নব কৌশল পদ্ধতি আবিষ্কার করে। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কারের মহিমায় পরাজিত হয়েছে বহুমাত্রিক প্লেগ থেকে শুরু করে সার্স , মার্ , কলেরা , গুটিবসন্ত, ইবোলার মতো ভয়ঙ্কর ভাইরাস। জীবন জিতেছে। পৃথিবীতে মানুষের বসবাস নিশ্চিত হয়েছে।

আমেরিকা, ইউরোপ, যুক্তরাজ্যে প‌্রতিনিয়ত মৃত্যুর গাণিতিক হিসেব প‌্রত্যক্ষ করে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। বিশ্বে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে হু হু করে , বাংলদেশেও বেড়ে চলেছে মৃত্যুহার। থেমে নেই দেশে দেশে ভাইরাসটি নিয়ে নানামাত্রিক গবেষণা। ইতিমধ্যে নভেল করোনার Type - ABC সম্পর্কে ধারণা পওয়া গিয়েছে । ভাইরাসটি প‌্রতিনিয়ত বিবর্তনের মাধ্যমে তার মারণী শক্তিকে অধিকতর বিধ্বংসী রুপে রুপায়িত করে দাপিয়ে কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

চলমান মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত পৃথিবীর অভিশাপ খ্যাত কোভিড -১৯" এর উৎপক্তি, বিস্তার , গবেষণা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক থাকলেও ভাইরাস শিকারীরা বলছেন অন্যকথা। নিয়ত মানবকল্যাণে নিয়োজিত তাঁদের ফ‌্রেম ওয়ার্কের আওতায় পূর্বাপর বিবেচনায় অনাগত, সম্ভাব্য পরবর্তী মহামারী নিয়ে গবেষণা ও ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন এইসব বিজ্ঞানীরা। এরই অংশ হিসেবে ২০১৩ সালে একদল ভাইরাস শিকারি চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমের ইউনান প‌্রদেশের চুনাপাথরের গুহাগুলোতে বাদুড়ের ওপর অনুসন্ধান চালান। ২০১৩ সালের ওই অনুসন্ধানে চীনের গুহা থেকে এমনই একটি ভাইরাস পাওয়া গিয়েছিলো যা কোভিড-১৯ " এর প‌ূর্বপুরুষ ছিলো বলে ধারণা করা হয়। নতুন ভাইরাস ও মহামারী শনাক্তকরণ বিশেষজ্ঞ আমেরিকান এনজিও ইকো হেলথ অ্যালায়েন্সের সভাপতিত্ব করা পিটার দাশাক বলেন, "আমরা বাদুড়ের মুখ থেকে লালা ও বিষ্ঠা সংগ‌্রহ করেছিলাম , যা থেকে প‌্রায় ৫০০টি নতুন করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা যায়। এর মধ্যে একটি ২০১৩ সালে চীনের একটি গুহায় পাওয়া গিয়েছিলো, যা কোভিড-১৯এর সম্ভাব্য প‌ূর্বপুরুষ ছিল"। সংগৃহীত: সিএনএন (বণিক বার্তা, ২৮ এপ‌্রিল , পৃ: ০৩)।

"অন্ধ হয়ে থাকার সুযোগ নেই" শীর্ষক শিরোনামে প‌্রকাশিত আমেরিকার ইয়েল ইউনিভারসিটির মেডিসিন অব হিস্ট‌্রির প‌্রফেসর ফ‌্রাঙ্ক স্নোডেনের বিখ্যাত গ্রন্থ" এপিডেমিকস এন্ড সোসাইটি : ফ‌্রম ব্ল্যাকডেথ টু দ্য প‌্রেজেন্ট ""এ তিনি বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে বলেছিলেন, " সার্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সোয়াইন ফ্লু বড় কিছুর ড‌্রেস রিহার্সাল মাত্র ; এর চেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারী আসছে।" ডার স্পিগেল সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করেছিলেন , আপনি কোভিড - ১৯ এর মতো কিছুর কথা চিন্তা করেছিলেন? স্নোডেন জবাবে " হ্যা অবশ্যই "বলেছিলেন । আরো বলেছিলেন, ""আর এটা কেবল আমি একমাত্র নয়, যে এমন ভাইরাসজনিত মহামারীর আশঙ্কা করছিলাম । ভাইরোলজিস্ট ও এপিডেমিওলজিস্টরা বারবার বিশ্বকে এ নিয়ে সতর্ক করেছিলো। আমি নিজেকেই প‌্রশ্ন করেছিলাম , ""এমন অন্ধ হয়ে কীভাবে থাকা যায়"?

বর্ষীয়ান মেধাবী এই বিজ্ঞানী ইতালিতে এখনও গবেষণার কাজে রত এবং আরো উল্লেখ করার মতো বিষয়টি হলো, তিনি বর্তমানে নভেল করোনা" ভাইরাসে আক্রান্তও বটে । তিনি কলেরা বিস্তার রোধে ১৮৫১-১৯১০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কথা বলেন এবং কোয়ারেন্টাইন ও ভ‌্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেন। ভাইরাস বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প‌্রমাণিত যে , এভিয়েন ফ্লু থেকে সার্স ও ইবোলা থেকে করোনা ভাইরাস পর্যন্ত এসব রোগ এসেছে জেনেটিক স্পিলওভার (মেরুদন্ডী প‌্রাণী থেকে মানুষে যেসব রোগ স্থানান্তরিত হয় ) থেকে । অবশ্য স্নোডেন হতাশ নন মোটেই , তিনি আশাবাদী বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনের বিষয়টিতে ( বণিক বার্তা , ৩০ এপ‌্রিল ) ।

যুগ যুগান্তের ইতিহাস ঘাটলে যেমন ভাইরাস সম্পর্কিত নতুন নতুন তথ্যের সন্ধান মেলে তেমনি এসব বিষয়ে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্হাগ‌্রহণের লক্ষ্যে দেশে দেশে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয়েছে মহামারীর মুভি , চলচ্চিত্র ; সেলুলয়েডেও যার অসংখ্য প‌্রমাণ মেলে। তেমনি টান টান উত্তেজনার উল্লেখযোগ্য একটা মুভি হলো ""চেন্নাই বনাম চায়না " , ২০১১ সালে এটি নির্মিত হয়েছিলো ঠিক এমনই এক মহামারীর প‌্রেক্ষাপটে। যেখানে প‌্রদর্শিত মুভিটিতে তুলে আনা হয় , ধরা পড়ে যাওয়া ভারতীয় নাগরিক যিনি পেশায় একজন প‌্রফেসর তিনি চায়নার হয়ে টাকার লোভে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন। মুভির নায়কের নানামুখী প‌্রশ্নের জবাবে প‌্রফেসর মানবতাবিরোধী ভয়ঙ্কর Operation Red " নামে এক Bio War" এর ধারণা দিয়ে যাচ্ছিলেন। বলা হচ্ছিলো , "বন্দুক নেহি , রকেট নেহি , it"s a Virus"। এমন এক প‌্রাণঘাতী ভাইরাস যেটি পুশ করা হয়েছিলো এক কুকুরের দেহে , কুকুরের চিকিৎসায় সংক্রমিত ডাক্তার , ডাক্তার যখন তার ফুটফুটে শিশু কন্যাটিকে আদর করছিলেন সেভাবে সংক্রমিত হয় কন্যাটি একইভাবে পর্যায়ক্রমে কন্যাটির সংস্পর্শে আসা তার বন্ধুরা একের পর এক সংক্রমণ হতেই পড়ে পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এভাবে ২৪ ঘন্টায় পুরো দেশ সংক্রমিত হয়ে মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় মুভিটিতে।

উলফ গ্যাং পিটারসন পরিচালিত চলচ্চিত্র " আউট ব‌্রেক", মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৯৫ সালের ১০ মে। আফ‌্রিকার ইবোলার ভয়ঙ্কর তান্ডবের প‌্রক্ষাপটে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিলো । চলচ্চিত্রে চিত্রায়িত ঘটনা অনুযায়ী, আফ‌্রিকার কঙ্গো থেকে ইবোলা ভাইরাস "মোটাবাতে " আক্রান্ত একটি বানর চোরাইপথে জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসে। বানরটি কোনোভাবে এক ব্যক্তিকে আঁচড় কেটে ফেলে! ব্যস! শুরু হয়ে যায় সংক্রমণ। ভাইরাস মোটাবা" ছড়িয়ে পড়ে সারা শহরজুড়ে , মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে চলেছে ক্যালিফোর্নিয়াসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্র। আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ। মৃত্যুর মিছিল যখন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এমন অবস্হায় শুরু হয় লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা। কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয় আক্রান্ত সবাইকে; মেডিক্যাল ক্রাইসিস চরমে পৌঁছে ; প‌্রতিষেধক তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা দিনরাত একাকার করে ঘাম ঝরিয়ে চলেছেন। কীভাবে মুক্তি মিলবে ভাইরাস মোটাবা" থেকে। রিচার্ড প‌্রিস্টনের লেখা বই "দ্য হট জোন" অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র এটি।

"চিলড‌্রেন অব মেন" বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর আরেকটি অনবদ্য মহামারীর ছবি; যেখানে দুনিয়ার সব নারী গর্ভধারণের ক্ষমতা হারিয়েছেন । ১৮ বৎসর যাবৎ পৃথিবীতে নতুন কোনো মানব শিশু জন্মলাভ করেনি। অন্যদিকে অজানা এক ভাইরাসজনিত কারণে সব মানুষ পাগল হতে থাকে । এহেন উত্তেজনাপূর্ণ সংকটময় পরিস্হিতিতে সদ্য গর্ভবতী এক নারীকে বাঁচানোর প‌্রয়াস থেকে চলচ্চিত্রটির কাহিনী এগুতে থাকে ( বণিক বার্তা , ২০ এপ‌্রিল এবং প‌্রগুক্ত, ০৪ মে )।

বিজ্ঞান বড়ো বিস্ময়! সভ্যতা যতো বিকশিত হয়েছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ততো অগ‌্রসর হয়েছে। প‌্রযুক্তির অভিযোজন ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষ নিজেকে যেমন বাঁচিয়েছে তেমনি সাজিয়েছেও মনের মতো করে। বিপর্যয়ও যে আসেনি তা কিন্ত নয়। তারপরও বিজ্ঞানের যুগে বৈজ্ঞানিক গবেষণার অনুপুঙ্খ ইতিবাচকতাকে আমরা স্বাগত জানাই। নতুন আবিষ্কার, নতুন শব্দভান্ডারেও ইদানিংকালে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা ভাষা-সাহিত্য। এই সময়কার বহুল উচ্চারিত-আচরিত শব্দগুলো হচ্ছে, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, স্যানিটাইজার, সামাজিক দূরত্ব, লকডাউন, পিপিই, হটস্পট, রেডজোন, প্যানডেমিক ড‌্রিম আরো কতো কী! এসবই থেকে যাবে মহাকালের হিসেবের খাতায়; প‌্রজন্মের উত্তরাধিকারীরা ধীরে ধীরে এসবের সাথে পরিচিতই শুধু নয় প‌্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেবে নিজেদের সুরক্ষায়।

জয়ী হওয়ার ইচ্ছে মানুষের সহজাত প‌্রবণতা ; হেরে যাওয়া স্বাভাবিক হলেও স্বভাবগত নয়। জয়ের নেশা বাঙালির মননে মানসে অস্থি-মজ্জায়, শিরা-উপশিরায় প‌্রবাহিত। একাত্তরে বীর বাঙালি মাত্র নয় মাসে সুগঠিত পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছে , হারেনি নিজেরা। কোনো প‌্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারে না, পারবে না। থমকে দাঁড়িয়েছে , হঠাৎ চমকে গিয়েছে কিন্ত পরাজিত হয়নি। "অমৃতের সন্তান" "মানুষ এভাবেই প‌্রতিরোধে-প‌্রতিষেধকে প‌্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ‌্রহণ করে জয়ী হবে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে।

লেখক: অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক পরিষদ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএস

অধ্যাপক মালেকা আক্তার চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close