• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

প্লাজমা থেরাপি আশার আলো হতে পারে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন

প্রকাশ:  ১৪ মে ২০২০, ০১:১৭
ফারহানা নীলা

Convalescent Plasma Therapy ( কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি) কোভিড১৯ আক্রান্ত রোগীর জন্য একটি আশার আলো হতে পারে।ইতোমধ্যেই আমরা অনেককে হারিয়েছি। সিএমএইচে একজন রোগীর জন্য AB positive কনভালেসেন্ট প্লাজমা প্রয়োজন ছিল। রোগী মারাত্মক ঝুঁকিতে তখন। তিনি আমাদের একজন ডাক্তার। কিন্তু খোঁজ করে রাত এগারোটার পর ডোনার পাওয়া গেলো। সব কিছু ঠিক করে প্লাজমা নিতে যে সময় প্রয়োজন, সেই সময় তখন আর হাতে নেই। রাত দুটোর দিকে তিনি মারা যান। তিনি ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা আবুল মুকারিম। তিনি কোভিড পজেটিভ ছিলেন। আমরা তাঁকে ফেরাতে পারিনি জীবনে। আমরা শোকাহত।

ডোনার পেয়ে প্লাজমা থেরাপির সময়টা তখন বিশাল দীর্ঘ মনে হলো।

অথচ যদি আমরা প্লাজমা ব্যাংক তৈরি করে রাখতে পারি, তাহলে অল্প সময়েই প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ করা যাবে। দ্বারে দ্বারে ডোনারের জন্য ঘুরতে হবে না। সময় নষ্ট হবে না। একজন মারাত্মকভাবে আক্রান্ত রোগীর জন্য সময়টা বিশাল। কালক্ষেপণ করার সময় থাকে না।

যারা ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছেন, তারাই কেবল এই প্লাজমা থেরাপির ডোনার হবেন। অনেকেই সুস্থ হয়ে কাজে ফিরছেন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরছেন। তাঁদের ব্যক্তিগত সদিচ্ছা আর সহমর্মিতা এখন খুব প্রয়োজন। প্রতিদিন আক্রান্ত সংখ্যা বাড়ছে। গত চব্বিশ ঘন্টায় আজ সর্বাধিক আক্রান্ত। ১১৬২ জন সনাক্ত আজ। মারা গেছেন ১৯ জন।

মানুষ বাজারে বাজারে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরছে। মানুষ লক ডাউন মানছে না। ভয়ও আর পাচ্ছে না। আক্রান্ত আর মৃত্যুর মিছিল ক্রমশ বড় হচ্ছে। ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আক্রান্ত হয়ে তারাই আবার হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরছেন। চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ছে।

অন্যান্য সব চিকিৎসার সাথে আগামী শনিবার ১৬ মে ২০২০ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগে শুরু হচ্ছে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি।

গত ১৮/০৪/২০২০ তারিখে পাঁচ সদস্যের একটি টিম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মারাত্মক ঝুঁকি পূর্ণ রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটি প্রটোকল তৈরী করেন। এথিকাল অনুমতি দেওয়ায় শুরু হচ্ছে কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি।

Convalescent plasma therapy in severely & critically ill COVID19 patients : a randomized clinical trial to observe the efficacy &Safety.

.কমিটিতে যারা কাজ করেছেন....

প্রফেসর ডা এম এ খান

প্রফেসর ডা মাজহারুল হক তপন

প্রফেসর ডা আহমেদুল কবির

প্রফেসর ডা সাইফ উল্লাহ মুন্সী

প্রফেসর ডা মোজাফফর হোসেন

এই প্রটোকল তৈরি করে প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে থাকছেন প্রফেসর ডা. মাজহারুল হক তপন।

কো- ইনভেস্টিগেটর হিসেবে থাকছেন....

প্রফেসর ডা এম এ খান

প্রফেসর ডা আহমেদুল কবির

প্রফেসর ডা সাইফ উল্লাহ মুন্সী

প্রফেসর ডা মো মোজাফফর হোসেন

ডা কাশফিয়া ইসলাম

ডা পঙ্কজ কান্তি দত্ত

ডা মাফরুহা আকতার

ডা এবিএম আল মামুন

কনভালেসেন্ট প্লাজমা এন্টিবডি টাইট্রেশন করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কেয়ার স্মাইল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের স্বত্বাধিকারী ডা ফাতেমা তুজ জোহরা ক্যামেলিয়া।

ডোনার পুল গঠনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন #FDSR

কিভাবে আমরা প্লাজমা ব্যাংক তৈরি করবো?

প্রথমেই ডোনার সিলেকশন।

যারা কোভিড১৯ আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে গেছেন তারা শুধু মাত্র তাদের রক্তের সাদা জলীয় অংশ দান করবেন।

এ্যাফেরেসিস মেশিনের মাধ্যমে নেওয়া হবে এই সাদা অংশ। প্রয়োজন হলে রেফ্রিজারেটেড সেন্ট্রিফিউজ মেশিনের মাধ্যমেও নেওয়া যেতে পারে( যদি এ্যাফেরেসিস মেশিন না থাকে)

১. প্লাজমা দান করার পূর্বে ২৮ দিন স্বাভাবিক তাপমাত্রা এবং উপসর্গ বিহীন যারা

অথবা ২. উপসর্গ চলে যাবার ১৪ দিন পর RT- PCR টেস্ট পর পর দুবার নেগেটিভ হলে( একদিনের ব্যবধানে)

প্রত্যেকের কাছ থেকে লিখিত সম্মতি পত্র নিতে হবে।

কারা প্লাজমা দান করতে পারবেন?

১. বয়স ১৮ বছর এবং তদূর্ধ্ব

২. কোভিড১৯ পজিটিভ টেস্ট রিপোর্ট

৩.সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ

৪.পুরুষ ডোনার। মহিলা হলে কখনো অন্তঃসত্ত্বা হননি এমন কেউ।

৫. ডোনারের এন্টিবডি টাইটার ১ঃ১৬০ বা আরো বেশী

৬.রক্তদাতা হিসেবে অন্য সকল উপযোগিতা

কারা দেবেন না?

১. যারা সম্মতি দেবেন না। স্বেচ্ছায় ডোনার হিসাবে নিজেকে আনছেন না।

২. রক্তদাতা হিসেবে সকল শর্ত পূরণের ঘাটতি আছে

৩. যাদের কাছ থেকে প্লাজমা নেওয়ার পদ্ধতি ঠিকমত কাজ করছে না।

এরপর ডোনার স্ক্রীনিং-এ

**********

১. এন্টিবডি ডিটেকশন এবং টাইট্রেশন

২.ব্লাড গ্রুপিং ( ABO &Rh)

৩. মাইনর ক্রসম্যাচিং

৪.স্ক্রীনিং (হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, এইচ আই ভি,ম্যালেরিয়া,সিফিলিস)

সংগৃহীত প্লাজমা.... প্লাজমা ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হবে।

কাদের জন্য এই প্লাজমা থেরাপি?

১. বয়স ১৮ বছরের বেশী

২.RT-PCR পজিটিভ

৩. তীব্র শ্বাসকষ্ট ( মিনিটে ৩০এর বেশী রেসপিরেটরি রেট)

৪.SPO2 ৯৩% এর নীচে ( হাসপাতালে ভর্তি) অথবা মারাত্মক নিউমোনিয়া

৫.যারা আগ্রহী

ফলো আপ করতে হবে... D1,D3,D7,D14,D28

কাদের জন্য এই প্লাজমা থেরাপি প্রযোজ্য হবে না?

১. পূর্ববর্তী এলার্জিক রিয়াকশনের ইতিহাস আছে

২.যাদের মারাত্মক অন্যান্য অসুখ আছে.... মারাত্মক হার্ট ফেইলিউর, ক্রনিক লিভার ডিজিজ, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ

৩. অন্তঃসত্ত্বা বা ব্রেস্ট ফিডিং মা।

একজনের থেকে ৪০০ মিলি প্লাজমা নেওয়া হবে।

২০০ মিলি এক ডোজ।

প্রথম দিন ২০০ মিলি দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ এক ঘন্টার মধ্যে পরিসঞ্চালন করতে হবে।

প্রয়োজন হলে তৃতীয় দিন আরো এক ডোজ মানে ২০০ মিলি দিতে হতে পারে যদি উপসর্গের উন্নতি না হয়।

আমরা বাঁচার জন্য ডুবন্ত পানিতে খড়কুটো আঁকড়ে ধরছি। আমরা আর একটি প্রাণও ঝরতে দিতে চাই না। আমরা জানি একটি জিনোম সিকোয়েন্সিং হয়েছে। আরো হবে ইনশাআল্লাহ।

ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকিয়ে দেবার জন্য আমাদের ব্যক্তি সচেতনতা জরুরী। নিজেদের আবদ্ধ রাখতে হবে ঘরে। নিজের হাতই এখন বড় শত্রু। এই শত্রুকে পরাভূত করতে বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। কোভিড১৯ থেকে বাঁচার প্রথম ধাপ প্রতিরোধ। প্রথম চিকিৎসাও প্রতিরোধ। আর প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা আর সাবধানতা।

তারপরও চিকিৎসার জন্য তাকিয়ে আছে জীবন।

আমার/ আপনার কাছে করুণ আকুতি নিয়ে কাঁদছে জীবন।

প্লাজমা থেরাপির জন্য আমাদের প্রয়োজন প্লাজমা ব্যাংক তৈরী রাখা।

আর সেটা তখনই সম্ভব যখন আপনি সুস্থ হয়ে অনুধাবন করবেন অসুস্থ কারো ব্যথা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ আপনাদের জন্য অপেক্ষায় আছে। ডাক্তাররা তৈরী.... ডোনার হিসাবে আপনি তৈরী তো!

আসুন আমরা সবাই এই যুদ্ধে শামিল হই। যুদ্ধ জয়ের গল্পটাতে আমরাও থাকি জীবনকে আর মানুষকে ভালবেসে। জীবনের জন্য জীবন.... আপনার সহমর্মিতার হাতটা বাড়িয়ে দিন জীবনের জন্য।

যারা এগিয়ে আসবেন, যারা ডোনার হবেন.... তাঁদেরকে সাধুবাদ। আপনারা জীবনের কাছে নমস্য।

লেখক: ফারহানা নীলা চিকিৎসক ও কবি।


পূর্বপশ্চিমবিডি/ওআর

ফারহানা নীলা,প্লাজমা থেরাপি,ডোনার
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close