• বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

‘স্যালুট’ সময়ের সাহসী যোদ্ধা আমাদের চিকিৎসকেরা

প্রকাশ:  ১০ এপ্রিল ২০২০, ০১:১৩ | আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২০, ০১:১৮
অধ্যপক মালেকা আক্তার চৌধুরী
অধ্যপক মালেকা আক্তার চৌধুরী

লেখাটি যখন আমার হাতে ঠিক তার দু’দিন আগেই অর্থাৎ ০৭ এপ্রিল, বিশ্বস্বাস্থ্য দিবসটি পালিত হলো --- অত্যন্ত অনাড়ম্বর অনানুষ্ঠানিক এবং সর্বগ্রাসী বিষন্নতার প্রেক্ষাপটে। প্রাত্যহিক জীবনে সুস্থতা যেমন বড়ো একটা নেয়ামত তেমনি অসুস্থতায় নেমে আসে হতাশার দীর্ঘশ্বাস। তাই সঠিকভাবে ভরপুর জীবনের জন্য সুস্থ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। কিন্ত এমন একটি সময়েই তাবৎ বিশ্বে চলছে স্মরণকালের ভয়াবহতম প্রাণঘাতী করোনার" মহাদুর্যোগের মহারণ। করোনার করুণা সহজে কেউ পাচ্ছে না, দোর্দন্ড প্রতাপে ভৌগোলিক রাজনৈতিক সীমা রেখাকে অতিক্রম করে গ্রাস করে চলেছে রাষ্ট্রের পর রাষ্ট্র, অঞ্চলের পর অঞ্চল। বিজ্ঞান- গবেষণা, বুদ্ধি - বিবেচনা, চিন্তা - চেতনা সবকিছুকেই হতবিহবল করে দিয়ে সে তার বিষধর - বিস্তার সুরক্ষিত করে চলেছে ।

জাতিসংঘের প্রতিনিধিত্বশীল এ সংস্থাটি বিশ্ব জনস্বাস্থ্য সচেতনতা ও সুস্থতা রক্ষা নিশ্চিত করতে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রতিবছর সংস্থাটির প্রতিপাদ্য বিষয়ে এমন কিছু ম্যাসেজ থাকে যা বিশ্ববাসীর স্বাস্থ্যসেবায় অত্যন্ত গুরুত্ববহ। দেখা যাচ্ছে ১৯৫০ সালে দিবসটির প্রথম প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো " Know Your Health Services ", কাকতালীয় হলেও প্রতিপাদ্যটি আজকের প্রেক্ষাপটে মিলে যাচ্ছে। নভেল করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে আজকের বিশ্ব সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ইচ্ছা - অনিচ্ছার সীমা অতিক্রম করে নিজে বাঁচতে, প্রিয় বিশ্বকে বাঁচাতে।

বিদ্যমান সময়ের মহাক্রান্তিকালে বিশ্ব অতিক্রম করছে ভয়ানক এবং অনিবার্য এক সংকটাপন্ন স্তব্ধ জমাটবাঁধা অদ্ভুত এক আঁধারের গলিপথ। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত মানবজাতি স্মরণকালের যে কোনো সময়ের মহামারীর তুলনায় বড়ো বেশি আতঙ্কিত - বিষাদগ্রস্ত। আতঙ্কের মাত্রাতিরিক্ত পরিস্থিতি মানুষকে ভীতিকর অবস্থায় কোনঠাসা করতে করতে পুরো বিশ্ববাসীকে নিরতিশয় লকডাউনের সংস্কৃতিতে নিপতিত করেছে।

অবস্থা - প্রেক্ষাপট কোথাও কোথাও ব্যতিক্রম থাকলেও আজকের এই নির্মম বাস্তবতায় নায়কোচিত বীরের ভূমিকায় থেকে সম্মুখ যুদ্ধে করোনাকে " রুখে দেবার মানসে মোকাবেলা করে যাচ্ছেন শত শত হৃদয়বান ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মীগণ। সেবার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যারা চিকিৎসা সেবার মতো মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেছেন, তাদের বীরোচিত - ঝুঁকিপূর্ণ ত্যাগ জাতি সারাজীবন শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করবে। পত্রিকার পাতা সয়লাব আজ করোনা " করোনা " উচ্চারণে আর তার বিরুদ্ধে কঠিন যোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত বীর সন্তানদের যুদ্ধ চালিয়ে নেবার গল্পে। আইইডিসিআর এর পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদেরকেও জাতি সম্মান এবং শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে। মানুষ মানুষের জন্য " এই স্লোগান আজ সকলের। দেখা যাচ্ছে, দেশে - বিদেশে অবসর প্রাপ্ত চিকিৎসকেরাও হাত গুটিয়ে বসে নেই, নিজ দায়িত্বে, স্বপ্রণোদিত হয়ে আপন পেশায় ফিরে এসেছেন কোনোরকম " লাইফ সেভিং ডিভাইস "ছাড়াই ।

সময়ের সাহসী যোদ্ধা আমাদের চিকিৎসকেরা। মানবতা - মানবিকতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ; পরিবার - পরিজন ছেড়ে, জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে, দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব সচেতন হয়ে দিনরাত করোনা আক্রান্তদের সেবা করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ সম্মানিত চিকিৎসক রয়েছেন যারা সেবা শেষে বাড়ি ফিরে নিজগৃহে স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টাইনে সময় কাটাচ্ছেন। প্রিয় স্বামী সন্তানদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকছেন। কেউ বা দায়িত্ব পালনের জন্য নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করে পরিজন থেকে রয়েছেন বহুদূরে, দুশ্চিন্তা বাসা বেঁধেছে সেইসব পরিবারেও। মহান সৃষ্টিকর্তা সবাইকে সুরক্ষা দান করুন -।

পর্যটন সমৃদ্ধ নগরী ইতালি আজ ভুতুরে এক মৃত্যুপুরী। সেখানেও সুরক্ষা সামগ্রীর সংকটে প্রাণ দিয়েছেন অসংখ্য মানবপ্রেমী চিকিৎসক। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের অধিনায়ক ( ইতালি) ফ্যাবিও ক্যানাবারো যিনি বর্তমানে কোচিং সূত্রে চীনে অবস্থান করছেন; তিনি বলেন, এ সময়ের সংকটে সম্প্রীতির কিছু নিদর্শন আমাদের চমৎকৃত করেছে। " আন্দ্রা টাট্টো বেনে " ( সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে) এসব বলা হচ্ছে ইতালির গৃহবন্দী জনগণের উদ্দেশ্যে। তিনি নিজ দেশের চিকৎসকদের নায়কোচিত বীরত্বের প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘স্যালুট’ জানাতে ভোলেননি। ক্যানবারো দৃঢ়তার সাথে অনুকরণীয় একটি আশ্বাস বাণী ব্যক্ত করেছেন, যেটি হলো - " ব্যক্তিগতভাবে আমরা কেউ ‘সুপারম্যান’ নই, তবে, যখন আমরা এক হই তখন সবকিছুই সম্ভব ।

আমাদের অনুকরণীয়; আমাদের ডাক্তার, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, বিজিবি, গণমাধ্যম, সংবাদকর্মী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অসংখ্য পেশাজীবী সাধারণ জনগণ। গত দু’ তিন দিন আগে বন্দরনগরী নারায়নগঞ্জে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে এক নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, তার সংস্পর্শে আসা ১৮ জন চিকিৎসক রয়েছেন কোয়ারেন্টাইনে সঙ্গনিরোধ অবস্থায়। আইসোলেশনে রয়েছেন সংস্পর্শে আসা আরও একজন ওয়ার্ডবয়। তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিটি স্পর্শকাতর ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে। দীর্ঘশ্বাস ছোটো থেকে বড়ো হচ্ছে প্রতিমূহুর্তে। একের পর এক চিকিৎসকেরা আক্রান্ত হচ্ছেন, আছেন কোয়ারেন্টাইনে, আছেন আইসোলেশনে । নিরাপদ নই আমরা কেউই।

তারপরও যেসব ডাক্তার, স্বাস্থ্য কর্মী নিজের জীবনকে বিপন্ন করে, মানবিক দায়িত্ব নিয়ে অসহায় মানবতার সেবা করে যাচ্ছেন তাদের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবতার মাতা খ্যাত দেশরত্ন শেখ হাসিনা সকৃতজ্ঞ চিত্তে পুরষ্কার - প্রণোদনাসহ সব রকম ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার সময়োচিত বিজ্ঞ সিদ্ধান্তটি চিকিৎসক পরিবার তথা এ পেশায় নিয়োজিতদের মনোবল বৃদ্ধি করে নতুনভাবে উজ্জীবিত করতে সহায়তা করবে। আপনার সুস্বাস্থ্যও আমাদের আন্তরিক কামনা।

সেইসাথে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করে তাদের যথাযথ নিরাপত্তা বিধানও জরুরী। বিভীষিকাময় বিবর্ণ বিশ্বে জয় হোক মানবতার। সকলের সতর্কতা, সক্রিয়তা ও আন্তরিকতায় নিবিড় পরিচর্যা বিহীন ‘কোমায়’ নিপতিত পৃথিবীতে ছুঁয়ে যাক প্রাণস্পন্দন।

জয়তু মানবতা! জয়তু বিশ্ব চিকিৎসক সম্প্রদায়৷৷

লেখক:অধ্যপক মালেকা আক্তার চৌধুরী ।

দর্শন বিভাগ ও সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষক পরিষদ।

সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম

করোনা আতঙ্ক,বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস,অধ্যপক মালেকা আক্তার চৌধুরী
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close