• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
  • ||

মেঘের শামিয়ানা টাঙিয়ে চাঁদের তিলক একেঁছে আকাশ

প্রকাশ:  ০৮ এপ্রিল ২০২০, ০০:৫৬
ফারহানা নীলা

আজ বুঝি পূর্ণিমা! চাঁদটা যৌবনবতী, কোনো কলংক তিলক দেখা যায় না। মেঘের শামিয়ানা টাঙিয়ে চাঁদের তিলক এঁকেছে আকাশ। মেঘগুলো ভেসে যায় ভেড়ার পালের মত। এত অসহ্য সুন্দর জোছনা..… আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে। চিলতে বারান্দার দরজাটা আজ খুলে দিয়েছি। গাছগুলো পানির অভাবে কেমন নেতিয়ে গেছে। কোনো যত্নআত্তি নেই আর। নয়নতারা ফুটেছে তবুও! বাহ্...।

অনেকদিন পর বাতাসের হুটোপুটি আমার ঘরে। অনেকদিন পর জোছনার ঢল আমার বিছানায়।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে যৌবনা চাঁদের ছবি তুলি। মনে হয় অদৃশ্য কোনো সূতোয় ঝুলে আছে চাঁদ! ঠিক আমারই মত...।

এই ঘরে থাকার আজ অষ্টম দিন। আমি জীবনের সাথে ঝোলাঝুলি করছি।আমি বেঁচে থাকার জন্য সুতোয় গিঁটের পর গিঁট দেই। ঘরের বাইরে যাবার উপায় নেই। অথচ কেউ আমায় বেঁধে রাখেনি। কেউ আমায় নিষেধ করেনি। রাতের পর রাত জেগে থাকা চোখে লেপ্টে রয়েছে আতংক। আমি খুব সাহস জড়ো করি, আমি ভয়কে তাড়াই ক্রমাগত।

ছোটবেলা থেকেই সাপে খুব ভয় আমার। ঘুমুতে গেলেও যদি সাপের কথা মনে আসে পা দুটো টেনে নেই ভয়ে। মনে হয় সাপ পেঁচিয়ে ধরেছে আমার দুপা। আজকাল আমি টের পাই সাপটা ক্রমশ উপর দিকে উঠছে। একটু একটু করে পেঁচিয়ে নিচ্ছে আমার সর্বাঙ্গ। অসার আমি দৌড়ে পালাতে চাই.... গলার কাছে হিসহিস আওয়াজ। ভয়ে কুঁকড়ে যাই আমি...।

এই বাসায় আমার স্বামী আর তিন বছরের মেয়ে গৌরী আছে। গৌরী রোজ রাতেই মায়ের কাছে ঘুমোবে বলে কান্না করে। বাবা গল্প বলে তবুও গৌরী কাঁদে.… মা! মা! আমি সহ্য করতে পারি না। সজোরে চেপে ধরি কান। একসময় ক্লান্ত গৌরী ঘুমোয়, আমার চাঁদের কণা ঘুমোয়। আমি ওর ঘুমন্ত মুখটাও দেখতে পারি না। ওকে জড়িয়ে একটু আদর করতে পারি না।

তিতাস আমার স্বামী। আমাদের যুগলবন্দী জীবনের বয়স পাঁচ বছর। তিতাসের বাবার পছন্দমতো আমাদের বিয়েটা হয়। আমি তিতাসকে খুব ভালবাসি। কারণ তিতাস আমার প্রথম প্রেম। বিয়ের বছরখানেক পর বুঝতে পারি তিতাসের মনে আর কেউ আছে নিভৃতে,যেখানে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। ঐখানে তিতাস বাঁধ দিয়ে রাখে। যতই জলের তোড়ে ভেসে আসি আমি, বাঁধ পেরোতে পারি না। তিতাস আমাকে কোনো অবহেলা করে না, উপেক্ষাও করে না। আমরা একসাথে সংসার করি খুব সমঝোতায়। এও জানি তিতাস আমাকে ভালও বাসে না। আমাদের কখনো ঝগড়াঝাটি হয় না। মান অভিমান হয় না। আমাদের বসবাস ভীষণ নিস্তরঙ্গ!

আমার প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। আমি লুকিয়ে কাঁদতাম। তারপর গৌরী এলো। আমি একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ল্যাব ইনচার্জ হিসেবে আছি। চাকরি, গৌরী,আর সংসার.... আমার দিন কেটে যায়।

প্রতিরাতে গৌরী ঘুমানোর পর তিতাস আমার ঘরের কাছে আসে। কিছু লাগবে কিনা জানতে চায়। তারপর ঘুমোতে চলে যায়। তিতাসের দায়িত্ব বোধ অনেক বেড়ে গেছে।

যেদিন জানলাম আমি কোভিড ১৯ পজিটিভ, ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম। হাসপাতালে একজন শ্বাসকষ্টের রোগী এসেছিল। নেব্যুলাইজ করা হলো। চিকিৎসা চলছিল। তার আগে টিবি রোগ হয়েছিল, তাও প্রায় দশ বছর আগে। তার কফ টেস্ট করতে ল্যাবে স্যাম্পল এলো। আমি মাইক্রোস্কোপে টিবির জীবাণু খুঁজি। অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে জেনেছি তিনি কেভিড ১৯ পজিটিভ এবং মারা গেছেন।

তারপর থেকে শুরু আমার এই ঘরবন্দী জীবন। প্রথমেই কোয়ারেন্টিনে, তারপর পরীক্ষার পর আইসোলেশনে। গত একমাস ধরেই করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।সবাইকে বাসায় থাকার জন্য বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু আমার তো ছুটি নেই। মাস্ক,গ্লাভস পরেই কাজ করি। কিভাবে যে আক্রান্ত হলাম আমি?

আমার খুব ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। এই ঘরটাতে অনেকগুলো বই। আমি এইকয়দিনেই পড়ে ফেলেছি সাতকাহন, লোটাকম্বল। মোটা মোটা বই... আগেও পড়েছি। আবারও পড়লাম। একসময় খুব দীপাবলি ভর করেছিল আমার উপর। কাল সকালে পদ্মা নদীর মাঝি পড়বো। খুব টানছে বইটা।

শরীরটা খারাপ লাগে। প্রথমে খুব গলা ব্যথা ছিল। কোনো কিছুর ঘ্রান আর স্বাদ পেতাম না। এখন কাশি আর জ্বর। মাঝপথেই শ্বাসকষ্ট, তবে বেশী না। তিতাস রান্না করে দরজার ওপাশে খাবার রেখে যায়। এও ছিল কপালে...তিতাস রাঁধে আর আমি খাই।

আমার খুব তালের শাঁস খেতে ইচ্ছে করছে। তিল ভর্তা দিয়ে গরম ভাত খেতে মন চাইছে। আম্মার কথা মনে পড়ছে খুব। স্কুলে যাবার সময় আম্মা ঘি আলু ভর্তা দিয়ে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিতো। আর আমি খাবো না, খাবে না বলতাম। ঢাকা লকড ডাউন। আম্মা রাজশাহীতে। রাজশাহীও লকড ডাউন। হয়তো আম্মার সাথে আমার আর কোনোদিনই দেখা হবে না।

আমি খুব সাহসী মেয়ে। কিন্তু আমি আর আগের আমাকে খুঁজে পাচ্ছি না।শুরুতে বারবার হাত ধুতে ধুতে আমার শুচিবায়ু রোগের মত হলো। আর এখন ডিপ্রেশনের রোগীর মত...।

গৌরীর জন্য ভীষণ কষ্ট হয়। পৃথিবীটা আর আগের মত থাকবে না। আমি না থাকলেও সব চলবে জানি আমি। তবুও আমার কষ্ট হয়। ছোট বোনটাকে খুব মনে পড়ে। কোলেপিঠে মানুষ করেছি ওকে। তবুও সান্ত্বনা আম্মার সাথে বোনটা আছে।

সকাল হয়ে এলো বুঝি। আলো ফুটতে শুরু করেছে। দরজাটা খোলাই ছিল। আজ ইচ্ছে করেই দরজা আটকে রাখিনি। কোথা থেকে দুটে কবুতর এলো বারান্দায়! রাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনেছি। কবুতর নাকি শান্তির দূত! আমার কেন তবে এমন লাগছে?

শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট.... তিতাস আর গৌরী নিশ্চয় ঘুমে এখনো। তীব্র একটা অভিমান আমাকে ঘিরে নেয়। আমি তিতাসকে ডাকি না।

আমি থাকা বা না থাকা.... তিতাসের জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। আমি জানি সেটা, খুব ভাল করেই জানি। শুধু হয়তো অভ্যস্থতায় একটু ভাটা পড়বে। গৌরীও বাবার সাথে থাকা শিখে গেছে।

টের পাচ্ছি সাপটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছে। আমার পা' দুটো নাড়াতে পারছি না। সাপটা হিসহিসিয়ে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরেছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে.... সাপটা ফণা তোলে। ফণায় নীলকান্তমণি। নীল বিষ আমার সারা শরীর ছেয়ে নেয়।

খুব জোরে আম্মাকে ডাকি..... কোনো শব্দ বের হয় না। বিষগুলো সব আমার ফুসফুসে জমতে থাকে....।

লেখক: চিকিৎসক ও কবি

পূর্বপশ্চিম- এনই/

ফারহানা নীলা
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
close